Bartaman Logo
১ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিশ্বের আরশোলারা একজোট হয়েছেন

‘আরশোলা’ কোনো গালি বা আপত্তিকর শব্দ নয়। উইকিপিডিয়ায় একটু ঢুঁ মারলেই জানা যাবে যে, আরশোলারা প্রায় ২০ কোটি বছর ধরে তাদের শরীরের মৌলিক গঠন অপরিবর্তিত রেখেছে—যা কিনা প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় প্রথম আবির্ভূত ‘হোমো সেপিয়েন্স’ বা আধুনিক মানুষের আগমনেরও ১৯ কোটি ৯৭ লক্ষ বছর আগের কথা।

বিশ্বের আরশোলারা একজোট হয়েছেন
  • ১ জুন, ২০২৬ ০৪:০০

পি চিদম্বরম: ‘আরশোলা’ কোনো গালি বা আপত্তিকর শব্দ নয়। উইকিপিডিয়ায় একটু ঢুঁ মারলেই জানা যাবে যে, আরশোলারা প্রায় ২০ কোটি বছর ধরে তাদের শরীরের মৌলিক গঠন অপরিবর্তিত রেখেছে—যা কিনা প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় প্রথম আবির্ভূত ‘হোমো সেপিয়েন্স’ বা আধুনিক মানুষের আগমনেরও ১৯ কোটি ৯৭ লক্ষ বছর আগের কথা। এই পৃথিবীতে টিকে থাকার অধিকারের প্রশ্নে মানুষের চেয়ে আরশোলাদের দাবিই অগ্রগণ্য। 

