Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিশ্বের চতুর্থ অর্থনীতি! আম আদমি ভালো আছে?

ধরা যাক, আপনি একটা ব্যবসায় নামতে চাইছেন। ছোটখাটো ব্যবসা। তার খরচও কিন্তু অনেক। ঘর ভাড়া নিতে হবে, কর্মী রাখতে হবে, প্রয়োজনীয় মেশিনপত্রও কিনতে হবে।

বিশ্বের চতুর্থ অর্থনীতি! আম আদমি ভালো আছে?
  • ৩ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: ধরা যাক, আপনি একটা ব্যবসায় নামতে চাইছেন। ছোটখাটো ব্যবসা। তার খরচও কিন্তু অনেক। ঘর ভাড়া নিতে হবে, কর্মী রাখতে হবে, প্রয়োজনীয় মেশিনপত্রও কিনতে হবে। হিসেব কষেছেন, শুরু করতেই মোটামুটি লাখ পাঁচেক টাকা বাজেট। অমুকবাবু আপনাকে বললেন, আসুন... আমার ঘর আপনাকে দিচ্ছি। তার জন্য এক টাকা দিলেই হবে। শুধু তাই নয়, কর্মী বা মেশিনপত্রের জন্য কিছু টাকা ভর্তুকিও দেব। আপনি তো হাতে চাঁদ পেলেন। প্রাথমিক খরচ তো বটেই, মাসে মাসে যত টাকা ঢালতে হবে ভেবেছিলেন, তার অনেকটাই বেঁচে গেল। কিন্তু তার বদলে অমুকবাবু কী পেলেন? অমুকবাবু আসলে দেখাতে চাইছিলেন, আমার ঘরে কতই না কাজ হয়। প্রচুর লোক আসে। অনেক উৎপাদন হয়। সবাই ভাবে, অমুকবাবু খুব বড়লোক। কিন্তু দিনের শেষে? অমুকবাবুর পক্ষে তাঁর স্ত্রী-সন্তানের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দেওয়াটাই মুশকিল হয়ে ওঠে। এটা একটা উদাহরণ মাত্র। মাইক্রো স্কেলে। এবার এই উদাহরণটাকে দেশের প্রেক্ষিতে নিয়ে ফেলা যাক। এখানে আপনি একটি কর্পোরেট সংস্থা। আর অমুকবাবু একটি রাষ্ট্র। তারা কর্পোরেট ট্যাক্স কমিয়ে দিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য পলিসি বদলেছে। কর্পোরেটদের কম টাকায় জমি এবং নানাবিধ ভর্তুকিও দিচ্ছে। এভাবে বিনিয়োগ এবং উৎপাদন হয়তো বাড়বে, জাতীয় গড় উৎপাদন বা জিডিপিও লাফ দিতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের উপকার হয় কি? অর্থাৎ, অমুকবাবুর স্ত্রী-সন্তান খেতে পাচ্ছে কি? তাদের জীবন যাপন উন্নত হচ্ছে কি? এটাই এখন সবচেয়ে আলোচ্য প্রশ্ন। চতুর্থ বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে ভারতের আত্মপ্রকাশের পর তো বটেই। 

Advertisement

প্রচার চলছে। সর্বত্র। জাপানকে ছাপিয়ে গিয়েছি আমরা। ৫ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতির প্রতিশ্রুতি আমাদের শ্রদ্ধেয় মোদিজি রাখতে পারেননি। সে সব ঢাকা পড়ে গিয়েছে। ৫ লক্ষ কোটি নিয়ে আর কোনও উচ্চবাচ্যও হচ্ছে না। বরং পুরো প্রচারেরই অভিমুখ জাপানের দিকে। কারণ, তাদের অর্থনীতি ৪,১৮৬.৪৩ বিলিয়ন ডলার এবং ভারতের ৪,১৮৭.