জীবনকে যা ধারণ করে থাকে তাকে বলে ধর্ম। ‘ধয়তে অনেন ইতি ধর্মঃ’। মনের সর্বাত্মক প্রকর্ষ ধর্মেরই নামান্তর। মহাভারতের বাণী—
জীবনকে যা ধারণ করে থাকে তাকে বলে ধর্ম। ‘ধয়তে অনেন ইতি ধর্মঃ’। মনের সর্বাত্মক প্রকর্ষ ধর্মেরই নামান্তর। মহাভারতের বাণী—
‘ধর্মস্য তত্ত্বং নিহিতং গুহায়াং।
মহাজনো যেন গতঃ সঃ পন্থাঃ।।’
ধর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব নিহিত রয়েছে হৃদয়গুহায়। জীবনের গভীরে বিদ্যমান এর অস্তিত্ব। লোকোত্তর পুরুষের যাত্রাপথই প্রকৃত ধর্মপথ যা মানুষের অনুসরণীয়।
মহাপ্রেমিক শ্রীচৈতন্য দেবভূমি ভারতবর্ষের এক অনন্য ধর্মাচার্য। মধ্যযুগের ধর্মান্দোলনের তিনি প্রবর্তক। গৌড়ভূমির ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের তিনি যুগনায়ক। ইতিহাস তাঁকে সৃষ্টি করেনি, ইতিহাসের তিনি স্রষ্টা। চৈতন্যদেবের ধর্ম থেকে বাঙালী পেয়েছে আত্মিক, আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিক বা ‘কালচারাল প্রগ্রেস’-এর দিক্ নির্দেশ। তিনি চেয়েছিলেন আত্মচৈতন্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক প্রতিটি মানুষ। বাঙালীর মনে তিনি এনে দিয়েছিলেন পূর্ণাঙ্গ মানুষের প্রত্যয়, তাঁর ধর্ম তাই বীরের ধর্ম। পাখির মতো খোলস ভেঙে বেরিয়ে এসে বাঙালীকে তিনি মাটির থেকে অনেক দূরে অসীম দিগন্তে উড়তে শিখিয়েছিলেন।
মানবিকতার বেদীমূলে প্রতিষ্ঠিত চৈতন্যদেবের ধর্ম মূলতঃ বৈষ্ণবধর্ম।
কালের যাত্রাপথে বৈষ্ণবধর্মের বিবর্তনের সূত্রটি অনিবার্য-ভাবে প্রাসঙ্গিক। বিষ্ণুর উপাসনা ভারতবর্ষে বৈদিক যুগ থেকে চলে আসছে।
ঋগ্বেদের বিষ্ণুদেবতার ভাবনা থেকেই বৈষ্ণব অধ্যাত্মচিন্তার উৎপত্তি। ঋগ্বেদের পর দেবলোকের প্রাণদেবতা যজ্ঞাগ্নি রূপে বিষ্ণুর অধিষ্ঠান।
বৈদিক নৈষ্ঠিক গৃহস্থমাত্রেই ছিলেন অগ্নিহোত্রী। গৃহকর্তা সহধর্মিনীসহ ‘গার্হস্থ্য অগ্নি’-কে পোষণ করতেন সন্তানস্নেহে। অগ্নি সেখানে কল্পিত হয়েছেন শিশুরূপে। পরবর্তীকালে কৃষ্ণলীলায় এই চিন্তারই রূপান্তর ঘটে নন্দযশোদা ও গোপাল ভাবনায়। চিরকালের সংসারের এই ত্রয়ী-রূপের প্রেক্ষাপটে ব্রজলীলায় বাৎসল্যরসের পরিপুষ্টি।
জ্ঞানঋদ্ধ অধ্যাপক সুকুমার সেন এই অভিমতেরই অনুবর্তী। কৃষ্ণের শৈশবকালীন বীরত্বব্যঞ্জক কাহিনীগুলি লোকসাহিত্য থেকে গৃহীত হয়েছিল স্থাপত্যশিল্পে। ভক্তিমূলক পুরাণগ্রন্থ এবং সংকলন গ্রন্থে ধৃত সংস্কৃত-প্রাকৃত-অপভ্রংশ শ্লোকে লোকায়ত রাধাকৃষ্ণ কাহিনী ও আদর্শ অপরিচিত ছিল না। কৃষ্ণের গোপীলীলার সংকেত মেলে কালিদাসের ‘রঘুবংশ’-এ এবং ‘মেঘদূত’-এ। ক্রমে ক্রমে গানে ও ছড়ায় কৃষ্ণকথা হয়ে ওঠে ভক্তিরস ও প্রেমরসের বাহন।
ভক্তিমার্গের সাধনার জন্ম দাক্ষিণাত্যে। বৈষ্ণবধর্মে ভক্তিরসের যোগান এসেছে দক্ষিণ ভারত থেকে। ‘‘উৎপন্না দ্রাবিড়ে ভক্তিঃ’’।
ডঃ মৈত্রেয়ী চৌধুরীর ‘প্রসঙ্গ শ্রী চৈতন্যদেব’ থেকে