Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শ্যামাপ্রসাদকেও ‘বিদেশি’ দেগে দিত এই শক্তি

ভারতের সবচেয়ে বড় সম্পদ ও সৌন্দর্য হল তার বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্য পরিস্ফুট হয়েছে নানা ক্ষেত্রে—ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে।

শ্যামাপ্রসাদকেও ‘বিদেশি’ দেগে দিত এই শক্তি
  • ১৬ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: ভারতের সবচেয়ে বড় সম্পদ ও সৌন্দর্য হল তার বৈচিত্র্য। এই বৈচিত্র্য পরিস্ফুট হয়েছে নানা ক্ষেত্রে—ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে। একটি প্রভাবিত করেছে অন্যটিকে। অতিসম্প্রতি একটি মারাত্মক ও অবাঞ্ছিত বিতর্ক দানা বেঁধেছে ভাষাকে কেন্দ্র করে। সেযব দেশে অনেক মুখের ভাষা, মাতৃভাষা প্রচলিত আছে—তাদের মধ্যে ভারতের স্থান একেবারে উপরের দিকে। পিপলস লিঙ্গুয়িস্টিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়া অনুসারে, ভারতে ৭৮০টির মতো ভাষা বেঁচে আছে। সংখ্যার বিচারে ভারতের স্থান পাপুয়া নিউ গিনির পরেই। ওশিয়ানিয়া অঞ্চলের এই দ্বীপরাষ্ট্রে প্রচিলত ভাষার সংখ্যা ৮৪০। যাই হোক, ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিল এখনও পর্যন্ত মোট ২২টি ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আরও ৩৮টি ভাষা এমন স্বীকৃতির দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দ্বারস্থ। 

Advertisement

ইতিমধ্যেই স্বীকৃত ২২টি ভাষার তালিকার শীর্ষে রয়েছে ইন্দো-এরিয়ান গোষ্ঠীর অসমিয়া এবং বাংলা। এই গোষ্ঠীর আরও একাধিক ভাষাকে সরকারি তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে দেবনাগরী লিপিতে লেখা হিন্দি একটি। বাকি ভাষাগুলি দ্রাবিড়িয়ান, সিনো-টিবেটান এবং অস্ট্রোএশিয়াটিক ফ্যামিলির অন্তর্গত। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, সংবিধান কোনও ভাষাকেই আলাদাভাবে ‘রাষ্ট্রভাষা’ বলেনি। তামাম ভারতে যোগাযোগের সুবিধার্থে দুটি ভাষাকে ‘অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ’ হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এই ভাষাদুটি হল হিন্দি এবং ইংরেজি। এর নেপথ্যে রয়েছে সংসদীয় কাজ, আইনপ্রণয়ন, আদালতের কাজকর্ম, কেন্দ্র এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারের মধ্যে যোগাযোগরক্ষার মতো প্রয়োজনগুলিকে সহজ করার অভিপ্রায়। এর থেকে পরিষ্কার যে, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষেত্রে কেন্দ্র যেমন রাজ্যগুলির ‘প্রভু’ এবং রাজ্যগুলি কেন্দ্রীয় সরকার বাহাদুরের ‘হুকুমবরদার’ নয়, তেমনি হিন্দি কোনোভাবেই বিশেষ কৌলীন্য বা মর্যাদা দাবি করতে পারে না। ভারত যুক্তরাষ্ট্রে তেমনি কোনও একটি বা দুটি রাজ্যও আলাদাভাবে ‘কেউকেটা’ নয়। অনুরূপ নীতি প্রযোজ্য রয়েছে প্রাদেশিক ভাষাগুলির জন্যও। 
ভারত একটি সুপ্রাচীন দেশ। পবিত্র ভারতের দেহে যুগে যুগে কত জাতি যে লীন হয়ে গিয়েছে তা এই দেশও আলাদাভাবে খেয়াল রাখেনি। এই দেশ 
কেবল ‘দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে’র দর্শনকে ধারণ করেছে। তারপরও জারি রয়েছে বিবিধ 
প্রসঙ্গে ‘বহিরাগত’ তত্ত্বে এক দেশকে বহুধাবিভক্ত করার দুরভিসন্ধি। কাউকে বলা হচ্ছে ‘এরা আক্রমণকারী কিংবা লুণ্ঠনকারীর বংশধর’, কাউকে বলা হচ্ছে অমুক সালের পর অন্য দেশ কিংবা অন্য রাজ্য থেকে ঢুকেছে, অতএব এরা ‘অনুপ্রবেশকারী’! শুধু মৌখিকভাবে দেগে দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না এই শক্তি—তারা মরিয়া হয়েছে ব্যাপারটাকে সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠা করতে। তার আগে ঘৃণা ছড়ানো এবং ভীতিসঞ্চারের যত রকম নষ্টামি করা সম্ভব সেসব করা হচ্ছে নির্বিকারচিত্তে ও নির্দয়ভাবে। 
এরা মনে রাখেনি, ভারতের মানচিত্র বারবার বদল হয়েছে। শেষবার বদল হয়েছে ১৯৪৭-এ দেশভাগের সময়। অখণ্ড ভারতে এক প্রান্তের মানুষ অন্য প্রান্তে শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি এবং নানাধরনের পেশাগত প্রয়োজনে যেতেন। কিছু মানুষ সেসব স্থানে 
