


ভারতীয় ন্যায়দর্শনের মতে বুদ্ধি ও ইচ্ছা আত্মার গুণ। কিন্তু শ্রুতি বলেন যে বুদ্ধি, ইচ্ছা, সংকল্প প্রভৃতি সমস্তই মনের রূপভেদ। স্বরূপতঃ যাহাই হোক জীবের অন্তঃস্তলের এই দুইটি বৃত্তির উপর জগতে ব্যষ্টিগত, সমষ্টিগত, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক, পারিবারিক, পারমার্থিক, ঐহিক ও পারত্রিক শুভাশুভ অনেকাংশে নির্ভর করে। যখনই সমাজে বা রাষ্ট্রে মনুষ্যগণের প্রচেষ্টায় কোন উৎকৃষ্ট রচনা দৃষ্ট হয় অনুসন্ধানে জানা যায় যে উক্ত ব্যাপারে বুদ্ধির খুব কৌশল থাকিলেও সকলের আন্তরিক শুভ ইচ্ছার সংযোগও ছিল।
আবার যখনই মনুষ্যকৃত কোনও ধ্বংসাত্মক কার্য চাক্ষুষ হয় তাহার অনুসন্ধানে বোঝা যায় যে সেই ধ্বংসেও বুদ্ধির খুব খেলা ছিল বটে কিন্তু তাহার সহিত কিছু লোকের অশুভ ইচ্ছাও যুক্ত হইয়াছিল। বিচারে স্থির হইয়াছে মানুষের স্বরূপ কেবল তাহার বুদ্ধি নহে বা মানুষের জীবন বুদ্ধির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নহে। পথে চলার জন্য বুদ্ধি একটা উপায় মাত্র। মানুষ বিপন্ন হইলে বুদ্ধি পথ নির্দেশ করিয়া দেয়।
কিন্তু মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রিত হয়, ইচ্ছাশক্তি বা ‘will’-এর দ্বারা, বুদ্ধি বা intellect-এর দ্বারা নহে। বুদ্ধি যদি তীক্ষ্ণ হয় তাহার সাহায্যে জীবনযাত্রার পথে অনেক বাধা অতিক্রম করা যায় যেমন কোনও অস্ত্র যদি হয় তাহার দ্বারা ছেদনের কাজ ভাল হয়। কোনও ছাত্র যদি পরীক্ষায় ভাল ফল করে আমরা বলি ছাত্রটি বেশ বুদ্ধিমান। কিন্তু তীক্ষ্ণবুদ্ধি ছাত্রের যদি সদিচ্ছা না থাকে তাহা হইলে কালক্রমে দেখা যায় যে সে তাহার প্রখর বুদ্ধিকে অসৎ কর্মে লাগাইয়া নিজের ও সমাজের প্রভূত অনিষ্ট সাধন করিয়াছে। যেমন একটি শাণিত অস্ত্রকে সংশোধিত করিয়া শল্য চিকিৎসক তদ্বারা ব্রণাদি কাটিয়ে রোগীকে নিরাময় করিতে সচেষ্ট হন কিন্তু ঐ অস্ত্রটি কোনও দস্যুর হস্তগত হইলে যে সুযোগ পাইলে উহার দ্বারা নরহত্যা করিতে উদ্যোগী হয়। একই অস্ত্র ঠিক আছে তাহার কোনও দোষ নাই কিন্তু তাহার সহিত সদিচ্ছা বা অসদিচ্ছার যোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন পরস্পর বিরোধী কর্মের জন্য উৎসাহ দেখা যাইতেছে।
শ্রীরামকৃষ্ণদেবের শ্রীমুখনিঃসৃত দৃষ্টান্ত এই স্থলে উল্লেখযোগ্য, একই সূর্যালোকে বা রাত্রিকালের আলোকে কেহ রামায়ণ মহাভারত গীতা চণ্ডী পাঠ করিতেছেন আবার কেহ বা জ্ঞাতিকে প্রতারণা করার জন্য জাল দলিল লিখিতেছেন। এখানে আলোকের সহিত সদিচ্ছা বা অসদিচ্ছার সংযোগে সৎকর্ম বা অসৎকর্ম হইতেছে। কিন্তু সূর্য বা আলোক উভয়কেই সমান আলোক দিয়াছে।
ধারাল অস্ত্রের দ্বারা বৃক্ষচ্ছেদন হয় নরহত্যা হয় আবার sterilise করিয়া operationও করা চলে। অস্ত্র কিছুই বলে না তাহার দ্বারা কোন্ কার্যটি সাধিত হইবে। তাহা বলে will বা ইচ্ছা।
জ্যোতির্ময় নন্দের ‘জ্যোতির্ময় রচনাঞ্জলি’ থেকে