সংগঠিত বেসরকারি ক্ষেত্রে যাঁরা চাকরি করেন তাঁদের বাস্তবে কোনও পেনশন নেই। ইপিএস-৯৫ মারফত তাঁদের হাতে মাসে মাসে যে টাকা দেওয়া হয় তাকে আর যাই হোক পেনশন বলা চলে না, পেনশনের নামে প্রহসন মাত্র। মোদি সরকার এই প্রকল্পে ন্যূনতম ১০০০ টাকা পেনশন দেয় বলে দাবি করে কিন্তু বাস্তবে সকলে তা পান না। কয়েক লক্ষ প্রবীণ ব্যক্তি ৫০০ টাকারও কম পান। মাসে ১০০০ টাকার নীচে পেনশন পান ৩০ লক্ষাধিক প্রবীণ ব্যক্তি। আর সর্বোচ্চ পেনশনের অঙ্ক ৫০০০ টাকারও কম, এবং এমন সৌভাগ্যবান প্রবীণ ব্যক্তির সংখ্যা হাতেগোনাই। দীর্ঘকাল চাকরি করার পর শেষ জীবনে এই ধরনের কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের দুর্দশার শেষ থাকে না। কেননা, বয়স যত বাড়ে তত পকেট ফাঁকা হয় এবং বেড়ে যায় চিকিৎসা খরচ। এমন দুর্দশাগ্রস্ত প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ৭০ লক্ষের বেশি। তাই ন্যূনতম পেনশনের অঙ্ক বাড়িয়ে ৯০০০ টাকা করার দাবিতে আন্দোলন চলছে বহু বছর যাবৎ। পেনশনের সঙ্গে ডিএ এবং বিনামূল্যে সুচিকিৎসার দাবিও রয়েছে তাঁদের। সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী ব্যক্তি কয়েকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও এখনও পর্যন্ত কথা রাখেননি। টালবাহানাই চলছে কেবল।
অতএব কর্মচারী ভবিষ্যনিধি তহবিলে (ইপিএফ) জমা অর্থই তাঁদের একমাত্র আর্থিক সম্বল। অবসরকালীন মূল প্রাপ্তি তাঁদের আপাতত ওটাই। তাই এই প্রকল্পভুক্ত শ্রমিক কর্মচারীদের প্রত্যাশা থাকে যে তাঁদের ভবিষ্যতের বিষয়টি সরকার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই বিচার করবে। একসময় তা করাও হয়েছিল। যেমন সুদের হার দীর্ঘদিন (১৯৮৯-৯০ থেকে ২০০১ সালের এপ্রিল-জুন পর্যন্ত) ১২ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। ইপিএফে সুদের হার নির্দয়ভাবে কমেছে মোদি জমানায় এসে। ২০১৫-১৬ সালেও ৮.৮০ শতাংশ সুদ পেয়েছেন ইপিএফ গ্রাহকরা। তার পরের বছর থেকে সুদের হার বেশিরভাগ বছরে শুধুই কমেছে। সাম্প্রতিক অতীতের মধ্যে সর্বনিম্ন হারে সুদ দেওয়া হয়েছে ২০২১-২২ সালে—৮.১০ শতাংশ। ২০২২-২৩ সালে .০৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। তার পরবর্তী দু’বছর ৮.২৫ শতাংশ হারে সুদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই হার ছিল ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে। এবছরের জন্যও তা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সম্প্রতি রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই) রেপো রেট ২৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৬.২৫ শতাংশ করেছে। রেপো রেট হ্রাসের এই সিদ্ধান্ত প্রায় পাঁচবছর বাদে। রেপো রেট কমানোর এর পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল ২০২০ সালের মার্চ মাসে। সেবার এক ধাক্কায় ৭৫ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪.৪০ শতাংশ করা হয়। হিসেব করে দেখা যায়, রেপো রেট যখন একটু বেশিও ছিল ইপিএফ গ্রাহকদের জমার উপর সুদের হারে তুলনামূলক সুবিধা সব বছর কিন্তু দেওয়া হয়নি। চলতি অর্থবর্ষ, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালের জন্য ইপিএফে ৮.২৫ শতাংশ সুদ ঘোষণা করেছে এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন। সূত্রের খবর, ওই সুদ মেটানোর পর কেন্দ্রীয় সংস্থাটির হাতে উদ্বৃত্ত থেকে যাবে ৫০০০ কোটি টাকারও অধিক। দপ্তরের কিছু কর্তার মত, ওই টাকায় ৮.৫৫ শতাংশ হারে সুদ দেওয়াই যেত।
তাহলে কেন সুদের হার বাড়ানো হল না? সূত্রের খবর, সরকার ইপিএফের টাকা বাজারে লগ্নি করে বসে আছে! তার থেকে আগামী অর্থবর্ষে যথাযথ ‘রিটার্ন’ আসবে না বলেই তাদের আশঙ্কা। এমনকী ইতিমধ্যেই ‘দেউলিয়া’ ঘোষিত দুটি সংস্থায়ও বিপুল অর্থ লগ্নি করা হয়েছে। তাতে রাতারাতি গায়েব হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা! অন্য সূত্রেও রিটার্ন ১৪ শতাংশ হ্রাসের দুঃসংবাদ রয়েছে। ইটিএফ বিক্রয় থেকেও প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার আশা নেই। তাই বিপুল টাকা উদ্বৃত্ত থাকলেও গ্রাহককে প্রত্যাশা মতো সুদ দিতে রাজি নয় ইপিএফও। অথচ, ৮.৬ শতাংশ হারেও সুদ দেওয়ার সুযোগ ছিল। তহবিল ঘাটতি রেখেও গ্রাহকদের সুদ প্রদানের হালফিল নজির রয়েছে। যেমন ২০২২-২৩ অর্থবর্ষে ১৬৮ কোটি টাকা ঘাটতি রেখেই সুদ দেওয়া হয়েছিল। পূর্বাপর একাধিক মানবিক নজির জলাঞ্জলি দিয়ে এবার ৭ কোটির অধিক ইপিএফ গ্রাহকের সঙ্গে বঞ্চনাই করা হল। এজন্য মোদি সরকারের ভুল সিদ্ধান্তই দায়ী। জনদরদ, শ্রমিক-কর্মচারী প্রীতি শুধুই মুখে, বাস্তবে সবই লবডঙ্কা মোদি সরকারের।