Bartaman Logo
১৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গণবিচারের স্বাদ কিন্তু বিপজ্জনক

পশ্চিমবঙ্গে গণবিচারের নতুন রূপ, ডিম থেরাপিতে জনতার আদালত। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণ। বিস্তারিত পড়ুন।

গণবিচারের স্বাদ কিন্তু বিপজ্জনক
  • ১৯ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: জনতার আদালত। জনরোষ। গণবিচার। এরকম নানাবিধ নাম দেওয়া হয়। গণপ্রহার এই তালিকায় সর্বোত্তম স্থান দখল করে আছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রশাসনিক পালাবদলের পর দেখা যাচ্ছে জেলায় জেলায় জনরোষের অভীধায় পরাজিত দল তৃণমূলের নেতা-কর্মী জনপ্রতিনিধিদের হেনস্তা করা হচ্ছে প্রকাশ্যে। ডিম ছুড়ে মারা হচ্ছে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘ডিম থেরাপি’। আপাতদৃষ্টিতে যে বা যারা এই ডিম ছুড়ে মারছে, তাদের বহিরঙ্গ দেখে আভাস পাওয়া যায় যে, এই শ্রেণি নিজেদের অর্থ দিয়ে ক্রেট ক্রেট কিনতে সক্ষম এমন নয়। তারা নিছক পদাতিক সেনাবাহিনী। ডিম কেনার টাকা অথবা ডিমের সাপ্লাইদাতা অন্য কেউ। 

Advertisement

গত ফেব্রুয়ারি মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি সার্কুলার জারি করেছিল। যেখানে বলা হয়েছিল, অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হবে, যা দিয়ে রাজ্যের ৮১ লক্ষ ১৯ হাজার স্কুলে অতিরিক্ত ডিম দেওয়া হবে মিড ডে মিলে। তার আগে বাংলায় মিড ডে মিলের একটি নীতি ছিল ওয়ান এগ ওয়ান উইক। অর্থাৎ সপ্তাহে একবার ডিম দেওয়া হবে। মিড ডে মিলের নীতি অবশ্য বারংবার বদল হয়ে থাকে। কিছু রাজ্যে ডিম ডে মিলে ডিম দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যেখানে সপ্তাহে তিনদিনও স্কুলের বাচ্চাদের মিড ডে মিলে ডিম দেওয়া সম্ভব হয় না, এমন রাজ্যে দিনের পর দিন এই অন্তহীন ডিম নষ্ট করার উৎসবের মানসিকতার জন্ম হল কীভাবে? 
পশ্চিমবঙ্গের মানুষের একাংশের মানসিকতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ ঘটেছে। কারণ, যারা মারছে তারা আনন্দ পাচ্ছে। যারা দেখছে ভিডিয়োতে তারাও আনন্দ পাচ্ছে। অথচ সকলেই একমত যে, বাংলার অর্থনীতি এবং মানুষের অথনৈতিক অবস্থা এমন নয় যে,  এভাবে প্রতিদিন জেলায় জেলায় হাজার হাজার ডিম নষ্ট করে ফেলার বিলাসিতা দেখানো সম্ভব!
