


সমৃদ্ধ দত্ত: উত্তরপূর্ব ভারত, পূর্ব ভারত, পশ্চিম ভারত, মধ্যভারত, উত্তর ভারত। সর্বত্র বিজেপি সরকার। দেশের মোট ২১ টি রাজ্যে বিজেপি অথবা এনডিএ জোটের সরকার চলছে। কিন্তু লক্ষণীয়ভাবে এককভাবে জনপ্রিয়, জোরালো উপস্থিতি, আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী এবং দেশের মধ্যে দ্রুত পরিচিত হয়ে যাওয়া বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর সংখ্যা তুলনায় কম। সেই তালিকায় তিনজনের নামই সবথেকে প্রথম সারিতে উঠে এসেছে, যাঁরা জোট সরকার চালাচ্ছেন না। প্রত্যেকেই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী তাঁরা। অর্থাৎ অন্য কোনো দলের উপর তাঁদের সরকার অথবা মুখ্যমন্ত্রিত্ব নির্ভর করছে না। আবার একইসঙ্গে তাঁরা তিনজনই নিজেদের রাজ্যে জনপ্রিয় এবং দলের উপর অথরিটি অথবা নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। সর্বোপরি এই তিনজনই হিন্দুত্বকে তাঁদের শক্তির অন্যতম চালিকাশক্তি করেছেন। এই তিনজন হলেন, যোগী আদিত্যনাথ, হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং শুভেন্দু অধিকারী।
বস্তুত নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহের পর দ্রুত বিজেপির আগামী প্রজন্মের শক্তিশালী উপস্থিতি-সংবলিত নেতা হিসাবে এই তিনজনের উত্থান চমকপ্রদ। সুতরাং বিজেপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্রে এই তিনজনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি অত্যন্ত তৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে। এই তিনজনের মধ্যে একঝাঁক সাদৃশ্য বর্তমান। তাঁরা স্পষ্ট জানেন যে, বিজেপি তথা সংঘ পরিবারের সমর্থক ও ভোটাররা ঠিক কী ধরনের ভাষা, ন্যারেটিভ, আক্রমণ, সিদ্ধান্ত, পদক্ষেপ পছন্দ করে। অর্থাৎ তাঁদের দলের যারা ক্যাপটিভ অডিয়েন্স, তাদের খুশি করা, তুষ্ট করা, আনন্দিত করার মতো বয়ান দেওয়া এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা ও কৌশল তাঁদের আয়ত্তাধীন।
বিজেপি সমর্থক ও ভোটারকুল কী চায়? তারা চায় তাদের সর্ববৃহৎ নেতা, সেনাপতি, মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীরা হবেন এককভাবে ক্যারিশমাসম্পন্ন, আগ্রাসীভাবে হিন্দুত্বের প্রচারক, কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশাসনিকভাবে নিজেদের অকুতোভয় ও কড়া প্রশাসক হিসেবে প্রতিভাত করতে সক্ষম। প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে যেন বিবেচনা করা হয়। আর শত্রুর শেষ রাখতে নেই। তাই যাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে ভাবা হবে, তাদের খাদের কিনারায় নিয়ে যাওয়ার জন্য যা করা দরকার তাই করতে এই নেতারা পিছুপা হবেন না। এই তিন নেতা কিন্তু সেটাই করে থাকেন। তাঁরা জানেন যে, তাঁরা শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং নিজেদের রাজ্যে ও দলে একটি ব্যক্তিগত সমর্থককুল ও জনভিত্তি তৈরি করে ফেলেছেন। সেই জনভিত্তির মন জয় করার উপায়ও তাঁদের জানা। বিরুদ্ধকণ্ঠকে দুর্বল করার কৌশলও তাঁরা আইনিভাবেই প্রবলভাবে প্রয়োগ করে থাকেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এই তালিকায় কেন দেবেন্দ্র ফড়নবিশ নেই? তিনিও তো সংঘ পরিবারের যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নাম। তার কারণ, তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ ও অনুগত হলেও আজকের তারিখ পর্যন্ত তাঁকে জোট সরকার চালাতে হচ্ছে। অর্থাৎ ইচ্ছা অথবা অনিচ্ছায় তাঁর সরকার সংখ্যাগতভাবে প্রয়াত অজিত পাওয়ার গোষ্ঠীর এনসিপি এবং একনাথ গোষ্ঠীর শিবসেনার সমর্থনের উপর নির্ভরশীল। এককভাবে বিজেপির গরিষ্ঠতা নেই। ঠিক একই কথা প্রযোজ্য বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর ক্ষেত্রেও। তাঁকেও নীতীশকুমারের দলের সমর্থনেই সরকার চালাতে হচ্ছে। এই দুজনই প্রতিশ্রুতিমান বিজেপি নেতা। কিন্তু তাঁদের হাত কিছুটা জোটধর্ম রক্ষায় বাঁধা। তাই সার্বিক শক্তি প্রদর্শন করতে পারছেন না। বাকি তিনজন কিন্তু একক গরিষ্ঠ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী।
