Bartaman Logo
২০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বন্ধ হোক ‘ডিম থেরাপি’-র নামে অসভ্যতা

বাংলায় ডিম থেরাপির নামে রাজনৈতিক অসভ্যতা বাড়ছে। তৃণমূল নেতাদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিস্তারিত পড়ুন।

বন্ধ হোক ‘ডিম থেরাপি’-র নামে অসভ্যতা
  • ২০ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: থেরাপির উদ্দেশ্য রোগমুক্তি। চিকিৎসাশাস্ত্রে বিভিন্ন রকম থেরাপির প্রয়োগ দেখা যায়। বাংলায় সরকার বদলের পর রাজনীতিতেও চালু হয়েছে এক নতুন থেরাপি। ডিম থেরাপি। পরিবর্তনের বাংলায় ‘ডিম থেরাপি’বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। রাজ্যের প্রায় সর্বত্র শুরু হয়েছে চুরি, দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তৃণমূলের নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রীদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া। এই থেরাপিতে দুর্নীতি রোগের উপশম হবে, সেই গ্যারেন্টি নেই। তবে, ‘ডিম থেরাপি’-র নামে বাংলায় রীতিমতো অসভ্যতা শুরু হয়েছে। অবিলম্বে তা কঠোর হাতে দমন করা দরকার। তা না হলে বিজেপির আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি কথার কথা হয়েই থেকে যাবে।

Advertisement

রাজনৈতিক নেতাদের ডিম বা জুতো ছোড়া নতুন কিছু নয়। দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল সহ আরও অনেককেই ডিম ছোড়া হয়েছিল। সাংবাদিক সম্মেলনের মধ্যেও রাজনৈতিক নেতাকে লক্ষ্য করে জুতো ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে। তবে, বাংলায় এই কালচার ছিল না। রাস্তা অবরোধ ও কালো পতাকা প্রদর্শনের মধ্যেই প্রতিবাদ সীমাবদ্ধ ছিল। অভিযুক্ত বা অপছন্দের নেতাকে ডিম ছুড়ে মারার সংস্কৃতি আমদানি হয়েছে বিজেপির বাংলায়। শুরুটা দমদমের সাংসদ সৌগত রায়কে দিয়ে। তারপর তা ছোঁয়াচে রোগের মতোই ছড়িয়ে পড়েছে। 
তবে, ডিম ছোড়ার বিপদটা লুকিয়ে আছে অন্য জায়গায়। এখন তৃণমূল নেতাদের লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হচ্ছে। পুলিশ নীরব দর্শকের মতো পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। কিন্তু, সব সময় ডিমই ছোড়া হবে, এমন গ্যারেন্টি নেই। যদি ডিমের বদলে অন্য কিছু ছোড়া হয়! তখন কী হবে? বিষয়টি নিয়ে ভাবার ও ভাবানোর সময় হয়েছে।
রাজ্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা শুধু পুলিশ প্রশাসনের নয়, শাসক দলেরও কর্তব্য। রাজ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলে আঙুল ওঠে শাসক দলের দিকেও। এই সত্যিটা বিজেপির অনেক নেতানেত্রী, মন্ত্রীসান্ত্রি বুঝতে চাইছেন না। মন্ত্রীরা লাল আলো লাগানো গাড়ি চাপছেন। সামনে ছুটছে পাইলট কার। তাবড় তাবড় পুলিশ কর্তা স্যালুট ঠুকছেন। কিন্তু, অনেক মন্ত্রীর কথাই প্রশাসকসুলভ নয়, বলছেন বিরোধী দলের নেতানেত্রীর মতোই। ডিম ছোড়া নিয়ে তাঁদের মন্তব্যে মায়ের শাসনের বদলে রয়েছে মাসির প্রশ্রয়। তাতে দলের কর্মী সমর্থকরা বিপুল উৎসাহ নিয়ে ‘ডিম থেরাপি’-র আনন্দ যজ্ঞে শামিল হচ্ছে। একটা কথা ভুললে চলবে না, নাগরদোলায় উপরে উঠলে নামতেও হয়। অপেক্ষাটা শুধু সময়ের। 
