Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বাবা-মায়ের সান্নিধ্যহীন শৈশবেই লালিত হয়েছে ‘অপরাধের বীজ’, কৃষ্ণনগরে ছাত্রী হত্যাকাণ্ডে ব্যাখ্যা বিশেষজ্ঞদের

কৃষ্ণনগরে ছাত্রী হত্যাকাণ্ডে উদাসীন অভিভাবকত্বের প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত। শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সতর্কবার্তা। বিস্তারিত পড়ুন।

বাবা-মায়ের সান্নিধ্যহীন শৈশবেই লালিত হয়েছে ‘অপরাধের বীজ’, কৃষ্ণনগরে ছাত্রী হত্যাকাণ্ডে ব্যাখ্যা বিশেষজ্ঞদের
  • ১০ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: ‘নেগলেক্টফুল প্যারেন্টিং’—বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায় উদাসীন অভিভাবকত্ব। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় একান্নবর্তী পরিবারের কনসেপ্ট উধাও। ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ছোট সংসারও সুখের নয়। বাবা-মায়ের নিত্য অশান্তি। আবার শান্তির খোঁজে চার হাতে রোজগার চাই। সন্তান বড় হচ্ছে নিজের মতো করে। তাদের আবেগ-অনুভূতি বাবা-মায়ের কাছে চরম অবহেলিত। ফলে, শৈশব ধাবিত হয় বিশৃঙ্খল, অসহিষ্ণুতার পথে। কৃষ্ণনগরে নামি স্কুলে প্রথম শ্রেণির ছাত্রী খুনে জড়িত নবম শ্রেণির দুই দিদির এমন মনস্তত্ব পর্যালোচনা করে মনরোগ বিশেষজ্ঞদের সিদ্ধান্ত—উদাসীন অভিভাবকত্বই তাদেরকে বিগড়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে তাঁদের সতর্কবার্তা, বাবা-মা যতই দূরে থাক প্রতিদিন অন্তত দু’বার সন্তানদের মনে উঁকি মারুন। তাদের সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম আবেগ অনুভূতিকে মর্যাদা দিন। তা না হলে এই ধরনের হাড়হিম করা ঘটনা সমাজকে নাড়িয়েই ছাড়বে। 

Advertisement

‎কৃষ্ণনগর কুইন্স উচ্চ বিদ্যালয়ের হস্টেলে মূলত পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন পড়ুয়ারা থাকে। নানা কারণে পরিবারের সমস্যার জেরে তারা বাবা-মায়ের ভালোবাসার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত। ছোট্ট সঞ্জনাকে নির্মমভাবে খুনে অভিযুক্ত  ধৃত দুই পরিবারেও একই সমস্যা রয়েছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, নিশ্চয় ওদের পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে অশান্তি, বাবা-মায়ের মধ্যে মিল নেই। অভিভাবক ছাড়াই বেড়ে উঠেছে। ফলে, ভালোবাসা, মায়া-মমতা, সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতা ওদের মধ্যে অনেক কম। কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল কিংবা কোনটা অন্যায়, কোনটা ন্যায়, তা উপলব্ধি করার ক্ষমতা ওরা হারিয়েছিল। তাই, এতবড় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েও নবম শ্রেণির দুই পড়ুয়া নির্বিকার। 
পুলিশের তদন্তেও উঠে আসছে একই তথ্য। তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন,  ধৃত দুই কিশোরীর পরিবারেই অস্থিরতা রয়েছে দীর্ঘদিন। একজনের বাবা-মা আলাদা থাকেন। অন্যজনের বাবা-মা পরিযায়ী শ্রমিক। ভিনরাজ্যে কাজ করেন। দীর্ঘ সময় তারা পরিবার থেকে দূরে থেকে বড় হয়েছে। নিহত সঞ্জনার মাও কর্মসূত্রে গুজরাতে থাকেন। বাবার সঙ্গে মায়ের বিচ্ছেদ। মা বর্তমানে অন্য পুরুষের সঙ্গে সংসার পেতেছেন। তাকে সৎবাবা বলে জানত সঞ্জনা। 
‎স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ও আবাসনের সুপার তন্বী সরকার এদিন বলছিলেন, ‘আমাদের হস্টেলে যারা থাকে, তারা সাধারণত পরিবারিক সমস্যার কারণে বাবা-মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন। ফলে, শিশুদের মধ্যে একটা মানসিক চাপ থাকেই। খুনের ঘটনায় যে দুজনকে ধরা হয়েছে, তাদেরও পরিবারিক একটা সমস্যা রয়েছে। তা হলেও ওরা সবাই নিজেদের মধ্যে মিলেমিশে একসঙ্গে আনন্দ করেই থাকত। পারিবারিক বিষয় নিয়ে ওরা খুব একটা আলোচনা করত না।’ 
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া ছেলে-মেয়েদের এই আলোচনার পরিসর বাড়ানোর উপরই জোর দিয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নরোত্তম হালদার। তিনি  বলছিলেন, ‘পরিবারে নিত্য অশান্তি লেগে থাকলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সন্তানরা। শৈশবে বাবা-মায়ের অবহেলার শিকার হয় তারা। ফলে বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই অনুশাসন, ভালোবাসা, মায়া-মমতা অনুভূতি কোনওটাই থাকে না। অনেক সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের মতানৈক্য তৈরি হয়। প্রাপ্তবয়স্ক না হলে সেটিকে কানডাক্ট ডিসঅর্ডার বলা হয়। আর সেটা হলে অপরাধমূলক কাজকর্মে ঝোঁক বাড়ে। এমনকী, যে কোনো মুহূর্তে ওরা হত্যার মতো ভয়ানক অপরাধ ঘটিয়ে দিতে পারে। বেপরোয়া আচার-আচরণও করে থাকে।’ 
সঞ্জনা খুনে ধৃত স্কুলের দুই দিদির মধ্যে এমন বেপরোয়া আচরণ লক্ষ্য করছেন তদন্তকারীরা। অভিযুক্তদের একজন দেড় বছর হস্টেলে রয়েছে। অন্যজন মাস ছয়েক হল এসেছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় অভিযুক্ত দুই কিশোরীর মানসিক স্থিরতা দেখে তাজ্জব দুঁদে পুলিশ অফিসাররাও। এত বড় অপরাধের পরও দু’জনের মধ্যে অনুশোচনা নেই, অনুতাপ নেই। অপরাধ সংগঠনের পর নিজেদের অবস্থানে অটল থাকার যে মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়েছে, প্রাপ্তবয়স্ক দাগি অপরাধীকেও হার মানাবে! ‎

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