যোগ-ব্যায়ামের উপকারিতা কী, তা বোঝাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদাহরণ টানা যেতেই পারে। ৭৫ পেরিয়েও তাঁর ‘ফিট’ থাকার মূল রহস্যই হল নিয়মিত যোগাসন চালিয়ে যাওয়া। বর্তমান বিশ্বে কম্পিউটার-ল্যাপটপ-মোবাইলের পর্দায় মুখ গুঁজে থাকা জীবনে কায়িক পরিশ্রমের অভাব ও অনীহা মানুষের শারীরিক-মানসিক সক্ষমতাকে যে ভয়াবহ সমস্যার মুখে ফেলে দিচ্ছে, তা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এর থেকে বাঁচতে যোগের কোনো বিকল্প নেই। সুস্থতা মানে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও আত্মিক দিক থেকেও ভালো থাকতে নিশ্চিত করা। যোগ হল সেই প্রাচীন ভারতীয় জীবনধারা, যা একইসঙ্গে শরীর-মন-আত্মাকে ভালো রাখার অনুঘটক হিসাবে কাজ করে। এই সত্য শুধু ভারতে নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও স্বীকৃত। তাই নরেন্দ্র মোদির প্রস্তাব মেনে ২১ জুন দিনটিকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস হিসাবে ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রসংঘ। সেইমতো ২০১৫ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে যোগ দিবস। ভারতই যেহেতু এর পথিকৃৎ, তাই এদেশে যোগ দিবস পালনের সমারোহও বেশি। এতকাল অন্যান্য রাজ্যে যোগ দিবসের মাহাত্ম্য টের পাওয়া গেলেও পশ্চিমবঙ্গে পদ্মশিবিরের ভিন্নমতের সরকার থাকায় যোগ দিবসে সেভাবে কোনো হেলদোল দেখা যায়নি। কিন্তু এ বছর রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি সরকার। তাই যোগ দিবসের একদিনের কর্মসূচি পালিত হবে তিন দিন ধরে। এই কর্মযজ্ঞে এরাজ্যে ‘প্রধান পুরোহিতের’ ভূমিকায় দেখা যাবে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে। রাজ্যে তাই তিন দিনের উৎসব। সরকারি স্তরে সাজো সাজো রব।
রাজ্যের মানুষকে যোগব্যায়ামের উপকারিতার বার্তা দিতে সরকারের উদ্দেশ্য সৎ ও আন্তরিক হলেও বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে তার আয়োজনে কেন দেদার খরচের বাহুল্য, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। তিন দিনের অনুষ্ঠানে শুক্রবার ১৯ জুন শহরের ১১টি জায়গা থেকে ম্যারাথন দৌড় কর্মসূচি পালিত হয়েছে। শনিবার ২০ জুন গঙ্গাবক্ষে ৫০০ নৌকা আর ৩০০০ ড্রোন ব্যবহার করে ‘যোগা কার্নিভাল’ হবে। ২১ জুন, যোগ দিবসের দিন মূল অনুষ্ঠানটি হবে রেড রোডে। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ভোরের এই যোগাসন কর্মসূচিতে কয়েকহাজার মানুষ অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার তো বটেই, এই তিন দিনের কর্মসূচি সফল করতে বেসরকারি সংগঠন ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থাকেও কাজে লাগানো হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। এই বিপুল আয়োজনের খরচ কত, তা নিয়ে সরকারি স্তরে এ পর্যন্ত কোনো উচ্চবাচ্য শোনা যায়নি। কিন্তু সরকারি অর্থ খরচের এক ঝলক মাত্র সামনে এসেছে। খবরে প্রকাশ, ২০ জুন শুধু জলপথে (গঙ্গাবক্ষে) যোগ-যজ্ঞ সাজানো হবে ৫০০টি নৌকা ও লঞ্চ দিয়ে। সুদূর সুন্দরবন থেকে ৫৮টি গেট পেরিয়ে এই জলযানগুলি নোঙর করেছে বাবুঘাটে। এই দীর্ঘ পথে ৫০০টি লঞ্চ-নৌকা কলকাতায় আনতে ডিজেল লাগবে ৪ লক্ষ লিটার। এক লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা ধরলে এই দুর্মূল্যের বাজারে শুধু তেল পুড়বে প্রায় ৪ কোটি টাকা! প্রশ্ন উঠেছে, মাত্র কিছুদিনের আগে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের যুক্তি বা দোহাই দিয়ে দেশবাসীকে জ্বালানি ব্যবহারে ‘সংযত’ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। কৃচ্ছ্রসাধনের পথে দেশের মানুষকে অপ্রয়োজনে সোনা কিনতেও বারণ করেছিলেন। বিদেশ ভ্রমণেও না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। তাহলে তাঁর সামনে নম্বর বাড়ানোর জন্য কেন এরাজ্যের নতুন বিজেপি সরকার ‘ব্যয়সংকোচ’-এর পথ পরিত্যাগ করে শুধু গঙ্গাবক্ষে চমক তৈরির জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করছে? এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
আন্তর্জাতিক যোগ দিবস ২১ জুন। সেই অনুষ্ঠানটি হচ্ছে রেড রোডে। এ জন্য প্রায় ছ-সাত দিন ধরে রেড রোডে যান চলাচল বন্ধ রেখে ইতিমধ্যে শহরের নাগরিকদের একাংশের ক্ষোভের মুখে পড়েছে সরকার। কিন্তু সরকারি অর্থ খরচ করে একদিনের অনুষ্ঠান কেন তিন দিন ধরে পালন করা হবে সেই প্রশ্ন তোলা কি অসংগত? গঙ্গাবক্ষে নৌকা বা লঞ্চে দাঁড়িয়ে বা বসে যোগাসন করলে তা দৃষ্টি আকর্ষণ করা ছাড়া সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াসে কোন অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করবে— সেই প্রশ্নও থেকে যায়। ৩০০০ ড্রোন উড়িয়ে একমাত্র গিমিক তৈরি করা ছাড়া যোগ ব্যায়ামের কোন উপকারিতা বোঝানো যাবে—তাও বোঝা দুষ্কর। যে নতুন সরকারের ঘাড়ে ৮ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ ফাঁসের মতো ঝুলে রয়েছে, যে শাসক দল এই সেদিনও বিরোধী থাকাকালীন পূর্বতন তৃণমূল সরকারের ‘মেলা-খেলা-ফেস্টিভাল-কার্নিভালে’ বিপুল অর্থ ব্যয়ের কড়া সমালোচনা করে এসেছে, ক্ষমতায় এসে তারাই এখন একদিনের কর্মসূচিকে টেনে তিন দিন করে জলের মতো টাকা খরচের বন্দোবস্ত করেছে। এর সমালোচনা হলে তা কি খুব অন্যায় শোনাবে? তবে কি আসলে সরকার বদল হলেও ভাবনা বদলাবে না! প্রচারের ঢাক পেটাতে কোটি কোটি টাকা খরচ হবে এভাবেই? সঠিক উত্তরের জন্য হয়তো আরও কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে রাজ্যের মানুষকে।