


ইতিহাসে কতশত রানি। কতই না তাঁদের কীর্তি! কিন্তু এঁদের সাম্রাজ্যে উঁকি দিলে বোঝা যায় বুদ্ধি ও গোপন চাল দিয়েই বিস্তর ষড়যন্ত্র ও বাধাকে তাঁরা টেক্কা দিয়েছেন। তাঁদের নানা সম্পর্ক ও জীবন ফিরে দেখলেন সমৃদ্ধ দত্ত।
রানি দুর্গাবতী
যুবরানি সাবধান!
চিৎকার করল আধার সিং।
দুর্গাবতী সেই চিৎকার গ্রাহ্য করল না। ১৩ বছর বয়সে সে ইতিমধ্যেই যে যুদ্ধবিদ্যা শিখে নিয়েছে, সেখানে আচমকা বলশালী ঘোড়ার অতিরিক্ত জোরে দৌড়নোর জেরে অপটু আরোহীদের মতো পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু সেনাপতি জুমের সিং ছাড়া এই অশ্বকে কেউ লাগাম পরাতে পারে না।
মাহোবের রাজা কিরাত রাই সেনাপতিকে বলেছিলেন, দুর্গাবতীকে অশ্বারোহণ আর অস্ত্রবিদ্যায় প্রশিক্ষণ দাও জুমের। তবে তোমার আস্তাবলের অশ্বদের ব্যবহার কোরো না, বাচ্চা মেয়ে, দুর্ঘটনা ঘটবে। সেদিনই সেকথা কানে যাওয়ার পর দুর্গা ভেবে নিয়েছিল কত দ্রুত সে ওই সেনাপতির আস্তাবলের অশ্বেই সওয়ার হবে।
আজ সেই দিন। কয়েক মাস ধরে প্রশিক্ষণ চলছে। তবে সেনাপতি হওয়ায় সর্বদা যুবারানিকে ভোর থেকে প্রশিক্ষণ দিতে পারেন না জুমের সিং। তিনি মাঝেমধ্যেই চলে যান রাজত্বের সীমান্ত প্রদেশে। কারণ, পাশেই গোন্দোয়ানার গড়হা কাতাঙ্গা রাজ্যের সংগ্রাম সিং সর্বদাই যেন ঘাড়ের কাছে শ্বাস ফেলছেন। তাঁর লক্ষ্য এই ক্ষুদ্র মাহোব রাজ্যটি। অতএব যখন তখন সীমান্তে হানা দেয় সংগ্রাম সিং-এর সেনা। জুমের সিং তাই সতর্ক থাকেন। নিজেই সেনাবাহিনি নিয়ে টহল দেন ওইসব সীমান্তে। তাঁর মহারাজার সেই শক্তি নেই যে, এককভাবে সংগ্রাম সিংকে কোনও যুদ্ধে শায়েস্তা করবেন। প্রশ্নই নেই। সামান্য সেনাবাহিনি। তবু, রাজপুত রক্ত তাঁদের শরীরে। ওই গোন্দ সম্প্রদায়ের সংগ্রাম সিং শাহের বশ্যতা স্বীকার করার প্রশ্ন নেই। জায়গাটা বুন্দেখলন্ডের অন্তর্গত। এক রাতের অশ্বারোহণে পৌঁছে যাওয়া যায় জব্বলপুর।
যখন নিজে থাকেন না রাজধানীতে, সেই সময় মহারাজার আদরের বড় কন্যা দুর্গাবতীর অস্ত্র প্রশিক্ষণ যেন বন্ধ না হয়। অতএব কখনও সহযোদ্ধা রতন সিং এবং কখনও আবার নিজের পুত্র আধার সিংকে সেই দায়িত্ব সঁপেছেন। প্রথম প্রথম ১৬ বছরের আধার সিং-এর উপর বিশ্বাস ছিল না যুবরানি দুর্গাবতীর। এই কিশোর আবার তাঁকে কী শেখাবে? কিন্তু ক্রমে দুর্গাবতী বুঝতে পারছেন যে, এই কিশোরের অস্ত্রশিক্ষা ও যুদ্ধবিদ্যার নৈপুণ্য কখনও হয়তো তার পিতাকেও ছাপিয়ে যায়।
আধার সিং-এর প্রশিক্ষণ পছন্দ হওয়ার কারণ হল, সে স্পষ্ট কথা বলে। যুবরানি হওয়ায় কোনও বিশেষ সমীহ সম্ভ্রম দেখায় না। কয়েকদিন আগে যুবরানি দুর্গাবতী প্রশ্ন করেছিল, আমার অসিযুদ্ধ কেমন লাগল তোমার? আধার সিং বলেছিল, খুবই ভালো। তবে একটা দুর্বলতা এখনও আছে।
দুর্বলতা? সেটা কী? দুর্গাবতী বিস্মিত হলেন। তাঁর প্রধান প্রশিক্ষক রাজ্যের সেনাপতি জুমের সিং তাঁকে অসিযুদ্ধ শিখিয়েছেন। তিনি নিজে বলেছেন, যুবরানি খুব দ্রুত উন্নতি করেছেন। অথচ এই ছেলেটি বলছে, দুর্বলতা? কিছুটা ক্ষুব্ধ হলেও দুর্গাবতী বললেন, কী দুর্বলতা দেখতে পেলে?
আধার সিং চোখে চোখ রেখে বলল, অসিযুদ্ধের সময় শরীরের প্রতিটি স্নায়ু, মুখমন্ডল যেন খুব শিথিল থাকে। আপনি একটু যেন শক্ত হয়ে যাচ্ছেন। আপনার মুখমন্ডল দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত, আপনার দেহ শক্ত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অসিযুদ্ধে সর্বদাই শরীরকে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাই হালকা, শিথিল। ওরকম শক্ত হয়ে থাকলে প্রতিপক্ষের আক্রমণ এড়ানো সর্বদা সম্ভব নয়। আর উত্তেজনা বেশি করে দানা বাঁধে।
কয়েক নিমেষ চিন্তা করে দুর্গাবতী বুঝলেন, সম্পূর্ণ সঠিক কথা। বুঝলেন, আধার সিং অত্যন্ত ভালো পর্যবেক্ষক। জুমের সিং-এর পর আগামী দিনে এই কিশোরই হয়তো আমাদের রাজ্যের যোগ্য সেনাপতি।
তিন মাস পর। আজকাল রতন সিং প্রশিক্ষণের জন্য প্রস্তুত হলে, দুর্গাবতী বলেন, আমি আধার সিং-এর কাছে প্রশিক্ষণ নেব। আপনি বিশ্রাম নিন আজ! সেকথা রতন সিং একাধিকবার শুনেছেন। আর জুমের সিংকে বলেওছেন। এক অজ্ঞাত হাসি ফুটে ওঠে জুমের সিং এর ঠোঁটে। যদিও মহারাজার কানে গেলে...। তবু নিয়তি কে খণ্ডাবে! আশায় বুক বাঁধেন জুমের সিং।
আধার সিং নীচু হল। নিজের মুষ্ঠিবদ্ধ দুই হাত সামনে ঝুলিয়ে রাখল। দুর্গাবতী এতদিন কিছু বলেননি। আজ বললেন, তুমি একজন পরিচারককে ডেকে আনো। এভাবে তোমার হাতের উপর পা রেখে অশ্বপৃষ্ঠে উঠতে হয়, এটা আমার ভালো লাগে না। তুমি আমাদের সেনাবাহিনির ভবিষ্যৎ সেনাপ্রধান। এই ছোট কাজ তুমি কেন করবে!
