সুখেন্দু পাল, ভাতার: জোড়া অভিশাপের ফল ভুগতে হয়েছিল সর্বকালের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা কর্ণকে। ভূমিদেবীর অভিশাপে রথের একটি চাপা বসে গিয়েছিল মাটিতে। আর পরশুরামের অভিসম্পাতে অত্যন্ত কঠিন সময়ে অস্ত্রবিদ্যার সমস্ত জ্ঞান ভুলে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কর্ণ এমন দুরাবস্থায় না পড়লে হয়তো ‘মহাভারত’ লেখা হতো অন্যভাবে। মঙ্গলবার ঠিক যেন সেই দৃশ্যের ‘রিপ্লে’ দেখলেন ভাতারবাসী। সৌজন্যে বিজেপির ‘পরিবর্তন যাত্রা’র রথ।
এসআইআর, নাম বাদ নিয়ে এখন উত্তাল বঙ্গের ‘ভোট-কুরুক্ষেত্র’। ক’দিন ধরেই বিজেপির নেতাদের ‘দুর্যোধন’ বলে কটাক্ষ করে আসছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অর্থাৎ ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট, বাংলায় পাণ্ডব বনাম কৌরব, ন্যায় বনাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এমন আবহেই বিজেপির রথের চাকাই বসে গেল মাটিতে! শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রথে তখন বসে দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সহ প্রথমসারির নেতারা। ‘সারথী’রা অনেক চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু চাকা আর ওঠেনি। অগত্যা নেমে আসতে হল শমীকদের। প্রখর রোদে তেতেপুড়ে যাওয়া অবস্থা সকলের। কপালে ঘাম মুছতে মুছতে ঠায় প্রায় ৪০ মিনিট দাঁড়িয়ে রইলেন শমীকরা। জানা যাচ্ছে, রথের জন্য গাড়ির উপর কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। সেটিই মাটিতে বসে যায়। ফলে, পুরো গাড়িটিই আর এগতে পারেনি। শেষে দক্ষ কর্মী এনে রথ টেনে তোলা হল। গড়াতে শুরু করল দেওয়ানদিঘির উদ্দেশ্যে। অত্যাধুনিক রথে এসি চলল। বিজেপি নেতারা রথে বসে ঠান্ডা হলেন। কিন্তু, রথযাত্রার শুরুতে তাঁদের যে উন্মাদনা ছিল, সেটা কর্পুরের মতো উধাও! তা হলে কি মঙ্গলবারে রথের চাকা বসে যাওয়ার মধ্যে অমঙ্গলের বার্তা পেলেন কথায় কথায় শাস্ত্র আওড়ানো বিজেপি নেতারা? তা জানতে এখনও ঢের সময় বাকি থাকলেও ভাতারের মানুষ থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতারা কটাক্ষ করতে ছাড়ছেন না। অনেকেই বলছেন, ‘অন্যায়ভাবে বহু মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে বিজেপি। বাংলার মাটি সেই অন্যায় মেনে নিচ্ছে না বলেই ওদের রথের চাকা বসে গিয়েছে।’ এমনকী পরিবর্তন যাত্রায় শামিল বিজেপি কর্মীদের কেউ কেউ আড়ালে, আবডালে বলছিলেন, ‘আমাদের দলের নেতারা সংস্কারে বিশ্বাসী। মহাভারত বা রামায়ণের কাহিনী তাঁরা খুঁটিয়ে পড়েন। তার থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যান। তাই, রথের চাকা বসে যাওয়ার বিষয়টি তাঁরা খুব একটা ভালোভাবে নিচ্ছেন না। এটা মোটেও শুভ সংকেত নয়।’
২০১৪ সালে লোকসভা ভোটের প্রচারে এসে বাঙালিকে দু’হাতে লাড্ডু বিলির কথা বলেছিলেন মোদি-শাহ-নাড্ডারা। সেই লাড্ডু তো দূরের কথা, বাংলাকে এযাবৎকাল শুধু বঞ্চনাই করে গিয়েছেন তাঁরা। একের পর এক প্রকল্পের টাকা বন্ধ করেছেন। ১০০ দিনের কাজ বন্ধ গরিব মানুষের রুজিরুটি কেড়েছেন। এখন ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের নামে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে। বিজেপিকে অভিসম্পাতের আওয়াজ উঠছে সর্বত্র। ফলত, ওঁদের রথের চাকা যে বসবে, সেটাই স্বাভাবিক। এমনটাই বক্তব্য তৃণমূলের।
ভাতারের তৃণমূল নেতা তথা জেলাপরিষদের শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ শান্তনু কোয়ার বলেন, ‘মহাভারতের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের শিক্ষা দেয়। বিজেপি বাংলার মানুষকে বঞ্চনা করে অভিশাপ কুড়িয়েছে। ফলে, রথের চাকা বসে যাওয়াতে ওঁদের নেতারা অশুভ ইঙ্গিত পেয়ে গিয়েছেন। তাই ওঁদের মুখে সেই হাসি আর নেই। ফ্লপ হচ্ছে যাবতীয় কর্মসূচি। এদিন বক্তব্য রাখতে গিয়ে শমীক ভট্টাচার্যও মহাভারতের প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন, ‘রাজ্যে সাতজন ধৃতরাষ্ট্রের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। যাঁরা শত সন্তানের পিতা।’ কিন্তু, কৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন জোড়া অভিশাপে মহাভারতের মূল চরিত্র কর্ণের রথের চাকা বসে যাওয়ার কাহিনী!