Bartaman Logo
১৮ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এ এক অন্য একুশে জুলাই

একুশে জুলাই পালনের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব স্পষ্ট। রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত জানুন।

এ এক অন্য একুশে জুলাই
  • ১৮ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: এ এক অন্য একুশে জুলাই। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই সচিত্র পরিচয়পত্র চালুর দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন কলকাতা পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়ে ছিলেন ১৩জন। পরের বছর থেকে একুশে জুলাই শহিদ স্মরণে সভা করেন মমতা। দু’দিন পর একুশে জুলাই। তবে এবার তৃণমূলের দু’টি গোষ্ঠী শহিদ দিবস পালন করবে। অবশ্য এবারের একুশে জুলাই পালনের উদ্দেশ্য শহিদ স্মরণ, নাকি অন্য গোষ্ঠীকে ‘শহিদ’ বানানো, তা নিয়ে সংশয় আছে। তবে, কাদা ছোড়াছুড়ি দেখে তিতিবিরক্ত তৃণমূল কর্মী সমর্থকদের একটাই প্রশ্ন, কবে বন্ধ হবে এই সার্কাস?

Advertisement

১৫ বছরের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দু’মাসের মধ্যেই ভেঙে গিয়েছে। দিন যত যাচ্ছে বিজেপি অনুপ্রাণিত তৃণমূল বিধায়ক ও পদাধিকারীদের ভিড় ততই বাড়ছে। শুধু বাড়ছে বললে ভুল হবে, ঘর উপচে পড়ছে। কেন্দ্রীয় এজেন্সির ‘হুড়কো’র ভয়ে যেভাবে লাইন পড়ছে তাতে হয়তো নব্য তৃণমূলীরাও একদিন শমীক ভট্টাচার্যের মতো বলে না দেয়, ‘দরজা বন্ধ।’
তথাকথিত দাপুটে ও প্রভাবশালী তৃণমূল নেতাদের কালীঘাট শিবির ত্যাগের সংখ্যা বাড়লেও অবাক করেছেন মদন মিত্র। ‘ভালো তৃণমূল’ শিবিরের যে 
দু’ চারজনের পায়ের তলায় মাটি আছে তাঁদের মধ্যে মদন মিত্র একজন। তৃণমূল হারার পরেও তিনি 
বুক চিতিয়ে বিজেপির বিরোধিতা করেছেন। ভালো তৃণমূল শিবিরকে তুলোধোনা করেছেন। মদনবাবুকে সবক শেখানোর জন্য রাতের অন্ধকারে তাঁর উপর হামলা চালানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি দমেননি। ফেসবুক লাইভ করে কারা আক্রমণ করেছে, কাদের মদত আছে, তা বিস্তারিত জানিয়েছেন। এহেন মদন মিত্রও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে নেতা মানলেন। সত্যিই তিনি কি মেনে নিলেন, নাকি মানতে বাধ্য হলেন? এই প্রশ্ন ওঠার কারণ, শিবির বদলের আগের দিনই তাঁর পরিবারের সদস্যদের কাছে পৌঁছেছিল এজেন্সির নোটিস।
অনুব্রত মণ্ডল থেকে মদন মিত্র সকলের শিবির বদলের কারণ নাকি একজনই। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রত্যেকের একটাই বক্তব্য, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের নেত্রী। কিন্তু, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের খবরদারি তাঁদের অসহ্য। শিবির 
বদল করলেও দল ছাড়ছেন না। তৃণমূল কংগ্রেসেই আছেন।’ এই বক্তব্যের মধ্যে যে কৌশল আছে, 
