


মৃণালকান্তি দাস: ঝংনানহাই একসময় ছিল রাজকীয় বাগান। চীনের সম্রাটরা অবসর সময় কাটাতে আসতেন বেজিংয়ের এই ফরবিডেন সিটির বাগানে। ১৯১২ সালে চীনের রাজকীয় যুগের অবসানের পর ঝংনানহাইকে প্রেসিডেন্টের বাসভবন হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। কয়েক দশক পর চীনের গৃহযুদ্ধে কমিউনিস্টদের বিজয়ের পর চেয়ারম্যান মাও সেতুং ঝংনানহাইকে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত করেন।
যদিও শুরুতে মাও তাঁর কার্যালয়ের জন্য ফরবিডেন সিটিকে বেছে নেননি। কারণ, তিনি নতুন চীনকে সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন। তা ছাড়া, সম্রাটের প্রাসাদে কাজ করা ও বসবাস করাটা কমিউনিস্ট পার্টির ‘জনগণের সেবা করার’ আদর্শের সঙ্গেও বেমানান। পরবর্তীতে বদলে গিয়েছে চীনের কাঠামো। ঝংনানহাইয়েরও ব্যাপক সংস্কার হয়েছে। বর্তমানে দেড় হাজার একরের এই বিশাল এলাকায় পুরানো প্যাভিলিয়ন ও মন্দিরগুলিকে নতুন করে সাজানো হয়েছে, যা এখন দলের অভিজাত শ্রেণির সমার্থক হয়ে উঠেছে। চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির অত্যন্ত গোপন ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এক এলাকা। ডিজিটাল ম্যাপিং প্ল্যাটফর্মগুলিতেও এই এলাকার ছবি কঠোরভাবে সেন্সর করা বা ঝাপসা করে রাখা হয়। এবারের চীন সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর শেষ সকালটি কাটিয়েছেন সেই ‘ঝংনানহাই’-এ।
চীনের ক্ষমতার এই মূল কেন্দ্রটিকে অনেক সময় হোয়াইট হাউস বা ক্রেমলিনের সঙ্গে তুলনা করা হয়। রাজধানী বেজিংয়ের বাকি অংশ থেকে এই এলাকাটিকে আলাদা করে রেখেছে শতাব্দীপ্রাচীন লালচে-গেরুয়া রঙের দেওয়াল। এই দেওয়াল পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন এমন মার্কিন নেতার
সংখ্যা হাতে গোনা। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ১৯৭২ সালে তাঁর যুগান্তকারী চীন সফরের সময় এই ঝংনানহাইয়ে মাও সেতুংয়ের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সেটিই ছিল প্রথম চীন সফর। এর ৩০ বছর পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিনের সঙ্গে ঝংনানহাইয়ে প্রবেশ করেছিলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঝংনানহাইয়ে এসেছিলেন বারাক ওবামাও। ২০১৪ সালে তিনি সেখানে জি জিনপিংয়ের সঙ্গে দেখা করেন। তারপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই সফর। ঝংনানহাইয়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে একপর্যায়ে ট্রাম্প জিনপিংকে বলেন, ‘দারুণ জায়গা। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আমিও এই রকম জায়গায় অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারতাম।’
এবারের সফরে ট্রাম্প ও জিনপিং প্রায় নয় ঘণ্টা একসঙ্গে কাটিয়েছেন। দুই রাষ্ট্রপ্রধানকে দেখে মনে হয়েছে, বছর কয়েক ধরে নানা ইস্যুতে উত্থান-পতনের পর দু’দেশের মধ্যে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা এসেছে। সত্যিই কি তাই? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের চোখে-মুখে এখন কঠিন এক বছরের ধকল স্পষ্ট। নিজের দেশের অভ্যন্তের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার কোনো সহজ পথ তাঁর সামনে খোলা নেই। এই যুদ্ধ মার্কিন সামরিক বাহিনীকে এক কঠিন জালে জড়িয়ে ফেলেছে। যার ফলে একদিকে যেমন জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী, অন্যদিকে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার সূচকও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। সম্প্রতি বেজিং সফরে সেই ধকলের ছাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ট্রাম্প বেজিংয়ে গিয়েছিলেন বড়ো বড়ো বাণিজ্য চুক্তি করার আশা নিয়ে। কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বিনিয়োগ নয়, বরং তাইওয়ানের ভাগ্য নির্ধারণই বেজিংয়ের প্রধান অগ্রাধিকার। ট্রাম্পের পছন্দের বাণিজ্যিক বিষয়গুলি থেকে আলোচনার আলো কেড়ে নিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এই বিতর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে মতবিরোধের সঠিক সমাধান না হলে আমেরিকার সঙ্গে ‘মুখোমুখি সংঘাত ও যুদ্ধ’ অবশ্যম্ভাবী।
