Bartaman Logo
১৭ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভোটদান কি মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত?

ভারতে ভোটদানকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠেছে। প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার SY Qureshi'র মতামত নিয়ে বিস্তারিত জানুন।

ভোটদান কি মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত?
  • ১৭ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত; বিশ্বের ২৭টি দেশ আছে যেখানে ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক। বেশ কিছু দেশে ভোট না দিলে জরিমানা হয়। বলিভিয়া এমন একটি দেশ যেখানে ভোট না দিলে বেতন আটকে দেওয়ার অধিকারও রয়েছে সরকারের কাছে। গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে ভোট নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কারণ ভোট না দেওয়ার অধিকারও গণতন্ত্র, এই অভিমতও যথেষ্ট জোরালো। যদি কোনো রাষ্ট্র সংসদীয় গণতন্ত্রকে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দেশ পরিচালনার অঙ্গ হিসেবে মনে করে, তাহলে সেই গণতন্ত্রের অবশ্যই সর্বশক্তিমান অস্ত্র হল ভোটদান। বাধ্যতামূলক ভোটদানের সপক্ষে যে যুক্তি দেওয়া হয় সেটি হল, যত বেশি সংখ্যক নাগরিক ভোটদানে অংশ নেবে, তত বেশি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন প্রণালীর বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে। 

Advertisement

ভারতে ফের নতুন একটি বিতর্ক মাথা চাড়া দিয়েছে। ভোটদান কেন মৌলিক অধিকারের তালিকায় থাকবে না? সম্প্রতি কংগ্রেসের একাংশ এই দাবি তোলার পর প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কু঩রেশিও এই নিয়ে বিস্তারিত মতপ্রকাশ করেছেন। যে প্রশ্নটি নিয়ে বহু বছর ধরেই বারংবার চর্চার সূত্রপাত হয়েছে, সেটি হল, ভারতে ভোটদানকে কেন এখনও সংবিধানের মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা হবে না? গণতন্ত্র রক্ষা করার ক্ষেত্রে এক ও একমাত্র মাধ্যম হল নির্বাচন। দেশবাসী ভোট দিয়ে নির্বাচন করবে শাসককে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে দফায় দফায় এমনকি সুপ্রিম কোর্টেও মামলা এবং শুনানি হয়েছে যে, কেন ভোটদান মৌলিক অধিকার হবে না?
এই বিষয়টি বর্তমানে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার কারণ হল, এসআইআর। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে লক্ষ লক্ষ নাগরিকের নাম বাদ চলে গিয়েছে। যারা অনুপ্রবেশকারী ও অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছে, তাদের নাম বাদ যাবে, এটা স্বাভাবিক, প্রত্যাশিত ও কাম্য। কিন্তু সমস্যা ও প্রশ্নের সূত্রপাত হয়েছে, যারা ভারতীয় নাগরিক, কিন্তু প্রযুক্তিগত কোনো কারণে তাদের নাম বাদ গিয়েছে এবং বলা হচ্ছে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির কারণে এই সমস্যা, তারা কেন ভোট দিতে পারবে না! এই নাগরিকদের স্ট্যাটাস বলা হচ্ছে বিচারাধীন। অর্থাৎ তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি। কিন্তু বাংলা ও বিহারে এই অংশকে ভোটদান থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এবার যদি দেখা যায়, এদের মধ্যে যাদের নাম আবার ভোটার তালিকায় স্থান পেল, তাহলে তাদের অধিকার কি ক্ষুণ্ণ হল না? অর্থাৎ তারা যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোট দিতে পারল না, এটা তো আইনি অধিকার লঙ্ঘিত হল। এই সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট একটি আশ্চর্য কথা বলেছে। একবার ভোট না হয় নাই দিল কেউ কেউ, তারা পরের বার দেবে! 
