মহাকাশ মানুষের কাছে এক বিস্ময়কর ও রহস্যময় স্থান। সেখানে না আছে বাতাস, না আছে গন্ধ ছড়ানোর কোনো মাধ্যমও। তবুও আশ্চর্যের বিষয় হল, মহাকাশচারীরা মহাকাশ ভ্রমণের সময় এক বিশেষ ধরনের ‘গন্ধে’র অভিজ্ঞতা লাভ করেন। বিষয়টি মহাকাশ গবেষণার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
যে সমস্ত নভশ্চর বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন গিয়েছেন কিংবা মহাকাশ অভিযানে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের অনেকেরই একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন যে, স্পেসওয়াক শেষে মহাকাশযানে ফিরে আসার পর তাঁরা অদ্ভুত এক গন্ধের টের পান। গন্ধ অনেকটা পোড়া মাংস, লোহা পোড়া, গান-পাউডার কিংবা আতশবাজি পোড়ার মতো। কেউ কেউ একে ওয়েল্ডিং বা ঝালাইয়ের ধোঁয়ার গন্ধের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। মহাকাশে তো সরাসরি শ্বাস নেওয়া অসম্ভব? তাহলে এই গন্ধের বিষয়টি তাঁরা অনুভব করেন কীভাবে? মহাকাশচারীদের দাবি, এই গন্ধ নাকি লেগে থাকে তাঁদের স্পেস স্যুট ও যন্ত্রপাতিতে। যা কেবিনে ফিরে আসার পর তাঁদের নাকে লাগে।
বাতাসহীন মহাকাশে গন্ধ আসবে কোথা থেকে? বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাকাশে কসমিক রশ্মি, উচ্চ শক্তির কণা ও পারমাণবিক অক্সিজেন উপস্থিতি রয়েছে। নভশ্চরদের পোশাক বা যন্ত্রপাতি যখন এসব কণার সংস্পর্শে আসে, তখন সেগুলোর উপর ক্ষুদ্র কণাগুলি রয়ে যায়। মহাকাশ থেকে স্পেস স্টেশন কিংবা মহাকাশযানের ভেতরে ফিরে এলে সেই পোশাক অক্সিজেন সমৃদ্ধ বায়ুর সংস্পর্শে আসে। বিভিন্ন রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে একটা গন্ধ তৈরি হয়। যা মানুষের নাকে পোড়া বা ধাতব গন্ধের মতো লাগে। এই গন্ধ আসলে মহাকাশের শূন্যতার নয়, বরং মহাকাশের কণার সঙ্গে মানুষের প্রযুক্তির মিথস্ক্রিয়ার ফল।
প্রথমে এই গন্ধকে অনেকেই কেবল অদ্ভুত অভিজ্ঞতা মনে করলেও পরে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব রয়েছে। মহাকাশে কী ধরনের কণা বা বিকিরণ উপস্থিত, তা এই গন্ধ থেকে ধারণা করা সম্ভব। ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী মহাকাশযাত্রা যেমন মঙ্গল গ্রহ অভিযান বা চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি বা উপনিবেশ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে মানুষের। তাই সেসব বাস্তবায়নের জন্য মহাকাশচারীদের ব্যবহৃত উপকরণ কতটা টেকসই ও নিরাপদ হতে পারে, তা জানার ক্ষেত্রেও এই তথ্য বিশেষ সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।
এছাড়াও মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলি নভশ্চরদের মানসিক প্রস্তুতির জন্যও কৃত্রিমভাবে মহাকাশের গন্ধ তৈরি করে থাকেন। যাতে তাঁরা আগে থেকেই এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন এবং বাস্তব অভিযানের সময় কোনো অস্বস্তি বোধ না করেন।
মহাকাশের গন্ধ আমাদের জানায়, মহাবিশ্ব কেবল নিঃশব্দ ও অসীম শূন্যতা নয়, বরং এটি একটি জীবন্ত পরীক্ষাগার। যেখানে অগণিত কণা ও শক্তি প্রতিনিয়ত ভাঙা-গড়ার খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই গন্ধ একদিকে যেমন মহাকাশচারীদের জন্য এক বিচিত্র স্মৃতি, অন্যদিকে তেমনই বিজ্ঞানীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয়ও। তাই মহাকাশের গন্ধ কেবল একটি রহস্যময় অনুভূতি নয়, বরং মানব সভ্যতার অগ্রগতির জন্য মহাবিশ্বের এক অদৃশ্য বার্তাও।