আধার সিং এর কালো চুল ঘাড়ে এসে নেমেছে। গায়ের রং তামাটে। চকচক করছে চোখ। নিটোল বাহু, কোমর এবং চওড়া কাঁধ। কিশোর নয়। যেন পূর্ণ বয়স্ক এক যুবা। সে নীচু হয়েই বলল, এটা আমার সম্মান বলে মনে করি। যুবরানি যে আমার দুই করবন্ধনীতে পা রেখে অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করছেন এই সময়টুকু মনে হয়, যুবরানির কোনও একটি নির্ভরশীলতা তো হতে পারলাম।
দুর্গাবতী হেসে ওঠেন। এরকমই একটি দিন আজ। জুমের সিং সীমান্তে। আধার সিং এসেছে যুবারানিকে অশ্বপৃষ্ঠেই কীভাবে নিক্ষেপ করতে হয় বল্লম, কীভাবে সামনে বা পিছন থেকে আসা আক্রমণ প্রতিহত করতে হয়, সেটি শেখানো হবে। যা যুদ্ধবিদ্যায় অত্যন্ত জরুরি এক পর্ব। কিন্তু দুর্গাবতী আজই জেদ করেছেন যে, আজ জুমের সিং-এর সবথেকে তেজী অশ্ব পবনের পৃষ্ঠে আরোহণ করবেন।
শিউরে উঠেছিল আধার সিং। প্রথমত এ এক আত্মহত্যা। দ্বিতীয়ত পিতা জানতে পারলে তো বটেই, মহারাজার কানে গেলেও সর্বনাশ তার উপর দোষ চাপবে। আর সেই দোষের ভাগীদার হবেন পিতা জুমের সিং। কিন্তু দুর্গাবতী বললেন, মহারাজা আমার পিতা। তাঁর মনোভাব আমি জানি। তাঁকে জানানোর কর্তব্য আমার। অতএব আনো সেই অশ্ব। এই হল সেই অশ্ব। যার উপর বসে আজ হবে অসিযুদ্ধের কৌশল রচনা। দ্রুত ছোটাতে হবে। পায়ের খোঁচায় লাগামের ইশারায় নিমেষে গতি বৃদ্ধি করে পবন। পিছনে নিজের অশ্বে ছুটে আসছে আধার সিং। তার হাতে একটা লাঠি। যেন ওটাই তীক্ষ্ণ বর্শা। এভাবেই হবে প্রশিক্ষণ।
পিছনে অন্য অশ্বকে তীব্র বেগে আসতে দেখে পবনের বেগ বৃদ্ধি পেল আরও। আর মুখ ফিরিয়ে দুর্গাবতী আধারের হাতে লাঠি দেখে আচমকা উঠে দাঁড়ান অশ্বপৃষ্ঠে।
এ কি! সর্বনাশ! ঠিক তখনই চিৎকার করে উঠল আধার সিং, যুবরানি সাবধান! পড়ে যাবেন!
দুর্গাবতীর অবিশ্বাস্য ভারসাম্য। ওই অবস্থায় অশ্বপৃষ্ঠে নিজেকে স্থির রেখে হাতের লাঠি ছুঁড়ে মারলেন আধারের দিকে। আধার সঙ্গে সঙ্গে নিজের গোটা শরীরকে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে বাঁদিকে নামিয়ে আনল। ঘোড়ার উপর দিয়ে সেই লাঠি উড়ে গেল! কিন্তু আধার ওই অবস্থায় চিৎকার করে বলল, বসে পড়ুন... বসে পড়ুন।
হেসে বসে পড়লেন দুর্গাবতী। একটা প্রবল ঝাঁকুনি দিল পবন। ছিটকে পড়ে যাচ্ছে সে। কিন্তু লাগাম ধরে ফেলল! আর পাশে তখন এসে পড়েছে আধার সিং-এর অশ্ব। আধারও চলন্ত অশ্ব থেকেই ঝাঁপ দিয়ে বসে পড়ল পবনের উপর। আর তুলে নিল দুর্গাবতীকে পলকের মধ্যে নিজের সামনে।
সর্বশক্তি নিয়ে লাগামে টান দেওয়ায় সামনের দুই পা উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল পবন। আধার আর দুর্গাবতী কিন্তু পড়ে গেল না।
আজ আপনি অত্যন্ত অযথা ঝুঁকি নিলেন। আধারের নাক মুখ থেকে আগুনের মতো শ্বাস পড়ছে। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঝাঁপ দিয়ে নীচে নেমেই এবার কোমরবন্ধনী থেকে অসি নিয়ে আক্রমণ করল আধারকে দুর্গাবতী। আধার হতচকিত হয়ে ঝাঁপিয়ে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে গেল অন্য প্রান্ত দিয়ে। তাঁর চোখে বিস্ময়!
দুর্গাবতী হাসছে। বলল, দেখলে তো, এরকম সময় তোমার উচিত ছিল তরবারি বের করে আমার তরবারিকে প্রতিহত করা। তুমি প্রাণভয়ে অশ্ব থেকেই ঝাঁপ দিলে!
আধার বলল, এটাও যুদ্ধের অঙ্গ! যুদ্ধে জয় আসল কথা। নিজের প্রাণ রক্ষা প্রকৃত লক্ষ্য। আগে সেটা। তারপর শত্রুকে পরাহত করা। কিন্তু আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনার যুদ্ধবিদ্যা অনেকটাই সম্পন্ন। আরও কিছু মাসের মধ্যে আপনি সম্পূর্ণ যুদ্ধবিশারদ হয়ে উঠবেন।
দুর্গাবতীর জন্ম হয়েছিল ১৫২৪ সালে চান্দেলা রাজপুত পরিবারে। তাঁর পিতার নাম কিরাত রাই। আবার মতান্তরে শালিবাহন। মাহোবা রাজ্যটি আসলে একটি জমিদারি বলা চলে। তবে চান্দেলা রাজ্যের এই হাল ছিল না। খাজুরাহো শাসন করত এই বংশের রাজা একসময়। কিরাত রাই কিংবা শালিবাহন যে নামই হোক মহারাজার, তিনি নিজের দুই কন্যাকেই চেয়েছিলেন পুত্রসন্তান হিসেবে মানুষ করতে। কারণ পুত্র ছিল না তাঁর। আর তাই দুর্গাবতী এই কিশোরী বয়সেই অস্ত্র ঘেকে যুদ্ধ ও শাস্ত্র, প্রতিটি বিদ্যায় পারদর্শী। সেনাপতি জুমের সিং বহুদিন ধরেই আড়াল থেকে লক্ষ্য করেন নিজের পুত্র যেভাবে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যুবরানিকে, সেই প্রক্রিয়া। তাদের আচার আচরণ। রতন সিং তাঁকে একাধিকবার বলেছে যে, যুবরানি তার কাছে নয়। আসলে বারংবার জেদ করে যে আধার সিং এর কাছে প্রশিক্ষণ নেবে। এই সব কিছু কি কোনও ইঙ্গিতবাহী নয়? নিশ্চয়ই তাই? সুতরাং স্বপ্ন দেখতে দোষ কী?