আগামী সেপ্টেম্বরে জিনপিংয়ের হোয়াইট হাউস সফরের প্রতিশ্রুতি এবং হতাশাজনক কিছু বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পকে বেজিং ছাড়তে হয়েছে। এই হতাশার পরিমাপ করা যায় একটি পরিসংখ্যানে— ট্রাম্প বেজিংয়ে পৌঁছানো থেকে শুরু করে তাঁর প্রস্থান পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম ৮ শতাংশ পড়ে গিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট অবশ্য এই সফরে আমেরিকার শীর্ষ ব্যবসায়ী কর্তাদের সঙ্গে চীনা নেতার সাক্ষাতের সুযোগ তৈরি হওয়াকে নিজের বড়ো সাফল্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে এই বৈঠক থেকে সুনির্দিষ্ট কী কী লেনদেন বা চুক্তি হয়েছে, তার কোনো জোরালো প্রমাণ তিনি দিতে পারেননি। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেছেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী— যাঁদের অধিকাংশই আগে কখনো প্রেসিডেন্ট জি-র সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাননি, এবারই প্রথম তাঁদের দেখা হল। তাই তাঁরা বিষয়টিকে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর মনে করেছেন।’
ঠিক এক বছর আগেও অবস্থা ছিল ভিন্ন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এক উপসাগরীয় রাজতন্ত্র থেকে অন্য রাজতন্ত্রে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন এবং ঘোষণা করছিলেন, এক নতুন যুগের সূচনা হতে চলেছে। ওয়াশিংটনে বসে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যার মধ্যে চীনের উপর আরোপিত শুল্ক এক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ১৪৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছিল। ট্রাম্প দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, তাঁর অঙ্গুলিহেলনে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ দ্রুত ইতি টানবে। একইসময়ে তিনি ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে কূটনৈতিক আলোচনায় বসার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু সেই সব প্রচেষ্টার বেশিরভাগই এখন ভেস্তে গিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এখনও পুরোদমে চলছে। তাঁর আরোপিত অনেক শুল্ক মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে দিয়েছে। আর ইরানের সঙ্গে কূটনীতির পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে এখন যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। জনপ্রিয়তার ধস এবং দেশের নড়বড়ে অর্থনীতির কারণে এক বছর আগের তুলনায় নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ সমর্থন তাঁর পক্ষে অনেক কম।
ইরানের ক্ষেত্রে, তেহরানের উপর বেজিংয়ের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে এবং পারমাণবিক ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাপ দিতে পারতেন। ট্রাম্প জানান, এবিষয়ে তিনি জিনপিংয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। তার কিছুক্ষণ পরেই এয়ার ফোর্স ওয়ানে চড়ে আমেরিকায় ফেরার পথে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি কোনো অনুগ্রহ বা সুবিধা চাইছি না, কারণ আপনি যখন কারও কাছে সুবিধা চাইবেন, তখন বিনিময়ে আপনাকেও সুবিধা দিতে হবে। আমাদের কোনো অনুগ্রহের প্রয়োজন নেই।’ এর পরিবর্তে তিনি দাবি করেন, এই যুদ্ধের আগে তেহরান কখনো যে প্রণালীটি বন্ধ করার সাহস দেখায়নি, সেই হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার জন্য আমেরিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর ট্রাম্প ছিলেন আক্রমণাত্মক ভূমিকায়। কিন্তু এই বছর মনে হচ্ছে চীন অনেক বেশি সক্রিয় এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে তারাই মূল নেতৃত্ব দিচ্ছে। ক্ষমতায় এক বছরেরও বেশি সময় কাটানোর পর ট্রাম্প বুঝতে পারছেন, চীনের ক্ষেত্রে সবসময় ‘লাঠি’ (জোর খাটানো) কাজ করে না।
