


সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: ২০০৯ সাল। লোকসভা নির্বাচনের আগের কথা। ততদিনে বাংলা প্রতিবাদে উত্তাল। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্বে বঙ্গবাসীর ক্ষোভের সুনামি মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ছে গ্রাম থেকে শহরের রাজপথে। প্রতিবাদের ঢেউয়ে রীতিমতো নাজেহাল দশা বামফ্রন্টের। সেই সময়ে বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের কোনো এক প্রচারসভার পাশ দিয়ে যেতে যেতে কানে এসেছিল স্লোগানটি—‘চুপচাপ, ফুলে ছাপ।’ দল গঠনের তিন বছর পর, ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল স্লোগানটি প্রথমবার ব্যবহার করলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য মেলেনি। কিন্তু এই স্লোগান সামনে রেখেই আট বছর পর লোকসভা ভোটে সাফল্য পেয়েছিল জোড়াফুল শিবির। তার পরের বছর রাজ্যজুড়ে পুরভোট, আরও এক বছর পর ২০১১ সালে বিধানসভায় জয়ের ক্ষেত্রেও বড়ো ভূমিকা ছিল এই স্লোগানটির। হবে নাই বা কেন! পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি ইতিহাস চিরকালই উচ্চকিত। জনসভার ভাষণ, মিছিলের স্লোগান বা দেওয়াল লিখন—সর্বত্র একটা অদৃশ্য রণহুংকার শুনে-দেখে অভ্যস্ত বঙ্গবাসীকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এই স্লোগানটি। যেন চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়েছিল, সবক্ষেত্রে শাসকের চোখে চোখ রেখে প্রতিবাদ করার বিপদ অনেক। অযথা সেসবের দরকার নেই। তার চেয়ে অনেক ভালো চুপ থাকা। সব হিসাব হবে ভোটবাক্সে। কড়ায় গণ্ডায়।
২০১১ সালে সেটাই হয়েছিল। পরিবর্তনের সবুজ ঝড়ে বিদায় নেয় বামেরা। তৈরি হয় মমতার সরকার। তার পরে আর সেভাবে শোনা যায়নি স্লোগানটি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে দল বদল করে বিজেপিতে যাওয়া রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় কয়েকটি প্রচারে অবশ্য পুরানো দলের স্লোগানটি ব্যবহার করেছিলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানিরও তা বেশ পছন্দ হয়েছিল। তাঁর মুখেও ‘চুপচাপ চুপচাপ, পদ্মে ছাপ পদ্মে ছাপ’ শোনা গিয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত পদ্মে প্রত্যাশামতো ছাপ পড়েনি। তারপর গঙ্গা দিয়ে বহু জল বয়ে গিয়েছে। শেষ পর্যন্ত ৪ মে রং বদলে গেল বাংলার। গেরুয়া ঝড়ে পতন হল মমতা সরকারের। বাংলা হল ডবল ইঞ্জিন।
এই ভোটের ফলাফল দেখে মনে পড়ছিল ২০১১ সালের কথা। সে বছরের মতো এবারেও মানুষজন কী অস্বাভাবিক চুপ থেকে সরকার পালটে দিল। সেই সঙ্গে বদলে গেল বাংলার রাজনৈতিক ব্যাকরণও। কারণ, তৃণমূল কংগ্রেসের ৮০টি আসনে নেমে আসা বা বিজেপির ২০৭ আসন জিতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গড়ার পূর্বাভাস এবারের প্রাক নির্বাচনি পর্বে সেভাবে শোনা যায়নি। কারণ, ২০১১ সালের মতো এবারেও কার্যত মুখ বুজে মনের ভাব মনেই গোপন রেখেছিলেন পরিবর্তন প্রত্যাশীরা।