ঠিক এরকমই সময় হঠাৎ উত্তর ও ভারতে ঝড় চলছে। হুমায়ুনের খোঁজে যখন তখন হানা দিচ্ছে বিভিন্ন রাজ্যে এক বাহিনি। বিহারের শাসক শের শাহ সুরির এই বাহিনি। শের শাহের ধারণা হয়েছে, হুমায়ুনের প্রতি সহানূভূতি সম্পন্ন হয়ে বুন্দেলা, বাঘেলা, রাজপুত, গোন্দ, মালওয়ার কোনও না কোনও রাজ্য হুমায়ুনকে আশ্রয় দিয়েছে। নিশ্চয়ই গোপনে কোথাও বাস করছে হুমায়ুন। তাই শের শাহের সেনা এমনকী তিনি নিজেও হাজির হয়ে চাপ সৃষ্টি করেন এইসব শান্তিপূর্ণ রাজ্যে।
হঠাৎ ছুটে এল দুই প্রহরী। মহারাজা শালবাহন বসে আছেন শয্যাকক্ষে। কী ব্যাপার!
তারা বলল, মহারাজা সংগ্রাম সিং শাহ আসছেন! সঙ্গে তাঁর পুত্র।
তৎক্ষণাৎ উঠে বসলেন মহারাজা। বললেন, সৈন্য সামন্ত নিয়ে? আক্রমণ করতে?
না মহারাজা। দূর থেকে সেরকম মনে হল না। খুব বেশি হলে ২০ জন হবে সঙ্গে। তবে বাহিনি নেই। কী করব?
মহারাজ চিন্তিত মুখে বললেন, সেনাপতিকে খবর দাও।
জুমের সিং বললেন, আমার মনে হয় না এখনও কোনও বিপদের সম্ভাবনা আছে। আপনি দেখা করুন।
গোন্দোয়ানার সবথেকে বৃহৎ এবং শক্তিশালী রাজ্য গড়হা। সংগ্রাম সিং এর এই রাজ্যে ৭০ হাজার গ্রাম। বাড়তে বাড়তে বাংলার কাছেও পৌঁছে গিয়েছে সীমানা। এহেন সংগ্রাম সিং নিজেই আসছেন সামান্য চান্দেলা রাজের কাছে?
সাদরে অভ্যর্থনা করা হল তাঁদের। সংগ্রাম সিং এর সঙ্গে রয়েছে পুত্র দলপত শাহ। কাী কারণে আসা?
সংগ্রাম সিং বললেন, সোজা কথা স্পষ্টভাবে বলা ভালো। আমার কিছু বাহিনিকে আপনি যদি কালিঞ্জর দুর্গে রাখার ব্যবস্থা করেন। তাহলে শের শাহের বিরুদ্ধে আমরা একজোট হয়ে আগাম তৈরি থাকতে পারি। এজন্য আমি আপনাকে নির্দিষ্ট অর্থ দিতে রাজি। এমনকী একাংশ যদি আমাকে বিক্রি করেন তাহলে খুব ভালো হয়। আমরা একইসঙ্গে মালিকানা নিয়ে সেখানে একটি শক্ত ঘাঁটি করতে পারি। কারণ কালিঞ্জরে আমরা থাকলে শের শাহ আমাদের নাগাল পাবে না।
কারাত সিং চমকে গেলেন। কালিঞ্জর দুর্গই তাঁর রাজ্যের একমাত্র গৌরবের এক কেল্লা। ওরকম সুন্দর ও সুবিশাল দুর্গ আর কোথায়? এই দুর্গের দিকে নজর পড়েছে সংগ্রামের? আসলে একবার প্রবেশ করলে আর বেরবে না সংগ্রামের সেনা।
তিনি মুখে কিছু বললেন না। হেসে বললেন, আমি একটু চিন্তা করে দেখছি। আপনার প্রস্তাব খুবই ভালো। কয়েকদিনের মধ্যেই জানাব। সংগ্রাম বুঝলেন, কিরাত রাই সম্ভবত প্রত্যাখ্যানই করলেন। তিনি ক্ষুণ্ণ হলেন। তবে মুখে কোনও কথা বললেন না।
কিরাত রাই সেদিনই স্থির করলেন কালিঞ্জার দুর্গ ফাঁকা রেখে দেওয়া যাবে না। সংগ্রাম সিং একটা কথা ঠিক বলেছেন। সত্যিই শের শাহ আসছে। যে কোনও সময় আক্রমণ করবে। হুমায়ুনের সঙ্গে কিরাত সিং এর সম্পর্ক ভালো। এমনকী বাবর ক্ষমতা দখলের পরই আশেপাশের হিন্দু রাজন্যবর্গকে ডেকে এনে সন্ধি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, কোনও আশঙ্কার কারণ নেই। সকলের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রেখে চলবেন তিনি। পাঠান, আফগানরা যদি আক্রমণ করে কোনও রাজ্যকে, মোগলরা সাহায্য করবে সেইসব দেশীয় রাজাকে। সেই সময় আগ্রায় গিয়ে দেখাও করেছিলেন বাবরের সঙ্গে কিরাত। অতএব ধরেই নেওয়া হবে যে, তিনি হুমায়ুনের বন্ধু। অতএব কিরাত সিং সেনাবাহিনি নিয়ে কিছুদিনের জন্য হলেও চলে গেলেন কালিঞ্জার দুর্গ।
আশঙ্কাও সত্যি হয়েছে। শের শাহের দুই পুত্র আদিল শাহ এবং ইসলাম শাহ। আদিল শাহ জৈষ্ঠ্য পুত্র। কিন্তু এখনও শের শাহ আভাস দেননি যে কাকে তিনি তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে বাছাই করবেন। অতএব দুজনের মনের ইচ্ছাই একই। একদিন পিতার স্থলাভিষিক্ত হওয়া। ক্রমেই এই দুই পুত্রের সহায়তায় শের শাহ নিজের সাম্রাজ্য বাড়াচ্ছেন। বাংলা, বিহার থেকে বাড়িয়ে আরও পশ্চিমে অগ্রসর হয়েছে তারা। আর একদিন মাহোবা এবং কালিঞ্জার দুর্গের বাইরে ইসলাম শাহ উপস্থিত হয়েছে। সে আক্রমণ করছে না। কিন্তু কিরাত সিং রাইকে বার্তা দিয়েছে, আত্মসমর্পণ করতে। ইসলাম বলেছে , মহারাজা আপনার এই দুর্গ আমরা নেব। কিন্তু আপনার রাজ্য আপনারই থাকবে। শের শাহ জানেন ভারতে প্রধান শক্তি হল দুর্গ নিজেদের দখলে থাকা। অতএব যেন স্নায়ুর লড়াই চলছে। কিরাত সিং পরিবার নিয়ে দুর্গের মধ্যে। আর বাইরে বসে রয়েছেশের শাহের বাহিনি।
কতদিন এভাবে বসে থাকব? আমরাই কেন আক্রমণ করছি না? জানতে চায় দুর্গাবতী। মহারাজা বললেন, আমাদের সেই শক্তি নেই যে সুলতানকে হারাব। ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে। ওরা কতদিন অপেক্ষা করবে? নিজেরাই চলে যাবে। যারা এই দুর্গ চায়, তারা দুর্গ ধ্বংস করবে না।
দুর্গাবতী ভাবছেন, আমরা সংগ্রাম সিং এর সহায়তা চাইছি না কেন? কিন্তু একথা বললেন তার পিতা ক্রুদ্ধ হবেন। অতএব কথাটা মনে রইল। দুর্গের পিছনের একটি গোপন সুড়ঙ্গ রয়েছে। যেটা যায় জঙ্গলে। সেটি অনেকেই জানে না। দুর্গাবতী সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে জঙ্গলে যায় মাঝেমধ্যেই। দুর্গে বসে বসে তার আর ভালো লাগে না। হাতে থাকে তির ধনুক। পিঠে বাঁধার বর্শা। সে যায় শিকার করতে।
মাঝেমধ্যেই তাঁর এই গোপন অভিযানের সময় জঙ্গলে দেখা হয় এক তরুণের সঙ্গে। সেই তরুণ যে ঠিক কী কারণে এভাবে জঙ্গলে ঘুরছে কে জানে? একদিন দুর্গাবতীর মাথার উপর একটি গাছ ভেঙে পড়ছিল। ঝাঁপ দিয়ে পিছন থেকে কেউ এসে তাকে সরিয়ে দিল। আর অন্য হাতে সেই গাছকে ধরে ফেলল। তরুণের পরিচয় থেকে জানা গেল সে সংগ্রাম সিং এর রাজ্যের রাজকর্মচারী। এখানে আসার কারণ শের শাহের বাহিনির গতিপ্রকৃতি জানতে। কারণ, তাদেরও সতর্ক থাকতে হচ্ছে যে, কখন কীভাবে আক্রমণ করবে শের শাহ।
আপনি আমার একটি কাজ করে দেবেন? জিজ্ঞাসা করল দুর্গাবতী।
তরুণ বলল, হ্যাঁ বলো না!
