Bartaman Logo
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

১৭০ বছর ইতিহাসের ঘরে

বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা বি ই কলেজ নামটা লোকের মুখ থেকে হারিয়ে যায়নি এখনও। তবে সরকারি পরিচয়টা বদলেছে। ভারতীয় প্রকৌশল বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠান, বা আইআইইএসটি, শিবপুর। ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় গেট দিয়ে সোজা ঢুকে ডানদিকে এগলেই পুরানো স্লেটার হল।

১৭০ বছর ইতিহাসের ঘরে
  • ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুদীপ্ত কুণ্ডু: বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বা বি ই কলেজ নামটা লোকের মুখ থেকে হারিয়ে যায়নি এখনও। তবে সরকারি পরিচয়টা বদলেছে। ভারতীয় প্রকৌশল বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিবিদ্যা প্রতিষ্ঠান, বা আইআইইএসটি, শিবপুর। ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় গেট দিয়ে সোজা ঢুকে ডানদিকে এগলেই পুরানো স্লেটার হল। বাইরে থেকে দেখলে আর পাঁচটা ঐতিহ্যবাহী ভবনের মতোই। লালচে দেওয়ালে নতুন রঙের ছোঁয়া, পুরনো কাঠবরগার ছাদ, ভারী দরজা। কিন্তু সেই দরজা পেরলেই সময় যেন হঠাৎ উলটো ঘুরতে শুরু করে। ফিরিয়ে নিয়ে যায় বেশ কয়েক দশক আগের ভারতবর্ষে। দেওয়ালে ঝুলে থাকা সাদা-কালো মুখ, হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ, কাচের ভিতরে থুপ মেরে বসা অচেনা যন্ত্রের সারি ফিসফিসিয়ে বলে দেয়, ঠিক জায়গায় এসেছেন। এটাই ইনস্টিটিউট আর্কাইভ ও মাইক্রো-মিউজিয়াম! বি ই কলেজ, বেসু কিংবা আইআইইএসটি... যাই বলুন, তার ‘জীবনস্মৃতির ঘর’। 

Advertisement

১৮৫৬ সালের ২৪ নভেম্বর। প্রথমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। কিছুদিন পর মাত্র চারটি ক্লাসরুম নিয়ে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের যাত্রা শুরু। প্রেসিডেন্সি কলেজ, হেয়ার স্কুল ঘুরে প্রায় ১৮৮০ নাগাদ প্রতিষ্ঠানটি শিবপুরের বিশপস কলেজের পরিত্যক্ত ভবনে এসে থিতু হয়। তারপর সময় বদলেছে, নাম বদলেছে। ঔপনিবেশিক ভারতের প্রয়োজন মেটাতেই ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার যে ভিত প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সেই ভিতের উপর গড়ে উঠেছে ভারতীয় মেধা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে স্বদেশি আত্মবিশ্বাস। কিন্তু এই ১৭০ বছরের যাত্রায় কত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার পুরানো হয়েছে। গবেষণার কাগজ হয়ে গিয়েছে জীর্ণ-হলুদ। লোহার গায়ে মরচে ধরেছে। একসময় যে যন্ত্র ছাত্রদের কাছে ছিল বিজ্ঞানের বিস্ময়, কয়েক দশক পর সেটিরই জায়গা হয়েছে স্টোররুমে। আরও পরে হয়তো উড গোডাউনের এক কোণে। সময়ের ধুলো তাদের ঢেকে দিয়েছিল। কিছু ছিল বাতিলের অপেক্ষায়, কিছু প্রায় ‘জাঙ্ক’। যেন ব্যবহার শেষ হলেই ইতিহাসেরও প্রয়োজন শেষ। আর সেখানেই শুরু হয় অন্য গল্প।
ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। আইআইইএসটি শিবপুরে শুরু হল ‘ রিপেয়ার, রিইউজ ফেসিলিটি’ (আরআরএফ) উদ্যোগ। উদ্দেশ্য সহজ—যা ফেলে দেওয়ার কথা, তা আগে খতিয়ে দেখা। যা মেরামত করা যায়, তা মেরামত করা। যা পুনর্ব্যবহারযোগ্য, তাকে নতুন করে কাজে লাগানো। পরিবেশবান্ধব ক্যাম্পাসের এই নয়া ভাবনার নেপথ্যে ছিলেন ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর অধ্যাপক ভি এম এস আর মূর্তি ও বোর্ড অব গভর্নর্সের চেয়ারপার্সন তেজস্বিনী অনন্ত কুমার। তারপর কাজটা নেমে এল মাটির কাছাকাছি। এগিয়ে এলেন ২০০৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, এস্টেট শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার বিভোর দাস। বিভিন্ন বিভাগে পড়ে থাকা বাতিল কাগজ, পুরনো চিঠি, নকশা, আলোকচিত্র, যন্ত্রপাতি ও নানা সামগ্রীর মধ্যে তিনি খুঁজতে শুরু করেন এমন কিছু, যা আসলে বাতিল নয়। তাঁর নেতৃত্বে ইতিহাসের খননকার্যে নামলেন প্রতিষ্ঠানের চার আউটসোর্সড কর্মীও। সন্তোষ মাঝি, অক্ষয় রাউত, বিমল মাহাত এবং শ্রীধর নায়েক। যাঁদের প্রতিদিনের কাজ ছিল ক্যাম্পাসের ঘাস ছাঁটা, তাঁরাই একসময় হয়ে উঠলেন ইতিহাস উদ্ধারের নীরব সহযাত্রী। এ কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক খনন নয়, অথচ পদ্ধতিটা অনেকটা তেমনই। ধুলো সরিয়ে খুলতে হয়েছে পুরনো স্টোররুম। আর এভাবে উদ্ধার করা প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে ফিরে এসেছে কয়েকটি প্রশ্ন, এটি কী? কখন তৈরি? কেন ব্যবহার করা হত? কে ব্যবহার করতেন? আর এতদিন কোথায় ছিল? 
