সঞ্জয় সরকার, কলকাতা: মণ্ডপের সামনেই রাখা বিশাল আকারের ঝাড়বাতি। চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। চারধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাচের টুকরো। ১২ জন সেগুলিকে জুড়ে এক বিশাল আয়নার রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তার মধ্যে হঠাৎ এক কর্মী বললেন, ‘বিশ্বের বৃহত্তম মন্দিরের প্রতিলিপি গড়ে তোলা চাট্টিখানি কথা নয়।’ সত্যিই তাই। মধ্য কলকাতার অন্যতম ক্রাউড পুলার পুজো হল কলেজ স্কোয়ার। এবার তাদের ৭৮তম বর্ষ। এবছর মণ্ডপ সেজে উঠবে কম্বোডিয়ার আঙ্কোরভাট মন্দিরের ধাঁচে। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ধর্মীয় কাঠামো হিসেবে পরিচিত। তাই সেই আদলে কোনও পুজো মণ্ডপ গড়ে তোলা মুখের কথা নয়। প্রতিদিন প্রায় ১৩০-১৪০ কর্মী দিনরাত কাজ করে চলেছেন। বাঁশ বাঁধা, কাচের দেওয়াল তৈরি— সব কাজ চলছে জোরকদমে।
হালফিলের থিমের ঝলকানিতেও কলেজ স্কোয়ারের জৌলুস এতটুকুও কমেনি। আর অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে ঝাড়বাতিটি তো রয়েইছে। একই সঙ্গে এবারও আলোকসজ্জায় থাকছে চমক। তার জন্য মুম্বই থেকে বিশেষ দল আনা হয়েছে। পুজো কমিটির মুখ্য সংগঠক বিকাশ মজুমদার জানান, ‘গত কয়েক বছর ধরেই থিমের রমরমায় ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে সাবেকিয়ানা। তবে আমরা ঐতিহ্য বজায় রাখার চেষ্টা চালাচ্ছি।’ এবছর মণ্ডপসজ্জার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নদীয়ার মুখ্যদা ডেকরেটার্সকে। বিগত বছরের মতো এবারও প্রতিমার দায়িত্বে সনাতন রুদ্র পাল।
মধ্য কলকাতার আর একটি জনপ্রিয় পুজো হল মহম্মদ আলি পার্ক। তবে গত কয়েক বছর ধরে ক্রমশ জৌলুস হারিয়েছে তারা। ২০১৮ সালে পার্কে থাকা ভুগর্ভস্থ জলাধার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মূলত রাস্তার উপর প্যান্ডেল করতে হচ্ছে আয়োজকদের। ফলে ইচ্ছা থাকলেও মনের মতো মণ্ডপ গড়ে তুলতে পারছে না তারা। তার মধ্যেও প্রতিবছরই চমক দেওয়ার চেষ্টার কোনও খামতি থাকে না। এবার তাদের ভাবনা, কৃষ্ণমন্দির। তবে ভগবান কৃষ্ণের হতে থাকছে না কোনও সুদর্শন চক্র। এই প্রসঙ্গে কমিটির মুখ্য সংগঠক অশোক ওঝা জানান, ‘সারা বিশ্বে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি চলছে। কোথাও না কোথাও যুদ্ধ লেগেই রয়েছে। তাই আমরা এবার ভগবান কৃষ্ণের হাত ধরেই শান্তির বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছি। তাই মন্দিরের মাথায় কৃষ্ণের হাতে থাকবে না কোনও সুদর্শন চক্র।’ একইসঙ্গে মন্দিরের ভিতর ১৫০ ফুটের অ্যাকোয়ারিয়ামের এক ক্যানভাস আঁকা হচ্ছে। তাতে এআই টেকলোনজির মাধ্যমে সমুদ্রতলের যাবতীয় কিছু তুলে ধরা হবে।’ মণ্ডপজ্জা ও প্রতিমার দায়িত্বে কুশ বেড়া ও তাঁর ছেলে দেবা বেড়া।
পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত স্টেশন শিয়ালদা। তবে পুজোর সময় দেখা মেলে অন্য চিত্রের। স্টেশন থেকে বেরিয়ে আসতেই মানুষের ঢল বেছে নেয় পছন্দের পুজো মণ্ডপ। শুরু হয় শিয়ালদহ অ্যাথলেটিক ক্লাব দিয়ে। রেল কোয়ার্টার সংলগ্ন এই পুজো এ বছর ৭৮ বছরে পা দিল। এবার ফেডারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কোর্ট অব জার্মানি (জার্মানির সুপ্রিম কোর্ট) ভবনের আদলে প্যান্ডেল করছে তারা। মণ্ডপসজ্জার দায়িত্বে মণ্ডল ডেকরেটার্স। পুজো কমিটির সহ-সচিব শ্রীজিত সাহা জানান, ‘আমাদের এবারের ভাবনা এই হেরিটেজ বিল্ডিং। আশা করছি, দর্শনার্থীদের ভালো লাগবে।’