আমাদের রাজা যদি সংগ্রাম সিং এর সাহায্য চান কিংবা প্রস্তাব দেন, তাহলে কি তিনি সাহায্য করবেন? এই বার্তাটিা মহারাজা সংগ্রাম সিংকে দেওয়া।
তরুণ বিস্মিত। বলল, এটা কি তোমাদের মহারাজাই বলেছেন!
দুর্গাবতী ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল, একেবারেই নয়। বরং উনি জানতে পারলে ক্ষতি হবে আমার।
তোমার? কেন? তোমার কেন ক্ষতি হবে?
দুর্গাবতী বলল, কারণ আমি তাঁর মেয়ে।
তরুণ আকাশ থেকে পড়ল। বলল, মাহোবের যুবরানি! তোমার শৌর্য সম্পর্কে অনেক শুনেছি। তুমিই সেই।
কয়েকদিন পর আবার দেখা। তরুণ বলল, আমাদের মহারাজ বললেন, যদি তোমাদের মহারাজা নিজে কিংবা দূত মারফৎ আমাদের সাহায্য চান, আমরা রাজি।
তোমাকে বললেন? তুমি সরাসরি তোমাদের মহারাজের কাছে যেতে পারো! দুর্গাবতী বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলেন।
তরুণ বললেন, হ্যাঁ। এমনকী যদি সেরকম দরকার য়ে, আমাকেই তো আসতে হবে। সেনা নিয়ে।
জিজ্ঞাসূ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল দুর্গাবতী। তারপর বলল, কে বলো তো তুমি?
তরুণ হেসে বলল, আমার নাম দলপত শাহ! মহারাজার পুত্র।
চমকে উঠে দুর্গাবতী বলল, সেকি! আপনি…আপনি…গোন্দ কাতাঙ্গার যুবরাজ! ক্ষমতা করবেন! আমি চিনতে পারিনি! দলপত বললেন, চিনতে পারলে কী করতে? কথা বলতে না! আমরা পারস্পরিক শত্রু রাজ্য বলে?
দুর্গাবতী সচরাচর লজ্জা পায় না। এই প্রথম যেন তার মুখে পড়ল সেই লাজুক আলো। এই তরুণের প্রতি এবার সে যেন পূর্ণাঙ্গ নয়নে তাকিয়ে রইল। দলপত শাহ সেই চোখে নিজের চোখ স্থাপন করল।
আদিল শাহ এবং ইসলাম শাহের পক্ষে সম্ভব হল না কালিঞ্জার দুর্গ দখল করা। আর তাই আসতে হয়েছে খোদ শের শাহকে। নিয়তির কী আশ্চর্য ইচ্ছাপত্র। যে শের শাহ এতদিন ধরে বারংবার ছেলেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, কোনওভাবেই কালিঞ্জার দুর্গ ধ্বংস করা যাবে না, সেই তিনিই রণথম্ভোর থেকে কালিঞ্জারে এসে কয়েকদিন অপেক্ষা করে ধৈর্য হারালেন। আর সহ্য করা যায় না। চিৎকার করে বললেন, কিরাত সিং এই শেষবার বলছি আত্মসমর্পণ করতে। কাল সকালে আক্রমণ করব। তৈরি হও।
কিন্তু পরদিন সকালে নিজের কামানের গোলা ফেটে খোদ শের শাহেরই মৃত্যু হল। যা অবিশ্বাস্য। এত যুদ্ধের নায়ক, মোঘল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হুমায়ুনকে যিনি জঙ্গল থেকে মরুতে পালিয়ে পালিয়ে পথে ঘাটে থাকতে বাধ্য করছেন, সেই প্রতাপশালী শের শাহের এভাবে মৃত্যু হল নিজের কামানের গোলার আঘাতে।
বুন্দেলখন্ড আর গোন্দোয়ানা স্বস্তি পেল। এবার অপেক্ষা কবে আসবেন হুমায়ুন। যদিও এতটা সহজ নয়। আর ঠিক এরকমই এক স্বস্তিপূর্ণ আবহে মহারাজা শালবাহন জানতে পারলেন এক আশ্চর্য খবর। তাঁর বড় কন্যা নাকি সংগ্রাম সিং শাহকে বিবাহ করতে উন্মুখ। শত্রুপক্ষকে? এ কীভাবে সম্ভব? কিরাত সিং শালবাহন রাজি নয় কিছুতেই। তারা ক্ষত্রিয় রাজপুত। আর সংগ্রাম শাহের পরিবার গোন্দ উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত। এই সম্পর্ক অবাস্তব।
কিন্তু ইতিহাস বলে সেই বিবাহ হয়েছে। কীভাবে হল? একাধিক অভিমত। একটি তথ্য বলছে, যা কার্যত লোকগাথায় পরিণত হয়েছে। সেটি হল, বহু চেষ্টাতেও যখন পিতাকে রাজি করানো যায়নি, তখন দুর্গাবতী একাই প্রাসাদ থেকে মধ্যরাতে বেরিয়ে এসেছিল। এবং অশ্বপৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে সোজা শ্বশুরবাড়িতে। কে নিয়ে এসেছিল তাঁকে সংগ্রাম সিং দলপত শাহের প্রাসাদে? শোনা যায় আধার সিং! অর্থাৎ দুর্গাবতীকে যে সেনাপতিপুত্র দিয়েছিলেন যুদ্ধ প্রশিক্ষণ। আধার সিং কিন্তু মনে মনে ভালোবেসেছিল যুবরানিকে। কিন্তু. যুবরানির পছন্দের মানুষ যে পাশের রাজ্যের রাজুকমার, একথা জানার পর আধার সিং নিজের ভালবাসা নিজের অন্তরেই গোপনে সমাধিস্থ করেছিল। তবে সে আর মাহোবায় ফিরে যাওয়ার সাহস করেনি। কারণ স্বাভাবিক। সে রাজকুমারীকে পালাতে সাহায্য করেছে এটা জানাজানি হয়ে গিয়েছে এতক্ষণে। সুতরাং তাঁর সাজা মৃত্যুদন্ডও হতে পারে।