ব্যস, সেই শুরু। এভাবেই যে কাঠের বাক্সটি আর কোনো কাজে লাগবে না বলে মনে হয়েছিল, সেটিই হয়ে উঠল কোনো ঐতিহাসিক যন্ত্রের নতুন ঠিকানা। পুরানো আলমারির দরজার মেহগনি কাঠ দিয়ে তৈরি হল ডিসপ্লে বক্স। উড গোডাউনের ধুলো ঝেড়ে, মরচে সরিয়ে, পুরানো জিনিসকে নতুন করে সাজিয়ে প্রস্তুত হল ইতিহাসের প্রদর্শনীর পালা।
২৪ নভেম্বর, ২০২৫। প্রতিষ্ঠানের ১৭০তম প্রতিষ্ঠা দিবসে আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে গেল ইনস্টিটিউট আর্কাইভ ও মাইক্রো মিউজিয়ামের দরজা। কিন্তু আসল গল্পটা সেদিন শেষ হয়নি, বরং শুরু হয়েছে।
গত কয়েক মাসে বিভিন্ন বিভাগ থেকে উদ্ধার হয়েছে বহু যন্ত্র ও সামগ্রী। কোনোটি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ধুলো জমা ঘর থেকে, কোনোটি মাইনিং বিভাগের স্টোর থেকে, কোনোটি আবার ইলেকট্রিক্যাল বিভাগের পুরানো সংগ্রহ থেকে। তৈরি হয়েছে প্রায় দশ লক্ষ টাকার রেভিনিউ বা সম্পদ। মিউজিয়ামের ভিতরে ঢুকলে নিছক কোনো একটি যন্ত্রের দিকে চোখ আটকে যায় না। দৃষ্টি ঘুরে বেড়ায় দেওয়াল থেকে কাচের বাক্সে, পুরানো ছবি থেকে নকশায়, নথি থেকে যন্ত্রে। দরজা দিয়ে ঢুকলেই প্রথমে নজর কাড়ে বেনিয়ফ সিসমোগ্রাফ। ১৯৫৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা ক্যালটেকের উপহার। একসময় আইআইইএসটি-র জিওফিজিক্যাল ল্যাবরেটরি থেকে এই যন্ত্র পৃথিবীর কম্পন রেকর্ড করত। হিমালয় থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য ভারত মহাসাগর... বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভূকম্পন সংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে যেত ক্যালটেকের সিসমোলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে। আজ সেই যন্ত্র নিশ্চুপ। কিন্তু তার পাশে দাঁড়ালে বোঝা যায়, একসময় এই নীরব ধাতব শরীরই শুনত পৃথিবীর ‘নাড়ির শব্দ’। তার পাশেই ১৯৫৪ সালের ‘ইন্টিগ্রেটিং স্ফিয়ার’। একসময় যার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ুয়ারা আলোকে শুধু চোখে নয়, সংখ্যায় ধরতে শিখেছিল। আলোকে মাপার সেই ফটোমেট্রিক যন্ত্রটি কেনার সময় খরচ হয়েছিল প্রায় ২০ হাজার টাকা। সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়েও তামার শরীরটি অতীতকে ধরে রেখেছে। 
খানিক তফাতে নীরব সাক্ষ্য দিচ্ছে পারকিনসন কোম্পানির শতবর্ষ প্রাচীন বেঞ্চ ভাইস। কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক যন্ত্র নয়, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার হাতেকলমে ইতিহাসের এক সাক্ষী। আছে ম্যানচেস্টারের জি কাসনস কোম্পানির পিস্টনের কাঠের মডেল, জার্মানির তৈরি প্যানফোট মেটালোগ্রাফ, ব্রিটিশ আমলের ল্যান্টার্ন স্লাইড প্রজেক্টর এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত শক্তিশালী এয়ারক্র্যাফ্ট ক্যামেরা। আরও একটু এগলেই দেখা মেলে মাইনিং বিভাগের পুরনো ড্রাম উইন্ডারের মডেলের। একসময় খনির গভীরে কেজ ওঠানামা করানোর প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করাত এই মডেল। ১৯০৬ সালে তৎকালীন বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভারতের প্রথম মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই ছোট্ট মডেলটি তাই শুধু একটি যন্ত্রের প্রতিরূপ নয়, ভারতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার জন্মকথার এক টুকরো স্মৃতি। আইএসএম, ধানবাদের সূতিকাগার।
