Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কমিশনের এই তালিকা বিচারকদেরই তো?

আদালতে একটা কথা চালু আছে, ‘আবেগ নয়, তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই হয় বিচার।’ গোটা বাংলা অভয়ার খুনির ফাঁসি চাইলেও আদালত তা মঞ্জুর করেনি।

কমিশনের এই তালিকা বিচারকদেরই তো?
  • ৪ এপ্রিল, ২০২৬ ০৪:০০

তন্ময় মল্লিক: আদালতে একটা কথা চালু আছে, ‘আবেগ নয়, তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই হয় বিচার।’ গোটা বাংলা অভয়ার খুনির ফাঁসি চাইলেও আদালত তা মঞ্জুর করেনি। কারণ দোষীকে ফাঁসিকাঠে ঝোলানোর মতো প্রমাণ সিবিআই আদালতে দিতে পারেনি। তাই সুপ্রিম কোর্ট যখন বিচারাধীন ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব বিচারকদের দিয়েছিল তখন সকলে মনে করেছিলেন, বৈধ ভোটাররা সুবিচার পাবেন। সেই আশাতেই ‘বিচারাধীন’রা যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ দাখিল করেছেন। তারপরেও কমিশন প্রকাশিত সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট থেকে বাদ পড়ছেন লক্ষ লক্ষ ভোটার। তাতে অনেকের মনেই জাগছে প্রশ্ন, বিচারকদের দেওয়া তালিকাই কমিশন আপলোড করছে তো? নাকি সেখানেও কমিশন কাঁচি চালিয়েছে?

