আনন্দে ভেসে বেড়ানো
বিশ্বকর্মা পুজো আমার খুব প্রিয়। এই দিন শুধু দেব আরাধনাই হয় না, ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দেও আমরা মেতে উঠি। প্রাচীন কাল থেকেই ঘুড়ি ওড়ানো চলে আসছে। ইতিহাস বলে, চীন থেকে ঘুড়ি ওড়ানোর ব্যাপারটি এদেশে আমদানি হয়েছে। আমি ঘুড়ি ওড়াতে খুব ভালোবাসি। এবার পেটকাটি ঘুড়ি কিনেছি। বাবা, কাকা, দাদাকে নিয়ে ছাদে ঘুড়ি ওড়াব। আমার সঙ্গে সবাই যেন ছোটো হয়ে যায়। কার ঘুড়ি কাটা হবে, তাই নিয়ে মজার প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। হঠাৎ ঘুড়ি কেটে গেলে সবাই মিলে চিৎকার করি, ‘ভোকাট্টা!’। মা ছাদে চপ-মুড়ি পাঠিয়ে দেন। সবাই একসঙ্গে জলখাবার খাই আর ঘুড়ি ওড়াই। সন্ধেবেলাও আমাদের এখানে ঘুড়ি ওড়ে। সূর্যের পড়ন্ত আলোয় সেই দৃশ্য দেখতে খুব ভালো লাগে। বিশ্বকর্মা পুজো এলেই মনে মনে বলি— ‘ঘুড়ি ওড়ে আকাশপানে, / মনও ওড়ে তারই টানে।’
—জীবেশ সাহা, সপ্তম শ্রেণি
শিল্পের দেবতা
বিশ্বকর্মা শিল্প ও কারিগরির দেবতা। বিভিন্ন কলকারখানায় ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে এই দেবতার আরাধনা হয়। কিন্তু আমাদের মতো ছাত্রদের কাছে এটা ঘুড়ির দিন। ‘ভোকাট্টা’ শব্দ শুনলেই মনে হয় বাড়ির বাইরে ছুটে বেরিয়ে পড়ি। ঘুড়ি লুটতে আমরা বন্ধুরা খুব ভালোবাসি। যদিও ঘুড়ি ওড়ানোর ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ অবশ্যই মেনে চলতে হয়। যেমন— ন্যাড়া ছাদে কখনোই ঘুড়ি ওড়াই না। আবার ঘুড়ি লোটার সময় নজর থাকে ঘুড়িটির দিকে, তাই যেকোনো সময় রাস্তাঘাটে বা ঝোপেঝাড়ে পড়ে গিয়ে বিপদ ঘটতে পারে। এই বিষয়ে সাবধান থাকতে হয়। যাইহোক, সবকিছু সামলে যখন কাটা ঘুড়ি আমার হাতে আসে, তখন আর আনন্দের সীমা-পরিসীমা থাকে না। মন বলে, ‘সুতোয় বাঁধা ঘুড়ি নয়, / স্মৃতিই আকাশ
ছুঁয়ে রয়।’
—অরিজিৎ ঘোষ, দশম শ্রেণি
পুজোর সঙ্গে ঘুড়ি
বিশ্বকর্মা পুজোর দিনটি আমার কাছে অন্য রকম। সকাল থেকে পুজোর ব্যস্ততা থাকে। তারপর দুপুর হতেই মন ছুটে যায় ছাদের দিকে। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ঘুড়ি ওড়ানোর চল আছে। কোথাও কোথাও ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতাও হয়। বাংলায় বিশ্বকর্মা পুজোয় ঘুড়ি ওড়ানোর রীতি বহু দিনের। পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগ্গার লড়াইয়ে জমে ওঠে শিল্পের দেবতার পুজোয়। এদিন রাতে আমাদের বাড়িতে খিচুড়ি খাওয়ার রীতি আছে। সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করি। খুব মজা হয়। বিশ্বকর্মা পুজোর আনন্দে মেতে ওঠে আমাদের গোটা পরিবার। বলতে ইচ্ছা করে— ‘সুতোয় বাঁধা ঘুড়ি আমার, / আকাশ জুড়ে খেলা।’
—অরিজিৎ বসু, অষ্টম শ্রেণি
আমার উৎসব
বিশ্বকর্মা পুজো একান্তই আমাদের উৎসব। ঘুড়ি ওড়ানোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি। শরতের নির্মল আকাশ ও অনুকূল বাতাস এই সময়টিকে ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য আদর্শ করে তোলে। বৃষ্টি হলেই সব আয়োজন, পরিকল্পনা বৃথা হয়ে যায়। একটা বিষয় দেখে অবাক হয়ে যাই— ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে বড়োরাও কেমন ছোটো হয়ে যায়। আমি বাড়ির ছাদে একাই ঘুড়ি ওড়াই। এদিন বাবাও আমার সঙ্গে যোগ দেন। প্রচুর ঘুড়ি কিনে আনা হয়। এই দিনটা একান্তই আমার। তাই বলব, ‘আকাশ জুড়ে রঙের খেলা, / পরিবারেই আনন্দ মেলা।’
—দীপায়ন মিত্র, দশম শ্রেণি
ঘুড়ির ঐতিহ্য