কোনো কোনো বস্তু আবার প্রযুক্তি সঙ্গে সঙ্গে দেশের আত্মনির্ভরতার গল্পও বলে। যেমন, স্বাধীন ভারতের প্রথম দিকে মিনিম্যাক্স কোম্পানির তৈরি পিতলের অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রটি। স্বাধীনতার পর কলকাতা ও বোম্বেতে ভারতীয় শিল্প ও প্রযুক্তি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যে দীর্ঘ প্রয়াস শুরু করেছিল, তার একটি ক্ষুদ্র স্মারক। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে ধুলো ঝেড়ে এই মাইক্রো মিউজিয়ামে নিয়ে আসা থাকা ট্রাস ব্রিজের মডেলটি ভারতীয় প্রকৌশলবিদ্যার এক অস্মিতা। ত্রিভুজের পর ত্রিভুজ জুড়ে তৈরি কাঠামো একসময় ছাত্রদের বোঝাত, কীভাবে ভার বণ্টন হয়, কীভাবে নিজের উপর চাপ সামলে দাঁড়িয়ে থাকে একটি সেতু।
মাইক্রো মিউজিয়ামের এককোণে রাখা পুরনো নাইফ সুইচ বা আইসোলেটর। এভাবেই একে একে ফিরে এসেছে সার্ভেয়িং থিওডোলাইট, অপটিক্যাল স্টেরিওস্কোপ, ম্যানুয়াল টাইপরাইটার, স্টেনোরেট টাইপিং মেশিন, ভ্যাকুয়াম টিউব, অ্যানালগ বৈদ্যুতিক পরিমাপক যন্ত্রগুলি। যত্ন করে রাখা হয়েছে অডিয়ো ক্যাসেট, ফ্লপি ডিস্ক, পোর্টেবল হার্ড ড্রাইভ সহ তথ্য সংরক্ষণের বদলে যাওয়া সময়ের ইতিহাসকে। আরও আছে... পিডব্লিউডির তৈরি নিজস্ব ইট ও ঐতিহ্যবাহী মাটির টালি, ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় তৈরি ক্লোরোস্কোপ, পুরানো মোটর, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার হ্যান্ড ড্রিল বা করাত, এ দেশে আসা প্রথম দিকের অ্যাংলো-সুইস দেওয়াল ঘড়ি, রুপোর আকরিক।
মাইক্রো মিউজিয়ামের ঘরে পাশাপাশি রাখা এই জিনিসগুলি দেখলে একটা প্রশ্ন জাগে, স্বাধীনতার আগে ভারত কি শুধু গ্রাহক ছিল বিদেশি প্রযুক্তির? উত্তরটা সোজা নয়। বিদেশি যন্ত্র এসেছিল, অবশ্যই। কিন্তু সেই যন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা তার ভাষা শিখেছে, তাকে নিজেদের প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়েছে, গবেষণার নতুন দরজা খুলেছে। ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার ভিতর দিয়েই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে স্বদেশি বিজ্ঞানচেতনার মাটি। স্বাধীনতার পরে সেই মাটিতেই গবেষণার বিস্তার ঘটেছে। এই মিউজিয়ামের যন্ত্রগুলি তাই একসঙ্গে পরাধীনতার স্মৃতি এবং আত্মনির্ভরতার যাত্রাপথ দুই-ই বহন করছে।