বিতর্কিত মন্তব্য করে অন্যদের পিছনে ফেলে দেওয়াটা দিলীপ ঘোষের বহুদিনের অভ্যাস। ডিম ইস্যুতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপবাবুর কথায়, ‘লোকজন এত সুন্দর প্র্যাকটিস করেছে যে ঠিক কপালে বললে কপালে মারছে, টাকে বললে মারছে টাকে। আমার মনে হয়, কোথাও প্র্যাকটিস করানো হচ্ছে।’পুরমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর পাওয়ার পর অগ্নিমিত্রা পলও দিলীপবাবুর সঙ্গে টক্কর নিচ্ছেন। তিনি আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে জিতে পুরমন্ত্রী হয়েছেন। রাজ্যের অন্যত্র তৃণমূল নেতাদের ডিম ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটলেও আসানসোলে ঘটেনি। সম্ভবত সেই আক্ষেপ থেকেই অগ্নিমিত্রা বলেছেন, ‘এখন খাবার ডিমের চেয়ে মারার ডিমের দাম বেশি। আসানসোলে এখনও ঘটেনি। আশা করি, আসানসোলেও এটা খুব তাড়াতাড়ি শুরু হবে। অনেকেই আছে যাদের ‘ডিমোক্রেসি’-র ছোবল দেওয়া দরকার।’ 
দিলীপবাবু এবং অগ্নিমিত্রাদেবী দু’জনই বিজেপি সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তাঁরা ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষকে সাক্ষী রেখে দেশের ও দশের ভালো করার শপথ নিয়েছেন। তাই তাঁদের মুখে এই ধরনের কথা শুনে মানুষ প্রশ্ন তুলছে, এজন্যই কি পালটানো হয়েছে সরকার?
তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, মন্ত্রীদের একটা বড়ো অংশ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল বলেই রাজ্যের মানুষ তাদের সরিয়ে দিয়েছে। মানুষ মনে করেছে, তৃণমূলকে সরিয়ে বিজেপিকে আনলে রাজ্যের ভালো হবে। প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনি প্রচারে এসে একটা কথা বারবার বলেছিলেন, ‘আতঙ্কের পরিবেশ থেকে বাংলার মানুষ মুক্তি চাইছে।’জনপ্রিয় হয়েছিল তাঁর ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’স্লোগান। কিন্তু, সরকার বদলের পর ‘ডিম থেরাপি’ সংস্কৃতি বাংলায় এক নতুন আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। 
তৃণমূলের যে সমস্ত নেতা বা কর্মী অন্যায় করেছে তাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করুক। বছরের পর বছর জেলের ঘানি টানানোর ব্যবস্থা করুক। এটা সকলেই চায়। কিন্তু, বিচারের আগেই ডিম ছুড়ে, কোমরে দড়ি পরিয়ে সামাজিকভাবে হেনস্তার বিষয়টি শুধু সাধারণ মানুষ নয়, বিজেপিরও অনেকে মেনে নিতে পারছেন না।
বিজেপির ঘরোয়া আলোচনায় অনেকে ডিম ছোড়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাঁরা বলছেন, এসব করার জন্য তো মানুষ আমাদের ভোট দেয়নি। মানুষ সমর্থন করেছে দু’টি কারণে। এক, দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ প্রশাসন ব্যবস্থা রাজ্যে গড়ে তোলা। দুই, ডবল ইঞ্জিন সরকারের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বাংলার বিপুল উন্নয়ন করা। আমাদের এখন সেদিকেই নজর দেওয়া দরকার। তৃণমূল আপাদমস্তক দুর্নীতিতে ডুবে গিয়েছিল। দুর্নীতিগ্রস্তদের বিরুদ্ধে মানুষের চরম ক্ষোভ রয়েছে। তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য রয়েছে সরকার ও আদালত। তাদের উপর ভরসা রাখতে হবে। সেটা না করে ডিম ছুড়লে সাময়িক মজা পাবে, কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হবে না। উলটে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দেওয়া হবে। 