আকাশে ঘুড়ি ওড়া দেখতে কার না ভালো লাগে। এই ঘুড়ির ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। মনে করা হয়, চীন দেশে প্রথম ঘুড়ি ওড়ানো শুরু হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে প্রথম ঘুড়ি ওড়ানো শুরু হয়েছিল। কঞ্চি, রেশম ও হালকা কাগজ দিয়ে প্রথম ঘুড়ি তৈরি হত। একসময় দূরত্ব মাপার জন্য নাকি ঘুড়িকে ব্যবহার করা হত। ভারতীয় উপমহাদেশে ঘুড়ি ওড়ানোর জনপ্রিয়তা বেড়েছে মুঘল আমলে। সেই সময় এটি বিনোদন ও উৎসবে পরিণত হয়। আমাদের রাজ্যে মূলত বিশ্বকর্মা পুজোয় ঘুড়ি ওড়ানো হলেও অঞ্চল ভেদে এর ফারাক আছে। কোনো কোনো অঞ্চলে মকর সংক্রান্তি কিংবা সরস্বতী পুজোয় ঘুড়ি উড়তে দেখা যায়। আমাদের এলাকায় শিল্পের দেবতার পুজোতেই পেটকাটি, চাঁদিয়াল, বগ্গাদের উড়তে দেখা যায়। তা যেন মনে করিয়ে দেয়— ‘সুতোয় বাঁধা ঘুড়ি উড়ে, / স্বপ্ন মেশায় নীল আকাশে।’
—শুভ্রনীল দাস, নবম শ্রেণি
ডানা মেলে ওড়ার পালা
আকাশে ঘুড়ি দেখলেই ডানা মেলে উড়তে ইচ্ছা করে। বিশ্বকর্মা পুজো এলেই আমার এত আনন্দ হয় যে, বলে বোঝাতে পারব না। এই সময় স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে পাড়ার মাঠে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়াই। বাবা গল্প বলেন, আগে ঘুড়ি ওড়াতে গেলে সুতোয় মাঞ্জা দিতে হত। এখন যদিও রেডিমেড সব পাওয়া যায়। মাঞ্জা দেওয়ার ঝামেলা নেই। বিশ্বকর্মা পুজোতে সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে হইহই করে ঘুড়ি ওড়াই। বাড়ির সামনেই মাঠ রয়েছে। সেখানে সবাই জড়ো হই। আমার পাশের বাড়ির একটি ভাই আছে, সে আমার লাটাই ধরে। তাই বিশ্বকর্মা পুজোর অপেক্ষায় আমরা যথেষ্ট উত্তেজিত। আর মনে মনে বলছি— ‘ঘুড়ির সঙ্গে উড়ে যায় / শৈশবের সব গান।’
—শাহিন সর্দার, নবম শ্রেণি
প্রধান শিক্ষকের কলমে
স্বাধীনতা পরবর্তীকালে উদ্বাস্তু সমস্যায় জর্জরিত বেলঘরিয়ার দেশপ্রিয় নগর। এখানকার শিক্ষাব্রতী মানুষজন সমাজকল্যাণের স্বার্থে যে সুদূরপ্রসারী কাজগুলি করেছিলেন, তার অন্যতম হল বেলঘরিয়া দেশপ্রিয় বিদ্যানিকেতন প্রতিষ্ঠা। তখনকার উদ্বাস্তু পরিবারগুলিতে জ্ঞানের আলো জ্বালাতে ১৯৫০ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই বিদ্যালয়ের পথচলা শুরু হয়। সদ্যই বিদ্যালয় তার গৌরবময় পঁচাত্তর বছর পেরিয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্ল্যাটিনাম উপলক্ষ্যে প্রাক্তন ও বর্তমান পড়ুয়াদের নিয়ে বর্ণাঢ্য প্রভাতফেরির আয়োজন করা হয়। এছাড়াও আয়োজন করা হয়েছিল রক্তদান উৎসব, আন্তঃবিদ্যালয় ফুটবল প্রতিযোগিতা, বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শনী, ম্যাজিক ও নানা চিত্তাকর্ষক প্রদর্শনীর।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত বহু ছাত্রছাত্রী এই বিদ্যালয় থেকে পাশ করে সমাজের নানান স্তরে সম্মানের সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। পল্লি এলাকার মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অকুণ্ঠ দানের ফলেই বেড়ার দেওয়াল ও মাটির মেঝের ঘর থেকে আজ প্রায় ৩০ কক্ষ বিশিষ্ট তিনতলা পাকা ভবন সগৌরবে দাঁড়িয়ে। আজও আমরা ছাত্রছাত্রীদের খেলাধুলোর জন্য সবুজ মাঠটি সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছি। তাছাড়া রয়েছে কিচেন গার্ডেন, মিড ডে মিলের সুন্দর ডাইনিং হল, দু’টি কম্পিউটার ল্যাব, উন্নত গ্রন্থাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ ছ’টি পরীক্ষাগার, বিশাল হল ঘর ইত্যাদি।
কেন্দ্রীয় সরকারের ভিজিল্যান্স উইক কর্মসূচিতে নির্বাচিত হয়েছে এই বিদ্যালয়। কঠোর শৃঙ্খলার পাশাপাশি আন্তঃশ্রেণি প্রতিযোগিতা, এনসিসি ব্যান্ড, শিক্ষামূলক ভ্রমণ ও স্পোকেন ইংলিশ শেখার ব্যবস্থা রয়েছে। পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত কেবল ছাত্রদের এবং উচ্চ মাধ্যমিকে সহশিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। মানবিক, বাণিজ্য ও বিজ্ঞানের প্রায় ২৫টি বিষয় পড়ানো হয়। এই বিদ্যালয় ভবিষ্যতে আরও উন্নতি করবে, সেই আশা রাখি।
—শুভ্র মুখোপাধ্যায়, প্রধান শিক্ষক