নতুন বিজেপি কতটা বদলে গিয়েছে? প্রধান পরিবর্তন হল, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের প্রত্যক্ষ সদস্য না হলেও নব্য বিজেপিতে রাজ্যে রাজ্যে সরকারের সর্বোচ্চ পদে আরোহণ করা যাচ্ছে। দলের কর্ণধার হওয়া সম্ভব হচ্ছে। এমনকি জীবনের বড়ো অংশই রাজনৈতিকভাবে বিজেপির বিরুদ্ধাচারণ করার পরও যাঁরা রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে ফেলে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের সাংগঠনিক যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে সংঘ অনুগামী বিজেপি নেতাদের টপকে সর্বোচ্চ আসনে ক্ষমতাসীন হতে পেরেছেন।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা ২০১৫ সাল পর্যন্ত ছিলেন অসমে কংগ্রেসের নেতা। তিনি বিজেপিতে যোগ দিয়ে ক্রমেই বিজেপির বাকি নেতাদের অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছেন জনপ্রিয়তায়। তাই তিনি দফায় দফায় মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন। শুভেন্দু অধিকারীও তাই। তিনি কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর তৃণমূল কংগ্রেসের প্রথম সারির জোরালো নেতা ছিলেন। বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি যোগ্যতাবলে এবং সাংগঠনিক ক্ষমতার সুবাদে বাকি সংঘ ঘনিষ্ঠ বিজেপি নেতাদের পিছনে ফেলে উঠে এসেছেন সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পদে। সম্রাট চৌধুরী ২০১৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দলে। এরপর বিজেপিতে যোগ দেন। ৯ বছরের মধ্যে তিনিই বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি জোট সরকারের। যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গে সরাসরি সংঘের যোগসূত্র যে খুব গভীর এমন নয়। তিনি গোরখনাথ ধামের কর্ণধার ছিলেন। গোরখনাথ মন্দিরের মঠাধীশ। একক জনপ্রিয়তায় তিনি গোরখপুর থেকে ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এমপি হয়েছেন।
পক্ষান্তরে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, ওড়িশার মতো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের একক ক্যারিশমা, জনপ্রিয়তা অনেকটাই কম। সেখানে বিজেপি দল হিসেবে জয়ী হয়েছে। এই মুখ্যমন্ত্রীদের ভাগ্যে হঠাৎ করেই সর্বোচ্চ পদ এসেছে। তাঁরা নিজেরা দীর্ঘদিন লড়াই করে যোগ্যতামান পেরিয়েছেন এই পদে বসার জন্য এমন নয়। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহেরা তাঁদের মনোনীত করেছেন। যদিও তাঁরা সংঘ অনুগামী ছিলেন।
বিজেপি ও সংঘ পরিবারের মুন্সিয়ানা হল, তারা সর্বদাই ভবিষ্যতের জন্য নেতা নির্মাণের একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া চালিয়ে যান। বিজেপির সিংহভাগ রাজ্যে একজন করে যুব মুখ্যমন্ত্রী রয়েছেন। তাঁদের হাতে কমবেশি ২০ থেকে ২৫ বছর সময় আছে রাজনীতির ময়দানে প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত থাকার ক্ষেত্রে। এই প্রত্যেককে নিজেদের রাজ্যকে সাজিয়ে তোলার জন্য কেন্দ্রে মোদি সরকারও আর্থিক ও পরিকাঠামোগতভাবে সামগ্রিক সাহায্য করে থাকে। তাই তাঁদের কাজটাও সহজ।
