Bartaman Logo
১৩ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শুভবুদ্ধি

আমাদের প্রাচীন ঋষিরা মনুষ্যজাতির বুদ্ধির সহিত সদিচ্ছার যোগে শুভবুদ্ধির উদয়ের জন্য কত উপদেশ, কত গ্রন্থ, কত প্রকারের বিধান করিয়া গিয়াছেন।

শুভবুদ্ধি
  • ২০ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আমাদের প্রাচীন ঋষিরা মনুষ্যজাতির বুদ্ধির সহিত সদিচ্ছার যোগে শুভবুদ্ধির উদয়ের জন্য কত উপদেশ, কত গ্রন্থ, কত প্রকারের বিধান করিয়া গিয়াছেন। তাঁহাদের প্রার্থনায় সদিচ্ছার মিলনে শুভবুদ্ধির কামনা দেখা যায়। ‘স নো বুদ্ধ্যা শুভায় সংযুনক্তু’ ‘মনঃ শিবসঙ্কল্পমস্তু’ ইত্যাদি। ভগবান্ বুদ্ধের সময় মানবজীবনে যাদৃশ নৈতিক উন্নতি হইয়াছিল তাহার তুলনা নাই। বুদ্ধবাণীর সংক্ষিপ্ত মর্মার্থ—সকলের প্রতি মৈত্রী, করুণা, শুভেচ্ছা। শাস্ত্রকার ঋষি বলিলেন সর্বভূতে মৈত্রীই ব্রাহ্মণের একটি প্রধান লক্ষণ। “কুর্যাদন্যন্ন কুর্যাদ্ বা মৈত্রো ব্রাহ্মণ উচ্যতে”। নির্জন পর্বতে বা অরণ্যে তপস্যারত সাধু মহাত্মাগণ কাহাকেও অর্থ বা খাদ্য দিতে আসেন না, কিন্তু তাঁহাদের শুভ কামনার দ্বারাই তাঁহারা নিরন্তর জগতের কল্যাণসাধন করিতেছেন। ‘সর্বে তে সুখিনঃ সন্তু সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ’ ইহাই তাঁহাদের শুভেচ্ছা। মহারাজ দিলীপ মহর্ষি বশিষ্ঠের আশ্রমে গিয়া তাঁহার নিকট রঘুবংশ-মহাকাব্যে যে উক্তি করিয়াছেন তাহা হইতে বুঝা যায় যে লোকহিতকামী ঋষিগণের কেবল পৃথিবীতে অবস্থানের দ্বারাই মঙ্গল সাধিত হইত।

Advertisement

“পুরুষায়ুষজীবিন্যো নিরাতঙ্কা নিরীতয়ঃ।
যন্মদীয়াঃ প্রজাস্তস্য হেতুস্ত্বব্রহ্মবর্চসম্।।”
এই দুঃখপরিপূর্ণ সংসারে পরস্পরের প্রতি শুভেচ্ছা পোষণ করিয়াই মানুষ মানসিক প্রসাদ লাভ করিতে পারে। অন্যের শুভ-কামনা করিলে তাহার দ্বারা নিজেরই শুভের বৃদ্ধি হয় এবং অপরের অশুভ কামনাতে নিজের অশুভ বৃদ্ধিলাভ করিয়া নিজের ক্ষতি করে, ইহা অন্তর্জগৎ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সত্য। এইজন্য আত্মীয়-বন্ধুগণের মধ্যে পরস্পর পত্রাদিতে প্রীতি ও শুভেচ্ছার বিনিময় চিরকালই চলিয়া আসিতেছে। চণ্ডীতে জগতের কল্যাণের জন্য বিশ্বজননীর নিকট দেবগণের কামনা—
“পাপানি সর্বজগতাঞ্চ শমং নয়াশু
উৎপাতপাকজানিতাংশ্চ মহোপসর্গান্।।”
মা নিষ্কাম ভক্তগণকে জাগতিক পদার্থ সমূহের মধ্যে যাহা শ্রেষ্ঠ সেই শুভা মতি দান করেন। “মতিমতীব শুভাং দদাসি” “প্রযচ্ছন্তি শুভাং মতিম্”—চণ্ডী। ব্রহ্মবিদ্যার কৃপায় শুভবুদ্ধি পাইলেই সাধক অনায়াসে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করিতে পারেন। শ্রীমদ্ভাগবতে এক মহাপ্রাণ ব্যক্তির শুভেচ্ছা ও ত্যাগের বার্তায় বিস্মিত হইতে হয়—
“ন কাময়েহহং গতিমীশ্বরাৎ পরামষ্টর্দ্ধিযুক্তা মপুনর্ভবং বা।
আর্তিংপ্রপদ্যোহখিলদেহভাজামন্তঃস্থিতো যেন ভবন্ত্যদুঃখাঃ।।”
আমি ঈশ্বরের নিকট অষ্টসিদ্ধি-সমন্বিত উৎকৃষ্ট গতি বা মোক্ষও চাই না। অখিল জীবের যত দুঃখ কষ্ট তাহা আমি ভোগ করিতে চাই, বিশ্বের সকলেই দুঃখমুক্ত হউক্। যে বুদ্ধির সহিত শুভৈষণার সংযোগ ঘটে তাহাই শুভবুদ্ধি। আর যে বুদ্ধিতে অশুভেচ্ছার মিলন হয় তাহা কুবুদ্ধি বা দুর্বুদ্ধি। কোনও মনীষী বলিয়াছেন জগতে সুশিক্ষিত অথচ অসৎ প্রবৃত্তির লোকের দ্বারা যত অনিষ্ট সাধিত হয় তদপেক্ষা অনেক কম অনিষ্ট সাধিত হয় অশিক্ষিত অসৎ লোকের দ্বারা। 
পণ্ডিতপ্রবর জ্যোর্তিময় নন্দের ‘জ্যোর্তিময় রচনাঞ্জলি’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