Advertisement

‘সায়েন্স এনসাইক্লোপিডিয়া’ আমাদের জানায় যে, আরশোলারা মানুষকে কামড়ায় না বা আক্রমণ করে না। তাদের আচরণ বরং ঠিক মানুষের বিপরীত। কারণ মানুষই বরং আরশোলাদের আক্রমণ করে থাকে। অবশ্য, আরশোলারা ব্যাকটেরিয়া বহন করে, রোগ ছড়ায় এবং অ্যালার্জির সৃষ্টি করে। মানুষও ব্যাকটেরিয়া বহন করে, রোগ ছড়ায় এবং অ্যালার্জির সৃষ্টি করে (বিশেষ করে প্রতিপক্ষ বা ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যে)। কিছু মানুষ আরশোলাদের ‘ঘিনঘিনে’ বা ‘অরুচিকর’ মনে করে—ঠিক যেমন কিছু মানুষ অন্য মানুষদেরও ‘ঘিনঘিনে’ বলে গণ্য করে থাকে।  
উত্তেজিত ও বিচলিত 
কয়েকদিন আগে, এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও বরেণ্য ব্যক্তিত্ব আরশোলাদের তাদের সুপ্তাবস্থা থেকে জাগিয়ে তুলেছেন। তাঁর মঙ্গল হোক; তিনি অবশ্য অবিলম্বে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি মূলত আদালতের আশেপাশে ঘুরে বেড়ানো ভুয়ো ডিগ্রির অধিকারী ভুয়ো আইনজীবীদের কথা বোঝাচ্ছিলেন। এমন ভুয়ো আইনজীবীদের গালিগালাজ করা বা কটু নামে ডাকাটা হয়তো সংগত; কিন্তু আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে নিবেদন করছি যে, তাদের ‘আরশোলা’ বলাটা ঠিক নয়। একবার জাগিয়ে তোলা হলে বা উত্তেজিত হয়ে উঠলে, আরশোলারা আর শান্ত হতে চায় না (এ যেন সেই প্রবাদবাক্যের মতো: ‘একবার বন্ধক মানে চিরকালই বন্ধক’। সেই জেগে ওঠা বা উত্তেজিত আরশোলাদেরই কয়েকজন মিলে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন, এক্স  (পূর্বতন টুইটার) প্ল্যাটফর্মে একটি হ্যান্ডেল খুলেছেন, একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছেন এবং ইনস্টাগ্রামেও একটি অ্যাকাউন্ট চালু করেছেন তাঁরা। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সেই হ্যান্ডেলটির ফলোয়ারের সংখ্যা ২২ মিলিয়ন বা ২ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি।  
সেই উত্তেজিত আরশোলারা এবার পালটা আঘাত হানলেন। তার ফলে, মানবজাতিই এবার উত্তেজিত ও বিচলিত হয়ে পড়ল। আমার ধারণা, মানুষজন এখন ‘কোলহাপুরি চপ্পলের’ ভিতরে পা গলিয়ে রেখেই ভয়ে থরথর করে কাঁপছে! তা না-হলে, ভারতের সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্তৃপক্ষ—যাদের হাতে রয়েছে সাড়ে ১৪ লক্ষ সক্রিয় সেনার সুবিশাল সশস্ত্র বাহিনী, ৪,২০০টি মূল যুদ্ধট্যাঙ্ক, ৫৮০টি যুদ্ধবিমান, ২৭০টি নৌ-জাহাজ, দুটি বিমানবাহী রণতরি এবং শত শত পারমাণবিক অস্ত্র; আর যাদের কোষাগারে রিজার্ভ ব্যাংক (আরবিআই) থেকে পাওয়া ২ লক্ষ ৮৬ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক ভাণ্ডার—তারা কেন মাত্র ৩০ বছর বয়সি অভিজিৎ দিগপে-র খোলা একটি সাধারণ এক্স  হ্যান্ডেলকে ভয় পাবে? কেনই-বা তারা এক্স  কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করবে সেই হ্যান্ডেলটি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য? অথচ এই অভিজিৎ দিগপেই হলেন সম্পূর্ণ ডিজিটাল-ভিত্তিক রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রধান মুখ বা পতাকাবাহী নেতা। মিস্টার ডিগপে এখন এক সুদূর দেশে অবস্থান করছেন এবং সেখানে তিনি আমাদের ‘বন্ধু-শত্রু’ (ফ্রেনেমি) মিস্টার ডোনাল্ড ট্রাম্পের তত্ত্বাবধানে—উফ্—‘জনসংযোগ’ বা ‘পাবলিক রিলেশনস’ (সেই বিপজ্জনক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নয় কিন্তু) বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পড়াশোনা করছেন। দলটির ওয়েবসাইট সিজেপি-র লক্ষ্যগুলি এভাবে তুলে ধরেছে: “যদি তরুণদের কণ্ঠস্বর সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এটাই একমাত্র উপায় হয়ে থাকে তো আমরা আরশোলার পরিচয়কেই নিজেদের পরিচয় হিসাবে গ্রহণ করি।” ‘অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর’—এই ট্যাগলাইন বা মূলমন্ত্র নিয়ে সিজেপি দাবি করেছে যে, তারা সেইসব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে যাদের কথা “এই ব্যবস্থা বা সিস্টেমটি আমল দিতে ভুলে গিয়েছে”। তিনি চান—বেকার, অলস, যাঁরা সর্বক্ষণ অনলাইনে মগ্ন থাকেন এবং যাঁরা পেশাদার ভঙ্গিতে ক্ষোভ প্রকাশ বা ‘র‍্যান্ট’ করতে পারেন—এমন সব মানুষ যেন তাঁর দলে যোগ দেন। তিনি গান্ধী, আম্বেদকর এবং নেহরুর আদর্শে অনুপ্রাণিত। সিজেপি-র নির্বাচনি ইস্তাহার পড়লে একইসঙ্গে হাসি পায় এবং চিন্তার উদ্রেক হয়। অথচ সাধারণ রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহার পড়লে কেবল ঘুমই পায়।  
‘ইট ইজ দ্য কজ...’ 
আমার মনে হয়, সিজেপি সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম, যার মধ্যে তরুণীরাও আছেন—মাঝে ছড়িয়ে থাকা ব্যাপক হতাশা, দুর্দশা এবং ক্ষোভের উপরই মূলত ভরসা করছে। এই হতাশা ও ক্ষোভের কারণগুলি হল: 