১৫৪৫ সালে শের শাহের মৃত্যু হল। সেই বছরই বিবাহ হয়ে গেল দলপত এবং দুর্গাবতীর। আর সংগ্রাম সিংও সেই বছরই বললেন, আমি আর সিংহাসনে থাকব না। তোমাদের হাতে রাজ্য তুলে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হব। কারণ আমি জানি এই বউমা আমার রাজ্যের সবথেকে বড় শক্তি হতে চলেছে। অতএব দলপত শাহ রাজা হলেন বটে, আদতে কিন্তু প্রধান শাসনকর্ত্রী দুর্গাবতী। ভারতের ইতিহাসে আত্মপ্রকাশ করলেন এক বীর যোদ্ধা এবং পরাক্রমশালী শাসক। রানি দুর্গাবতী।
একমাত্র পুত্র বীর নারায়ণের জন্মের চার বছরের মধ্যেই হঠাৎ সামান্য অসুস্থতায় মৃত্যু হল দলপত শাহের। ২৬ বছরের রানি দুর্গাবতী সম্পূর্ণ একা। ঠিক এই সময় থেকে আশেপাশের রাজ্যগুলির নজর পড়ল গোন্দ বনের উপর। অর্থাৎ রানি দুর্গাবতীর রাজ্য। একজন রানি শাসক। সুতরাং কতদিন আর সামলাবে? সর্বাগ্রে মান্ডুর সুলতান বাজ বাহাদুর আক্রমণ করলেন সীমান্ত এলাকা। দুর্গাবতীর প্রিয় হাতির নাম শরমন। এই সেই হাতি যেটায় চেপে তিনি তাঁর স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত চলে গিয়ে তাজ খানকে পরাস্ত করেছিলেন যুদ্ধে। তাজ খান অবিশ্বাসের চোখে দেখেছিলেন যে, তাঁকে লক্ষ্য করে এক হাতির পিঠে থাকা নারী যে শৌর্যের সঙ্গে তির ছুঁড়েছে, সেটা যেন বাতাসকে পাল্লা দেয়। আর সেই সময় দলপত শাহ কামান দাগছিলেন। স্বামী ও স্ত্রীর যৌথ আক্রমণে তাজ খানের সেনাবাহিনি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। আজ দলপত শাহ বেঁচে নেই। রানি একা। কিন্তু বাজ বাহাদুর গান বাজনা শের শায়েরিতে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন। নিজের প্রজাদের তুষ্ট করতে গিয়েছিলেন যে, তিনিও যুদ্ধ করে দখল, করতে পারেন অন্য রাজ্য। আর তাই দুর্বল নারী শাসককে বেছে নিয়েছিলেন। ভুল করেছেন। কারণ গোন্দবন রাজ্যের যেদিনে পান্না, সেখানে দ্রুত পৌঁছে গিয়ে বাজ বাহাদুরকে ভোরে আক্রমণ করলেন রানি দুর্গাবতী। সঙ্গে মাত্র ২ হাজার সেনা। রানি দুর্গাবতীর পাশেই লড়াই করছেন তাঁর বিশ্বস্ত সেই সেনাপতি আধার সিং। আর যৌথ বিক্রমে বাজ বাহাদুর মাত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই পালালেন। কিছুদিনের জন্য নিশ্চিন্ত। তবে কতদিনের? কারণ চিল শকুনের মতোই সকলের নজর দুর্গাবতীর দিকে। এবং তাঁর রাজ্যের প্রতি।
দিল্লি আগ্রার রাজনীতি পালটাচ্ছে। যে বৈরাম খান ১৪ বছরের আকবরের অভিভাবক হয়ে চালাচ্ছেন মোগল সাম্রাজ্য, হঠাৎ তাঁর আড়ালে এক নারীর উত্থান ঘটছে। নারীর নাম মেহাম অঙ্গা। আকবরের ধাত্রীমাতা। ক্রমাগত মেহাম অঙ্গা আকবরকে বলে চলেছেন, তোমার একক কৃতিত্ব কিছুতেই নিতে দেবে না ওই বৈরাম খান। তোমাকে কুক্ষীগত করে রাখতে মরিয়া তিনি। তোমার শক্তি আছে। অতএব আকবর ক্রমেই স্থির করলেন আর বৈরাম খানের অধীনে নয়। এবার আত্মপ্রকাশ করতে হবে।
আত্মপ্রকাশের প্রথম ধাপ সাম্রাজ্য বৃদ্ধি। অতএব মালওয়া ও মান্ডু দখলে এল। পালিয়ে গেলেন বাজ বাহাদুর। আকবর যাঁকে পাঠিয়েছিলেন মান্ডু দখলে, সেই আদম খানের লক্ষ্য ছিল শুধুই মান্ডু মালওয়ার ধনসম্পদ নয়। আরও বেশি কিছু। বাজবাহাদুরের রানি রূপমতী। কিন্তু বাজ বাহাদুর যেত যুদ্ধে পরাস্ত হয়েছেন, এই সংবাদ পেয়ে আর অপেক্ষা করেননি সেই রূপমতী। অসামান্য গায়িকা ব্রাহ্মণ কন্যা রূপমতী কেনই বা রানি হয়েছিলেন বাজ বাহাদুরের? সেই প্রেমকাহিনি সর্বজনবিদিত। তাই নতুন করে আর উল্লেখযোগ্য নয় এই বীর রানিদের কাহিনিতে।
কিন্তু আকবরের নজরে আসলে রানি দুর্গাবতীর রাজ্য। প্রথম লক্ষ্য পান্না দখল। হেরাত থেকে আসা হুমায়ুনের অন্যতম বিশ্বস্ত এক সেনাপতি আসফ খানকে কারা মানিকপুরের শাসক করে পাঠিয়েছিলেন আকবর। আসফ খান প্রথমেই দখল করে নিলেন পান্না। হীরের খনির এই রাজ্য দখলে চলে আসায় এবার পাশের রাজ্য নিশানায়। অর্থাৎ রানি দুর্গাবতীর রাজ্য।
আসফ খান আকবরের অনুমতি চাইলেন। রাজিও হলেন আকবর। কিন্তু আগে জানতে হবে কী চাইছেন দুর্গাবতী। অতএব আকবরের দরবার থেকে পীর মহম্মদ এবং আলি কুলি খান উপস্থিত হলেন দুর্গাবতীর রাজসভায়।এঁরা দুজন আকবরের মনসবদার। একজন গোয়ালিয়রের। অন্যজন মান্ডুর। তাঁরা ছদ্ম বিদ্রোহী। বললেন, আমরা এসেছি মোগল সাম্রাজ্যকে হিন্দুস্তান থেকে দূর করতে। আপনি কি আমাদের সঙ্গে থাকবেন?