থেকেও গিয়েছেন। এইভাবে কোন ধর্ম, ভাষা এবং সংস্কৃতির মানুষ যে শেষমেশ কোথাকার স্থায়ী 
বাসিন্দা হয়ে গিয়েছেন তার হিসেব পাওয়া মুশকিল। এইভাবে বিভিন্ন ছোটবড় শহর মিনি ভারতের 
চরিত্র এবং চেহারা পেয়ে গিয়েছে। এই প্রশ্নে সবার আগে আসে কলকাতা, মুম্বই, দিল্লি, বারাণসী, পাটনা, রাঁচি, কটক, গুয়াহাটি, বিলাসপুর, বিশাখাপত্তনম, বেঙ্গালুরু প্রভৃতি শহরের নাম। এই পরিস্থিতিতে কোনও একটি ভাষার মানুষকে একটিমাত্র অঞ্চলে রেখে ভারতকে স্বাধীন করার জাদু কারও জানা ছিল না। 
ভারতে বাংলাভাষী মানুষ সবচেয়ে বেশি পশ্চিমবঙ্গে। এছাড়া ত্রিপুরা এবং অসমের বরাক উপত্যকাসহ সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলেই তাঁরা আছেন বিপুল সংখ্যায়। বাঙালিরা ছড়িয়ে রয়েছেন দিল্লি, আন্দামান, ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র-তেলেঙ্গানা অঞ্চলেও। সারা পৃথবীতে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা ২৮ কোটির বেশি (সপ্তম স্থান)। তাঁদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি বাংলাদেশে এবং ৩৫ শতাংশের মতো ভারতে বসবাস করেন। ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে, সারা ভারতে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ কোটি। সংখ্যাটি ইতিমধ্যে ১১ কোটি অতিক্রম করেছে বলেই অনুমান করা হয়। বাঙালিরা হল ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাষা গোষ্ঠী। একটি নগর কসমোপলিটন চরিত্র পেয়ে গেলে সেখানে রাজ্যের প্রধান ভাষার আধিপত্য হ্রাস পাওয়ার মধ্যে অসূয়ার অনুসন্ধান অনুচিত। কলকাতায় বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা ৬০ শতাংশের কিছু বেশি। আবার মুম্বইতে মারাঠিভাষী মানুষের সংখ্যা নেমে এসেছে ৪০-৪২ শতাংশে। অন্য রাজ্য এবং ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ শুধু একটি মুখ নিয়ে দিকে দিকে মুভ করেননি, সঙ্গে একটি ঊর্বর মস্তিষ্ক এবং দুটি দক্ষ হাতও নিয়ে গিয়েছেন, এই সত্যটি মনে রাখতে হবে। তার ফলে এই ‘বহিরাগত’ (অত্যন্ত অন্যায় অন্যায্য ও মানবসভ্যতার পক্ষে বড়ই বেমানান অভিধা) লোকজন সামান্য কিছু গ্রহণ করার পাশাপাশি দিয়েছেন বা অবদান রেখেছেন অনেক বেশি। এই সত্যটি উপলব্ধি করতে না-পারার চেয়ে মারাত্মক কূপমণ্ডূকতা কিছু হয় না। আর সেটাকেই সম্বল করে ফের ক্ষমতার রাজনীতির মাগনা প্রসার চাইছে কেউ কেউ। 
তার জন্য সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছেন বাঙালি বা বাংলাভাষীরা। এখন কাগজ-টিভি খুললেই সামনে আসছে অমুক রাজ্যে কিছু বাঙালি লোককে আটকে রাখা হয়েছে। তাঁদের থানায়-হাজতে রেখেও নির্যাতন করার অভিযোগ উঠছে। এমনকী ঘটেছে কাউকে কাউকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করার মতো ভয়াবহ কাণ্ডও। কী তাঁদের অপরাধ? মুখের ভাষা, মাতৃভাষায় কথা বলেছেন তাঁরা! ঘৃণা, বিভাজন, বিচ্ছিন্নতার ব্যবসায়ীদের চোখে এমন লোকজন নাকি ‘বাংলাদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’! এই অমানবিক কারবার যেসব জায়গায় ঘটেছে তার মধ্যে ওড়িশা, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, দিল্লির বিষয়গুলি সামনে এসেছে। নিজ দেশে পরবাসী করে দেওয়ার এই খেলায় সবচেয়ে বেড়ে খেলছে অসম। বলা বাহুল্য, এটিও মোদি-শাহদের বিজেপি-শাসিত রাজ্য। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা স্বয়ং, একসময়ের (১৯৬০ এবং পরবর্তী) ভয়ঙ্কর ‘বঙ্গাল খেদা’ আন্দোলনের স্মৃতি ফেরাতে মরিয়া! ‘বহিরাগত’ বা ‘বিদেশি’ হুজুগে ওই পর্বে অসম থেকে পাঁচ লক্ষাধিক বাংলাভাষী মানুষকে খেদানো হয়েছিল। তার আগে তাঁদের উপর নামিয়ে আনা হয়েছিল ভয়াবহ অত্যাচার। মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার দাবিতে নেমে ১৯৬১ সালে একদল বঙ্গসন্তানকে রক্ত, এমনকী প্রাণও দিতে হয়েছিল। সেই আগুন ছাইচাপা ছিল দীর্ঘদিন, ফের উসকে দিয়েছেন সম্প্রতি অসমের মুখ্যমন্ত্রী মহোদয়! 