বেকারত্ব: বর্তমানে দেশে বেকারত্বের হার ৫.২ শতাংশ; আর ১৬-১৭ শতাংশ বেকারত্বের হার তরুণদের মধ্যে। দেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যা (ওয়ার্ক ফোর্স) ৬৪ কোটি ৩০ লক্ষ এবং শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার (লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশন রেট বা এলএফপিআর) বড়োজোর ৬০ শতাংশ। বাকি ৪০ শতাংশ—বা প্রায় ২৫ কোটি মানুষ—ক্ষমা করবেন, তাঁরা আসলে ‘আরশোলা’। যদি সিজেপি এই সমস্ত ‘আরশোলা’র ভোট নিজেদের ঝুলিতে ভরতে পারে, তবে তারাই সরকার গঠন করবে। (উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল ২৩.৬ কোটি ভোট এবং কংগ্রেস ভোট পেয়েছিল ১৩.৭ কোটি)। 
পেট্রল ও ডিজেল: চলাফেরা বা গতিশীলতাই হল ‘আরশোলাদের’ প্রাণশক্তি। জ্বালানির অত্যধিক মূল্য এই ‘আরশোলাদের’ চলাফেরার স্বাধীনতাকে সীমিত করে দেয়। বর্তমানে দিল্লিতে এক লিটার পেট্রলের দাম ১০২.১২ টাকা এবং এক লিটার ডিজেলের দাম ৯৫.২০ টাকা। অন্যদিকে, বিজেপিকে ভোটদানের ‘পুরস্কার’ হিসাবে কলকাতার বাসিন্দাদের যথাক্রমে ১১৩.৫১ টাকা এবং ৯৯.৮২ টাকা দরে ​​পেট্রল ও ডিজেল কিনতে হচ্ছে। 
কারখানায় চাকরি: সংজ্ঞা অনুসারে, ‘আরশোলা’রা স্বভাবতই অলস প্রকৃতির হন। যেহেতু তাঁরা রোজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে পাড়ার ‘শাখায়’ (রাজনৈতিক বা সামাজিক সংগঠনের প্রাতঃকালীন সমাবেশে) যোগ দিতে যান না, তাই সরকারের অধীনে কোনো চাকরি পাওয়ার সুযোগ তাঁদের কখনোই হবে না। এই পরিস্থিতিতে, তাঁদের জন্য দ্বিতীয় সেরা বিকল্পটি হল—কোনো কারখানায় কাজ করা। পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রকের (এমওএসপিআই) তথ্য অনুসারে, ভারতে ২ লক্ষ ৬০ হাজার ৬১টি রেজিস্টার্ড কারখানা রয়েছে। এই কারখানাগুলিতে কর্মসংস্থান বা চাকরির আনুমানিক সংখ্যা হল ১ কোটি ৯৫ লক্ষ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কারণে অনেক চাকরিই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে, আর ২৫ কোটি ‘আরশোলা’ কখনোই কারখানায় কোনো চাকরি পাবেন না। আর ঠিক এই কারণেই তাঁদের মধ্যে এত হতাশা। 
পারিবারিক সহায়তা: এই ‘আরশোলারা’ তাঁদের পরিবারের—বিশেষ করে মায়েদের—সহযোগিতা পান; এর বিনিময়ে তাঁরা প্রতিমাসে পরিবারে ৫ কেজি করে বিনামূল্যে পাওয়া খাদ্যশস্য নিয়ে আসেন। যেহেতু পারিবারিক ঋণের পরিমাণ মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪২ শতাংশ এবং পারিবারিক সঞ্চয়ের পরিমাণ ৫-৬ শতাংশ মাত্র, তাই পরিবার থেকে এই ‘আরশোলারা’ নগদ অর্থের খুব সামান্যই সহায়তা পান এবং তাঁরা চরম নগদ অর্থের সংকটে ভুগছেন। 
‘বিকশিত ভারত’-এর বিলিয়নেয়ার: এই ‘আরশোলারা’ আশা করেছিলেন যে, ‘বিকশিত ভারত’-এর যুগে তাঁরা বিলিয়নিয়ারে পরিণত হবেন। কিন্তু ১২ বছর যাবৎ বিজেপির শাসন চললেও, বিলিয়নেয়ারদের সংখ্যা বৃদ্ধির গতি অত্যন্ত ধীর এবং হতাশাজনক। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ২০৫; অথচ বিলিয়নেয়ার হওয়ার আশায় লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ২৫ কোটি ‘আরশোলা’! এছাড়া, ২০১৪ সালে ‘আচ্ছে দিন আয়েঙ্গে’ (সুদিন আসবে) স্লোগানের সঙ্গে যে ১৫ লক্ষ টাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা সেই অর্থের জন্যও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। আশা ধূলিসাৎ করে দিল সি-ইএ আরশোলারা তাঁদের ‘আরশোলা অর্থনৈতিক উপদেষ্টা’র (ককরোচেস ইকোনোমিক অ্যাডভাইজার বা সি-ইএ) শরণাপন্ন হলেন। সি-ইএ’র পরামর্শ ছিল বেশ হতাশাব্যঞ্জক: “২০২৭ অর্থবর্ষে বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে; ওইসঙ্গে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিটও বাড়বে। মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এখন ঊর্ধ্বমুখী। স্বাভাবিকের চেয়ে দুর্বল ‘মনসুন’ বা বর্ষাকালীন বৃষ্টির ঘাটতি কৃষিতে যে বিরূপ প্রভাব ফেলবে তাতে জটিল হতে পারে সরবরাহ ব্যবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি আকর্ষণের কাজটি আরো কঠিন হয়ে ওঠে। সমাধান হল—একটি বিশ্বাসযোগ্য করনীতি, নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামোর পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা হ্রাস।” (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৩ মে, ২০২৬) মহাবিপর্যয়ের পূর্বাভাস এখন স্পষ্ট। 
আরশোলারা হয়তো শেষমেশ এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হবেন যে, আসন্ন এই মহাবিপর্যয় প্রতিরোধের একমাত্র উপায়—প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সহায়তায় মানুষের হাত থেকে আরশোলাদের হাতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্যোগ গ্রহণ।
লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

সম্পর্কিত সংবাদ