সমস্যা হল, ভারতের গণতন্ত্র মসৃণভাবে একমুখী নয়। যা অবশ্যম্ভাবী হিসেবে বিবেচিত হয়, আচমকা দেখা যায় নির্বাচনে সেটি হল না। সম্পূর্ণ বিপরীত ফল হয়ে গেল। এই প্রবণতাকে লক্ষ্য করে বলা যায়, আগামী বছর ২০২৭ সালে উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে আবার জয়লাভ করা যোগী আদিত্যনাথের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে তাঁর নেতৃত্বে ফলাফল ভালো হয়নি বিজেপির। সুতরাং সেটার পুনরাবৃত্তি হলে তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ক্ষেত্রে বিপদ। অর্থাৎ উত্তরপ্রদেশে পরাজিত হলে তিনি আর ভবিষ্যতের শক্তিশালী বিজেপি নেতা হিসেবে তালিকাভুক্ত হবেন না। কারণ নরেন্দ্র মোদি কখনো গুজরাতে কোনো নির্বাচনেই পিছিয়ে পড়েননি বা পরাজিত হননি।
আবার এই তিন মুখ্যমন্ত্রী অথবা বাকি সব বিজেপি মুখ্যমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ২০২৯ সালের লোকসভা ভোটের উপর। কোনো কারণে ওই নির্বাচনে বিজেপি কিংবা এনডিএ যদি সরকার গঠন করতে না পারে, তাহলে কিন্তু কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভিন্নমুখী হয়ে যাবে। এই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির শক্তিশালী মুখ্যমন্ত্রীরা চরম সংকটে পড়বেন রাজ্য চালাতে। কারণ তখন বিজেপি বিরোধী কোনো শক্তি কেন্দ্রে এলে এইসব রাজ্যকে সমানভাবে কোণঠাসা করা হবে। তখন আবার এই মুখ্যমন্ত্রীদের সরকার বাঁচানো, দল রক্ষা করা প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে।
যদিও সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। কারণ বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব যেভাবে সামগ্রিকভাবে ভোট ম্যানেজমেন্ট সফলভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে, তাদের ভোটে পরাজিত করা অত্যন্ত দুরূহ। বিশেষভাবে বিজেপি বিরোধীদের শক্তি ক্রমহ্রাসমান। উত্তরপ্রদেশে পুনরায় ২০২৭ সালে অখিলেশ যাদবের পরাজয় হলে, তাঁর আবার ফিরে আসা কঠিন। যোগী আদিত্যনাথ আরও শক্তিশালী হয়ে যাবেন।
সুতরাং প্রমাণিত হবে সংঘের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও প্রশিক্ষণ ছাড়াই দেশের মধ্যে বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন যাঁরা, তাঁরাই সবথেকে জোরালো, আগ্রাসী, রাজ্য ছাড়িয়ে দেশের অন্যত্রও জনপ্রিয়তা পাওয়া শাসক হয়েছেন। হিমন্ত বিশ্বশর্মা, যোগী আদিত্যনাথ এবং শুভেন্দু অধিকারীরা একটি ফরমুলা অনুসরণ করছেন এবং করবেন। সেটি হল, নরেন্দ্র মোদিকে তাঁরা রোলমডেল করেছেন। একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে সেই রাজ্যকে আর্থিক ও শিল্পবাণিজ্য, পরিকাঠামো, প্রশাসনিকভাবে উন্নত, উজ্জ্বল করে প্রতিভাত করার একটি পরিকল্পনা গ্রহণ। তাহলে প্রমাণিত ও প্রচারিত হবে যে, তাঁরা একদিকে যেমন জনপ্রিয় নেতা, অন্যদিকে সুশাসক। ঠিক যেটি মোদি অর্জন করেছিলেন।
এই তিন মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই রয়েছে উচ্চাশা। সেটি মোটেই অপ্রত্যাশিত নয়। অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ পরবর্তী যুগে কোনো একদিন দেশের সর্বোচ্চ আসনে বসার স্বপ্ন। যদিও অনেক পথ বাকি তাঁদের। সাফল্য ধরে রাখতে হবে। সংঘের সাহায্য ছাড়া সম্ভব নয়। প্রশান্ত কিশোর একাধিকবার একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তিনি বলেছেন, আগামী দিনে বিজেপির যিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন, তিনি হবেন আরও কট্টরপন্থী কোনো হিন্দুত্ব রাজনীতির জনপ্রিয় নেতা। সেই ভবিষ্যদ্বাণী কতটা মিলে যায় সেই উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভেই নিহিত!