Bartaman Logo
১৭ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘সেটিং’ রাজনীতি ও দলবদল

‘সেটিং’ রাজনীতি ও দলবদল
  • ১৭ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাজনীতিতে কৃতজ্ঞতা বোধহয় সবচেয়ে সস্তা এবং দুষ্প্রাপ্য বস্তু। বিশেষ করে ক্ষমতার ভরকেন্দ্র যখন স্থানান্তরিত হতে শুরু করে, তখন দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গীরাও কীভাবে ভোল বদলে ফেলতে পারেন, বর্তমানে বাংলার রাজনীতি তার ক্লাসিক উদাহরণ। গত বুধবার কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্রের হাত ধরে কালীঘাট তৃণমূলের ভাঙন পর্বে যুক্ত হল এক নতুন অধ্যায়। অনুব্রত মণ্ডল আগেই গিয়েছেন। এবার মদন মিত্রও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তৃণমূল’ শিবিরে নাম লেখালেন। আর দল ছাড়ার মুহূর্তেই অবধারিতভাবে তাঁদের তূণ থেকে বেরলো সেই চেনা তির—দলের এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী একমাত্র অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়! তৃণমূলের অন্দরে আইপ্যাক বা অভিষেকের ‘হিটলারি’ কায়দায় দল চালানো নিয়ে ক্ষোভ নতুন নয়। ভোটের ভরাডুবির পর হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে যখন দলনেত্রী স্বয়ং অভিষেককে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাতে বলেন, তখন বাগনানের বিধায়ক অরুণাভ সেন সহ কয়েকজন বিদ্রোহ করেছিলেন। পরবর্তীকালে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে কুণাল ঘোষ—সবার গলাতেই বিভিন্ন সময়ে অভিষেকের ‘কর্ম পদ্ধতি’ বা ডায়মন্ডহারবার ক্লাবের বিপুল অর্থের উৎস নিয়ে উষ্মা প্রকাশ পেয়েছে। মদন মিত্রও দল ছেড়েই সরব হলেন—ইডির চেয়ে নাকি ‘এবি’ বেশি ভয়ঙ্কর! অনুব্রতও তিহার জেল খাটার দায় চাপালেন ‘ভাইপোর’ ঘাড়ে। শুনতে বেশ নাটকীয় লাগে। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই যে চন্দ্রিমা, ফিরহাদ, অরূপ থেকে শুরু করে মদন-অনুব্রতদের লাইনে দাঁড়িয়ে ঋতব্রত শিবিরে নাম লেখানো—তা কি শুধুই অভিষেকের উপর ক্ষোভ? নাকি এটা আদতে নিজেদের পিঠ বাঁচানোর এক চরম সুবিধাবাদী কৌশল? 

Advertisement

টাইমিং-এর চেয়ে বড়ো সত্য আর কিছু হয় না। পুরনিয়োগ দুর্নীতিতে মদন মিত্রের স্ত্রী ও পুত্রদের ইডির নোটিস পাঠানোর ঠিক চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এন্টালির বিধায়কের বাড়ি হয়ে পরদিন বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার ঘরে গিয়ে বসা—এটা কি স্রেফ কাকতালীয়? একইভাবে, ইটভাটা লুট ও হামলা কাণ্ডে তদন্তের খাঁড়া ঝুলতেই অনুব্রতের ভোলবদল কি নিছকই কাকতালীয়? কুণাল ঘোষের সেই তির্যক মন্তব্যটাই এখানে খাঁটি সত্য হয়ে দাঁড়ায়—কেন্দ্রীয় এজেন্সির ‘পারিবারিক নিমন্ত্রণ’ পাওয়ার পরেই কেন এই জ্ঞানোদয়? আগে কেন নয়? তখন মুখ খুললে জেলে যেতে হত—এই ঠুনকো অজুহাতে কি নিজেদের অপরাধবোধ আর কাপুরুষতা ঢাকা যায়? মদন মিত্র কালো চশমা চোখে দু’লাইনের কবিতা আউড়ে বললেন, তিনি নাকি ‘সুখের পালঙ্ক’ ছেড়ে ‘খাটিয়া’ বেছে নিলেন। কিন্তু বাংলার নাগরিকরা বোকা নন। তাঁরা ভালো করেই জানেন, এই খাটিয়া আসলে ক্ষমতার আরও কাছাকাছি থাকার। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদ্রোহী ব্লকে যোগ দিয়ে বা কেন্দ্রের শাসক দলের জোটসঙ্গী হয়ে ইডি-সিবিআইয়ের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার এক নিরাপদ ‘সেটিং’। রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়রা যখন অবলীলায় ‘স্বপ্নভঙ্গ’-এর দোহাই দিয়ে শুভেন্দু অধিকারীকে ‘দাদা’ সম্বোধন করে বিজেপির গুণগান গাইতে শুরু করেন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে এই আদর্শের বুলি আসলে ক্ষমতার ছাতার নীচে মাথা গোঁজার তাগিদ মাত্র। চলতি মাসে রাজ্যসভার তিন সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব, প্রকাশচিক বরাইক তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। বৃহস্পতিবার রাজ্যসভার সাংসদপদ থেকে ইস্তফা দেন কোয়েল মল্লিকও। তার পরেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের সঙ্গে দেখাও করেন তিনি। আর এই সবকিছুর চক্করে এই ‘নেতা’রা ভুলে গেলেন সেই মানুষটিকে, যিনি না থাকলে রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে এঁদের কোনো অস্তিত্বই থাকত না। শূন্য থেকে দল তৈরি করে মদন মিত্রদের লাইমলাইটে আনা, অনুব্রতকে ‘বীরভূমের বাঘ’ বানানো—এ তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই অবদান। আজ দুর্দিনে সেই নেত্রীর হাত ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে একবারও তাঁদের হাত কাঁপল না? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফেসবুক লাইভে এসে ঠিকই বলেছেন, ‘অভিষেককে খারাপ বলাটা আসলে বাহানা।’ দেড় বছরের বাচ্চাকে নিয়ে রুজিরা যখন সিবিআই দফতরে যান, তখনও মাথা নোয়াননি অভিষেক। একটু ‘সেটিং’ করে নিলে হয়তো সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পেতে পারতেন তাঁরাই। কিন্তু তা না করে আজ যখন তাঁরা মনে জোর রেখে লড়ছেন, তখন পুরানো সঙ্গীরাই ইডির ভয়ে ইঁদুরের মতো গর্ত খুঁজছেন। 
ক্ষমতার অলিন্দে যখন বেড়াল ঝুলি থেকে বেরনোর উপক্রম হয়, তখন অনেকেই দিক পরিবর্তন করেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, যাঁরা ঝড়ের দিনে ছাতা সরিয়ে নেন, তাঁরা আর যাই হোন, মানুষের নেতা হতে পারেন না। ২০০৪ সালে একা হয়েও যদি মমতা ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, ২০২৬ সালেও তিনি পারবেন—তাঁর এই আত্মবিশ্বাসটুকুই আসল। ক্ষমতার পালঙ্ক বদলাতে পারে, কিন্তু বাংলার মানুষ এই চরম কৃতজ্ঞতাহীনতার রাজনীতিকে ক্ষমা করবে কি না, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