ওয়াশিংটন পোস্ট লিখছে, জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য এমন একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন, যা ২০১৭ সালে চীনে তাঁর শেষ সফরের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তাঁরা ঝংনানহাই-এ রাজকীয় উদ্যানে একসঙ্গে হাঁটেন, যেখানের কিছু গাছের বয়স নাকি হাজার বছরেরও বেশি— যা মূলত চীনের প্রাচীন ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্নতার এক মৃদু ইঙ্গিত। বর্তমানে চীনের শীর্ষ নেতাদের সুরক্ষিত সদর দপ্তর ও বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত ঝংনানহাই পরিদর্শনের এই পুরো সফরটি ছিল ট্রাম্পের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি সুপরিকল্পিত আয়োজন। কারণ সেখানে বিদেশিদের প্রবেশাধিকার বড্ড বিরল। তবে এটা একইসঙ্গে চীনের এক ধরনের শক্তি প্রদর্শনও ছিল। যা মার্কিন অতিথিদের মনে করিয়ে দেয়, ট্রাম্পের ক্ষমতা ছাড়ার বহু বছর পরও জিনপিং ঠিক একইভাবে এখানকার গোলাপ বাগান পরিচর্যা করে যাবেন।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের চায়না সেন্টারের পরিচালক রায়ান হাস-এর কথায়, ‘ট্রাম্প এই সফর থেকে নিজের কোনো বড়ো সাফল্য দাবি করতে পারেন, বেজিং তাকে তেমন কোনো প্ল্যাটফর্ম দেওয়ার আগ্রহই দেখায়নি।’ চুক্তি বলতে, চীন আমেরিকার কাছ থেকে আরও সয়াবিন ও বোয়িং বিমান কিনবে— এমন একটি অস্পষ্ট সমঝোতা হয়েছে বেজিংয়ে। এছাড়া দেখানোর মতো বড়ো কোনো চুক্তি ট্রাম্পের হাতে নেই। ইরান যুদ্ধ, তাইওয়ান, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার, বাণিজ্য কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো ইস্যুগুলিতে প্রকাশ্যে কোনো বড়ো অগ্রগতি হয়নি। অথচ এই ইস্যুগুলোই বিশ্বের দুই মহাশক্তির মধ্যে উত্তেজনার মূল কারণ। এসব ইস্যু নিয়ে আলোচনার বদলে ট্রাম্পকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কূটনীতিতে মেতে উঠতে দেখা গিয়েছে। তিনি চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা বন্ধুত্ব গড়ার দিকেই বেশি জোর দিয়েছেন।
১৯৯০-এর দশকে মার্কিন বিদেশ দপ্তরের এশিয়া বিশেষজ্ঞ সুসান এল শির্ক জানান, জিনপিং যখন অনেক সংযত ভাষা ব্যবহার করছিলেন, ট্রাম্প তখন রীতিমতো তোষামোদে মেতেছিলেন। ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে জিনপিংয়ের ভূয়সী প্রশংসা করেন ট্রাম্প। বলেন, ‘হলিউড যদি কখনো জিনপিংয়ের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য কাউকে খুঁজতে যায়, তাহলে তাঁর মতো
কাউকে পাওয়া যাবে না। কারণ, জিনপিং লম্বা, খুবই লম্বা। বিশেষ করে এই দেশের জন্য। কারণ, এখানে মানুষ সাধারণত কম উচ্চতার হয়।’ এই সফরে আমেরিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন কী ছিল— এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেন, ‘আমি মনে করি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সম্পর্ক। সম্পর্কই সবকিছু।’
চীনা বিশ্লেষকরা বলছেন, দেখে মনে হচ্ছে, ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য— বিশ্বজুড়ে মার্কিন আধিপত্য বা ছায়াকে কিছুটা গুটিয়ে আনা। সিংহুয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি-র পরিচালক ডা ওয়েই-এর কথায়, ট্রাম্প সমগ্র বিশ্বের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কের ধরনটি মৌলিকভাবে বদলে দিতে চান। অতীতে, আমেরিকা ছিল একমেরু বিশ্বব্যবস্থার এমন এক মহাশক্তি, যা অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার দিক থেকে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করত। এখন তিনি এই সম্পর্ককে পুরোপুরি বদলে দিয়ে আমেরিকাকে একটি ‘সাম্রাজ্য’ থেকে অন্য সাধারণ দেশগুলির মতো একটি সাধারণ ‘জাতি-রাষ্ট্র’ (নেশন স্টেট)-এ রূপান্তর করতে চান। এবং এর জন্য মূল্য চোকাতেও ট্রাম্প প্রস্তুত।
প্রশ্ন হল, তাহলে কি বিশ্বজুড়ে আমেরিকার মাতব্বরির দিন ফুরিয়ে আসছে? এর উত্তর খুঁজছেন ঝংনানহাই—এর কর্তারাও!