দুর্গাবতী বললেন, আপনারা তো মোঘল বাদশাহেরই মনসবদার। আপনারা সেই সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা বলছেন। বোঝা গেল না।
তাঁরা বললেন, কাবুলের সুলতান মীর্জা হাকিম, সম্রাটের খুড়তুতো ভাইয়েরা সকলে আসলে বাদশাহের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। আমরাও আছি। আপনি আমাদের সঙ্গে এলে আমাদের শক্তি বৃদ্ধি পাবে। তাই অনুরোধ।
কিন্তু আমাদের তো অন্য রাজ্যকে আক্রমণ করা কিংবা বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধ করা রীতি নয়। আমাদের রাজা দলপত শাহ বলে গিয়েছিলেন যে, আমরা যুদ্ধ করব একমাত্র আত্মরক্ষার্থে। কখনও অন্য রাজ্য দখল করতে নয়।
পীর বললেন, মহারানি এটাও একপ্রকার আত্মরক্ষা। আজ নয় কাল শাহেনশাহ আপনার রাজ্য আক্রমণ করবেন। আমাদের উপরও সেরকম নির্দেশ আছে। তাই আগে থেকে সতর্ক হওয়া কি উচিত নয়? আপনাকে সরাসরি যুদ্ধে আসতে হবে না। আপনার যে হস্তিবাহিনী আছে, অশ্ববাহিনি আছে, তাদের একাংশ আমাদের সঙ্গে থাকলেই হবে।
রানি দুর্গাবতী বললেন, আমাদের সঙ্গে তো মোগল সম্রাটের এখনও সম্পর্ক খারাপ হয়নি। তবে আপনারা বলছেন যখন, নিশ্চয়ই খতিয়ে দেখব। কয়েকদিনের মধ্যেই জানাচ্ছি।
পীর মহম্মদ এবং আলিু কুলি বুঝলেন, সময় নিচ্ছেন রানি।
কিন্তু তাঁরা এটা বুঝলেন না যে, রানি দুর্গাবতী সময় নিচ্ছেন না। তিনি তার আগেই সংবাদ পেয়েছেন যে, এই দুজন হল আকবরের পাঠানো চর। মিথ্যা কথা বলে বিভ্রান্ত করছে। কারণ কী? কারণ গোয়ালিয়রের দরবারে রানির নিজের গুপ্তচর রাখা আছে।
ঠিক ১৫ দিন পর আসফ খানকে গোয়ালিয়রে হাজির। ১০ হাজার সেনা নিয়ে। আর অপেক্ষা নয়। তিনি গোয়ালিয়র থেকে পাঠালেন একটি চিঠি। রানিকে। যেখানে লেখা আছে সম্রাট আকবর আকবর আপনার বীরত্বে মুগ্ধ। আপনার পাণিপ্রার্থী তিনি। ধর্ম বজায় রেখেই আপনি আমাদের সম্রাজ্ঞী হতে পারেন। আপনাকে একা আর রাজস্ত করতে হবে না। আপনি হবেন হিন্দুস্তানের সম্রাজ্ঞী। যদিও মতান্তরে আসফ খান নাকি নিজে রানির সঙ্গে দেখা করেও এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
রানি দুর্গাবতীর চোখ আরক্ত হয়ে গেল। তাঁর নাক থরথর করে কাঁপছে। এই স্পর্ধা এই বিদেশি পায় কীভাবে? তিনি সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, গ্রেপ্তার করো এই বেয়াদপকে। এখনই।
আসফ খান পাথর হয়ে গেল। তিনি আকবরের মনসবদার। আগ্রার সেনাপতি। তাঁকে গ্রেপ্তার করবে এক রানি! তিনি দ্রুত ত্যাগ করলেন স্থান! প্রশ্ন হল, আদৌ কি আকবর এই প্রস্তাব পাঠিয়েছেন? নাকি আসফ খান সকোনও এক বিশেষ কারণে এই কথা বলল?
আসফ খানকে তাড়া করলেন স্বয়ং রানি দুর্গাবতী? আসফ খান দ্রুত বেরিয়ে এসে তাঁর বাহিনি ছিল বাইরে। তাদের নির্দেশ দিয়ে চম্বলের দিকে চলে গেলেন। পিছনে আসছেন দুর্গাবর্তী।
আসফ খান হঠাৎ এক টিলার আড়ালে। সেখান থেকে ছুঁড়লেন বল্লম। দুর্গাবতী অশ্বপৃষ্ঠে। তিনি তৎক্ষণাৎ নিজেকে বাঁচিয়ে আধার সিংকে বললেন, সামনে গিয়ে আটকাও আধার সিং।
কিন্তু ততক্ষণে আসফ খান ঘোড়া পাস অতিক্রম করে চলে গিয়েছেন। দুর্গাবতী কিন্তু ছাড়বেন না। তিনি আধার সিংকে বললেন, আমাকে যে অপমান করেছে আমি ওর প্রাণ নিয়েই ছাড়ব। আক্রমণ জারি রাখো! সত্যিই অসাধ্য সাধন করলে দুর্গাবতী। গোয়ালিয়র পর্যন্ত গিয়ে আসফ খানের শিবিরে আক্রমণ চালালেন তিনি। যা আসফ খান কল্পনা করেননি। আসফ খানের গোটা বাহিনি পর্যুদস্ত। পালালেন আসফ খানও।
মোগল সম্রাটের বাহিনিকে এভাবে আক্রমণ করে পালাতে বাধ্য করা হয়েছে, এই ইতিহাস তখনও পর্যন্ত হয়নি। সুতরাং পরদিন দ্রুত সেই খবর ছড়িয়ে গেল। আর বাতাসের মতো অন্য দেশীয় রাজ্যেও খবর ছড়ালো। রানি দুর্গাবতীর জয়ধ্বনি শুরু হল চম্বল ও বুন্দেলাঞ্চলে।
কিন্তু সাতদিন পর আসফ খান আরও বহুগুণ সেনা নিয়ে আক্রমণ করল গোন্দ বন। নগরীরঙ প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে মোগল সেনা। এবারও অকুতোভয় রানি দুর্গাবতী। তিনি আধার সিং, অর্জুন দাস এবং পুত্র বীর নারায়ণ যুদ্ধক্ষেত্রে। রানিকে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। আসফ খান আবার পিছু হটছে। আচমকা একটি গোলা এসে লাগল রানির কাঁধে। পরক্ষণেই তির। অশ্ব থেকে পড়ে যাচ্ছেন তিনি। আর রানিকে পড়ে যেতে যেতে দেখেই তাঁর সেনাও পালাচ্ছে।
আধার সিং দিশাহারা। রানি দুর্গাবতী চিৎকার করে বললেন, ভাগো মাৎ! নিকালো মোগল কো হিঁয়াসে! হামি হি জিতেঙ্গে। কিন্তু নিস্তেজ হচ্ছে তাঁর কন্ঠস্বর।
আধার সিং এসে দাঁড়ালেন। তাঁকে দেখেই রানি দুর্গাবতী বললেন, আধার, শেষবার আমার একটা উপকার করো। আমাকে হত্যা করো। আর তারপর তুমি লড়াই জারি রাখো।
আধার বললেন, অসম্ভব! আমি পারব না আপনাকে হত্যা করতে।
আধার, আমাকে জখম অবস্থায় মোগল বাহিনি ধরলে বেইজ্জতি বেশি হবে। তোমরাও যুদ্ধ করতে পারবে না।
আধার সিং পারলেন না।
রানি দুর্গাবতী কোমরবন্ধ থেকে তাঁর ছুরি বের করে চকিতে নিজের বুকে বসিয়ে দিলেন! চিৎকার করলেন, জয় ভবানী!