সেটা মানুষ বুঝতে পারছে। তবে লক্ষণীয় হল, চাপের মুখে যে যাই বলুন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেউ অস্বীকার করতে পারছেন না। নির্বাচনে হারলেও ২ কোটি ৬০ লক্ষ ভোটার তাঁকেই বিজেপি বিরোধী মুখ বলে মনে করেছেন। এই অঙ্কটা দিল্লির বিজেপি নেতাদের মাথাতেও আছে। তাই ২০১৪ সালে কংগ্রেস মুক্ত ভারত গড়ার ডাক দেওয়া বিজেপির এখন টার্গেট, বাংলাকে মমতামুক্ত করা। সেই লক্ষ্যেই তারা ঘুঁটি সাজাচ্ছে।
এই মুহূর্তে যা পরিস্থিতি তাতে শমীক ভট্টাচার্যরা লকগেট খুলে দিলে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিরা ছাড়া ‘ভালো তৃণমূলে’র অধিকাংশ বিধায়ক এবং জনপ্রতিনিধি হয়তো গেরুয়া হয়ে যাবেন। কিন্তু, বিজেপি আপাতত বিধায়কদের জন্য দরজা বন্ধ রেখেছে। তবে, এমন একটা চাল চেলেছে যাতে প্রয়োজন হলেই তাঁদের কাজে লাগাতে পারে। বিজেপি আপাতত লোহা দিয়ে লোহা কাটছে। ভালো তৃণমূল শিবিরকে দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অপদস্থ করাচ্ছে। অনেকে বলছেন, ভালো তৃণমূলের অবস্থা জালের মধ্যে পুকুরে জিইয়ে রাখা মাছের মতো। মাছ পুকুরের জলেই আছে। কিন্তু জাল থেকে বেরনোর পথ নেই। এই জাল অভিমন্যুর চক্রব্যূহের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
তবে, এখন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদদের পোয়াবারো। তাঁদের বিধায়কদের মতো জালের মধ্যে ছটফট করতে হচ্ছে না। লোকসভার সদস্যদের মতো একটা অনামী দলের মেম্বার হয়ে কটাক্ষ হজম করতে হচ্ছে না। তাঁদের জন্য রয়েছে ‘স্পেশাল অফার’। তৃণমূল ছাড়লেই বিজেপির টিকিট। তাঁর বিরুদ্ধে যত অভিযোগই থাকুক না কেন, কেন্দ্রীয় এজেন্সি ছোঁয়া তো দূরের কথা, ফিরেও তাকাবে না। আপাতত তিনজনের হিল্লে হয়ে গিয়েছে। সেই পথে পা বাড়িয়েছেন কোয়েল মল্লিকও। 
তবে, ‘তোলামূলে’র সদস্যদের রাজ্যসভার টিকিট দেওয়ায় বিজেপি কর্মীরা বেজায় চটেছেন। পাশাপাশি যাঁরা বিধানসভার টিকিট না পেয়ে রাজ্যসভায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁরাও বেশ ক্ষুব্ধ। তবে, এই সব ক্ষোভ, অভিমানকে পাত্তা দিচ্ছে না নেতৃত্ব। বলছে, এর পিছনে নাকি রয়েছে জাতীয় স্বার্থ। আর বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেওয়ার শিক্ষা তো আমরা ছোটোবেলাতেই পেয়েছি। তাই বুকে যত জ্বালাই থাক, বৃহত্তর স্বার্থে বিজেপির ‘তৃণমূলীকরণ’ মেনে নিতেই হবে। যন্ত্রণার এখানেই শেষ নয়। শোনা যাচ্ছে, বিল পেশের আগেই তৃণমূলের ২০জন সাংসদও বিজেপিতে যোগ দেবেন।
এমনই এক পরিস্থিতিতে এবার একুশে জুলাই পালন হচ্ছে। শিবির দু’টি। একটির মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর ডাকে পুলিশের গুলির সামনে 
বুক পেতে দিয়েছিলেন তাঁর অনুগামীরা। অন্যটির মাথায় ‘দলবদলু’ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, যাঁর সঙ্গে একুশে জুলাইয়ের দূর দূরান্তের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ তাঁরই নেতৃত্বে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, অনুব্রত মণ্ডল, মদন মিত্ররা শহিদ স্মরণ করবেন। এমনটা কেউ ভাবতে পেরেছিল?
