Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিচারের বাণী, বিচারপতির নয়

বস্তা বস্তা টাকার বান্ডিল, আধপোড়া নোট এবং অবিশ্বাসের কাঠগড়ায় খোদ বিচার ব্যবস্থা। এমন একটা দিন সাধারণ মানুষ দেখতে চায় না।

বিচারের বাণী, বিচারপতির নয়
  • ২৫ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: বস্তা বস্তা টাকার বান্ডিল, আধপোড়া নোট এবং অবিশ্বাসের কাঠগড়ায় খোদ বিচার ব্যবস্থা। এমন একটা দিন সাধারণ মানুষ দেখতে চায় না। অথচ বিচারপতি যশোবন্ত ভার্মা দেশবাসীকে আজ তেমনই পরিস্থিতিতে এনে দাঁড় করিয়েছেন। দোলের দিন, অর্থাৎ ১৪ মার্চ আগুন লেগেছিল তাঁর বাংলোতে। তার সাতদিন পর সামনে এসেছে একটি অভিযোগ, বিচারপতির বাড়ির আউটহাউজ বা স্টোররুমে নাকি ১৫ কোটি ‘বেহিসেবি’ টাকা ছিল। সবটাই অভিযোগ। কিন্তু গুরুতর। প্রমাণসাপেক্ষ। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রাথমিক তদন্ত ইতিমধ্যেই শেষ। দিল্লি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি দেবেন্দ্র কুমার উপাধ্যায় সবদিক খতিয়ে দেখার পর জানিয়েছেন, গভীরতর তদন্তের প্রয়োজন আছে। অর্থাৎ, অভিযোগের সারবত্তা যে রয়েছে, সেটা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন। মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার থেকে বিচারপতি ভার্মার ছ’মাসের কল ডিটেইলস নেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের যে কর্মী ছ’মাস আগে বিচারপতি ভার্মার কাজে নিযুক্ত হয়েছিলেন, তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যও জানানো হয়েছে শীর্ষ আদালতকে। এরই মধ্যে বিচারপতি ভার্মাকে সব ধরনের মামলা শোনা থেকে ‘অব্যাহতি’ দেওয়ার পাশাপাশি গভীরতর তদন্তের জন্য সুপ্রিম কোর্ট কমিটিও গঠন করে দিয়েছে। তাতে রয়েছেন পাঞ্জাব-হরিয়ানা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি শীল নাগু, হিমাচল প্রদেশের প্রধান বিচারপতি জি এস সন্ধ্যাওয়ালিয়া এবং কর্ণাটক হাইকোর্টের বিচারপতি অণু শিবরামন। বেনজিরভাবে শীর্ষ আদালত পোড়া নোটের ভিডিও প্রকাশ করেছে। তার মানে, ডাল মে সত্যিই কুছ কালা হ্যায়। এখন অপেক্ষা দু’টি উত্তরের। একটি তাৎক্ষণিক এবং অন্যটি সুদূরপ্রসারী। প্রথম প্রশ্ন, এই তদন্তের শেষে কী পাওয়া যাবে? আর দ্বিতীয়, ভারতের বিচার ব্যবস্থার ভাবমূর্তি এই ঘটনার জেরে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

Advertisement

ভারতে বিচারক-বিচারপতিরা সাধারণভাবে আইনের ঊর্ধ্বে থাকেন। তাঁদের বিরুদ্ধে যদি কোনও অভিযোগ ওঠে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে। পুলিস চাইলেই যেমন আমাকে বা আপনাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, কোনও বিচারপতির বেলায় সেটা সম্ভব নয়। হাইকোর্টের বিচারপতি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। আর নিম্ন আদালতের বিচারকের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। তাঁরাই প্রাথমিক তদন্ত করবেন। রিপোর্ট চাইবেন। তাঁদের মতামত বিচার ব্যবস্থার শীর্ষ স্তরে পাঠাবেন। তারপর যাবতীয় সিদ্ধান্ত। প্রথমে সেই বিচারক বা বিচারপতিকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। তারপর শুরু হবে তদন্ত। ঠিক যেমনটা বিচারপতি ভার্মার