তবে, ডিম থেরাপি প্রতিবাদের অস্ত্র হলে সমাজের সর্বস্তরে তার মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। শুধু রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেই এটা সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্বাস্থ্যে, শিক্ষায়, ব্যক্তিগত পরিসরেও এর প্রভাব পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ ইতিমধ্যেই শিক্ষকদের উপরেও ডিম থেরাপি শুরু হয়েছে। এই মুহূর্তে সংখ্যাটা হয়তো হাতে গোনা। তবে, এখনই কড়া পদক্ষেপ না করলে ‘ডিম থেরাপি’-র ঘটনা গাণিতিকহারে বাড়বে। এমন অনেক ক্ষেত্রে এই ঘটনা ঘটবে, যা এই মুহূর্তে আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। 
হয়তো দেখা যাবে, পরীক্ষায় কম নম্বর পেলে ছাত্র শিক্ষকের উপর ডিম থেরাপি প্রয়োগ করছে। আবার ডাক্তার দেখিয়ে রোগ না সারলে রোগীও চিকিৎসকের উপর ডিম থেরাপি প্রয়োগ করতে পারে। উত্তর ২৪ পরগনার এক বিজেপি নেতা আক্ষেপ করে বলেন, দীর্ঘদিন আমাদের দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিও জানতে চাইছেন, আমাদের এখানে ডিম ছোড়া কবে হবে? উনি এমন করে বললেন যেন ডিম না ছুড়লে আমরা পিছিয়ে পড়ব।
পরাজিত দলের নেতাদের উপর ‘ডিম থেরাপি’প্রয়োগ হচ্ছে বলে হয়তো এখন অনেকে মজা নিচ্ছেন। হাসাহাসি করছেন। কিন্তু, এটা যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রাথমিক ধাপ, সেটা বুঝতে হবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, ডিম ছুড়ে মারার ঘটনা ঘটছে প্রকাশ্যে এবং পুলিশের চোখের সামনে। 
অনেকে মনে করছে, পুলিশের একাংশের মদত এবং প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়েই ডিম থেরাপির ঘটনা ঘটছে। পুলিশ চাইলেই এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে। কোনো অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাকে বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার বা আদালতে তোলার সময় বিক্ষোভকারীদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে দিলেই এই ঘটনা এড়ানো যায়। কিন্তু, সেটা করা হচ্ছে না। উলটে বহু ক্ষেত্রে থানা থেকে অনেক আগে ধৃতকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাতে বিক্ষোভকারীরা ধৃত নেতাকে হেনস্তা করার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। ডিম নিয়ে এগতে দেখেও পুলিশ আটকানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করছে না। অনেক ক্ষেত্রে ডিম লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ফাটছে পুলিশের গায়ে লেগে। তাতে উর্দিতে দাগ লাগছে। এই দাগ কি শুধু উর্দিতেই লাগছে, নাকি ভাবমূর্তিতেও?
পাড়ার কয়েকজন মাতব্বর তৈরি করছে ডিম থেরাপির ‘টার্গেট লিস্ট’। মোবাইলের ক্যামেরা অন করে ছোড়া হচ্ছে একের পর এক ডিম। সেই ডিম মাথায় বা টাকে লেগে ফাটলেই আছড়ে পড়ছে বিশ্বকাপে মেসির হ্যাটট্রিকের উল্লাস। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমেষে ভাইরাল হয়ে যাচ্ছে সেই ভিডিও। লাইকের ছড়াছড়ি। উপচে পড়ছে কমেন্টবক্স। পরিবর্তনের বাংলায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এখন রিলস বানানোর উপকরণ। এটাই কি পরিবর্তন?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