বিধায়ক এবং সাংসদ সংখ্যার নিরিখে এখন নব্য তৃণমূলরাই দলে ভারী। তবে, কারা প্রকৃত তৃণমূল, কারা প্রতীক পাবে, সেটা আদালত ও নির্বাচন কমিশন ঠিক করবে। কিন্তু, রাজ্যের মানুষ কাদের আসল তৃণমূল মনে করছে, সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন। এর উত্তর এখনই মিলবে না। তবে, বিধায়ক ভালো তৃণমূলে যোগ দিলেন মানেই সেখানকার নেতা কর্মীরা তাঁকে অনুসরণ করবেন, এমনটা ভাবার কারণ নেই। উত্তর ২৪ পরগনার বাদুড়িয়া পঞ্চায়েত সমিতির অনাস্থা পাশের ঘটনায় তার প্রমাণ মিলেছে। বাদুড়িয়ার বিধায়ক ভালো তৃণমূলে। তাঁর অনুগামী বলে পরিচিত পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা আনেন কালীঘাটপন্থী সদস্যরা। ২৭-০ ভোটে সেই প্রস্তাব পাশও হয়েছে। কোন শিবিরকে মানুষ বিজেপি বিরোধী হিসাবে চাইছে, সেটা জানার জন্য একটা সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
২০২৯ সালে লোকসভা নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে পঞ্চায়েত নির্বাচন আছে। এবছর ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই কিছু পুরসভার নির্বাচন হবে। রাজ্য রাজনীতির যা হাল তাতে পুরসভার নির্বাচনে বিজেপি ড্যাং ড্যাং করে জিতবে। রাজ্যের শাসক দলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর অবস্থায় আপাতত কেউ নেই। বিজেপি চাইলে অধিকাংশ পুরসভাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে নিতে পারে। কিন্তু, সেটা তারা করবে বলে মনে হয় না। ‘ভালো তৃণমূল’কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দিতে তাদের কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। ‘ভালো তৃণমূল’ যে অকৃতজ্ঞ নয়, সেটা তাঁদের নেতা পদে পদে প্রমাণ দিচ্ছেন। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার মুখ্যমন্ত্রীর পদাঙ্ক অনুসরণের দৃশ্যটি ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। বাংলার মানুষ তা ভুলতে চাইলেও পারবে না।
তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর তো বটেই, তার আগেও ১৭ বছর একুশে জুলাই পালন করেছে। শহিদ স্মরণকে ঘিরে প্রতিবছর তৃণমূলের পক্ষ থেকে জেলায় জেলায় প্রস্তুতিসভা হত। এবার তার ছিটেফোঁটাও নেই। নির্বাচনে জয় পরাজয় থাকে। এক দল জিতলে অন্যরা হারবে, এটাই নিয়ম। জয়ীরা উন্নয়নের কাজ করে। আর পরাজিতরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালায়। ২০১১ সালে বামেরা বাংলায় হেরেছিল। তারপর থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। আদর্শগতভাবে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে থাকা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে ভোটে লড়েছে। তাতে লাভ হয়নি, সেটা অন্য বিষয়। তবে বাস্তব হল, তারা নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হাল ছাড়ছে না। সেই দিক দিয়ে এবার একুশে জুলাই ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূলের কাছে হতে পারত ঘুরে দাঁড়ানোর শপথ নেওয়ার দিন। নানান ইস্যুতে বিজেপিকে চেপে ধরার বদলে একের পর এক আত্মঘাতী গোল করে চলেছে। 
কথায় আছে, প্রেমে ও যুদ্ধে সবই ন্যায়। রাজনীতির ময়দান হল যুদ্ধক্ষেত্র। সেখানে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করতে চাওয়ার মধ্যে কোনো অন্যায় নেই। রাজ্যের ১৫ বছরের শাসকদল তৃণমূলকে দুর্বল করার চেষ্টা বিজেপি চালাবে, সেটাই স্বাভাবিক। কারণ দুই দলের ভোটের ব্যবধান ৩০ লক্ষ। তবে ‘অপারেশন লোটাস’ বঙ্গ রাজনীতির কুশীলবদের মুখোশ খুলে দিয়েছে। বিজেপি দেখিয়ে দিল, সরকারি ক্ষমতার দম্ভে যারা নিজেদের বাঘ, সিংহ বলে প্রচার করত, তারা আসলে ‘জোকার’।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