আইনি অধিকার কেন? কারণ, ভোটদানের অধিকার হল স্ট্যাটুটরি অধিকার। আইনগত অধিকার। অর্থাৎ সংসদে আইন প্রণয়ন করে এই অধিকার প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু মৌলিক অধিকার নয়। সংবিধানে দুটি অধিকার আছে। একটি হল মৌলিক অধিকার। ফান্ডামেন্ডাল রাইটস। দ্বিতীয়টি হল স্ট্যাটুটরি রাইটস। আইনগত অধিকার। মৌলিক অধিকার সর্বোত্তম অধিকার। সংবিধানের ১২ থেকে ৩৫ নং ধারার মধ্যে এই অধিকারগুলি বর্ণিত এবং ৩ নং অংশের অন্তর্ভুক্ত। যেগুলি কঠোরভাবে সুরক্ষিত। খুব সহজে বদল করা, লঙ্ঘন করা অথবা স্রেফ আইন সংশোধন করেই পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। 
বিগত ৮০ বছরে বারংবার প্রশ্ন উঠেছে, আমাকে কে শাসন করবে, সেই  শাসককে মনোনীত করার অধিকার মৌলিক অধিকার নয় কেন? ১৯৫২ সালে প্রথমবার সুপ্রিম কোর্টে এই বিষয়টি উত্থাপিত হয়। এন পি পুন্নুস্বামী বনাম রিটার্নিং অফিসারের মধ্যে হওয়া ওই মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এবং ভোটদান এই দুটি মৌলিক অধিকার হতে পারে না। নিছক স্ট্যাটুটরি রাইটস। আইনগত অধিকার। ১৯৮২ সালে জ্যোতি বসু ও অন্যান্য বনাম দেবী ঘোষাল ও অন্যান্য মামলায় ঠিক একই অবস্থান জানিয়ে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। ২০০৬ সালে কুলদীপ নায়ার বনাম ভারত সরকারের মামলায় সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দেয়, গণতন্ত্র যদিও সংবিধানের মৌলিক ভিত্তি (বেসিক স্ট্রাকচার), 
কিন্তু নাগরিকদের ভোট দানের অধিকার জনপ্রতিনিধিত্বমূলক আইন অনুযায়ী একটি অধিকার। 
কেন এই নিয়ে এত বিতর্ক? প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি একটি গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। সেটি হল, এই অবস্থানের ম঩ধ্যে কি রয়েছে পরস্পরবিরোধী যুক্তি? কেন? কারণ, ২০০৩ সালে ইউনিয়ন অফ সিভিল লিবার্টিস বনাম ভারত সরকারের মধ্যে হওয়া একটি মামলায় এই সুপ্রিম কোর্টই বলেছিল, যদিও ভোটদানের অধিকার সামগ্রিকভাবে আইনগত অধিকার, কিন্তু একজন ভোটার কাকে ভোট দেবে সেই স্বাধীনতা মৌলিক অধিকারের অন্তর্গত। কারণ ওটা সংবিধানের ১৯ নং ধারা (১) (A) অনুযায়ী অধিকার বিবেচিত হবে। কেন? কারণ এটা তো বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতারই অঙ্গ! অতএব একজন নাগরিক কাকে ভোট দেবে, সেটা যদি কোনোভাবে লঙ্ঘিত হয়, তাহলে সেটা সংবিধানের মৌলিক অধিকার হরণ করার সমান হবে। সেইমতো হবে শাস্তি। এখানেই শেষ নয়। ‘নোটা’র অধিকারও কার্যত মৌলিক অধিকারের ধারারই অন্তর্গত। অর্থাৎ কাউকে মনোনীত না করা ও সকলকেই খারিজ করে দেওয়ার অধিকার সেই ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন তথা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যেই নিহিত। সেই কারণেই প্রশ্ন উঠছে যে, কেন ভোটদানের অধিকারকে সরাসরি মৌলিক অধিকারের আওতায় আনা হবে না? 