০২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, আমেরিকা, চীন, জার্মানির পরই এবার নাম ভারতের। ফারাক সামান্য। তাতে কী? মাধ্যমিকে এক নম্বরের পার্থক্যে ছেলেমেয়েরা ১০-১৫ র‌্যাঙ্ক পিছনে চলে যায়! আর এ তো দেশের অর্থনীতির ব্যাপার। প্রশ্নটা অন্যত্র। অর্থনীতির ভাষায় জিডিপি এবং জিডিপি পার ক্যাপিটার মধ্যে শুধু দুটো শব্দ নয়, একেবারে আকাশ-পাতালের তফাৎ। জিডিপি হল কোনও রাষ্ট্রের জাতীয় গড় উৎপাদন। আর জিডিপি পার ক্যাপিটা বললেই সেটা মাথাপিছু হিসেব চলে আসে। অর্থাৎ, প্রত্যেক দেশবাসীর ভূমিকা এবং প্রাপ্তি। জিডিপির নিরিখে ভারত চার নম্বরে থাকলেও, জিডিপি পার ক্যাপিটার হিসেবে আমরা কিন্তু ১৪০ নম্বরে। কারণ, চার লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতিতে ভারতবাসীর মাথাপিছু গড় আয় হল বছরে ২ হাজার ৮৮০ ডলার। টাকার অঙ্কে প্রায় ২ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা। মাসে ২০ হাজার টাকার আশপাশে। এটাও কিন্তু ফাঁকা কলসির মতোই হিসেব। কেন? আসল অঙ্কটা শুরু এখানেই। কারণ, দেশের ৪০ শতাংশের বেশি সম্পদ রয়েছে মাত্র ১ শতাংশ ভারতীয়র কাছে। অর্থাৎ, আম্বানি, আদানি প্রমুখ। আর যদি দেশের ৫ শতাংশ ধনীর হিসেব নেওয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে, তাঁরাই ভারতের ৬২ শতাংশ সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাহলে বাকি থাকল কত? ৩৮ শতাংশ। মানে দেড় লক্ষ কোটি ডলারের খানিক বেশি। এই অঙ্কটাকে ১৪০ কোটি দিয়ে ভাগ করলে বেরবে সঠিক মাথাপিছু হিসেব। এখন আমরা দেখতে পাব, ভারতীয়দের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৪ ডলারের আশপাশে। টাকার অঙ্কে প্রায় ৯১ হাজার টাকা। বছরে। অর্থাৎ মাসে ৭ হাজার ৬০০ টাকা। গড়ে এই টাকাতেই আম ভারতবাসীকে সংসার চালাতে হয়। মোদির ভারতে এটাই সত্যি। এটাই নিউ নর্মাল। 
সাড়ে সাত হাজার টাকায় এখন কী হয়? বিশেষ করে শহরাঞ্চলে? তিনজনের পরিবারে ধরে নেওয়া যাক আট কেজি চাল, এক কেজি ডাল, এক কেজি করে লাল তেল-সাদা তেল, একটা গ্যাস সিলিন্ডার, অন্তত ৫০০ টাকার ইলেকট্রিক বিল, ফোনের জন্য ২০০ টাকার ন্যূনতম রিচার্জ ভ্যালু লেগেই থাকে। মাছ-মাংস বা ডিম না খেলেও শুধু সব্জির পিছনে খরচ মাসে অন্তত ৮০০ টাকা। বাড়ির কর্মক্ষম যে মানুষটি কাজে যাচ্ছেন, তাঁর যাতায়াতের খরচ আর কমবেশি অসুখ-বিসুখ তো আছেই। এখানেই দেখুন, সাত হাজার টাকা বেরিয়ে গিয়েছে। অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনও কিছুতে হাত না দিয়েই। