ভারত হল একটি যুক্তরাষ্ট্র। বহু ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি ভারত নামক সুবিশাল দেশটিকে বিশিষ্টতা দান করেছে। ভারতের এই বহুত্ব সুন্দর হয়ে উঠতে পেরেছে তার ঐক্য ও সংহতির জোরে। ২৮টি রাজ্য এবং ৮টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ১৪০ কোটি মানুষের ঐক্য ও সংহতিই ভারতকে করে তুলেছে অন্যতম সেরা এক বিশ্বশক্তি। যেকোনও জিনিস গড়ার চেয়ে তা রক্ষা করা কঠিন। ভারতকে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয় প্রতিমুহূর্তে। স্বাধীন ভারত ৭৮ বছর যাবৎ এত বড় চ্যালেঞ্জে সবসময় জয়ী হচ্ছে। আগামী দিনেও জিততে হবে আমাদের, ভূমিভাগের সঙ্গে ভারতহৃদয়ের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের শক্তিকে অক্ষুণ্ণ রেখে। কেবল মুখে মুখে চাইলেই এই শক্তির অক্ষুণ্ণতা রক্ষিত হবে না, আকাঙ্ক্ষার উৎসটি হতে হবে অবশ্যই সকলের হৃদয়। তবেই আমরা বিচ্ছিন্নতার ব্যাধিমুক্ত হয়ে প্রকৃত ভারতবাসী হিসেবে উন্নতির শিখর স্পর্শ করার স্পর্ধা অর্জন করতে পারব। বিবিধের মাঝে মহামিলনের জয়গান গেয়েই এগতে হবে সকলকে। কিন্তু ইদানীং এক্ষেত্রে ছন্দপতন লক্ষণীয়। কোথাও চওড়া হচ্ছে হিন্দু-মুসলিম ভেদভাব। কোনও ক্ষেত্রে ভয়াবহ আকার নিচ্ছে বাঙালি, বিহারি, মারাঠি, অসমিয়া, ওড়িয়া, গুজরাতি, তামিল, তেলুগু, মালয়ালি, কন্নড়, কাশ্মীরি, মাড়ওয়ারি নামক সংকীর্ণ আঞ্চলিক পরিচয়।
অতিসম্প্রতি বাঙালি বা বাংলাভাষীরা তো ভারতের নানা প্রান্তে রীতিমতো আক্রান্ত! শুধুমাত্র মাতৃভাষা ‘বাংলায়’ কথা বলার ‘অপরাধে’ কিংবা সরকারি নথিতে ‘বাঙালি’ পরিচয় আবিষ্কৃত হওয়ার পর বহির্বঙ্গে তাঁদের রকমারি নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে। দুর্ভাগ্য এই যে, বেশিরভাগ অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ রাজ্যগুলি থেকে। বিষয়টি নিয়ে বাংলার শাসক দলের এমপিরা সংসদে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রতিকার দাবিসহ সমস্যাটির প্রতি মোদি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এছাড়া কলকাতাসহ বাংলার নানা প্রান্তে বেরিয়েছে প্রতিবাদ মিছিল এবং সংহতি পদযাত্রা। সমস্যাটি আদালত পর্যন্তও গড়িয়েছে। আদালতের ভর্ৎসনার পরও কেন্দ্রীয় শাসক দল এবং তাদের পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলির মানবিক মুখ আমরা দেখতে পাইনি। কেন্দ্রীয় সরকারকেও ‘অভিভাবকের’ ভূমিকায় দেখেনি কেউ। বলা বাহুল্য, আক্রান্ত ব্যক্তি এবং পরিবারগুলির বেশিরভাগই প্রান্তিক ও গরিব শ্রেণিভুক্ত। তাঁরা মূলত পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে দিল্লি, মুম্বই, আমেদাবাদসহ ভারতের নানা জায়গায় কাজ করেন। আর তাঁরাই সেসব জায়গায় বেনজির পুলিসি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাঁদের আটক কিংবা গ্রেপ্তার করে ‘অনুপ্রবেশকারী’ দেগে দেওয়া হচ্ছে। গেরুয়া বাহিনীর দাবি মেনে ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলির পুলিস এখন অতিসক্রিয়, যারা প্রকৃত জঙ্গি বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ধরতে পদে পদে ব্যর্থ, তারাই এখন ‘বাংলাদেশি’ আর ‘রোহিঙ্গা মুসলিম’ ধরতে মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত! আর তাদের এই হুজুগের মূল শিকার বাঙালি। সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বাঙালি বা বাংলাভাষী গরিব মানুষজন মোটেই ভালো নেই।
দেশের সরকার মূক বধিরের ভূমিকায় ‘অস্কারজয়ী’ হতে পারে কিন্তু বাংলার জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে এই অনাচার মুখ বুজে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। সম্প্রতি বীরভূমে দাঁড়িয়ে নির্যাতিত পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফিরে আসারই আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি পরিষ্কার আশ্বস্ত করেন, ঘরে ফিরে কেউ বেকার হয়ে যাবেন না। ওই দুর্গত শ্রমিক পরিবারগুলিকে বাঁচাতে তাঁর মা-মাটি-মানুষের সরকার নতুন প্রকল্প চালু করবে। সেই ঘোষণার মাত্র আড়াই সপ্তাহের মধ্যেই ‘কথা রাখলেন’ জনদরদি শ্রমিক দরদি নেত্রী। সোমবার নবান্ন থেকে বাংলার ২২ লক্ষ ‘পরিযায়ী শ্রমিক’-এর জন্য ‘শ্রমশ্রী’ প্রকল্প ঘোষণা করেছেন তিনি। রাজ্যে ফিরে আসা শ্রমিকরা প্রথম একবছর এই প্রকল্পে মাসে পাঁচহাজার টাকা হারে আর্থিক সহায়তা পাবেন। পাশাপাশি মিলবে আরও একাধিক সুবিধা। পরিচয়পত্র প্রদান, বিকল্প কর্মসংস্থান, চিকিৎসা এবং ছেলেমেয়েদের শিক্ষার দিকগুলিও রাজ্য দেখবে। সোমবার পর্যন্ত ২,৭৩০ জন পরিযায়ী শ্রমিক সপরিবারে বাংলায় ফিরে এসেছেন। সব মিলিয়ে একটি ভরসার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আশা করা যায়, পরিযায়ী শ্রমিকরা ফিরে এসে বাংলার পুনর্গঠনেই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবেন। একইসঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে, আমরা যেন গেরুয়া পার্টির ‘আদর্শ’ অনুকরণ করে ভিন রাজ্য থেকে বাংলায় আসা মানুষজনের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করি। বাংলা কোনওদিনই কোনওরকম সংকীর্ণতায় বিশ্বাস করে না। যে বাংলা সারাভারতকে ‘জনগণমন’ এবং ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্র উপহার দিয়েছে, তার হৃদয় আকাশের মতোই উদার। বাংলা বিশ্বাস করে, সবাইকে নিয়েই আমাদের প্রিয় ভারত।