সম্প্রতি তিনি খোলাখুলি জানান, অসমের কোনও বাসিন্দা জনগণনার নথিতে ‘মাতৃভাষা বাংলা’ লিখলেই বোঝা যাবে অসমে কতজন বিদেশি (বাংলাদেশি) বসবাস করছে। হিমন্তের বার্তা স্পষ্ট, দিল্লি বা ওড়িশার মতো বিজেপি-শাসিত অসমেও কেউ যদি বাংলা ভাষায় কথা বলেন, তাহলে তাঁর কপালে ‘বাংলাদেশি’ তকমাই জুটবে। ইতিমধ্যেই অসম সরকার বাঙালি ধরে ধরে এনআরসি নোটিস পাঠাতে শুরু করেছে। এবার বাংলা ভাষা সংক্রান্ত মন্তব্যে বিতর্ক গড়াল বহু দূর। হিমন্তের দাবি, ‘ভাষাকে কখনোই ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। অসমের রাজ্য ও সরকারি ভাষা হিসেবে অসমিয়াই চিরস্থায়ী। তাই কেউ যদি জনগণনার সময় বাংলা ভাষার কথা লেখেন, তাতে বিদেশি নাগরিকদের সংখ্যা নির্ধারণ করাই সহজ হবে!’ 
পরিষ্কার বোঝা যায়, বাংলাদেশের ভাষার সঙ্গে সাদৃশ্য থেকেই এই মূর্খামি। পাঞ্জাবি, সিন্ধি, উর্দু প্রভৃতি পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান ভাষা। তাহলে ভারতে এসব ভাষায় যাঁরা কথা বলেন তাঁদের কি ‘পাকিস্তানি’ বলে দেওয়া হবে? আরও একাধিক পড়শি দেশের ভাষার নরনারী বহুকাল যাবৎ ভারতের বাসিন্দা। গেরুয়া ফর্মুলায় এই বদনাম তাঁদের নামেও রটিয়ে দেওয়া সম্ভব। বহু ভারতীয় ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন। তাঁরা কি সবাই ইংরেজ কিংবা আমেরিকান? বলা নিষ্প্রয়োজন যে, এমন প্রতিটি সংকীর্ণতাই অন্যায় এবং সভ্যতার সীমাবহির্ভূত ব্যাপার। 
আশার কথা, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দলের এমপিরা এই সংক্রান্ত প্রতিটি অন্যায়ের জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন। মমতা স্বয়ং বলেছেন, ‘প্রয়োজনে পথে নামব।’ আর এখানেই আমাদের প্রশ্ন, বঙ্গ বিজেপির নিখাদ অবস্থানটা কী—তাঁরা কি এই অন্যায়ের প্রতিকার দাবি করবেন? বাঙালি বা বাংলাভাষীদের বাঁচার লড়াইয়ে শামিল হবেন তাঁরাও? নাকি বিজেপির বিভাজন ও ঘৃণার রাজনীতির সঙ্গে গলা মিলিয়ে প্রতিরাতে হুক্কা হুয়া আওয়াজ তুলবেন? শমীক ভট্টাচার্যরা খেয়াল করেছেন কি, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কেও আজ ‘বহিরাগত’, ‘বিদেশি’, ‘অনুপ্রবেশকারী’ প্রভৃতি তকমা দিতে এই ক্ষমতার বেওসায়িরা দু’বার ভাবত না!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