ভারতের রাজনীতিতে বাংলার জায়গা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। এই গুরুত্ব ঐতিহাসিক কারণেই। কোনো দল তামাম ভারতে মাতব্বরি করেও অন্তত একবার বাংলার রাজ্য ক্ষমতা পরিচালনার অধিকার না পেলে কুলীন গণ্য হয় না। বিজেপির ব্যথা এই জায়গাটাতেই। মোদি-শাহের পার্টি নিজেকে দুনিয়ার বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল বলে দাবি করে থাকে। বিজেপি আরো মনে করে, তারা পার্টি উইথ আ ডিফারেন্স। তারা মানে যে বঙ্গসন্তান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই তাদের পার্টির জনক। তাদের সবচেয়ে বড়ো দাবি, পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটি শ্যামাপ্রসাদের সৃষ্টি। অথচ শ্যামাপ্রসাদের জনসংঘের উত্তরসূরি বিজেপি বাংলাতেই কল্কে পায় না। বিজেপির এবং অবশ্যই নরেন্দ্র মোদির একটি পছন্দের স্লোগান হল, মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। মোদির ব্যথা এই জায়গায়। তিনি ভারতেশ্বরের সিংহাসনে রয়েছেন টানা তিনটি টার্ম। কিন্তু তাঁর নেতৃত্ব মেনে চলা বঙ্গ বিজেপি এখনো পর্যন্ত রাইটার্স/নবান্নের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেনি। মোদিজির দীর্ঘায়ু কামনা করেও অনুমান হয় যে, প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে এটাই তাঁর শেষ দফা। অতএব তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বকালে বাংলার এটাই শেষ বিধানসভা নির্বাচন। মোদির নেতৃত্বে বিজেপির বাংলা দখলের সুযোগ ‘হয় এবার নয় নেভার’!
তাই বিজেপির ছোটো বড়ো সকলের মধ্যেই বাড়তি উৎসাহ কৌতূল আগ্রহ সবই পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত যা ছবি, বাংলার আম জনতা মোদির স্বপ্নপূরণের কোনো সম্ভাবনাই দেখছে বলে মনে হয় না। বিজেপির বহু সমর্থও পার্টিকে নিয়ে যার-পর-নাই হতাশ। কিন্তু ভোট মেশিনারিকে ভোটগ্রহণ এবং গণনা পর্যন্ত চাঙা রাখতে দিল্লিওয়ালারা একটা কৌশল নিয়েছেন। তিনটি সমীক্ষক সংস্থাকে দিয়ে রিপোর্ট বানিয়েছেন তাঁরা। ওই রিপোর্টগুলি দিয়ে এই পূর্বাভাস ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বাংলায় ১৩৫-১৫০টি আসন পেতে পারে বিজেপি! এই গাঁজাখুরি পরিসংখ্যানে চোখ রেখেই বাংলার রাজনীতি সচেতন মানুষ পুরানো প্রশ্ন আওড়াতে শুরু করেছেন, টাকা কি গাছে ফলে? পাগল না সিপিএম? প্রভৃতি। মানুষ তো ভুলে যায়নি—২০২১ ও ২০২৪ সালের যথাক্রমে বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনেও ভাড়া করা সমীক্ষক সংস্থা বগল বাজাবার মতোই রিপোর্ট উপহার দিয়েছিল দিল্লিকে। কিন্তু সেই গেরুয়া স্বপ্ন চুরমার হয়েছিল ভোটগ্রহণের দিন মানুষের চোখমুখ দেখেই, গণনা পর্যন্তও প্রতীক্ষা করতে হয়নি কাউকে। বুদ্ধিমান মানুষ দুভাবে শেখে—দেখে এবং ঠেকে। বিজেপির সামনে দৃষ্টান্ত ছিল ভূরি ভূরি, ভালো ছাত্র হলে তারা সেসব দেখেই পর্যাপ্ত শিক্ষা নিতে পারত। কিন্তু তারা তা নেয়নি। এমনকি গত দুবার রাম ঠেকা ঠেকেও দলীয় নেতৃত্ব বঙ্গ বিজেপিকে তৈরি করেনি। তৈরি করা যেত দুভাবে—দলীয় সংগঠন মজবুত করে এবং বাংলার মনজয়ের জন্য দিল্লির ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে। এই জোড়া হাতিয়ারকেই ভোঁতা করে রাখা হয়েছে সযত্নে। দলীয় সংগঠন মজবুত করার জন্য যা করা দরকার ছিল এসআইআর ধুয়োয় বিজেপিওয়ালারা করে চলেছেন ঠিক তার উলটো কারবার। অন্তর্ভুক্তির রাজনীতিকে দুয়ো দিয়ে বিজেপি বেশি করে শান দিচ্ছে বিভাজন বিদ্বেষের নীতিতে।
তারা বুঝতেই চাইল না যে বাংলা—বিহার, ইউপি, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র কিংবা কর্ণাটক নয়। এখানে হিন্দু এবং মুসলমান হল একজন মানুষের দুটো হাত। একটা কেটে ফেললে তার পক্ষে সুস্থভাবে বাঁচা অসম্ভব। গত দুটো লোকসভা নির্বাচনে অনেকগুলি এমপি দিয়েও একজনও পূর্ণমন্ত্রী পেল না পশ্চিমবঙ্গ। দিল্লির দরবারে সিকি আধুলির কোনো মূল্য নেই। প্রতিবার দু-চারজন ওজনদার পূর্ণমন্ত্রী পেলে তাঁরা বাংলার জন্য দরকষাকষি করে বহু উন্নয়ন আদায় করে আনতে পারতেন। বাংলায় বিজেপির সংগঠন মজবুত এবং বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তা বিরাট সহায়ক হতে পারত। মোদিজি, আপনার পার্টির প্রতিপক্ষের নাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মা-মাটি-মানুষের দল তৃণমূল কংগ্রেস। আর আপনার হাতে ধরা একটা কুলো। কুলোর বাতাস দিয়ে মমতা এবং তৃণমূলকে উড়িয়ে দেবেন! বাংলার মানুষ যদি আপনাদের দুয়ো দিতে ‘পাগল কি গাছে ধরে?’ গোছের প্রশ্ন ছুড়ে দেয় তাকে দোষ দেবেন না।