বিশেষ নিবন্ধ, তন্ময় মল্লিক: ভোট রাজনীতিতে ডানপন্থী দলগুলির জন্য ‘হাওয়া’ একটা বড়ো ফ্যাক্টর। একুশের নির্বাচনে বাংলায় হাওয়া তোলার জন্য বিজেপি মাঠে নামিয়েছিল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট টিমকে। তাতে হাওয়া উঠেছিল জবরদস্ত। সেই হাওয়ায় খসে গিয়েছিল পদ্মের পাপড়ি। তারপর বাংলায় প্রতিটি নির্বাচনে গোহারা হয়েছে বিজেপি। এমনকি, নরেন্দ্র মোদির নিশ্চিত হ্যাটট্রিক আবহেও এরাজ্যে বিজেপির আসন কমে ১৮ থেকে হয়েছে ১২। ছ’মাস আগেও বিজেপি অফিসগুলিতে কর্মীর চেয়ে মাছি থাকত বেশি। তারপরেও বিজেপি জিতলেও জিততে পারে, এমন হাওয়া তৈরিতে মরিয়া গেরুয়া শিবির। এবার বঙ্গ বিজেপির ‘হাওয়া কল’ এসআইআর। তবে, মুসলিমদের পাশাপাশি প্রচুর হিন্দু নাম বাদ যাওয়ায় অনেকেই বলছেন, বিজেপির ‘হাওয়া কল’ দিয়ে এবার গরম হওয়া বেরবে। সেই গরমে ফোটার আগেই ঝলসে যাবে পদ্ম!
চারদিন পর এরাজ্যে প্রথম দফার ভোট। কমিশনের ‘খরচের খাতায়’ চলে যাওয়া ভোটাররা এবার ভোট দিতে পারবেন না, তা একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। যদিও দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে ট্রাইবুনালের বিচারে যাঁরা বৈধ ভোটার বলে বিবেচিত হবেন, তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। একথা ঠিক, সুপ্রিম কোর্ট বাংলায় ভোট চুরি ঠেকাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। তারপরেও ট্রাইবুনালে আবেদনকারীদের মধ্যে কতজন ভোট দিতে পারবেন বা আদৌ পারবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। কারণ রায় বাস্তবায়িত হয় সদিচ্ছার উপর। জ্ঞানেশ কুমারের সেটা নেই।
বাংলায় একটা কথা আছে, আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও। কাউকে কিছু শেখাতে গেলে নিজেকে আগে সেটা মানতে হয়। কিন্তু, নির্বাচন কমিশন সেটা মানছে না। শুনানি পর্বে সুপ্রিম কোর্ট বারবার বলেছে, নাম বাদ দিলে জানাতে হবে তার কারণ। অথচ কমিশন নাম বাদের কারণ জানায়নি। বিরোধীদের অভিযোগ, নাম বাদ দেওয়ার মতো যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই বলেই কমিশন জানাচ্ছে না। নিজেদের খুশিমতো ভোটারদের নাম কাটছে, অফিসারদের বদলি করছে।
বিরোধীদের এই অভিযোগ মান্যতা পেয়েছে ফরাক্কার কংগ্রেস প্রার্থী মহতাব শেখের নাম বাতিলের ঘটনায়। মহতাব সাহেবের পাসপোর্ট ছিল। তা সত্ত্বেও তাঁর নাম বাতিল করে দিয়েছিল কমিশন। বিষয়টি তিনি সুপ্রিম কোর্টের নজরে আনেন। তাঁর নথি যাচাই করে আদালত জানিয়েছে, মহতাব সাহেব এদেশের বৈধ নাগরিক। তাই তাঁর ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, মহতাব শেখকে অন্যায়ভাবে ‘বে-নাগরিক’ করা হয়েছিল। প্রশ্ন উঠছে, এর দায় কার? নির্বাচন কমিশনের, নাকি যাঁরা তথ্য যাচাই করেছেন তাঁদের?
এসআইআর করে বাংলার লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়াকে বিজেপি নেতৃত্ব তাদের জয় বলে মনে করছে। তারা প্রচার করছে, তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের ভোটের ব্যবধান যত ছিল এসআইআর করে তার থেকেও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে বিজেপির ক্ষমতা দখল সময়ের অপেক্ষা।
একথা ঠিক, এসআইআরের নামে কমিশন রীতিমতো গা জোয়ারি করে বাংলার লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছে। তাতে বিজেপির কি সত্যিই খুব লাভ হবে? পরিসংখ্যান বলছে, বাংলায় প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। এর মধ্যে প্রকৃত ভোটারের সংখ্যাটা কত দেখা যায়। প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম বিচারাধীন ছিল। তার মধ্যে সাড়ে ৩২ লক্ষের কিছু বেশি ভোটারের নাম বৈধ বলে কমিশন স্বীকার করে নিয়েছে। বাদ গিয়েছে ২৭ লক্ষ ১৬ হাজারের মতো নাম।
ধরে নেওয়া যাক, এঁরা প্রত্যেকেই ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। এছাড়াও আরও সাত লক্ষ আবেদন ট্রাইবুনালে জমা পড়েছে। এই সাত লক্ষ মূলত খসড়া তালিকা থেকে বাদ যাওয়া
ভোটার। তাহলে বাংলা থেকে প্রকৃত ভোটার কত বাদ গেল? ৩৪ লক্ষ ৩৫ হাজার। এঁরা নাগরিকত্বের তথ্য প্রমাণ দাখিল করে ট্রাইবুনালের মুখোমুখি হওয়ার সাহস রাখেন। তাই এঁদের বেশিরভাগই প্রকৃত ভোটার বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। আর বাকি যাঁরা আবেদন করেননি তাঁরা হয় মৃত অথবা তাঁদের নাম দু’জায়গায় ছিল।
এবার দেখা যাক, বিচারাধীন তালিকা থেকে ২৭লক্ষ নাম বাদ যাওয়ায় বিজেপির কতটা লাভ হতে পারে। এই ২৭ লক্ষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ গিয়েছে মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা, মালদহ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদীয়া জেলায়। একথা