Advertisement

নির্বাচন কমিশনের মতো একটি ‘নিরপেক্ষ’ সংস্থার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীরা তুলতে শুরু করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বাংলায় এসআইআর শুরুর সময় থেকেই কমিশনের আচরণ যথেষ্ট সন্দেহজনক। ২০০২ সালে অনলাইনে ভোটার তালিকা আপলোড করার সময়েই কমিশন বহু বুথে শত শত ভোটারের নাম উড়িয়ে দিয়েছিল। তখন প্রশাসন ছিল রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণে। তাই সম্পূর্ণ তালিকা আপলোড করার ব্যবস্থা করেছিল। অনেকের মতে, সেই নাম বাদ দেওয়াটা ছিল নির্বাচন কমিশনের ‘টেস্ট কেস’। তারপর নির্বাচন কমিশন প্রশাসনের দায়িত্ব পেতেই শুরু করে দেয় আসল ‘খেলা’।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন তুলেছিল, এসআইআর নিয়ে বাংলায় এত হইচই হচ্ছে কেন? একথা ঠিক, এ রাজ্যের মতো এসআইআর নিয়ে এত হইচই কোথাও হয়নি। কারণ বাংলার মতো কোনো রাজ্যকেই কমিশন ‘টার্গেট’ করেনি। আরও একটা বিষয় এখানে বলা দরকার। অধিকাংশ রাজ্যেই ভোট পড়ে ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। কিন্তু আমাদের রাজ্যে ভোট পড়ার হার গড়পড়তা ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ। বাম আমলেও প্রায় একই হারে ভোট পড়ত। এটা বাংলার মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয়। হইচইয়ের আরও একটি কারণ ‘ডিটেনশন ক্যাম্পে’র আতঙ্ক।
কমিশন যখন ২০০২ সালের ভোটার তালিকাকে ভিত্তি করে ‘ম্যাপিং’ করেছিল তখন সবচেয়ে কম ‘আনম্যাপড’ ভোটার পাওয়া গিয়েছিল সংখ্যালঘু এলাকাগুলিতে। মুসলিম এলাকায় ম্যাপিংয়ে এসেছিল ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ নাম। প্রচুর হিন্দু, বিশেষ করে মতুয়া ও নমঃশূদ্রর নাম বাদ পড়েছিল। তারপরই এমন অ্যাপ বানানো হল যাতে মুসলিমদের নাম ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’তে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। হলও তাই। এআই নির্ভর অ্যাপ প্রায় দেড় কোটি ভোটারকে ‘সন্দেহজনক’ বলে চিহ্নিত করল। 
ভুক্তভোগীরা বলছেন, বাংলার ভোটাররা নয়, সন্দেহজনক কমিশনের কাজকর্ম। এমনটা মনে করছেন ভারতের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ওয়াই এস কুরেশিও। বাংলার এই পরিস্থিতির জন্য তিনি জ্ঞানেশ কুমারের দিকে সরাসরি আঙুল তুলেছেন। খুব স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘স্বচ্ছ সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশনের কোনো কিছুই লুকানোর নেই। কিন্তু, আজকাল এমনই কাণ্ড ঘটছে। তথ্য লুকানো হচ্ছে।’ এই অতিসক্রিয় এসআইআর আদৌ প্রয়োজন ছিল না বলে তিনি মনে করেন। কারণ ৩০ বছর ধরে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ হয়েছে। ফলে তালিকার ৯৯ শতাংশই সঠিক। সেই তালিকা ভোটের মুখে নতুন করে করার প্রয়োজন ছিল কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন। 
বাংলায় বিচারাধীন ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ভোটারের নথি যাচাই করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৪৭ লক্ষ 
ভোটারের নথি যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। 
সুপ্রিম কোর্টে কমিশন এমনই দাবি করেছে। তার মধ্যে কত নাম বাদ গিয়েছে, সেটা স্পষ্ট করেনি। কেউ বলছেন ১৮ লক্ষ, কেউ বলছেন ২০ লক্ষ, কেউ বলছেন ২২ লক্ষ। সবটাই অনুমান এবং সূত্রের খবর। ফলে বিভ্রান্তি বাড়ছে। 
ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য মানুষ হন্যে হয়ে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু, কোথায় গেলে সুবিচার পাবে, বুঝতে পারছে না। মানুষের হাহাকার কমিশনের কানে পৌঁছাচ্ছে না। কারণ নির্বাচন কমিশনের অবস্থা মুক ও বধিরের মতো। কিছু শুনছে না, বলছেও না। কমিশনের পাখির চোখ বাংলাকে বিজেপির হাতে তুলে দেওয়া। তারজন্য যখন যা কৌশল নেওয়ার নিচ্ছে। তার খেসারত দিচ্ছে লক্ষ লক্ষ ভোটার।
কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক আজিজুল হকের বাড়ি ধুবুলিয়ায়। তিনি কৃষ্ণনগর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার। ১৯৯৭ সাল থেকে নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসারের দায়িত্ব সামলে আসছেন। এবারও তিনি প্রিসাইডিং অফিসার। ট্রেনিংও নিয়েছেন। কমিশনের চোখে ছিলেন ‘বিচারাধীন’ ভোটার। সন্দেহ দূর করতে পাশপোর্ট, স্কুল সার্টিফিকেট সব দিয়েছেন। তাই ভোটার তালিকায় নাম ওঠা নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না। কিন্তু সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে ‘ডিলিটেড লিস্টে’। অথচ বাড়ির ১১জনই বৈধ ভোটার। ভাবুন একবার। সকলের ভোট নেওয়ার দায়িত্ব যাঁর কাঁধে, কমিশনের চোখে তিনিই ‘অবৈধ’ ভোটার।
শেখ মহম্মদ ইরফান হাবিব বীরভূম জেলার সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তরের আধিকারিক। ডব্লুবিসিএস অফিসার। এবারও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। বাড়ি পূর্ব বর্ধমানের রায়নায়। সেই সুবাদে তিনি রায়নার ভোটার। একটু ভুল হল। এতদিন ভোটার ছিলেন। কিন্তু, এখন আর নন। কমিশন প্রকাশিত ‘ডিলিটেড লিস্টে’ তাঁর নাম রয়েছে ১৪৭ নম্বরে।
এরকম অনেক শিক্ষক, অফিসার রয়েছেন যাঁরা বছরের পর বছর নির্বাচন পরিচালনা করেছেন। ভোট দিয়েছেন। কিন্তু টিম জ্ঞানেশ কুমারের সৌজন্যে ভোটাধিকার খুইয়েছেন। এখন তাঁরা কিল খেয়ে কিল হজম করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু, যাঁরা সরকারি অনুশাসন বা শৃঙ্খলায় বাঁধা নেই তাঁরা প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন। তাঁদের একজন খানাকুলের বলপাইয়ের বেলদ গ্রামের শেখ জিয়াবুল ইসলাম। তাঁর বাবা, মায়ের ছাড়াও বাড়ির অনেকেরই নাম আছে। কিন্তু তাঁর নাম ‘ডিলিটেডে’র তালিকায়। ওই বুথের ১৫৫জন বিচারাধীনের মধ্যে পাশ করেছেন মাত্র ১৯জন। বাকি ১৩৬জন ফেল। তার প্রতিবাদে জাতীয় পতাকা নিয়ে বিক্ষোভ, রাস্তা অবরোধ সবই হয়েছে। কিন্তু ‘কাজির বিচারে’ কি ন্যায়বিচার মেলে? 
এসব দেখে অনেকের সন্দেহ, বিচারকদের দেওয়া তালিকাই কমিশন আপলোড করছে তো? এই সন্দেহের কারণ, বিচারকদের কাছে তথ্য প্রমাণই শেষ কথা। সেক্ষেত্রে বছরের পর বছর শিক্ষকতা ও সরকারের উচ্চপদে চাকরি করা ব্যক্তিদের নাম বাদ যায় কী করে? এর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। 
প্রথম দফায় বিপুল সংখ্যক মানুষের মানুষের নাম বাদ যাওয়ার দায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল বিএলওদের ঘাড়ে। বিজেপি এবং কমিশন বলেছিল, বিএলওরা যথাযথভাবে কাজ করেনি। ফলে প্রাথমিক ক্ষোভ আছড়ে পড়েছিল বিএলওদের উপর। বহু জায়গায় বিএলওরা আক্রান্ত হয়েছিলেন। কেউ কেউ চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মঘাতী হয়েছেন। পবরর্তী পর্যায়ে ‘নন্দ ঘোষ’ বানানো হল অ্যাপ এবং রাজ্যের অফিসারদের। আর এখন? ঘুরিয়ে দায় ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বিচারকদের দিকে। কারণ বিচারাধীন ভোটারের তথ্য যাচাই করছেন বিচারকরা। তাই নাম বাতিলের কোনো দায় তাদের নেই বলে হাত ধুয়ে ফেলছেন কমিশনের কর্তারা। 
এসআইআর নিয়ে গেরুয়া শিবিরের এখন সাপের ছুঁচো গেলা অবস্থা। ভোট প্রচারে নেমে কমিশনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা টের পাচ্ছেন বিজেপি নেতারা। বারাকপুরে ভোট চাইতে গিয়ে এক মহিলা ভোটারের প্রশ্নে বিজেপি প্রার্থীর গলদঘর্ম অবস্থা। বিয়ের কারণে ওই মহিলার মেয়ের পদবি বদলেছে। তাই তাঁর নাম বাদ দিয়ে কমিশন। কেন এমনটা হবে? প্রশ্নবাণে জর্জরিত বিজেপি প্রার্থীর উত্তর, ‘আমাদের হাতে ক্ষমতা দিলে এই সমস্যা থাকবে না।’ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য মতুয়াদের ক্ষোভ সামাল দিতে দায় ঠেলছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের কর্মী ও অফিসারদের দিকে। কিন্তু শমীকবাবু, এতদিন তো আপনারাই এসআইআর ও কমিশনের কাজের সাফাই দিলেন। কোটি নাম বাদ যাবে বলে হুংকার দিলেন। আর এখন বিপাকে পড়ে দোষ চাপাচ্ছেন রাজ্য সরকারের উপর? মানুষ কি এতটাই বোকা?
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বলেছেন, ‘এবার ভোট দিতে না পারলে তাঁর ভোটাধিকার চিরকালের মতো চলে গেল, এমনটা নয়।’ ভুক্তভোগীরা বলছেন, উলটোটা হলে ক্ষতি কী? সমস্ত বিচারাধীন ভোটার ভোট দিক। তারপর অবৈধদের চিহ্নিত করে নেওয়া হোক আইনি ব্যবস্থা। তা না হলে বৈধ ভোটারদের হালও ‘সোনালি বিবি’র মতোই হবে। কিন্তু কেন দেশের নাগরিকদের বারবার ‘সোনালি বিবি’ হতে হবে? এর বিচার আদালত করবে কি না জানা নেই। তবে, জনতার আদালতে এর বিচার একদিন না একদিন হবেই।

সম্পর্কিত সংবাদ