সংবাদদাতা, দুর্গাপুর: স্মার্ট যুগে বা ব্যস্ততার যুগে কুলদেবতার নিত্যপুজো করার সময় নেই। তাই একাধিক বনেদি বাড়ির আদি পুরুষের উপাস্য দেবদেবীর ঠাঁই মিলছে দুঃস্থ পুরোহিতের মাটির ঘরে। বংশের কুলদেবতার নিত্যসেবার দায়ভার দিয়ে দেওয়া হচ্ছে তাঁদেরই। তবে বাৎসরিক নিত্যসেবা ও পুজো-অর্চনার খরচ বহন করছেন ওই সব বনেদি বাড়ির কোনও না কোনও বংশধর। এমনই বনেদি বাড়িগুলির বর্তমান প্রজন্মের দাবি, ব্যস্ততার যুগে বংশের কুলদেবতার নিত্যসেবা ও পুজো-অর্চনায় যাতে কোনও ব্যাঘাত বা অনিষ্ট না ঘটে, তাই পুরোহিতের ওপর দায়ভার সঁপে দেওয়া হচ্ছে। এমনই নজিরবিহীন দৃশ্যর দেখা মিলেছে পশ্চিম বর্ধমান জেলার কাঁকসা থানার কাঞ্চনপুর এলাকায়। ওই এলাকায় বসবাসকারী বছর ৭৩-র পুরোহিত বিজয় চক্রবর্তীর মাটির বাড়িতে এখনও পর্যন্ত ঠাঁই মিলেছে প্রায় ২০টি বনেদিবাড়ির কুলদেবতার।
বনেদিবাড়ি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, একসময় এলাকার বহু জমিদার ছিলেন। এলাকার বিপুল জমিজায়গার খাজনা তাঁরা আদায় করতেন। তাঁরা কখনও জমিদার বা এলাকায় মহাজন নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁদের ছিল কুলদেবতা। বংশের গোত্রেই তাঁরা পূজিত হতেন। কয়েকশো বছরের পুরনো ওই সমস্ত অভিজাত পরিবারগুলির বংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় জমি-জায়গা কমে আসে। বংশধরের বহুজন চাষাবাদ ছেড়ে বিভিন্ন কর্মসংস্থান ও ব্যবসায় লিপ্ত হয়ে যায়। বংশে গোষ্ঠীর লড়াই সহ শরিকী বিবাদ থেকে ঐতিহ্যবাহী রীতিনীতি প্রায় নষ্ট হতে থাকে। কুলদেবতার পুজো ও নিত্যসেবা নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়ে যায়। পরিবারের নানান জটিলতার কারণে তাঁরা কুলদেবতাকে এলাকার পুরোহিতের বাড়িতে পৌঁছে দেন। পুরোহিত বিজয় চক্রবর্তী বলেন, আমি ১৩ বছর বয়স থেকে পুজো করে আসছি। বহু বনেদি বাড়ির কুলদেবতা আমার বাড়িতে রয়েছে। প্রায় ১৫টি কুল দেবতার শালগ্রাম শিলা ও বিগ্রহের আমি নিত্যসেবা করি। প্রায় ৫০-৬০ বছর ধরে পুজো করে আসছি। কুল দেবতার মধ্যে রয়েছেন রঘুনাথ, রামচন্দ্র, শিব, লক্ষ্মীজনার্দন, বাসুদেব, মা মনসা, ধর্মরাজ, চাঁদরায় ইত্যাদি। ২৫ পয়সা, ৫০ পয়সা থেকে পুজো শুরু করেছিলাম। এখন কোনও পরিবার ৩০০ টাকা অথবা তার অধিক টাকাও দিয়ে থাকেন। ওই সমস্ত পরিবারগুলি তাঁদের কুলদেবতার নিত্যসেবা ও পুজোর জন্য আমাকে বেছে নিয়েছেন। পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান সহ বীরভূম জেলার বহু বনেদি বাড়ির কুলদেবতার পুজো আমার বাড়িতে হয়। এলাকার চট্টোপাধ্যায় বাড়ির বর্তমান বংশধর একজন সদস্য জীবন কিশোর চট্টোপাধ্যায় বলেন, আমাদের কুলদেবতা রঘুনাথ। বাবা হেমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়রা ছিলেন চার ভাই। সেই সময় কুলোদেবতার নিত্যসেবা কে করবেন, তাই নিয়ে টানাপোড়েন হচ্ছিল। তখনই বাবা শালগ্রাম শিলা পুরোহিত বিজয় চক্রবর্তীর কাছে দিয়ে আসেন। আমাদের বর্তমান বংশধরেরা সবাই কর্মজীবনে ব্যস্ত। তাই কারও পক্ষেই নিত্যপুজো করা সম্ভব নয়। বিজয়বাবু সেই দায়িত্ব পালন করছেন। নিজস্ব চিত্র