ক্ষেত্রে হচ্ছে। তেমন কিছু যদি না হয়? তাহলে আইন এবং তদন্তকারী এজেন্সিকে অপেক্ষা করতে হবে সেই বিচারপতির অবসর পর্যন্ত। অতীতের এমনই এক গল্প চাউর আছে এক বিচারপতির বিরুদ্ধে। দুর্নীতির অভিযোগ ছিল তাঁর নামে। ঠিক অবসরের দিন বিকেলে সেই বিচারপতির বাড়ি রেইড করে আয়কর দপ্তর। উদ্ধার হয় কোটি কোটি টাকা। রীতিমতো সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে সেই বিচারপতি ঘোষণা করেন, এই টাকা পুরোটাই তাঁর স্ত্রী রোজগার করেছেন ‘ক্লায়েন্ট’দের ‘এন্টারটেন’ করে। আর ভারতীয় আইন অনুযায়ী কোনও মহিলা যদি কাউকে ‘এন্টারটেন’ করাটাকে রোজগারের মাধ্যম হিসেবে দেখান, সেই সোর্স সরকার জানতে চাইতে পারে না। আয়কর দপ্তরকে তিনি বলেছিলেন, এই আয় মোতাবেক যা কর হয়েছে, সেটা কেটে নিতে। আয়কর দপ্তরও সেটাই করেছিল। এবং ফিরেছিল মাথা নিচু করে। 
কথায় বলে, আইন থাকলে তার ফাঁকও থাকবে। শোনা ‘গল্প’টিতে সেই ফাঁকই ব্যবহার করেছিলেন বিচারপতি। মানুষের মনে প্রশ্ন থাকতেই পারে, এখন যে ঘটনায় গোটা দেশ তোলপাড় হয়ে রয়েছে, সেখানেও কোনও ফাঁক গলে অভিযোগের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি হবে না তো? সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত কমিটি এই তদন্তে চূড়ান্ত নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে ঠিকই, পাশাপাশি বিচারপতি ভার্মাকেও তাঁর সাফাই দেওয়ার পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত তিনি জানিয়েছেন, এই টাকার ব্যাপারে কোনও খবর তাঁর কাছে নেই। এমনকী ওই আউটহাউজ বা স্টোররুমে তাঁর যাওয়ার প্রয়োজনও পড়ে না। বরং সেখানে দরজা খোলাই থাকে। যে কেউ যেতে-আসতে পারে। প্রশ্ন হল, ‘যে কেউ’ বলতে এখানে কী বোঝানো হচ্ছে? একজন হাই প্রোফাইল বিচারপতির বাসভবন চত্বরে তো ‘যে কেউ’ পৌঁছতেই পারবে না। কড়া নিরাপত্তার বলয়েই সে আটকে যাবে। অথচ কেউ একজন বা একাধিক ব্যক্তি সেখানে অবলীলায় যাতায়াত করেছে, ১৫ কোটি টাকা মজুতও রেখেছে। তারপরও কেউ জানতে বা বুঝতে পারেনি!
সরকারি দপ্তরের অন্দরমহলে ঘুষ খাওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কোনও সংশয় নেই। আমলাতন্ত্রের মতো কেরানিতন্ত্রও চলে আকছার। ফাইল একটা টেবল থেকে অন্য টেবল পর্যন্ত পৌঁছতেও ঘুষ চায় অসৎ কর্মী-অফিসাররা। এখন আবার মূল্যবৃদ্ধির বাজার। দু’-পাঁচশো টাকায় হাতের নখই গরম হয় না, তালু তো দূরঅস্ত। অন্তত হাজার টাকা! বড় অসৎ অফিসার হলে সেটা লাখে পৌঁছয়। সেখানে ১৫ কোটি টাকা যদি ঘুষ খেতে হয়, তাহলে বুকের খাঁচা এবং পদ—দুটোই লাগে। কোটি টাকার উপর ঘুষ ‘যে কেউ’ খাওয়ার মতো অবস্থায় থাকে না। যেমন উচ্চ স্তরের কাজ হাসিল করার না থাকলে ‘যে কেউ’ ১৫ কোটি বেহিসেবি টাকা দেবেও না। তাহলে সত্যি বিচারপতি ভার্মার বাংলোয় কী হয়েছিল? মানুষ কিন্তু জানতে চায়। কারণ, বিচার ব্যবস্থায় কালি লাগুক, সেটা তারা দেখতে চায় না। ভয়ে থাকে... এই আস্থাটুকুও না চলে যায়! আমরা জানি, সব অফিসার দুর্নীতিগ্রস্ত নন। কয়েকজনের জন্য গোটা ব্যবস্থার উপর অনাস্থার মেঘ জড়ো হয়। কিন্তু বিচার ব্যবস্থা? এই একটি ক্ষেত্রে তো এতটুকু অনিয়মের অভিযোগও মানতে পারে না তারা। কারণ এটাই তো আম জনতার শেষ ভরসা! এখানেও যদি আঁচড় লাগে, মানুষ যাবে কোথায়?