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, ২০১১ আর ২০২৬ সালের পরিস্থিতি কি এক ছিল? এক কথার উত্তর, না। কিন্তু ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা ও সমাজের সবস্তরে দুর্নীতির ঘুণপোকা যেভাবে বাসা বেধেছিল, সেটাকে অস্বীকার করার জায়গাও ছিল না। চোরাস্রোতের মতো বইছিল পরিবর্তনের আশা। কিন্তু রাজ্যজুড়ে পরিবর্তনের এই শক্ত মাটি তৈরি হল কীভাবে? আসল চমক লুকিয়ে সেখানেই। একথা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে, অঙ্গ ও কলিঙ্গের সঙ্গে বঙ্গ বিজয় করতে এবারে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মেগা র্যালিগুলি আসলে ছিল বুস্টার ডোজ। কারণ তার বহু আগে থেকেই নিঃশব্দে ভিত তৈরির কাজটি সেরে রেখেছিল আরএসএস, হিন্দু সংহতি মঞ্চের মতো সংগঠনগুলি। সংঘের পরামর্শ মেনে ভোটের বহু আগেই ময়দানে নামানো হয়েছিল বিজেপির নীচুতলার কর্মীদের একাংশকে। তাঁদের মাধ্যমে গত কয়েক বছর ধরে রাজ্যের সর্বত্র চলেছে ‘হুইস্পারিং ক্যাম্পেইন’। সেই প্রচার এতটাই চুপচাপ হয়েছে যে জেলায় জেলায় বসেও তার কোনো আঁচ পায়নি তৃণমূল বা আইপ্যাকের সদস্যরা।
আসলে ক্ষমতায় দীর্ঘদিন থাকতে থাকতে ছোটোখাটো অনেক বিষয় পাত্তা না দেওয়াই শাসকের দস্তুর। বিজেপির কাছে এটাই ছিল তৃণমূলের ‘অ্যাকিলিস হিল’। আর শাসককে মাটি ধরিয়ে দিতে পদ্মশিবির জোর দেয় এই ‘মাইক্রো লেভেল হুইস্পারিং ক্যাম্পেইনে’ই। নিজেদের কথা বলার জন্য তারা বেছে নিয়েছিল এমন মানুষদের, যাঁদের সঙ্গে আম জনতার নিবিড় যোগ রয়েছে। যেমন ধরুন, অটোচালক ‘দাদা’রা। গত এক বছর ধরে বিভিন্ন রুটে বিজেপি ঘনিষ্ঠ কয়েক হাজার অটোচালক যাত্রীদের সঙ্গে কথোপকথনের মাঝেই অত্যন্ত ক্যাজুয়ালি জুড়ে দিয়েছেন তৃণমূলের নীচুতলার ছোটো ছোটো দুর্নীতি, সিন্ডিকেটরাজ বা ‘কাটমানি’র প্রসঙ্গ। তালিকায় রয়েছে পাড়ার বিউটি পার্লার, মুদি দোকান ও চায়ের ঠেকগুলি। মফস্সল বা কলোনি এলাকার ছোটো ছোটো বিউটি পার্লারের ‘দিদি’, পাড়ার মুদি দোকানি বা চায়ের ঠেকের আড্ডাবাজরাই হয়ে উঠেছিলেন পদ্মশিবিরের প্রধান প্রচারক। রূপচর্চায় ব্যস্ত নারীদের আড্ডায় অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ঢুকে পড়েছে সন্দেশখালি বা আর জি কর কাণ্ডের মতো নারীদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত জ্বলন্ত ইস্যুগুলি। সেখানে কোথাও ভোট চাওয়ার তাগিদ ছিল না। লক্ষ্য ছিল একটাই—ক্ষোভের আগুন উসকে দেওয়া।
২০২১ সালের তুলনায় এবারে বিজেপির প্রচারকৌশল ছিল অনেক বেশি ঘরোয়া। আনুষ্ঠানিক জনসভার চেয়ে জোর দেওয়া হয়েছিল ‘মণ্ডল কমিটি’ এবং ‘বুথ স্তরের’ গৃহ-সম্পর্ক অভিযানের উপর। প্রতি সন্ধ্যায় ছোটো ছোটো দল করে কর্মীরা সাধারণ ভোটারের বাড়িতে গিয়ে হাজির হতেন। কোনো রাজনীতির কথা নয়, চা-মুড়ি খেতে খেতে চলত আড্ডা। এই নিরন্তর ও দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক জনসংযোগ ভোটারদের মনে এক ধরনের ভরসা তৈরি করেছিল, যা ২০২১ সালে প্রচারের মেগা মঞ্চ থেকে করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি, প্রচারের আলোয় সেভাবে না এসেও বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনশল, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব, বিপ্লব দেবরা বাংলার প্রায় ৪৪,০০০ বুথকে চিহ্নিত করে এক নিশ্ছিদ্র সাংগঠনিক জাল বুনেছিলেন। আর সেই সমস্ত বুথে নিয়োগ করা হয়েছিল ‘পান্না প্রমুখ’ (ভোটার তালিকার একটি পাতার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী)। তাঁদের উপরে দেওয়া হয়েছিল ৩০-৬০ জন ভোটারের দায়িত্ব।
গত বিধানসভা ভোটের থেকে এবারের নির্বাচনকে আরও আলাদা করেছে একটাই বিষয়— এসআইআর। এই পর্বে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়ে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এই ‘বাদ’ পড়া ভোটারের ধাক্কা সরাসরি পড়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাংকে। ২০২১-এর ৩৮% থেকে বেড়ে এবারে বিজেপির ভোট শেয়ার হয়েছে ৪৬%। অন্যদিকে, তৃণমূলের ভোট শেয়ার ৪৮% থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৪০%। এই ৮ শতাংশের ঐতিহাসিক ‘সুইং’ সম্ভব হয়েছে কারণ বহু আসনে বিজেপির জয়ের মার্জিনের চেয়ে ওই অঞ্চলে ডিলিট হওয়া ভোটারের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। আর তা যে হবে, সেই হিসাবের আভাস বিজেপি নেতৃত্বের কাছেও ছিল। সেই কারণেই তাঁরা বুক বাজিয়ে বলতে পেরেছিলেন, ‘মাইনাস যত হবে, প্লাসের দরকার তত কম হবে।’ অর্থাৎ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার প্রক্রিয়াই বঙ্গজয়ের পথকে মসৃণ করে তুলবে।
এসআইআরের পাশাপাশি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মেরুকরণের রাজনীতি। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করেছে যে বাংলার ভোটার তালিকায় ‘এক কোটি বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারী’ রয়েছে। এসআইআরের ফলে তৈরি হওয়া আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে হিন্দু ভোটের এক নজিরবিহীন মেরুকরণ ঘটেছে। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এসআইআর বিরোধিতা শুধুমাত্র সংখ্যালঘু ভোট সুরক্ষিত করার জন্য বলেও প্রচার চলে। যে সমস্ত এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটব্যাংক বড়ো ফ্যাক্টর, সেখানে দাবি ওঠে, ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতা ত্যাগ করে হিন্দুদেরও এককাট্টা হয়ে ভোট দেওয়া শিখতে হবে। এই পর্বে বিজেপি পাশে পায় একাধিক হিন্দুত্ববাদী সংগঠনকে। যারা নিজেরা একবারের জন্যও কাউকে বিজেপিকে ভোট দিতে বলেনি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে এলাকায় এলাকায় হিন্দুত্বের জিগির তুলেছিল। ঘুরিয়ে ভোটবাক্সে সেই সুফলই পেয়েছে বিজেপি।