এই অভিমতের বিরুদ্ধ মতও রয়েছে। যেখানে বলা হয়, সংবিধানের মৌলিক অধিকারগুলি সার্বজনীনভাবে যেকোনো মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ ওগুলি সরাসরি সভ্য সমাজে মানবজীবনের অধিকার হিসেবে গণ্য করা হয়। অর্থাৎ ধর্মের অধিকার, মতপ্রকাশের অধিকার, জীবনযাপনের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার ইত্যাদি। যেগুলিকে সংবিধানের পার্ট থ্রির মধ্যে রাখা হয়েছে। এই অধিকারগুলির সঙ্গে মানবজীবন যাপনের আবশ্যিক শর্তগুলি অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। তাই তার মধ্যে ভোটদান সামঞ্জস্যপূর্ণ ও যুক্তিসঙ্গতই নয়। 
কিন্তু প্রশ্ন হল, গণতন্ত্র কেন ভালো? কারণ এখনও পর্যন্ত সংসদীয় গণতন্ত্রের তুলনায় উন্নত রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থা প্রমাণিত হয়নি। আর সেই সংসদীয় গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শত্রু হল স্বৈরাচার। গণতন্ত্রের মধ্যে বহু ত্রুটি থেকে যাওয়ার কারণেই দেশে দেশে ও যুগে যুগে দেখা গিয়েছে, দেশে গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় থাকলেও শাসকের মধ্যে স্বৈরাচারের মনোভাব প্রবল। ভোটদানের অধিকারকে যদি মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে কি কিছুটা হলেও স্বৈরতন্ত্রের পদধ্বনিকে প্রতিহত করা যাবে না? 
রাষ্ট্র কিংবা কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করলেই যাতে বৈধ নাগরিকের ভোটদানের অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সেই রক্ষাকবচ দেওয়া দরকার। যে বৈধ নাগরিক ট্যাক্স দিয়েছে, অতীতে অসংখ্যবার ভোট দিয়েছে, সেই ভোটেই বহুবার বহু শাসক ও সরকার গঠিত হয়েছে। তাহলে একদিন হঠাৎ কোনো এক কারণে সেই ভোটারকেই অবৈধ ঘোষণা করা অথবা সন্দেহজনক ভোটার হিসেবে তকমা দেওয়ার সঙ্গত কারণ গণতন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন। 
অবৈধ নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র তার অভিযান ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে। আবার সেই কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বৈধ নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া সরাসরি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অফ হিউম্যান রাইটসের অন্তর্গত ২১ নং ধারায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে ভোটের অধিকার প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ ভোটের অধিকার যথেষ্ট শক্তিশালী প্রতিটি গণতন্ত্রে।  কিন্তু গণতন্ত্রের প্রয়োগ ও সুরক্ষা প্রদান ক্রমশ কমছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই গণতন্ত্র হরণ প্রবণতা বাড়ছে। 
২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৬৫টি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকরা নিজেদের দেশে ভোটপ্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিল। কিন্তু ওই বছরই বিশ্বজুড়ে সবথেকে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ, মতপ্রকাশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। একইসঙ্গে ঘটছে রাজনৈতিক অবিশ্বাস, বিশ্বাসঘাতকতা এবং অনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখল। ভারতের মতো দেশে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ভোটদানের অধিকারই শুধু‌ ঩বেঁচে আছে মানুষের কাছে একক স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে। অথচ সেই অধিকারের আয়তন কমে চলেছে। রাজনৈতিক দলগুলির আচরণেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট। 
ভারতে ক্রমেই মূল্যহীন হয়ে যাচ্ছে ভোটাররা। কারণ যাকে ভোটার ভোট দিচ্ছে, সে কিছুদিনের মধ্যে দলবদল করে ফেলছে। যে দলকে একজন ভোটার নিজের পছন্দমতো বেছে নিয়েছে, সেই দল প্রতিপক্ষের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফেলছে। ভোটাররা হয়তো বুঝতেও পারছে না যে, তাদের মতামতের মূল্য প্রতিনিয়ত কমছে। নেতাদের মূল্য সর্বার্থেই বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে ভোটারের মূল্য কমছে। যা গণতন্ত্রের সবথেকে বড়ো দুর্ভাগ্য! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