ভারত জনসংখ্যায় এক নম্বরে। আয়তনেও পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এক দেশ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের কদর কিন্তু এজন্য নয়। ভারতের খ্যাতি ও গ্রহণযোগ্যতা যে সামান্য কয়টি কারণে তার মধ্যে একটি হল মহাকাশ বিজ্ঞানে ভারতের চমকপ্রদ অগ্রগতি। আর এই ক্ষেত্রে নিরন্তর অগ্রগতির কৃতিত্ব দাবি করতে পারে যে প্রতিষ্ঠান তার নাম ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ইসরো)। ভারতের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে বিশাল অবদান রেখেছে চলেছে এই সংস্থা। যোগাযোগ ও সম্প্রচার, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, দূরপাল্লার নেভিগেশন (যেমন নেভ-আইসি) এবং চন্দ্রযান ও আদিত্য-এল১-এর মতো ঐতিহাসিক মহাকাশ অভিযানের মাধ্যমে ইসরো ভারতকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মহাশক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
ইসরোর গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলি হল—(ক) যোগাযোগ ও সম্প্রচার: ইনস্যাট এবং জিস্যাট সিরিজের উপগ্রহগুলির মাধ্যমে ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ, টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং রেডিয়ো সম্প্রচার ব্যবস্থা সম্ভব হয়েছে। (খ) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আবহাওয়া: ইনস্যাট স্যাটেলাইটের সাহায্যে আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস পাওয়া যায়। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উদ্ধারকার্য ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে এই উপগ্রহগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। (গ) কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ পর্যবেক্ষণ: ভারতীয় রিমোট সেন্সিং (আইআরএস) উপগ্রহগুলির মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা, জমির ব্যবহার, ভূগর্ভস্থ জলের অবস্থান এবং ফসলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর ফলে কৃষি পরিকল্পনা ও মৎস্য আহরণে প্রভূত উন্নতি হয়েছে। (ঘ) নেভিগেশন (নেভ-আইসি): ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি আঞ্চলিক নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম (নেভ-আইসি) স্থল, সমুদ্র ও আকাশপথে নির্ভুল অবস্থান নির্ণয় এবং সময় নির্দেশ করতে সাহায্য করে। এই ব্যবস্থা অসামরিক ব্যবহারের পাশাপাশি দেশের প্রতিরক্ষায়ও কাজে লাগে। (ঙ) মহাকাশ বিজ্ঞান ও গবেষণা: চন্দ্রযান-১ (চাঁদে জলের উপস্থিতি আবিষ্কার), চন্দ্রযান-২, চন্দ্রযান-৩ (চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফল অবতরণ) এবং ভারতের প্রথম সৌর মিশন ‘আদিত্য-এল১’ মহাকাশ গবেষণায় ভারতের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। (চ) সাশ্রয়ী বাণিজ্যিক সাফল্য: ইসরো শুধুমাত্র নিজেদের কাজেই নয়, পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিকেল (পিএসএলভি) এবং লঞ্চ ভেহিকেল মার্ক-৩ (এলভিএম৩) রকেট ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বের অসংখ্য দেশের ছোটো-বড়ো উপগ্রহ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করে। ইসরো এইভাবে ভারতকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এনে দিয়েছে। বলা বাহুল্য, আন্তর্জাতিক মহাকাশ বাজারে এই সূত্রে মজবুত হয়েছে ভারতের অবস্থান। ইসরোর কর্মকাণ্ড অবশ্যই এখানেই থেমে থাকবে না। সংস্থার পাইপলাইনে রয়েছে একের পর এক ভবিষ্যৎ মিশন (যেমন মহাকাশচারী পাঠানোর গগনযান প্রকল্প) বা উপগ্রহ উৎক্ষেপণ পরিকল্পনা। আর এহেন সংস্থা সম্পর্কেই সামনে এসেছে এক বিপরীত চিত্র। কাগজের শিরোনামে জায়গা করে নিয়েছে ‘ইসরো ছাড়ার ঢল বিজ্ঞানীদের’! ভাবা যায়?
ভারতে স্কুল, কলেজ লেভেলে বিজ্ঞানের নানা শাখায় পড়ার বিশেষ আগ্রহ চোখে পড়ে। বলা বাহুল্য, এই ছাত্রছাত্রীরা তুলনায় বেশি মেধাবী। এঁদের একটি অংশ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং বিজ্ঞানের আরও কিছু শাখায় চলে যান। আর একটি অংশ স্বপ্ন দেখেন মহাকাশ গবেষণার কাজে নিজেদের যুক্ত করার। তাঁদের কাছে এ এক স্বপ্নের জগৎ। ভারতের তরুণ প্রজন্মকে এই স্বপ্নের জগতে প্রবেশের চাবিকাঠি হাতে ধরিয়ে দিতে পারে ইসরো। কিন্তু একদল উজ্জ্বল বিজ্ঞানী গবেষক প্রযুক্তিবিদ ইঞ্জিনিয়ার সেই সংস্থাটিই ছেড়ে যেতে মরিয়া! এ মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। অমূল্য রত্ন হিসাবে গণ্য হয় যে মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণা ও উদ্ভাবন সংস্থা, সেখানকার শতাধিক উচ্চপদস্থ বিজ্ঞানী স্বেচ্ছাবসর গ্রহণের জন্য আবেদন করেছেন। একইভাবে ইস্তফা দিতে চেয়েছেন বহু বিজ্ঞানী। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, হঠাৎ কী এমন হল? ভাটার টান রুখতে মোদি সরকার অবশ্য কারও ইস্তফা মঞ্জুর না-করারই কৌশল নিয়েছে। কিন্তু এ কোনো ফলপ্রসূ উপায় নয়। অপছন্দের চাকরি ছেড়ে দেওয়াও একজন ভারতীয় নাগরিকের অধিকার। সরকার জবরদস্তি করলে তা আদালতে খারিজ হতে পারে। বরং খুঁজে দেখা দরকার—প্রতিষ্ঠানে বা সরকারের ত্রুটি কোথায়? ইসরোয় কাজ করার ক্ষেত্রে কিছু গবেষক ও বিজ্ঞানীর সমস্যা কোথায়? মহাকাশ গবেষণা এবং অভিযানগুলি সফল করার ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক এবং আমলাতান্ত্রিক বাধা উপস্থিত হচ্ছে কি না খুঁজে দেখে স্বচ্ছতার সঙ্গেই সেসব দূর করা জরুরি। ইসরোয় থাকতে যাঁরা আগ্রহ হারাচ্ছেন, যাবতীয় ইগো ছেড়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে সরকারের উপযুক্ত কর্তাদের। এই সমস্যা এখনই দূর করা না গেলে ভবিষ্যতে এর জন্য যে মূল্য চোকাতে হবে তা কিন্তু বিপুল। এই দুঃসংবাদ মহাকাশ বিজ্ঞান অধ্যয়নে নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার পরিবর্তে বিমুখ করে তুলতে পারে। সেই ক্ষতি হবে অপূরণীয়।