পঙ্কজ ত্রিপাঠী: ‘কালা’ ছবির শ্যুটিং চলছে। আট-ন’বছর আগের কথা। মুম্বইতে তখন বেশ গরম। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে দুটো চেয়ার নিয়ে বসে নানা পাটেকর। হাতে কড়া দুধ চা। শর্ত একটাই—চিনি বেশি থাকতে হবে। শ্যুটিং সেটে এটা তাঁর জন্য পরিচিত দৃশ্য। দুটো বা তিনটে চেয়ার একসঙ্গে করে বসবেন। শখ, ওই দুধ চায়ের। ওই সিনেমায় আমার কাজ ছিল দু’-তিনদিনের। নানাজির সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তবে সামান্যই। হঠাৎই আমাকে ডাকলেন... ‘পঙ্কজ, একটা কথা বলি শোনো। অপেক্ষা করতে শেখো... বড়ো চরিত্রের জন্য অপেক্ষা। এই ধরনের ছোটো চরিত্র বেশি কোরো না। তুমি বড়ো চরিত্রের জন্য তৈরি।’ ওঁর কথা শুনে যতটা আনন্দ হয়েছিল, অবাক হয়েছিলাম তার অনেক বেশি। ‘কালা’ ছবিটা করতে রাজিই হয়েছিলাম রজনীকান্ত এবং নানার জন্য। কিন্তু শ্যুটিংয়ে উনি যে আমাকে আলাদা করে অবজার্ভ করছিলেন, বুঝতে পারিনি। প্রকৃত ‘গুরু’ বোধহয় এমনই হন। ছোটো ছোটো মন্তব্য, অভিব্যক্তি, অনুভূতিতে আজীবন শিখিয়ে যান। ‘স্যার’ বলতাম ওঁকে। আমার আজীবনের গুরু। আজ তাই বাস্তবিকই আমি গুরুকে হারালাম।
শুধু অভিনয় নয়, জীবন সম্পর্কেও ধারণা বদলে দিয়েছিলেন নানাজি। কঠিন কথা সহজে বলার অসাধারণ ভঙ্গি ছিল। বাইরের মানুষ হয়তো বুঝতে পারবেন না, কিন্তু নানার মধ্যে এক শিশুকে খুঁজে পেতাম। যে সারাক্ষণ পরিবারকে আঁকড়ে থাকতে চাইত। আমাকে বহুবার বলেছেন, যতটা প্রয়োজন, ততটাই কাজ করা উচিত। সময় দিতে হবে পরিবারকেও। কাজ আর ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ না। আবার কঠিনও নয়। সেটা নানা স্যারই আমাকে শিখিয়েছেন।
এখন তো চারিদিকে কত অভিনয় শিক্ষার ক্লাস। আমি তো বলব, নানা পাটেকরের ছবিগুলো মন দিয়ে দেখলেই মাস্টারক্লাস করা হয়ে যাবে। ‘পারিন্দা’র গ্যাংস্টার, ‘ক্রান্তিবীর’-এ বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠ, আবার ‘ওয়েলকাম’-এ কমেডি উদয়, কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব! রসবোধও ছিল তীক্ষ্ণ। নানাজির গুণ এটাই যে, নিজেই চরিত্র হয়ে উঠতেন। ছাপ রেখে যেতেন। আপনার দেখে একটাই কথা মনে হবে—এই চরিত্র অন্য কেউ করতে পারবে না। সত্যিই ‘নটসম্রাট’।
ছবি তৈরির আগে এখন ‘ওয়ার্কশপ’ হয়। নানাজি বিশ্বাস করতেন, গোটা পৃথিবীটাই ওয়ার্কশপ। বলতেন, ‘পঙ্কজ... প্রতিটা মানুষই তো ওয়ার্কশপের সাবজেক্ট। হাঁটা, কথা বলা, চোখ পিটপিট করা, দেঁতো হাসি, আঙুল মোচড়ানো— কোনটা কখন কাজে লাগবে জানো না। তাই চোখ আর মাথা যেন সবসময় পরিষ্কার থাকে। মন দিয়ে অবজার্ভ করো। সেটাই কাজে লাগবে।’
আর্ট কলেজের বন্ধুদের মিস করতেন। রং-তুলির সঙ্গে সম্পর্ক ছোটো থেকেই। জেব্রা ক্রসিং এঁকে একসময় রোজগার করেছেন। সেই স্ট্রাগল ভুলে যাননি। সেজন্য কৃত্রিম কোনো কিছুই পছন্দ ছিল না। কেউ অহেতুক প্রশংসা করলে বিরক্ত হতেন। রাগতেন না, কিন্তু পছন্দ-অপছন্দ স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতেন। ওঁকে দেখে, ওঁর কথা শুনেই অনেক কিছু শিখেছি। জীবনের নানা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও গাইড করতেন। আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কাজ করতেন নানাজি। বিশ্বাস করুন, সেটা আমি বাইরে থেকে শুনেছি। কখনো কোনো আড্ডায় এ নিয়ে ঢাক পেটাতে দেখিনি। নানাজির প্রয়াণে সিনেমা জগতের বড়ো ক্ষতি হল। আর আমার ক্ষতিটা ব্যক্তিগত। তিনি নেই... বিশ্বাস করতে সময় লাগবে। নানাজি সশরীরে আর থাকবেন না। কিন্তু ওঁর কাজ তৈরি করবে পরবর্তী প্রজন্মকে।