Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘বিশ্বগুরুর’ বিশ্বভ্রমণ

মানতেই হবে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটা ‘ব্যাপার’ আছে। সমাজসেবা করার উদ্দেশ্যে ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়া একজন

‘বিশ্বগুরুর’ বিশ্বভ্রমণ
  • ২৫ মার্চ, ২০২৫ ০১:০৩
Prefer us on Google

মানতেই হবে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটা ‘ব্যাপার’ আছে। সমাজসেবা করার উদ্দেশ্যে ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পড়া একজন ‘ফকির’-এর গল্প শুনে তা হজম করে ফেলেছে দেশের মানুষ। এরপর শোনা গিয়েছে চা-ওয়ালার গল্প, মোদির কথা। কিন্তু এসব তো গোড়ার কাহিনি। তাঁর মুখ্যমন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠা এবং গত দশ বছর ধরে ক্ষমতার শীর্ষস্থানে থেকে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাকি জীবনটা নিজের মতো করে সুখভোগ, বিলাসী জীবনযাপনে কোনও কার্পণ্য রাখবেন না। সেইমতো নিজের মতো করে সবটা গুছিয়ে নিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। যেমন, আকাশ ভ্রমণে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য দুটি বিমান কেনা হয়েছে, যার অর্থমূল্য ৮ হাজার ৪৫৮ কোটি টাকা। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিমানের মতোই সুরক্ষিত সেই বিমান। রয়েছে সব আধুনিক বন্দোবস্ত। তিনি যে গাড়িটি ব্যবহার করেন তাঁর দাম ১২ কোটি টাকা। এই গাড়ির ক্ষতি করতে গেলে গুলি বোমাও হার মানবে। শুধু কি আকাশ বা সড়কপথে যাতায়াতের সুখ? তাঁর প্রভাব প্রতিপত্তি থাকে নজরকাড়া। চালু কথায়, তিনি নাকি এক পোশাক দু’বার ব্যবহার করেন না। দিনে বার কয়েক পোশাক বদল করতেও তাঁর জুড়ি নেই। তিনি যে ফাউনটেন পেন ব্যবহার করেন তার দাম ১.৩০ লক্ষ টাকা। চশমার দামও লক্ষ লক্ষ টাকা। এই চশমা নাকি মাটিতে আছাড় খেলেও ভাঙে না। যে ‘স্যাটেলাইট’ ফোন ব্যবহার করেন মোদি তা শুধু ভিআইপিদের জন্যই তৈরি হয়। তাঁর হাতে দেখা যায় অ্যাপল বা মোভেডো-র মতো ব্র্যান্ডের দামি ঘড়ি। মোদির দশ লাখি সুট নিয়ে দেশজুড়ে চর্চা কম হয়নি। তবু তিনি ‘ফকির’, গরিবের ‘বন্ধু’! যদিও তাঁর জমানায় বহু গরিব অভুক্ত বা অর্ধভুক্ত থাকে!

Advertisement

এমন এক বিলাসী ভোগী মানুষ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পরিব্রাজকদের মতো যখন-তখন দেশভ্রমণে বেরিয়ে যাবেন, এতে আশ্চর্যের কী আছে? আর সত্যি বলতে কী, দেশের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সু-সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নানা জায়গায় যাবেন তাতে কোনও অস্বাভাবিকত্ব নেই। কূটনীতি, বিদেশনীতির প্রয়োজন ও স্বার্থে এসব একজন দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রীকে করতেই হয়। তবে সেক্ষেত্রে দেশের মানুষের স্বার্থরক্ষাই  অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। তথ্য বলছে, ইন্দিরা গান্ধী ১৫ বছরের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ১১৩ বার বিদেশভ্রমণ করেছেন। প্রয়াত মনমোহন সিং দশ বছরে বিদেশ গিয়েছেন ৭৩ বার। অটলবিহারী বাজপেয়ি পাঁচ বছরের শাসনকালে ১৩১ দিন বিদেশে কাটিয়েছেন। আর সকলকে ছাপিয়ে রেকর্ড করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যিনি নাকি গরিবের কথা ভাবেন, গরিবের বন্ধু। তিনি প্রথমবার কুর্সিতে বসে ২০১৪ সালের জুন মাসে ভুটান গিয়ে যে বিদেশযাত্রা শুরু করেছিলেন তা আজও অব্যাহত। সরকারি তথ্য বলছে, শুধু প্রথম পাঁচ বছরেই মোদি ৭৪ বার বিদেশসফর করে ফেলেন। সব মিলিয়ে বিদেশ ভ্রমণের সংখ্যাটা ১০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। ফলে দেশের নাগরিকদের করের টাকায় বিদেশভ্রমণের জন্য খরচের বহরও বেড়েছে। তথ্য জানাচ্ছে, মনমোহনের দশ বছরে বিদেশভ্রমণের জন্য খরচ হয়েছিল ৭০০ কোটি টাকা। মোদি সব অর্থেই ব্যতিক্রম। তাই তাঁর ক্ষেত্রে দশ বছরে বিদেশভ্রমণের খরচ সেই তুলনায় অন্তত তার তিন গুণ বেড়েছে বলে নিন্দুকেরা মনে করছে।
আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকা গেল না। অবশেষে সত্যিটা সামনে এল। বিরোধী চাপে অবশেষে সংসদে মোদির দেশভ্রমণের জন্য তিন বছরের খরচের হিসাব সংসদে পেশ করল কেন্দ্র। তিন বছরে ২৮টি দেশে তাঁর সফরের জন্য খরচের হিসাব দেখলে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার জোগাড়। স্রেফ ‘বিবিধ’ খাতেই তাঁর খরচের অঙ্ক ৭৫ কোটি টাকা। তিন বছরে ২৮টি দেশ ঘুরে ‘গরিবের’ বন্ধু মোদির জন্য খরচ হয়েছে ২৫৮ কোটি ৯৭ লক্ষ ৮ হাজার টাকা। এলাহি সব কাণ্ডকারখানা! ২০২২-২৪ অর্থাৎ গত তিন বছরে ৩৮ বার বিদেশ সফরে গিয়ে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর থাকার (হোটেল ইত্যাদি) খরচ হয়েছে ১০০ কোটির উপর টাকা। লক্ষণীয় যে, এসবই হচ্ছে জনগণের করের টাকায়। অবশ্য ভোট এলেই তিনি সোচ্চারে বলেন, গরিবের স্বার্থরক্ষাই তাঁর সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। তিনি দিতে চান সুশাসন। আচ্ছে দিন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের যে, প্রধানমন্ত্রী মোদির বিদেশ সফরে কোনও খামতি না থাকলেও এখনও দেশের কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করেন। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্বের জ্বালায় জেরবার। বিশ্ব ক্ষুধা তালিকায় ১২৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৫। স্বঘোষিত ‘বিশ্বগুরু’ একটি বারের জন্যও ভেবেছেন কি তাঁর এই দেশভ্রমণে ব্যয় করা কোটি কোটি টাকায় এঁদের জন্য কত কী করা যেত! এমন বিদেশভ্রমণ ওই আম আদমির চোখে বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