রানি দুর্গাবতীর অসীম সাহস ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।
দুই
রানি চেন্নাম্মা
খবরদার একটুও এগোবে না।
নারীকন্ঠ! এখানে এই ঘোর জঙ্গলের মধ্যে নারীকন্ঠ কার?
হতচকিত মাল্লাসরজা। কর্নাটকের কিট্টুর রাজ্যের এই মহারাজা মাল্লাসারজা দেশাইয়ের প্রিয় শখ হল মৃগয়া। শিকার করার নামে রাজা রাজড়াদের অবশ্য আড়ালের নেশা হল অবাধ মদ্যপান। জঙ্গলে তৈরি করা শিবিরে নারীসঙ্গ। যথেচ্ছ খাদ্য, গান বাজনা, নৃত্য। কিন্তু মাল্লাসরজা সেরকম নয়। তিনি সত্যিই শিকার করা পছন্দ করেন। এবং নেহাৎ প্রাণীহত্যাই নয়। তিনি চেষ্টা করেন সেইসব প্রাণীকেই হত্যা করতে, যারা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ মানুষের ক্ষতি করছে। প্রাণহানি ঘটাচ্ছে। গ্রামবাসী অনেক সময় জঙ্গলে প্রবেশ করে জীবিকার কারণে। তাদের আক্রমণ করে বাঘ। ভাল্লুক। নিয়ম করে কিছু কিছু প্রাণী গ্রামে প্রবেশ করে। গৃহপালিত প্রাণী কিংবা মানুষ মেরে ফেলে। আবার জঙ্গলে পালায় তারা।
এরকমই এক বাঘ কিছুদিন ধরেই অত্যাচার করছে আশেপাশের গ্রামে। এরকমই যখন তখন ঢুকছে গ্রামে। আবার মানুষ কিংবা প্রাণী হত্যা করে পালাচ্ছে। আর তাই এরকম অভিযোগ আর নালিশ পেলে আরও বেশি করে মহারাজ চলে যান জঙ্গলে। শিকার করতে। বিশেষ করে তাঁর সন্ধান থাকে সেই প্রাণীর, যে তাঁর প্রজাদের উপর অত্যাচার চালিয়েছে। হত্যা করেছে।
এদিনও সেরকম এক শিকারে এসেছেন রাজা মাল্লাসারজা। আর তিনি হাতির উপর থেকে একেবারে নিখুঁত নিশানায় নিক্ষেপ করেছেন বর্শা। এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গিয়েছে শিকার। একটি অতিকায় বাঘ। হাতির পিঠ থেকে নেমে মাল্লাসারজা এগিয়ে গেলেন শিকারের দিকে। আর তৎক্ষণাৎ সেই চিৎকার। খবরদার! হাত দেবে না শিকারকে! নারীকন্ঠ।
মাল্লাসরাজা এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গী সেনাবাহিনির কয়েকজন। ব্যক্তিগত বন্ধু কয়েকজন যোদ্ধাও। সকলেই বিস্মিত। সত্যিই তো! কার কন্ঠ? তাও আবার এই অরণ্যে?
ঝুপ করে শব্দ। চকিতে সকলে পিছনের দিকে তাকায়। একটি গাছের আড়াল থেকে ঝাঁপ দিয়ে মাটিতে নেমেছে এক নারী। পরনে অবশ্য পুরুষের পোশাক। কোমরবন্ধে তরবারি। পিঠে রয়েছে তূণীরও। সেই নারীর নাম চেন্নাম্মা। তিনি বললেন, খবরদার! এই শিকার আমার! আমি মেরেছি আগে! আমার ছোঁড়া বল্লমেই এই বাঘের মৃত্যু হয়েছে প্রথমে। তারপর আপনি ছুঁড়েছেন!
মহারাজা কিছুটা বিস্মিত এবং তার থেকেও বেশি বিরক্ত। সকলের সামনে তিনি বর্শা ছুঁড়েছেন। তাঁর বর্শা বিদ্ধ করেছে বাঘকে। আর এই মেয়েটা বলছে সে মেরেছে? আশ্চর্য তো! আর এই মেয়ে কে? এভাবে জঙ্গলে ঢুকে একা একা শিকার করছেঃ! শিকার না করেই দাবি করছে সে শিকার করেছে। রক্তিম হয়ে উঠছে মহারাজের গাল ও চোখ। ক্রোধে।
বাঘ ওই তো অদূরে পড়ে আছে। তার শরীরে তো বিঁধে আছে…ভালো করে তাকিয়ে এবার কিন্তু চমকে গেলেন মহারাজা। আরে! তিনি তো একটি বল্লম ছুঁড়েছেন! কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে বাঘের শরীরে দুটি বল্লম! এটা কীভাবে সম্ভব! তার মানে মেয়েটি ঠিক বলছে?
মেয়েটি ছুটে কাছে গেল বাঘের। তাপর একটি বল্লমে হাত ছুঁয়ে বলল, এই তো আমার বল্লম! দেখুন, এটা কি আপনার ছোঁড়া?
রাজা এগিয়ে দেখলেন, সত্যিই তো এই বল্লম তাঁর নয়। তাঁর ছোঁড়া বল্লম একটু পাশেই। তবে একইভাবে বিদ্ধ করা। অতএব তাদের দুজনের ছোঁড়াবল্লমই আসলে বাঘকে ভূপতিত করেছে এবং নিহত হয়েছে সে। আর তাই কৃতিত্ব দুজনেরই। সেকথাই বললেন রাজা।
চোখ দুটি টানা টানা। দৈর্ঘ্য তেমন নয় চেন্নাম্মার। তবে গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল শুধু নয়, যেন আলো ঠিকরে বেরচ্ছে। কর্নাটকের এই অঞ্চলের কন্যাদের এই উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ তো হওয়ার কথা নয়। তাহলে এই কন্যা কার সন্তান? মহারাজার কৌতুহল হল।
চেন্নাম্মাকে দেখে এবং কথা বলে মহারাজার বেশ ভালো লাগছে। তিনি জানতে চাইলেন তুমি কি একাই এসেছো?
চেন্নাম্মা বললেন, না, আমার সঙ্গে আমাদের গ্রামের পাইক বরকন্দাজরা আছে। তবে তারা বাঘের শব্দে বিভ্রান্ত হয়ে অন্যদিকে চলে গিয়েছে। আর আমি গাছের উপরেই ছিলাম। আমি এই জঙ্গল চিনি। আগেও এসেছি। এই বাঘটি নিয়ম করে এখানে জল খেতে আসে। সেটাও জানি। এই বাঘ বহু মানুষকে হত্যা করেছে। খুনী হয়ে গিয়েছে। নরখাদক। তাই একে মারতেই আমার আসা।
বিস্মিত হলেন রাজা। তুমি কেন মারবে! কে তুমি?
