


ভারত শুধু জনসংখ্যার বিচারে শীর্ষস্থানীয় দেশ নয়, এই দেশের সম্ভাবনার দিকটি প্রশ্নাতীত। এই দেশের নাগরিকদের প্রকৃত মানবসম্পদে রূপান্তরিত করা গেলেই সেই অপার সম্ভাবনার বাস্তবায়ন সম্ভব। তার জন্য প্রত্যেকের কাছে পৌঁছে দেওয়া দরকার সময়োপযোগী শিক্ষা। নিশ্চিত করতে হবে সবার জন্য সুস্বাস্থ্য। তবেই নাগরিকরা কাজকর্মের জন্য উপযুক্ত হয়ে উঠবেন। সেই যোগ্য মানুষগুলির জন্য হাতে হাতে কাজের ব্যবস্থা করতে হবে অতঃপর। বেকারত্ব ঘুচলেই তাঁরা সম্পদ সৃষ্টিতে অংশ গ্রহণ করবেন, নেতৃত্বও দেবেন কেউ কেউ। এই সুযোগ জাতি ধর্ম লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের জন্য অবাধ হলেই বৈষম্যহ্রাসের পরিবেশ তৈরি হবে। সেই ধারা অব্যাহত রাখা গেলেই একদিন বৈষম্য দূরও হতে পারে। এই স্বপ্নই তো দেখে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ। এই দুরূহ কাজ, বিশ্বায়নের যুগে, একটি দেশ নিজেকে পাণ্ডববর্জিত রেখে সম্ভব করতে পারে না। বন্ধুদেশগুলির সাহায্য সহযোগিতা নিয়েই তাকে এগোতে হবে।
এই সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপ্রদানে প্রতিবেশী দেশগুলিকে অগ্রাধিকার প্রদান বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের পশ্চিমের নিকটতম প্রতিবেশী পাকিস্তান তার জন্মলগ্ন থেকেই বৈরীভাব নিয়ে চলেছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বের নীতি বজায় রাখা সম্ভব হলেও পাকিস্তানকে আজও পাশে পাওয়া যায়নি। তাই ‘পুবে তাকাও’ নীতি নিয়ে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মায়ানমার, চীন প্রভৃতির দিকে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করে আছে ভারত। কিন্তু ঘন ঘন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের মতি বুঝে ওঠা মুশকিল। চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বহুকাল যাবৎ অম্লমধুর। তাই ভারতকে পাশ্চাত্যের দিকে ঝুঁকতেই হয়। এই ব্যাপারে ইউরোপ বারবারই ভারতের সহযোগী হয়ে কাজ করার সদিচ্ছা দেখিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকা প্রশংসনীয়। এই ব্যাপারে ইতালির বর্তমান নেতৃত্বের জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। সে-দেশের প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি শিল্প থেকে গবেষণার নানা ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে একযোগে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক স্তরে বিশ্বজুড়ে একটা বড়ো মাপের পরিবর্তন ঘটছে। সেই সন্ধিক্ষণে ভারত ও ইতালির সম্পর্ক বন্ধুত্বের পরিসর অতিক্রম করে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারিত্বে পরিণত হয়েছে। এই কৌশলের প্রধান চালিকাশক্তি—রাজনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে নিয়মিত মতবিনিময়। একবিংশ শতকে সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার দিকগুলি নির্ধারিত হবে কোন দেশ কতটা উদ্ভাবনশীল, শক্তি ও জ্বালানি ক্ষেত্রে রূপান্তরে কতটা সক্ষম বা কৌশলগত সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কতটা দক্ষ—তার উপর ভিত্তি করে। আর সেজন্যই ভারত ও ইতালি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরো গভীর ও বহুমাত্রিক করে তুলতে যত্নবান হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করেছে। ২০২৯ নাগাদ ইতালি এবং ভারতের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ২০ বিলিয়ন ইউরোতে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ‘মেড ইন ইতালি’ ও ‘উৎকর্ষ’ অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। এর সঙ্গে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে উৎকর্ষের ক্ষেত্রে যে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, রয়েছে তার নিবিড় যোগ।
এর প্রেক্ষিতে ভারতে উৎপাদন প্রক্রিয়ার জন্য ইতালির শিল্পমহলে যেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে, তেমনই ইতালিতেও ভারতীয় শিল্প সংস্থাগুলির উপস্থিতি বাড়ছে। বর্তমানে ভারত ও ইতালিতে দুই দেশের সহস্রাধিক সংস্থা সক্রিয়। পাশাপাশি, এই অংশীদারিত্বের কেন্দ্রে রয়েছে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনী বিষয়গুলি। বস্তুত মানুষকে মূল কেন্দ্র রেখে ভারত ও ইতালি পারস্পরিক সহযোগিতাকে শক্তিশালী করে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। এসব নীতি ও পরিকল্পনার বাস্তব রূপায়ণ আমরা অবশ্যই প্রত্যাশা করি। কিন্তু এগুলি কোনো আশু সমাধান নয়। দেশ এই মুহূর্তে ভীষণই সংকটে, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে। এই সংকট থেকে মুক্তির দিশা কেন্দ্রীয় সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশিত। কিন্তু নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে কিছু ‘ভালো ভালো’ পরামর্শ, উপদেশের অধিক কিছু মেলেনি। শুধু তাই নয়, দেশবাসীকে সংযম, মিতব্যয়িতা এবং ত্যাগ-তিতিক্ষার পরীক্ষায় বসিয়ে প্রধানমন্ত্রী উড়ে গিয়েছেন ইউরোপ। এই দফায় মেলোনির দেশ ইতালি সফর রীতিমতো বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, মেলোনিকে মোদির চকোলেট উপহারকে নানাভাবে কটাক্ষ করেছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। সমালোচনার ঝড় বয়ে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সাধারণের আলোচনায়। ব্যাপারটিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রমোদভ্রমণের স্তরে নামিয়ে এনেছে দেশবাসীর একটা বড়ো অংশ। এজন্য তীব্র সংকটে পড়া দেশবাসীকে দোষ দেওয়া যায় না। দায়ী করা যায় না রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও। দেশবাসীর যন্ত্রণা, আবেগ বুঝে সময়োচিত পদক্ষেপ করা ছাড়া মানুষের মুখ বন্ধ করতে পারবেন না নরেন্দ্র মোদি। মানুষ মোটেই ভালো নেই—এই নির্মম সত্য যেন কোনোভাবেই ভুলে না যায় সরকার।