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলদের সংরক্ষণে মোদি সরকার বছরে ৮ লক্ষ টাকার সিলিং বেঁধে দিয়েছে। কিন্তু মহামান্য শাসক বাহাদুর একবারও ভেবে দেখেননি, মুষ্টিমেয় একটা শ্রেণিকে বাদ দিলে বাকি ভারতের বছরের আয় এক লক্ষ টাকাও পেরয় না। ৮০ কোটি দেশবাসীকে সরকারকেই বিনামূল্যে রেশন দিতে হয়। তারপরও কি ৪ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতি নিয়ে হাঁকডাক করা সাজে? যে জাপানকে ছাপিয়ে যাওয়া নিয়ে এত তর্জন-গর্জন, সেই দেশের মাথাপিছু বাৎসরিক আয় কত? ৩৩ হাজার ৯০০ ডলার। সেটাও আগের অর্থবর্ষের হিসেবে। মোদিজি বলতেই পারেন, ওখানে তো মাত্র ১ কোটি ২৫ লক্ষ মানুষ থাকে। তাহলে চীন নিয়ে কী বলবেন? আমাদের পড়শি দেশের অর্থনীতি যখন চার লক্ষ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল, তখন চীনের মাথাপিছু আয় ছিল সাড়ে তিন হাজার ডলার। আর এখন ১৩ হাজার ডলার। 
গত ১০ বছর ধরেই জাপানের অর্থনীতি অত্যন্ত ধীরগতিতে এগচ্ছে। তার কয়েকটা কারণ আছে। প্রথম এবং প্রধান কারণ অবশ্যই জাপানের মানুষের গড় আয়ু। ওই দেশে এক একজন নাগরিক গড়ে ৮৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে। উপরন্তু জন্মের হার কম। ফলে, গত কয়েক বছর ধরে জাপান একটা অদ্ভুত ফেজের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে, অথচ সেই শূন্যস্থান ভরাট হচ্ছে না। উপরন্তু সামাজিক সুরক্ষা খাতে খরচ বাড়ছে। বিশেষত স্বাস্থ্যক্ষেত্রে। তার প্রভাব অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে পড়ছে। কিন্তু এখনও জাপানের যে কোনও জনপদের কথা ভাবলে ঝাঁ-চকচকে রাস্তা, বুলেট ট্রেন, ভিখিরি ও হকারবিহীন ফুটপাত কিংবা চোখ ধাঁধানো কমার্শিয়াল বহুতলের কথাই মনে পড়বে। আর ভারতে? বাইরের দেশের কোনও প্রধান এলে রাস্তার দু’পাশ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখার স্মৃতি। 
প্রত্যেক দিন মূল্যবৃদ্ধির পাঁকে ডুবছে সাধারণ মানুষ। মাস গেলে যতটুকু টাকা হাতে আসছে, তা আর পর্যাপ্ত মনে হচ্ছে না। চিকিৎসা খরচ, স্কুলের বেতন, যাতায়াত খরচ বাড়ছে লাগাতার। সঞ্চয়? প্রশ্নই উঠছে না। প্রতি মাসেই কোনও না কোনও কারণে ধারের জ্বালায় বার্নল লাগাতে হচ্ছে মধ্যবিত্তকে। এই দেশবাসী কীভাবে তাহলে ভোগ্যপণ্য কিনবে? কীভাবেই বা তাহলে পণ্যের চাহিদা বাড়বে? আর চাহিদা না বাড়লে কোম্পানি উৎপাদন করবেই বা কেন? আমেরিকার শুরু করা শুল্কযুদ্ধে একটা লাভ ভারতের হয়েছে। বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে পেরেছে নয়াদিল্লি। তাতেও কিন্তু দেশবাসীর লাভ কিছু হয়নি! মোদির ভারতে ধনী আরও ফুলেফেঁপে উঠছে। আর গরিব তলিয়ে যাচ্ছে দারিদ্র্যের গহ্বরে। তাতে অবশ্য প্রচার থামছে না। রাস্তার মোড়ে, জনসভায়, টিভির পর্দায় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর তাঁবেদাররা ৪ লক্ষ কোটি ডলারের অর্থনীতি নিয়েই হুঙ্কার দিয়ে চলেছেন। তাঁরা একটা হিসেব মানুষের সামনে রাখুন— সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির আওতায় দেশের মোট কত মানুষ পড়েন! কোনও ব্যক্তি একটিও সামাজিক প্রকল্পে নাম লিখিয়ে থাকলে, সেই হিসেব যেন তালিকায় থাকে। তা সে আয়ুষ্মান ভারত হতে পারে, সবুজ সাথী, কিংবা লাডলি বহেন। দেখবেন... তালিকা বানাতে দেশ উজাড় হয়ে যাবে। এটাই প্রকৃত সত্যি। 