আর এসবের থেকেও চিন্তাজনক হল গোটা ‘জনরোষ’ চলছে পুলিশের সামনে। যা বর্তমান রাজ্য সরকারের কাছে মোটেই সুখকর হওয়ার কথা নয়। কারণ, এই যে পুলিশের উপস্থিতিতে মানুষ আইন নিজেদের হাতে তুলে নিচ্ছে, এমনকি পুলিশকেও ডিমের আক্রমণ সহ্য করতে হচ্ছে, এসবই হল আইনের শাসন না মান্য করার একটি সিগন্যাল। মধ্যরাতে যেমন  সিগন্যালে লাল বাতি থাকলে জনশূন্য রাস্তার ক্রসিং-এ নিয়ম মেনে গাড়ি বা বাইক আরোহীর দাঁড়িয়ে থেকে অপেক্ষা করার দৃশ্য বিরল হয়ে আসছে। কেউ নেই, গাড়ির আনাগোনা নেই, ট্রাফিক পুলিশও নেই। তাহলে আর দাঁড়াবো কেন? অতএব সিগন্যাল অমান্য করে যাওয়াই যেন নিয়ম! যা নিয়মের মধ্যে পড়ে, ভারতে দেখা যায়, সেটি অমান্য করার মধ্যেই জনগণের একাংশের আনন্দ ও বীরত্ব। 
তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতাকালে সর্বস্তরে যেভাবে দুর্নীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, দাদাগিরি এবং একচ্ছত্র এক দমনপীড়নের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, সেটি 
থেকে জনরোষ ছিলই। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আর জি কর-এ যে শ্রেণির জনতার রোষ ও ক্ষোভ আছড়ে পড়েছিল, সেই একই জনতা কি এভাবে ডিম ছুড়ছে? সম্ভবত না। আর জি কর কাণ্ড, দুর্নীতি, 
শিক্ষায় অব্যবস্থা, নিয়োগে অনিয়ম ইত্যাদি কারণে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রকাশ অবশ্যই হয়েছে ভোটের মাধ্যমে। কিন্তু ঠিক সেই অংশটিই ডিম থেরাপিতে অংশ নিচ্ছে এমন হয়তো না। হতে পারে তারা এসব দেখে আনন্দ পাচ্ছে। তবে নিরীহ গৃহস্থ, ডাক্তার, শিক্ষক, অধ্যাপক, সরকারি বেসরকারি চাকুরে, সাধারণ ব্যবসায়ী, ছাত্রছাত্রীরা কি অন্য কারও সাপ্লা‌ই করা ডিম হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে যে, কখন উদ্দিষ্ট ব্যক্তি আসবে, তারপর তাকে লক্ষ্য করে ডিম ছুড়ব? আগে থেকেই মোবাইল সাংবাদিকদের রেডি করে রাখা হবে ভিডিও তোলার জন্য? এটা কি খুব স্বাভাবিক? সম্ভবত নয়। একটি বিশেষ শ্রেণি এই কাজটি করছে। প্রশ্ন হল, পুলিশ কিছু করবে না তোমরা ডিম মেরে যাও, এরকম কোনো আশ্বাস পেয়েই কি এই ডিম উৎসব? 
বিপদ হল, এই শ্রেণিই চিহ্নিত হয়ে থেকে যাচ্ছে। আজ যারা ডিমের আক্রমণে আক্রান্ত তারা এবং তাদের আত্মীয় বন্ধু পরিবার তীক্ষ্ণ চোখে দেখে রাখছে আক্রমণকারীদের মুখ। সুতরাং ভবিষ্যতে যদি আক্রান্ত এই অংশটি প্রতিশোধ নিতে চায়, তখন কারা আক্রান্ত হবে? আজকের আক্রমণকারী এই পদাতিক সেনাবাহিনী। উস্কানিদাতাদের কিছুই হবে না। 
যে তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রবল জনরোষ, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা এখনই নিতে হবে এরকম চাপ সৃষ্টি করা হোক পুলিশ প্রশাসনের উপর। পুলিশকে এলাকায় এলাকায় বাধ্য করা যে, এই নেতাদের গ্রেপ্তার করা হোক। দরকার হলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়াও আইনের প্রতি বিশ্বাসের প্রতিফলন। কিন্তু পাবলিক শেমিং করা, ডিম ছুড়ে মারা, শারীরিকভাবে দলবদ্ধভাবে গণপ্রহার এসবই হল গণবিচারের স্বাদ।  রাগ মিটিয়ে নেওয়ার সুযোগ। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার আনন্দ। 
মনে রাখতে হবে এই যে দলবেঁধে আক্রমণের অর্থ হল, ভিড়ের শক্তির একজন হয়ে নিজেকে শক্তিশালী মনে করা। কিন্তু ভিড়ের শক্তি তো একক শক্তি নয়। যদি তৃণমূলের সময়কালকে আইনের শাসনহীন একটি অরাজকতা হিসেবে মনে করা হয়, তাহলে নতুন বিজেপি সরকারের আমলেও সেই আইনের শাসনকেই বিশ্বাস না করার একটি প্রবণতার জন্ম যাতে না হয়, সেদিকে রাজ্য সরকারের নজর দেওয়া দরকার। 