ঠিক, বিচারাধীনের তালিকায় থাকা মুসলিমদের নামই বেশি বাদ গিয়েছে। সেই সংখ্যাটা মুর্শিদাবাদ এবং মালদহ জেলায় বেশি। কারণ দু’টি জেলাই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা ঘুরে মনে হয়েছে, ভোট কাটার কারণে মালদহে বিজেপি কিছুটা ফায়দা তুলতে পারে। কিন্তু মুর্শিদাবাদে তেমন লাভ ঘরে তুলতে পারবে না। এই জেলায় চার পাঁচটি আসনে বিজেপি মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও বাকি জায়গায় লড়াই তৃণমূলের সঙ্গে কংগ্রেসের। সেখানে বিজেপির জেতার সম্ভাবনা নেই।
তবে, নাম কাটার খেসারত এবার বিজেপিকেও দিতে হবে। তার প্রথম কারণ এসআইআর নিয়ে মানুষের চূড়ান্ত দুর্ভোগ হয়েছে। তারজন্য তারা জ্ঞানেশ কুমারের চেয়েও বিজেপিকেই বেশি দায়ী করছে। সেই ক্ষোভের আঁচ ইভিএমে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। দ্বিতীয়ত, ২৭ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ায় উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদীয়া জেলায় বিজেপির ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রচুর মতুয়া ও নমঃশূদ্র ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। তার জেরে বিগত নির্বাচনগুলিতে এই দু’টি জেলায় ‘ক্লিন সুইপ’ করেছে এমন অন্তত ৯টি আসনে বিজেপি এবার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এসআইআর যে বিজেপির ক্ষতি করবে, সেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়ির সদস্য তথা বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুর। তিনি বলেছিলেন, ‘খসড়া তালিকা থেকেই লক্ষাধিক মতুয়া নাম বাদ গিয়েছে।’ মতুয়াদের ক্ষোভের ক্ষতে মলম লাগানোর জন্য বিজেপি নেতারা এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘হিন্দুদের ভয় নেই। দিল্লিতে বড়ো বড়ো মন্ত্রী রয়েছেন। কিছু একটা ফাঁক বের করবেন।’ সেই আশাতেই মতুয়ারা দল বেঁধে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের সভায় ভিড় করেছিলেন। কিন্তু নাগরিকত্ব লাভের নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী দিতে পারেননি। বরং মতুয়া সহ বাংলার মানুষের মনে আশার আলো জ্বালালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। সুপ্রিম কোর্টও সম্ভবত বুঝেছে, বাংলার মানুষের প্রতি চরম অবিচার করছে বিজেপি এবং কমিশন। তাই প্রয়োগ করেছে বিশেষ ক্ষমতা।
তবে, বিজেপির জন্য এসআইআরের বিপদটা এবার অন্য জায়গায়। জেলায় জেলায় ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, কোনো পরিবারের সকল সদস্যের নাম বাদ যায়নি। কোনো পরিবারে ৬জনের মধ্যে ৪জনের, আবার কোনো পরিবারের ১১জন সদস্যের মধ্যে একজন বা দু’জনের নাম বাদ গিয়েছে। তার ফলে যাঁদের নাম থেকে গিয়েছে তাঁরা ‘নোটায়’ ভোট দিতে পারেন, কিন্তু বিজেপিকে দেবেন না। বহু ক্ষেত্রেই বাদ পড়া পরিবারের সদস্যরা সাফ জানিয়েছেন, ভোটটা যাকেই দিই না কেন, বিজেপিকে দেব না। এই পরিস্থিতিতে দিলীপ ঘোষের মন্তব্য তাঁদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে। দিলীপবাবু বলেছেন, ‘যাদের নাম বাদ গিয়েছে তারা দেশদ্রোহী।’ একেই বলে, কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে। যে জ্বলুনিটা উপর উপর ছিল, সেটা চলে গিয়েছে গভীরে।
একুশের নির্বাচনে মূলত মোদি-অমিত শাহ জুটিই বাংলায় ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেছিল। এবার শুধু প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা যোগী আদিত্য নন, বিজেপিশাসিত সমস্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও দাপুটে নেতারা প্যারেড করে বাংলায় আসছেন। পাশে রয়েছে নির্বাচন কমিশন, সিবিআই-ইডি, লক্ষ লক্ষ সিআরপিএফ-বিএসএফ। বাংলায় তৈরি করেছে অঘোষিত যুদ্ধ পরিস্থিতি। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী সব সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন। বাকি আছে শুধু বাংলার দখল নেওয়া। বাংলা দখল করতে পারলেই কমে যাবে পেট্রল-ডিজেল, গ্যাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। মিটে যাবে প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা। তাই বাংলার মেয়েকে হারাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ঝাঁপিয়ে পড়েছে গোটা বিজেপি দলটা। মানতেই হবে, দম আছে ‘বাংলার মেয়ের’।
এসব দেখে অনেকেই বলছেন, বাংলা দখলের
জন্য নরেন্দ্র মোদি যত কেন্দ্রীয় বাহিনী এরাজ্যে পাঠিয়েছেন তার অর্ধেক যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নামাতেন, তাহলে পাক অধিকৃত কাশ্মীর চলে আসত ভারতের মুঠোয়।