নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: পুজো মরশুম মানেই থিমের ভাষাতত্ত্ব। ভারতীয় ভাষাতত্ত্বের সরণিতে যেমন ইন্দো-আর্য ভাষাগোষ্ঠী এক নিবিড় জটিল সমন্বয় তৈরি করেছে। পুজো মরশুমেও তেমনই থিমকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল ধারার মনোহর বিন্যাস। সেকারণেই দেবীবন্দনায় মিশে যায় সামাজিক জটিলতার আখ্যান। বাউল সাধনার ধারাকে মনোরঞ্জনের রঙে চুবিয়ে পুজোর আয়োজন মাতেন উদ্যোক্তারা। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
বৃদ্ধাশ্রমকে সামাজিক ব্যাধি হিসাবে দেখতে চাইছেন কেওটার ফুলবাগান উন্নয়ন সমিতির পুজো উদ্যোক্তারা। ফুলবাগানের মণ্ডপে এবার গড়ে উঠছে আস্ত এক তিনমহলা বৃদ্ধাশ্রম। যার প্রতিটি ঘরে থাকছে এক একটি সিন্ধুপ্রমাণ বিষাদকথা। ফুলবাগানের থিমের নাম, প্রতি-মা। প্রত্যেক মায়ের মনের কথা বৃদ্ধাশ্রমের আঙিনায় পুজো মরশুমে কেমন করে ডুকরে ওঠে, তারই এক অনবদ্য শিল্পময় নির্মাণ দেখা যাবে এই মণ্ডপে। একগুচ্ছ মডেল ব্যবহার করা হচ্ছে। থিমের সঙ্গে মানানসই আলোকসজ্জা থাকছে। আর থাকছে এক ভিন্নরকমের প্রতিমা। দেবী এখানে দশভুজা নন, নাগরিক চৈতন্যের রঙে রাঙিয়ে তাঁকে দ্বিভুজা করা হয়েছে। লক্ষ্মী-সরস্বতী এখানে মায়ের সাধারণ কন্যাসন্তান। কিন্তু তাঁরাই মা’কে আগলে রেখেছেন। পুত্রসন্তানদের রাখা হয়েছে মায়ের পায়ের কাছে। উদ্যোক্তারা বার্তা দিতে চেয়েছেন, পুত্রসন্তানদের জন্যই অধিকাংশ সময় মা’কে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হয়। গোটা আখ্যানে রয়েছে অনেকগুলি ভাবের সমাবেশ। যেমন, দ্বিভুজা দেবীর আটহাতের বিকল্প হিসেবে তাঁর চার সন্তানের আট হাতকে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে। পুজো উদ্যোক্তা পিঙ্কু ঘোষ বলেন, নতুনকে নিয়ে পুরানোর সঙ্গে থাকা, একত্রিত পরিবারের বার্তা দিতে চেয়েছি আমরা। ৫৪ বছর পার করে কেওটার নবীন সংঘ আবার ভিন্নভাবের এক থিম হাজির করেছেন। ক্লাবকর্তারা আলোর বর্ণময় আয়োজনে চোখ ধাঁধিয়ে দিতে চান। পুজোর থিমের নাম, আলোকমঞ্জরী। পাটের নানা উপকরণে মণ্ডপের অন্দর ও বাহিরসজ্জা করা হচ্ছে। সঙ্গে থাকছে আধুনিক ধারার মৃন্ময়ী দেবী। একটি বিপুল অর্ধচন্দ্রের উপরে অবস্থান করবেন দেবী দুর্গা। মণ্ডপসজ্জার অন্দরভাগ কিছুটা বিমূর্ত। বাইরে নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করা হয়েছে আলোর খেলা দেখাতে। মূল মণ্ডপের ভিতরে ঘূর্ণায়মান মঞ্চ থাকবে। সেটি আলোকমঞ্জরীর মূল চমক। পুজোর উদ্যোক্তা গৌতম দাস বলেন, এটি ভিন্নধর্মী আয়োজন, দর্শকদের পছন্দ হবেই। চুঁচুড়ার মার্কণ্ডগলি সর্বজনীন এবার ৪৯ বছরে বাউলকে আশ্রয় করে প্রেমের সুরে বেঁধেছে দেবীকে। মার্কণ্ডগলির থিম, গেরুয়া মাটির পথে। মণ্ডপজুড়ে বাউলের পোশাক, তাঁদের ব্যবহৃত একতারা-দোতারা’র মতো বাদ্যযন্ত্রের বিপুল সমাবেশ থাকবে। সঙ্গে শীতলপাটি দিয়ে নকশাদার অন্দরমহল দেখা যাবে। পুজোর উদ্যোক্তাদের মতে, শিব অনেকটা বাউলের মতো প্রেমিক। দেবীদুর্গাও সাধনভজনের মধ্যে দিয়েই পেয়েছিলেন শিবকে। বাউলের সাধনতত্ত্বকে সেই শিবদুর্গার প্রণয়কথার মধ্যেই বিকশিত করতে চেয়ে পুজোর আয়োজন করেছে মার্কণ্ডগলি। হিমালয়ের প্রেক্ষাপটে অবশ্য প্রণয়রত শিবদুর্গার সঙ্গে তাঁদের সন্তানসন্ততিরাও থাকবেন। পুজোর উদ্যোক্তা সৌরভ দাস বলেন, ভাব ও ভাবনার অনবদ্য সমাবেশ দেখা যাবে।