মোদিবাহিনীর লাফঝাঁপ দেখে মনে পড়ছে আয়ারল্যান্ডের কথা। এক সময় ভয়াবহ মন্বন্তরের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল এই দেশ। তখন পাঁচ বছরের মধ্যে ১০ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। দেশ ছেড়েছিল আরও লাখ লাখ আয়ারল্যান্ডবাসী। ইউরোপীয় ইকনমিক কমিউনিটিতে (এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন) যোগ দেওয়ার পর আয়ারল্যান্ডের ভাগ্যের চাকা ঘোরে। এই কমিউনিটির সদস্যদের মধ্যে ফ্রি ট্রেডের পাশাপাশি কোম্পানিগুলি যে কোনও একটি দেশে কর দিতে পারত। সেই সুযোগটাই নিয়েছিল আয়ারল্যান্ড। নামমাত্র ট্যাক্স ঘোষণা করে। সঙ্গে প্রায় বিনামূল্যে জমি এবং ভর্তুকিও। ফলে বিশ্বের বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি তাদের হেড কোয়ার্টার সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল আয়ারল্যান্ডে। চার-পাঁচ দশকের মধ্যেই ইউরোপের এই ছোট্ট দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার চ্যালেঞ্জ ছুড়ছিল আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানিকে। কিন্তু একটা বিষয় বুঝতে হবে— এই সবটাই হয়েছিল বিদেশি বিনিয়োগের জন্য। তারা যা লাভ করেছে, তার প্রায় সবটাই আয়ারল্যান্ড থেকে তুলে নিজেদের দেশে নিয়ে গিয়েছে। উপরন্তু সেইসব সংস্থায় কর্মরতদের ৯০ শতাংশই বিদেশি হওয়ায়, বেতন বাবদ তাঁরা যা পেয়েছেন, সেটাও আয়ারল্যান্ডে থাকেনি। শুধুমাত্র লোক দেখাতেই দেশের জিডিপি বেড়েছে, কিন্তু সেখানকার মানুষের হাল ফেরেনি। ভারতের হাল কিন্তু খুব বেশি আলাদা নয়। আমাদের দেশে এখনও জিডিপির ১৮ শতাংশ আসে কৃষিক্ষেত্র থেকে। দেশের ৫০ শতাংশ মানুষ কোনও না কোনওভাবে চাষবাসের সঙ্গে যুক্ত। রিয়েল এস্টেট, তথ্য-প্রযুক্তি, আর ফিনান্স সেক্টর থেকে আসে ৫০ শতাংশ জিডিপি। বেশিরভাগ মানুষ অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন। তাঁদের না আছে কোনও পিএফ, না আছে পেনশন। ৪ লক্ষ কোটি ডলারের প্রচার আমাদের কাছে শাহরুখ খানের সিনেমাও নয়। তাতে অন্তত বিনোদন পাওয়া যায়। আর জিডিপি বৃদ্ধির প্রচারে কীভাবে রিঅ্যাক্ট করতে হবে, আমরা সেটাই এখনও জানি না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বরং মন দিই চাল-ডাল-তেলের দামে। ওটাই যে বাস্তব। তাতে কোনও মিথ্যা প্রতিশ্রুতির মোড়ক নেই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