বিভিন্ন রাজ্যে এসআইআর শুরুর আগে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা ছিল, প্রতিটি বৈধ নাগরিকের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনীর প্রায় অন্তিমলগ্নে এসে অন্তত দুটি অঙ্কের উত্তর মেলানো যাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, প্রথম পর্বে প্রায় ৬৩ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ‘বিবেচনাধীন’-এর তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন ৬০ লক্ষ ভোটার। এখন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব বর্তেছে ৭০৫ জন বিচারকের উপর। তাঁদের বিবেচনায় শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় ৩৭ লক্ষ বিচারাধীনের নিষ্পত্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যদিও দু’দফায় অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে প্রায় ৩০ লক্ষের। কিন্তু এঁদের মধ্যে কারা ‘যোগ্য অর্থাৎ বৈধ’ বিবেচিত হয়ে ভোটাধিকার পেলেন, কারা থাকলেন ‘বৈধ নয়’— কমিশন সেই তথ্য দিতে পারেনি। ফলে বিচারাধীনের তালিকা নিয়ে গোটা রাজ্যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে দুটি অঙ্কের উত্তর মেলাতে পারছেন না কেউ। ফলে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এ রাজ্যের অসংখ্য মানুষ। বলাই বাহুল্য, নির্বাচন কমিশনের তড়িঘড়ি এ রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করা এবং তারপর যথাযথ পরিকল্পনার অভাবের মাশুল দিতে হচ্ছে এ রাজ্যের অগুনতি মানুষকে। উঠছে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নও। গেরুয়া শিবিরের অঙ্গুলিহেলনে এসআইআর-এর কাজ হচ্ছে বা তাদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে বলেও শাসক দল তৃণমূলের তরফে বারবার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে একটা সংশয় ধোঁয়াশা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গে দু’ দফার ভোটে প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন যথাক্রমে ৬ এবং ৯ এপ্রিল। নিয়ম মতো, মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিনের আগে পর্যন্ত বিচারাধীন তালিকায় থাকা ভোটারদের মধ্যে যাঁরা ‘যোগ্য’ হিসাবে বিবেচিত হবেন, তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। কমিশন সূত্রে খবর, প্রতিদিন দেড় লক্ষের মতো নামের মীমাংসা করছেন বিচারকরা। সেই হিসাবে প্রথম দফার মনোনয়নের শেষ দিন (৬ এপ্রিল)-এর আগে হাতে থাকা ৯ দিনে সর্বোচ্চ সাড়ে ১৩ লক্ষ নামের মীমাংসা হওয়ার কথা। আর শুক্রবার পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৭ লক্ষ নামের। দুটি যোগ করলে বাকি যে ১০ লক্ষ বিবেচনাধীনের নাম তালিকায় থাকবে— নির্দিষ্ট সময়ের আগে তার ফয়সালা হবে কোন জাদুযন্ত্রে—সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর কি আছে কমিশনের কাছে? এর একটাই অর্থ, এই ১০ লক্ষ নাম নিষ্পত্তির বাইরে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা। এর মধ্যে যাঁরা ‘যোগ্য’— তাঁরা ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন কি না তাও লাখ টাকার প্রশ্ন। আদৌ এঁদের নিষ্পত্তি কবে, কীভাবে হবে— তাই নিয়ে ধোঁয়াশার পাশাপাশি চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। সঙ্গত কারণেই তাই প্রশ্ন উঠছে, দেশের নাগরিকদের এভাবে কেন চরম অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাতে হবে?
দ্বিতীয়ত, বলা হয়েছে, যাঁরা ‘অযোগ্য’ বলে চিহ্নিত হবেন তাঁরা ভোটাধিকার পেতে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে পারবেন। একটি সূত্রে জানা যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক হিসাব হল, বিচারাধীন তালিকায় ৪০ শতাংশ (২৪ লক্ষ) নাম অযোগ্য হিসাবে বাদ পড়তে চলেছে। তার মানে, চাইলে তাঁরা সবাই ট্রাইবুনালে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন করতে ১৫ দিন সময় পাবেন তাঁরা। আবেদন অনলাইন এবং অফলাইনে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসক, অতিরিক্ত জেলাশাসক ও মহকুমা শাসকের কাছে লিখিতভাবেও করা যাবে। ইতিমধ্যে রাজ্যের ২৩টি জেলার জন্য ১৯টি ট্রাইবুনাল গঠনের কথা বলা হয়েছে। প্রতিটি ট্রাইবুনালের মাথায় রাখা হচ্ছে একজন করে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে। বিস্ময়ের কথা হল, প্রথমে পরিকল্পনা থাকলেও এখন প্রতিটি ট্রাইবুনালের জন্যই নাকি কলকাতায় জায়গা দেখা হচ্ছে। তার মানে জেলাতে কোনো ট্রাইবুনাল হয়তো হবে না। ঘটনা হল, দৃশ্যমানতা ট্রাইবুনাল শনিবার পর্যন্ত তৈরিই হয়নি! ফলে কবে ট্রাইবুনাল কাজ শুরু করবে— তা পরিষ্কার নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, রাজ্যে ভোটের যা নির্ঘণ্ট তাতে ট্রাইবুনাল গঠন, তার কাজ শুরু করা, ‘অযোগ্যদের (বৈধ নয়)’ আবেদন করার জন্য ১৫ দিনের সময়সীমাকে মান্যতা দেওয়া এবং প্রতিটি আবেদন বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য যে সময় পাওয়া যাবে— তা কি যথেষ্ট? সঙ্গত প্রশ্ন হল, ট্রাইবুনালের বিচারে কেউ ‘যোগ্য’ বিবেচিত হলেও তিনি কি এবার ভোট দিতে পারবেন? হাজারো প্রশ্ন। নির্বাচন কমিশন অবশ্য সব দায়দায়িত্ব বিচার বিভাগের উপর ছেড়ে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছে। কিন্তু এসবের পরিণতিতে যে আশঙ্কার মেঘ তৈরি হয়েছে তা হল, শেষপর্যন্ত এঁদের কি ‘সন্দেহজনক’ ভোটার বা ‘ডি ভোটার’ হিসাবে দেগে দেওয়া হবে? যেমনটা হয়েছে অসমে? তারপর ঠিকানা হবে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’? অমিত শাহ একদা যেমন অনুপ্রবেশকারী ধরতে এসআইআর বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন, এর উদ্দেশ্য হল ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ করা। কারণ এরা সব নাকি ‘অনুপ্রবেশকারী’! এটাই হয়তো না মেলা অঙ্কের শেষ পরিণতি।