তথাকথিত জনরোষ আছড়ে পড়ছে এবং দেখা যাচ্ছে পুলিশ উপস্থিত। পুলিশের চোখের সামনে ডিম থেরাপি চলছে। গণপ্রহার চলছে। পুলিশকে নীরব দর্শক হয়েও থাকতে দেখা যায়। এই দৃশ্য পুলিশ, প্রশাসন এবং রাজ্য সরকারের ইমেজের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে ভালো নয়। মনে করা হচ্ছে, আইন হাতে তুলে নেওয়ার বিরুদ্ধে সম্ভবত পুলিশের কিছু করার নেই। সেই বার্তা বিপজ্জনক। হয়তো সেই কারণেই অবশেষে পুলিশ কিছু ক্ষেত্রে আক্রমণকারীদের গ্রেপ্তার করা শুরু করছে।  কিন্তু সার্বিক কঠোরতা  সেভাবে দেখা যাচ্ছে না। যেন এক প্রচ্ছন্ন অনুমোদনই আছে, এরকমই দেখেশুনে ধারণা হয়। 
যদিও বহু ক্ষেত্রেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে বেশ কিছু আক্রমণকারীকে। কিন্তু বৃহত্তর  প্রশ্ন হল, আইন একবার নিজের হাতে নেওয়ার অভ্যাস ও মজা যদি জনতার হাতে চলে আসে, তাহলে বারংবার সেটা঩কেই অন্যায়ের প্রতিবাদের সঠিক পথ হিসেবে মনে হবে। তাই এই প্রবণতা চলতে থাকলে, যেকোনো একজনকে যদি কোনো ভিড় টার্গেট করে, তাহলে তার বিচার সেখানেই হয়ে যাবে। গণপ্রহার হবে। ভিডিও করা হবে। সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হবে। 
রাজ্য সরকারের এখনই উচিত কঠোরভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা। কারণ, আজ হয়তো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের এই জনতার বিচার চলছে। কিন্তু একবার এই স্বাদ এবং পদ্ধতি রাজ্যজুড়ে মান্যতা পেয়ে গেলে, যেকোনো অপরাধও সংঘটিত হয়ে যাবে জনরোষের নাম দিয়ে। বাংলাদেশ, নেপালের আন্দোলনকে জনরোষের আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেইসব আন্দোলনের দখল নিয়েছিল মবোক্রেসি। অর্থাৎ জনতা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করা, ট্রেন, বাস, ভবনে আক্রমণ করা। এসব কোনো গণতান্ত্রিক দেশের লক্ষণ নয়।  কিন্তু এই বৃহৎ পরিকল্পনাগুলির জন্ম হয় ক্ষুদ্র এক্সপেরিপেন্টের মাধ্যমে। রাজ্য সরকারকে তাই এই গণবিচার পদ্ধতি এখনই বন্ধ করতে হবে। সিপিএম ৩৪ বছর। তৃণমূল ১৫ বছর। বিজেপিরও তো একদিন পরিবর্তন হবে! তখন কি একই দৃশ্যাবলির অবতারণা হবে? তাহলে আর পরিবর্তন কীসের?
এক মাস হয়ে গিয়েছে। এবার  যত রাজনৈতিক অপরাধী আছে তাদের বাছাই করে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হোক। কিন্তু সবথেকে বেশি করে আমরা দেখতে চাই পিলার বসছে, উড়ালপুল হবে, কারখানা চালু হচ্ছে, সরকারি চাকরির নিয়োগের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হচ্ছে, সরকারি দপ্তর ও থানায় গেলে যথাবিহিত অভিযোগ ও আবেদন শোনা হচ্ছে এবং ব্যবস্থা নেওয়া চলছে। সিন্ডিকেট প্রথা বন্ধ হোক। কাটমানি বন্ধ হোক। ছেলেমেয়েদের আর বা‌ইরে যেতে হচ্ছে না শিক্ষা ও চাকরির জন্য। জবরদখল করা ফুটপাত-রাস্তা মুক্ত হোক পুনর্বাসনের মাধ্যমে। সমাজ সুস্থির হলেই গণবিচার বন্ধ হবে। আর গণবিচার চলতে থাকলে সমাজ আরও অস্থির হবে। 
এসব এক মাসে সম্ভব নয়। কিন্তু সূত্রপাতের গন্ধটা যেন পাওয়া যায় শীঘ্রই। ডিম থেরাপি কিন্তু শীঘ্রই পুরানো হয়ে যাবে! তৃণমূল খারাপ ছিল, তাই তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কতটা খারাপ ছিল শুধুই তার বিবরণ আগামী ১০ বছর ধরে শুনে বঙ্গবাসী কী করবে? এখন সকলেই চাইবে প্রকৃত পরিবর্তনের স্বাদ পেতে। গণবিচারের স্বাদ নয়। উন্নয়নের স্বাদ বেশি মধুর। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