Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘গ্যাসের’ ধাক্কা

‘গ্যাসের’ ধাক্কা
  • ১৫ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অঙ্কটা কিছুতেই মিলছে না। মেলার অবশ্য কথাও নয়! ভারতে রান্নার গ্যাস অর্থাৎ এলপিজির অধিকাংশটাই আমদানি করতে হয়। এরমধ্যে ৭৫ ভাগ গ্যাসই আসে ইরানের হরমুজ প্রণালী দিয়ে। গত দু’সপ্তাহ ধরে যুদ্ধের কারণে এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। ফলে রান্নার গ্যাসের জোগান নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি আর কিছুদিন চললে ভারতে মজুত গ্যাসের ভাণ্ডার যে ফুরাবে, তা সাদা চোখেই পরিষ্কার। ঘটনা হল, মজুত গ্যাসের পরিমাণ ও দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন দিয়ে গোটা দেশের চাহিদা পূরণ করা যে এখনই যথেষ্ট কঠিন হয়ে যাচ্ছে, মোদি সরকার যে আসন্ন ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা ভেবে যারপরনাই চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করছে— তাও পরিষ্কার। অথচ দেশের মানুষের কাছে প্রকৃত পরিস্থিতি বা সত্যটা আড়াল করে তেমন সংকট নেই বলে নাগাড়ে বলে চলেছেন সরকারের মাথারা! গত কয়েকদিন কাশ্মীর থেকে কলকাতায় গ্যাসের জন্য যে হাহাকার দেখা যাচ্ছে, তা নাকি স্রেফ আতঙ্কের কারণে (প্যানিক বুকিং) তৈরি হয়েছে! এই আতঙ্কের সুযোগে গ্যাসের কালোবাজারিও হচ্ছে। 

Advertisement

সন্দেহ নেই, গ্যাসের জন্য গোটা দেশে আতঙ্কের ছবিটা স্পষ্ট। কিন্তু মুখে পর্যাপ্ত গ্যাস মজুত থাকার দাবি করলেও দেশের মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়ে তাঁদের ফের রাস্তায় টেনে নামানোর মতো পরিস্থিতি তৈরির দায় অস্বীকার করতে পারে না মোদি সরকার। গত কয়েকদিনের ‘ক্রনোলজি’ হল, যুদ্ধের কথা বলে রান্নার গ্যাসের দাম একলপ্তে সিলিন্ডার পিছু ৬০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গৃহস্থের গ্যাস বুকিংয়ের সময়সীমা শহরে ২৫ দিন ও গ্রামাঞ্চলে ৪৫ দিন করে দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক গ্যাস বিক্রি কার্যত বন্ধ রাখা হয়েছে। গ্যাসের বিকল্প হিসাবে রেশনে কেরোসিন তেলের ঢালাও ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিকল্পের পথে সরকার হঠাৎ বায়োগ্যাস ও পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাসের ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলতে শুরু করেছে। আবার চুল্লির আগুন জ্বালিয়ে রাখতে কয়লা, কাঠ, শুকনো পাতা, গুল ঘুঁটের মতো আদি ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার নিদানও দিচ্ছেন কেউ কেউ। এরই পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি তেল, গ্যাসের জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানাতে খোদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী থেকে বিদেশমন্ত্রী টেলিফোনে দফায় দফায় তদবির করে চলেছেন ইরানের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে। প্রশ্ন উঠেছে, গ্যাস নিয়ে মোদি সরকারের এমন পদক্ষেপ ও আচরণ কি দেশবাসীর মনে উদ্বেগ ছড়ানোর জন্য যথেষ্ট উপাদান নয়? দেশের পেট্রলিয়াম মন্ত্রক এই পরিস্থিতিকে যতই লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করুক, আসল সত্য হল, অনলাইনে বুকিং ব্যবস্থা কার্যত শিকেয় ওঠায় খালি সিলিন্ডার নিয়েই গ্যাসের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে সব রাজ্যে। অবশ্য শনিবার এ রাজ্যে মোদিজির ব্রিগেডের সভার জন্য অস্থায়ী রান্নাঘরে কিন্তু গ্যাসের কোনো আকাল নেই! 
অথচ, আগাম সতর্ক হলে এই পরিস্থিতি হয়তো এড়ানো যেত। এই যুদ্ধ যে অবশ্যম্ভাবী, তার আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল অনেক আগে থেকেই। যুদ্ধ বাঁধলে যে তেল ও গ্যাসের সংকট দেখা দিতে পারে তা আন্দাজ করাও খুব কঠিন ছিল না। ভারত অনায়াসেই ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে দেশীয় জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারত। যে চেষ্টা এখন করছে। তাহলে এই সমস্যা হয়তো হত না। কিন্তু অভিযোগ, আমেরিকার তাঁবেদারিতে ব্যস্ত মোদি সরকার। তাই সম্ভবত এসব ভাবার অবকাশ পায়নি। এখন তারই খেসারত দিতে হচ্ছে দেশবাসীকে। আর তাই পশ্চিমবঙ্গ সহ পাঁচ রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা ভোটে পদ্মশিবির ইভিএম-এর বাক্সে সমুচিত জবাব পেতে পারে বলে গেরুয়াবাহিনীতেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে। গত কয়েকমাস ধরে এসআইআরকে কেন্দ্র করে যে অভিযোগ উঠেছে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তার সামাল দিতেই পদ্মশিবিরে ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে রান্নার গ্যাস নিয়ে জনমানসে আতঙ্ক। রান্নার গ্যাসের সঙ্গে খাবারের সরাসরি যোগ। ব্যাখ্যা যাই হোক, এই পরিস্থিতির জন্য যে মোদি সরকার দায়ী, হেঁশেলে ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ করেছে কেন্দ্র—তেমন ধারণায় প্রলেপ দেওয়ার মতো আপাতত কোনো উপায় দেখছে না পদ্মবাহিনী। তার উপর গোদের উপর বিষফোড়ার মতো গ্রাম ও শহরের ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা গ্যাস বুকিং-এর ২৫-৪৫-এর শর্ত সাধারণ গ্রাহকদের অসন্তোষ বাড়িয়েছে। বাড়িয়েছে ধন্দও। প্রশ্ন উঠছে, এক্ষেত্রে কেন বিজেপি গ্রাম-শহরের বিভাজন করছে? গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটররাও পড়ছেন সমস্যায়। অঞ্চল ও এলাকার উপর ভিত্তি করে বর্তমানে দেশে চার রকমের ডিস্ট্রিবিউটরশিপ আছে। বহু জায়গায় গ্রাম ও শহর মিলেমিশে একাকার। এই শর্তের গেরোয় গ্রামবাসী কারা তা চিহ্নিত করাই মুশকিল। একদিকে গ্যাস বুক করতে না পারার ক্ষোভ, অন্যদিকে বুকিংয়ের শর্ত বিজেপিকে বেশ বেকায়দায় ফেলেছে। গ্রামীণ ভোটে কি তার প্রভাব পড়বে না? তাই এমন কৃতকর্মের জন্য ঠিক কতটা মূল্য চোকাতে হবে— সেই ভাবনাই হয়তো রাতের ঘুম ছোটাবে কেন্দ্রের শাসক দলের নেতাদের।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