নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাকপুর: ঐতিহাসিক শহর বারাকপুরে পুজো নিয়ে লড়াই নতুন নয়। পুজো কমিটি কার দখলে থাকবে, তা নিয়ে রীতিমতো রাজনৈতিক লড়াই হয়েছিল। তার জেরে জেল পর্যন্ত খাটতে হয়েছিল পুজোর কর্তাদের। শুধু পুজোর কর্তাদেরই নয়, স্বয়ং মাদুর্গাকেই বারাকপুরের পুজোমণ্ডপ থেকে বারাসতে তুলে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ! ঘটনাটি চিড়িয়া মোড়ের যুবশক্তির মানস পুজোর। এই পুজোর শুরু ১৯৭৭ সালে। কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন বারাকপুরের প্রাক্তন পুর চেয়ারম্যান সুপ্রভাত ঘোষ। কিন্তু ১৯৮৪ সালে ওই পুজো কমিটির দখল নেন সিপিএমের কিছু নেতা-কর্মী। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তুমুল গোলমাল হয়। চারদিন জেল খাটতে হয় সুপ্রভাত ঘোষসহ তিনজনকে। ওই গোলমালের জেরে ১৯৮৬ সাল থেকে পুজোই ছেড়ে দেন তাঁরা। ফের ২০১০ সাল থেকে টানা ওই পুজো হয়েছে তাঁদের নেতৃত্বে। কিন্তু এবছর রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই পুজোটি ফের হাতছাড়া হল ওই কমিটির। পুজো এবার আর সুপ্রভাত ঘোষরা করছেন না। দায়িত্ব নিয়েছেন বিজেপি নেতা তথা মণ্ডলের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় যাদব।
ক্ষমতার হাতবদল হবার সঙ্গে সঙ্গেই একটি পুজো বাদে সব পুজোই শাসক দলের নেতা-কর্মীদের দখলে চলে গিয়েছে। এখনো পর্যন্ত কেবল বারাকপুর পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান উত্তম দাসের পুজো কমিটিই তাঁর দখলে আছে। বাকি তৃণমূল নেতা তথা প্রাক্তন কাউন্সিলার জয়দীপ দাস, প্রাক্তন কাউন্সিলার জিতব্রত পালিত, প্রাক্তন কাউন্সিলার সত্যজিৎ আচার্য প্রমুখের হাত থেকে পুজো কমিটির দখল বিজেপির হাতে চলে গিয়েছে। তবে পুজোর আয়োজনে কোনো খামতি নেই। পুজোর প্রস্তুতি জোর কদমে চলছে থিম ও সাবেকিয়ানার মেলবন্ধনে।
চিড়িয়া মোড়ে হিন্দি স্কুলের মাঠে যুবশক্তির মানস প্রায় ৭০ ফুট উচ্চতার একটি কাল্পনিক মন্দির তৈরি করছে। উত্তর শহরতলিকে টেক্কা দিতে দক্ষিণ ভারতের একটি মন্দিরের অনুকরণে মণ্ডপ তৈরির কাজ চলছে। এই পুজোর অন্যতম কর্মকর্তা সঞ্জয় যাদব বলেন, প্রতিমা হবে সাবেকি। পরিবেশবান্ধব রং দিয়ে প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। আমাদের পুজোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সব বয়সের মানুষ আড্ডা দিতে পারবেন। বাঙালিয়ানাকে তুলে ধরাই আমাদের পুজো কমিটির অন্যতম লক্ষ্য। এই পুজো উদ্বোধন করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
বারাকপুরে সবচেয়ে পুরানো বারোয়ারি পুজো হল শিবতলা বারোয়ারি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজন। এবার এই পুজোর ১১৩ বছর। কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রাক্তন কাউন্সিলার আইনজীবী সত্যজিৎ আচার্য। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এবার নেই। এবার সেখানে কেরলের পদ্মনাভ মন্দিরের অনুকরণে মণ্ডপ তৈরি হচ্ছে। হাতবদল হয়ে গিয়েছে জিতব্রত পালিতের ক্লাব বলে পরিচিত মণ্ডলপাড়া ইয়ুথ ক্লাব পুজো কমিটির। একই রকমভাবেই বদল হয়ে গিয়েছে সুকান্ত সরণি পূর্ব তালবাগানের পুজো কমিটি। গতবছর পর্যন্ত এই পুজো কমিটির কর্তা ছিলেন প্রাক্তন কাউন্সিলার জয়দীপ দাস।
সবেধন নীলমণির মতো পুরানোদের মধ্যে একটিমাত্র পুজো কমিটি দখলে রয়েছে। সেটি প্রাক্তন চেয়ারম্যান উত্তম দাসের পুজো বলে পরিচিত মধ্য নোনা সর্বজনীন পুজো কমিটি। তাদের এবারের পুজো ৫২ বছরে পড়ল। সেখানে পুরানো দিনের একটি রাজবাড়ি তৈরি হচ্ছে। প্রতিমা হচ্ছে সাবেকি। উত্তম দাস বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এলাকার মানুষকে নিয়ে পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছি। রয়েছি এবারও।
তবে বারাকপুরের বিধায়ক কৌস্তভ বাগচির স্পষ্ট কথা, পুজো নিয়ে ‘আমরা ওরা’ রাজনীতি করি না। কেউ কেউ নিজের থেকে সরে গিয়েছেন। আসছেন না কেউ কেউ। আমি চাই, পাড়ার সবাই মিলে পুজো করুন। আমার নিজের কোনো পুজো নেই। আমি বারাকপুরের সব পুজোতেই আছি।