গত নির্বাচনে তৃণমূলের সবথেকে বড়ো অস্ত্র ছিল বিজেপিকে ‘বহিরাগত’ বা ‘হিন্দি বলয়ের পার্টি’ হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া। কারণ সেই প্রচারে কৈলাস বিজয়বর্গীয়দের মতো বহিরাগত নেতাদের সামনে রেখেছিল বিজেপি। কিন্তু এবারে শুভেন্দু অধিকারী বা শমীক ভট্টাচার্যদের মুখ হিসাবে তুলে ধরে সেই ভাবমূর্তি পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলে বিজেপি। উলটে তৃণমূল রাজ্যসভায় অবাঙালি মুখদের পাঠানোয় ‘বহিরাগত’ তাস ব্যবহার করে তৃণমূলকেই কোণঠাসা করে দেয় তারা। তৃণমূলের বাঙালি আবেগের জবাবে বিজেপির প্রার্থীরা মাছ নিয়ে প্রচারে নামেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ঝালমুড়ি খাওয়ার ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে বোঝাতে হয়, বিজেপি বাংলার সংস্কৃতির পরিপন্থী নয়। এই ধরনের অপটিক্সের সুফলও মিলেছে ভোটে।
নির্বাচনে জয়ের অন্যতম বড়ো চাবিকাঠি হল ‘উইনেবিলিটি’। অর্থাৎ জেতার সম্ভাবনা তৈরি করা। ভোটাররা কখনো এমন দলকে ভোট দিতে চান না, যাদের জেতার ক্ষমতা নেই। বিজেপি কেন্দ্রে থাকার সুবাদে শাসকের ক্ষমতা ব্যবহার করে ভোটারদের মনে এই বিশ্বাস তৈরি করতে পেরেছিল যে, এবারের ভোটে তাদের জয় অনিবার্য। তৃণমূলের নির্বাচনি রণকৌশল ও প্রচার পরিচালনাকারী সংস্থা আইপ্যাকে ইডি রেইড থেকে সেই ঘটনার সূত্রপাত। প্রথম দফার ভোটের ঠিক ২০ দিন আগে আইপ্যাকের কাজ বন্ধের ই-মেল সেই ধারণাকে আরও মজবুত করে। আবার তৃণমূল বিরোধিতার জায়গা থেকেই রাজ্যে বামেদের এক বড়ো অংশের ভোট এবার সরাসরি পদ্ম শিবিরের ঝুলিতে গিয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করলেও শেষ পর্যন্ত তৃণমূলকে হারাতে পারে একমাত্র বিজেপি, এই ধারণা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল।
অবশ্য হওয়ার কারণও ছিল। মডেল কোড অব কনডাক্ট চালু হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন এক ধাক্কায় পশ্চিমবঙ্গের ৪৮৩ জন সরকারি আধিকারিককে বদলি করে। যেখানে অন্যান্য রাজ্যে এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ২৩। এই একটি পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা পৌঁছে যায় যে, প্রশাসনের উপর তৃণমূলের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবারে ভেঙে গিয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হয় নজিরবিহীন দু’দফার ভোট ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন। যার ফলে তৃণমূলের স্থানীয় ভোট ম্যানেজাররা কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। ভোটকেন্দ্রে যেতে ভোটারদেরও কোনো বাধা পেতে হয়নি। ফল? রাজ্যে রেকর্ড ৯৩% পোলিং হয়েছে।
২০২৬ সালের ৪ মে’র ফলাফল শুধু বিজেপির উত্থান নয়, এটা আসলে বহুস্তরীয় এক জটিল রাজনৈতিক বিবর্তনের গল্প। বাংলার এই নতুন সরকার গঠনের নেপথ্যে নেতা-মন্ত্রীদের চোখধাঁধানো প্রচারের থেকেও অনেক বেশি অবদান রইল
রুটের সেই মুখচেনা অটোচালক ‘দাদা’ বা বিউটি পার্লারের ‘দিদি’দের। যাঁদের ছোটো ছোটো দুঃখ-কথার সিঁড়ি বেয়ে চুপচাপ ভোট পড়ল ইভিএমে। আর পালটে গেল ফুল। সঙ্গে বদলে গেল বাংলার ইতিহাসের গতিপথও।