রাহুল গান্ধী ২০১৯ সালে একটি মন্তব্য করেছিলেন... ‘ছোট্ট প্রশ্ন, সব চোরেদের নামের পিছনেই একটা শব্দ কেন থাকে? মোদি, মোদি, মোদি! নীরব মোদি, ললিত মোদি, নরেন্দ্র মোদি। আর একটু খুঁজলে এমন অনেক পাওয়া যাবে।’ সেই সময় গুজরাতে বিজেপির জনপ্রতিনিধি প্রাণেশ মোদি একটি মামলা করেন। তাঁর দাবি, এভাবে মোদি নামের সবার সম্মানহানি করেছেন রাহুল গান্ধী। মাসের পর মাস কেটে গেল শুনানিতে। তারপর বিচারক যখন মামলাকারীকে বললেন, এর জন্য রাহুল গান্ধীকে সশরীরে হাজিরা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রাণেশ মোদি মামলাটাই অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে দিলেন। সেটা আবার মাথাচাড়া দিল ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আচমকাই। কারণ, বছর ঘুরতেই যে লোকসভা ভোট! তখন কিন্তু মাত্র ২০ দিনে সাতবার তারিখ পড়ল। শুনানি হল। আর সাজাও। ফৌজদারি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলেন রাহুল গান্ধী। চলে গেল সংসদ সদস্যপদ। কোন জাদুবলে সেই মামলা গতি পেয়েছিল? চার বছর আগে একজন বিচারক বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চাননি। অন্য বিচারক এজলাসে আসা মাত্র কীভাবে প্রাণেশ মোদির মনে হল, এটাই মামলা পুনরুজ্জীবিত করার সঠিক সময়? কীভাবেই বা এই মামলায় সর্বোচ্চ সাজা হল? রাহুল কিন্তু বারবার বলেছিলেন, সম্প্রদায়কে উদ্দেশ করে কিছু বলা তাঁর লক্ষ্য ছিল না। ক্ষমাও চেয়েছিলেন। তারপরও সর্বোচ্চ সাজা! অথচ নরেন্দ্র মোদি মঙ্গলসূত্র নিয়ে মন্তব্য করেন। বিভাজনের দ্ব্যর্থহীন শব্দবন্ধে উস্কানির ধোঁয়া ওঠে। তখন কিন্তু মামলা গৃহীত হয় না। কিংবা তা গতিও পায় না। কেন? বিরোধীরা বারবার অভিযোগ করে এসেছে, এই জমানায় সংবাদমাধ্যম তো বটেই, বিচার ব্যবস্থারও কণ্ঠরোধ করে রেখেছে সরকার। পরিকাঠামো নেই, নিয়োগ ঝুলে, সরকারের পক্ষে রায় হলে প্রাইজ পোস্টিং... অর্থাৎ বার্তা স্পষ্ট। বিচারপতি ভার্মাকে নিয়ে গোল শুরু হওয়া মাত্র আরও একবার নড়েচড়ে বসেছে মোদি সরকার। তারা বলছে, এইজন্যই তা আমরা চেয়েছিলাম বিচারপতি নিয়োগের কলেজিয়াম ব্যবস্থার বদল আনতে। বিচার ব্যবস্থায় সরকারের প্রতিনিধি থাকবে না কেন? ন্যাশনাল জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কমিশন আইন সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়েছিল সেই ১০ বছর আগে। তাও সুপ্রিম কোর্ট সেটা কার্যকর করতে দিল না। এবার করতেই হবে। অর্থাৎ, বিচার ব্যবস্থার অন্দরেও ঢুকে পড়বে শাসক। তাদের পছন্দ। অপছন্দও। একটা কি দুটো চোনার সুযোগ নিয়ে দুধের গামলাটাকেই নোংরা করে দেবে শাসকের ‘অভিপ্রায়’। মানুষ তখন ভাববে... এবার কোথায় যাব? 
সত্যিকারের বিচারক বা বিচারপতি মামলার প্রথম দিনই বুঝে যান, অপরাধী কে। তারপরও তিনি বসে থাকেন। তথ্য-প্রমাণের অপেক্ষায়। কখনও সেই কাঙ্ক্ষিত প্রমাণ তিনি হাতে পান। কখনও নয়। বুঝতে পারেন, অপরাধী ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। তবুও কিছু করতে পারেন না। অন্ধকার ঘর, ফাইলের স্তূপ, মামলার পাহাড়। তাও সাধারণ মানুষ সেখানেই আসে... এক বুক আশা নিয়ে। ভাইয়ে ভাইয়ে, পাড়া-পড়শিতে, চেনা-অচেনায় বিবাদ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন একটাই কথা কানে আসে—কোর্টে বুঝে নেব। কেন? উত্তর একটাই—ভরসা। আস্থা। আমরা এখনও মনে করি, পুলিস অভিযোগ না নিলে, প্রশাসন কাজ না করলে, সরকার অনিয়ম করলেও আদালত পাশে দাঁড়াবে। কোর্ট আমাদের কথা শুনবে। বিচার করবে। ন্যায়বিচার। বিচারক এবং বিচারপতির দায়িত্ব, সেই আস্থা বজায় রাখা। হতে পারে, সাড়ে চার কোটি মামলা দেশের নানা আদালতে এখনও ফয়সালার জন্য দিন গুনছে। হতে পারে, ধুঁকতে থাকা পরিকাঠামো বিচারকদের ওই উঁচু চেয়ারটায় বসার ইচ্ছেটাকেই দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দেয়। হতে পারে, এদেশে এখনও এক লক্ষ মানুষের জন্য একজন মাত্র বিচারক ধার্য... তাও মানুষ ভরসা রাখে। বিচারকের উপর। বিচার ব্যবস্থার উপর। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