শুধু যন্ত্রের ইতিহাস নয়, এই সংগ্রহশালাজুড়ে রয়েছেন বহু মানুষের স্মৃতি। স্বাধীন ভারতবর্ষের ভাবনায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ইনস্টিটিউটের সেই প্রাক্তনীদের কথাও এখানে সংরক্ষিত। কেউ প্রকৌশলে, কেউ সমাজে, কেউ জাতীয় জীবনে নিজের ছাপ রেখে গিয়েছেন। স্যার আর এন মুখোপাধ্যায়, স্যার বীরেন মুখোপাধ্যায়েরা যেমন রয়েছেন, তাঁদের পাশেই ফজলুর রহমান খান। দেশভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাওয়া সেই বাঙালি ইঞ্জিনিয়ার, যাঁকে বলা হয় ‘আইনস্টাইন অফ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। ১৯৭২ সালে শিকাগোর ১১০ তলা উইলিস টাওয়ারের প্রকৌশল-ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারিং মেধার নাম উজ্জ্বল করেছিলেন তিনি। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের স্থাপত্য কারিগরির সঙ্গে যুক্ত বাঙালি চিফ ইঞ্জিনিয়ার অনুকূল চন্দ্র মিত্রকেই বা ক’জন চেনেন। এমনকি বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের পিতার শিক্ষকতা সূত্রও সংরক্ষিত রয়েছে এখানে।
গোটা মিউজিয়ামটি কেবল বিজ্ঞানের ইতিহাস নয়, এটি মানুষ, প্রতিষ্ঠান, দেশ ও সময়ের আন্তঃসম্পর্কেরও দলিল। স্লেটার হলের সংগ্রহে রাখা চিঠিপত্রগুলি তার প্রমাণ। স্যার আর এন মুখোপাধ্যায়ের চিঠি, বিভিন্ন প্রিন্সিপালের পত্র, অধ্যাপক বৃহুলের স্বাক্ষর করা নথি, গেজেট নোটিফিকেশন, ১৯১৭-১৮ সালের ক্যালেন্ডার, বি ই কলেজের প্রসপেকটাস, ১৯০৭-০৮ সালের মাইনিং বিভাগের রুটিন সব মিলিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন জীবন যেন কাগজে জমাট বেঁধে আছে। আর এসবের ভিড়ে লুকিয়ে সবচেয়ে বিস্ময়কর সম্পদগুলির একটি... ১৯০২ সালের ‘শিবপুর কলেজ পত্রিকা’র বিশেষ সংখ্যার প্রতিলিপি। যে সময়ে পরাধীন দেশে ইংরেজি ছিল ক্ষমতার ভাষা, সেই সময়েও ছাত্রদের নিজস্ব ভাষায় ভাবনা প্রকাশের পথ তৈরি হয়েছিল শিবপুরেই।
একদিকে ঔপনিবেশিক সময়ের যন্ত্র, অন্যদিকে ভারতীয় মেধার উত্থান, একদিকে বিদেশি প্রযুক্তির ছাপ, অন্যদিকে স্বাধীন দেশের বিজ্ঞানচর্চার বিস্তার, একদিকে টাইপরাইটার, ফ্লপি ডিস্ক, অন্যদিকে আজকের ছাত্রদের তৈরি সেন্সর-নির্ভর অডিয়ো ব্যবস্থা এত সব কিছু চিনিয়ে দিতেও তো লোক লাগে। অথচ এই মাইক্রো মিউজিয়ামে কোনও অভিজ্ঞ গাইড নেই। তাহলে কে শোনায় ইতিহাস আর প্রযুক্তির মেলবন্ধনের গল্প? প্রতিটি প্রদর্শিত সামগ্রীর সামনে রাখা হয়েছে সেন্সর-যুক্ত একটি স্পিকার। দর্শক সামনে দাঁড়ালেই শুরু ইতিহাসের ধারাবিবরণী শুরু। এই প্রযুক্তির ব্যবস্থাটিও প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের হাতে তৈরি। অর্থাৎ, এক প্রজন্ম যে যন্ত্র দিয়ে বিজ্ঞান শিখেছিল, আর এক প্রজন্ম সেই যন্ত্রের গল্প শোনানোর প্রযুক্তি তৈরি করেছে। সময়ের এই হাতবদলটাই এই মিউজিয়ামের আসল সৌন্দর্য।
এই মিউজিয়াম তাই কোনোমতেই কোনো অতীতের সংগ্রহশালা নয়। এটি যেন একটি প্রশ্নের উত্তর—কোনো পুরানো জিনিসকে আমরা কখন ‘আবর্জনা’ বলি, যখন তার ব্যবহার শেষ হয়ে যায়? নাকি যখন তাকে আমরা ভুলে যাই? উড গোডাউনের অন্ধকারে পড়ে থাকা যন্ত্রগুলির ব্যবহার ও তো শেষ হয়েছিল বহু আগেই। স্লেটার হলের পুরনো দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে আসার সময় তাই মনে হয়, আসলে মিউজিয়াম থেকে বেরনো যায় না।
• ছবি : অতূণ বন্দ্যোপাধ্যায়
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