চেন্নাম্মা বললেন, তিন. কাকাতি এলাকার জমিদার ধুলাপ্পা গৌড়ার মেয়ে।
কাকাতি? এবার হাসি পেল মহারাজা মাল্লাসারজের। ২৯টি গ্রাম নিয়ে ওই জাগীর। তার জমিদার আবার তাঁদের অধীনস্থ। এই মেয়ে এখনও বোধহয় চিনতে পারেনি তাঁকে। অতএব এখন কিছু বলার দরকার নেই। এই মেয়েকে বেশ পছন্দ হয়েছে মাল্লাসারজের। তিনি বললেন, তোমার পাকি বরকন্দাজ সব মনে হয় ভয়ে পালিয়েছে। চলো আমি পৌঁছে দিয়ে আসি।
চেন্নাম্মা বললেন, প্রয়োজন নেই। আপনি কে আমি জানি না। আপনার হয়ত ধারণা হয়েছে আমি অবলা নারী। একা একা ফিরতে পারব না। সেই ভয় নেই। আমার হাতে এখনও পর্যন্ত ৬ জন দস্যুর মৃত্যু হয়েছে। রাস্তায় পথিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যারা আক্রমণ করে হত্যা করে এবং লুটপাট করে পালায়, তাদের আমি সহ্য করি না। হত্যা করি। তাই আমার কোনও সাহায্য দরকার হয় না অচেনা পুরুষের।
সঙ্গে সঙ্গে তরবারি বের করে সামনে ঝাঁপিয়ে এলেন মহারাজের দুই সঙ্গী। তাঁরা বললেন, তুমি জানো কার সঙ্গে কথা বলছ? কিট্টুর রাজ্যের রাজার সঙ্গে। এই হলেন কিট্টুর মহারাজ মাল্লসারজ দেশাই। এখনও ক্ষমতা প্রার্থনা করো।
চেন্নাম্মা এবার সত্যিই হতচকিত। তিনি বুঝতেই পারেননি যে এতক্ষণ যাঁর সঙ্গে তিনি কথা বললেন, তিনি এই রাজ্যের রাজা। অতএব সত্যিই এভাবে মহারাজার সঙ্গে কথা বলা ভুল। তিনি ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে বললেন, মহারাজা আমাকে মার্জনা করুন। আমার আচারণে ঔদ্ধত্য প্রকাশ পেয়েছে। আমি দুঃখপ্রকাশ করছি। পিতার কাছে শুনেছি আপনি অত্যন্ত প্রজাবৎসল। আপনার রাজত্বে প্রজা এবং বিশেষ করে সাধারণ গরিব খুবই নিরাপদে আছে।
মহারাজা একটু হেসে বললেন, তাহলে আমার ওই অশ্বে আরোহণ করো। আমি আমার হাতিতে যাচ্ছি। তোমাকে আমরা পৌঁছে দিতে চাই তোমার গৃহে। কোনও আপত্তি কোরো না। এটা কিন্তু রাজার আদেশ। এই আদেশ পালন না করলে কারাদন্ড! বলেই হাসতে লাগলেন মহারাজা।
চেন্নাম্মা সামান্য লজ্জা পেলেন। তিনি যতই লড়াকু এবং ডানপিটে হন না কেন, আদতে তো এক নারী বটে! আর এই সামনের মানুষটি যতই মহারাজ হন, আসলে তো ইনিও এক পুরুষ। সুতরাং এক নারী হিসেবে চেন্নাম্মার চোখে যা ধরা পড়ছে সেটি ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। মহারাজার চোখে ঘোর লেগেছে। যে মুগ্ধতা নিয়ে তিনি দেখছেন চেন্নাম্মাকে, সেই দৃষ্টি একজন নারীর চেনা। তবে একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সেই দৃষ্টিতে নেই কোনও শারীরিক বাসনা। সেই দৃষ্টি দিয়ে নারী শরীরকে অবলোকন করার যে কুৎসিৎ পৌরুষ সেটা একবার দেখলেই চেনে যে কোনও নারী। অতএব এই পুরুষটিকে চেন্নাম্মার ভালোই লাগল। যদিও বয়সে মানুষটি অনেকটাই বড় তাঁর তুলনায়।
চেন্নাম্মা যা ভেবেছিলেন সেটি মোটেই ভ্রান্ত নয়। মহারাজার মনে ধরেছে এই সাহসী স্পষ্ট বক্তা মেয়েটিকে। এরকম এক গ্রামীণ জমিদারের কন্যার যেমন হওয়ার কথা এই মেয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত। একেবারেই যেন পৃথক।
কিট্টুর নামক এক ক্ষুদ্র দেশীয় রাজ্যকে দখল করতে সকলেই চায়। এতদিন ছিল মোঘল আর মারাঠারা। তাদের পাশাপাশি হায়দরাবাদের নিজাম। এই তিন শক্তির হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে কিট্টুর। কিন্তু ১৭০৭ সালে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগলরা কিছুটা হতোদ্যম হল। বরং আচমকা উঠে এল এক নতুন শক্তি। মহীশূরের হায়দার আলি। আবার সেই হায়দার আলি, মারাঠা আর নিজামের মধ্যে টানাপোড়েন। কেন? কারণ এই ক্ষুদ্র রাজ্য কিট্টুর। সকলেই চায় এই রাজ্যকে দখল করতে। অথবা নিদেনপক্ষে অনুগামী করে রাখতে।
কিছুতেই বশ করতে না পেরে কিট্টুরের রাজা বীরাপ্পা দেশাইকে মারাঠারা কারাবন্দি করে। আর সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। বীরাপ্পা দেশাইয়ের কোনও সন্তান ছিল না। তই তিনি দত্তক গ্রহণ করেছিলেন এক পুত্রকে। কারাবাসের আগেই। সেই দত্তকপুত্রই হলেন আজকের রাজা মাল্লাসারজ। তিনি কাকাতি গিয়ে জমিদারকে বললেন, আপনার মেয়েকে আমি বিবাহ করতে চাই। আপনার আপত্তি আছে?
একজন জমিদার আর কী আপত্তি করবেন? অতএব তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। যদিও চেন্নাম্মার মা পদ্মাবতীর সামান্য আপত্তি ছিল। কারণ এই মহারাজা মানুষ ভালো। এমনকী গান বাজনা অঙ্কন এসবেও খুব শৌখিন। কিন্তু তাঁর তো আগেও বিবাহ হয়েছে। আগের স্ত্রীর নাম রুদ্রাম্মা। তাহলে আবার কেন বিবাহ! পদ্মাবতীর আপত্তি না টেকার অন্যতম কারণ হল, চেন্নাম্মা। ১৫ বছর বয়সী চেন্নাম্মা নিজেই তো এই বিবাহে ইচ্ছুক। এই রাজার প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মেছে।
রুদ্রাম্মার সঙ্গে কিন্তু চেন্নাম্মার কোনও শত্রুতা হল না। রুদ্রাম্মা বরং বেশ নিজেই হাসিমুখে এই কন্যাটিকে আরও পরিণতমনস্ক করে তোলার ভার নিলেন। কারণ এই মেয়ের বড় যোদ্ধা হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে স্বয়ং মহারাজাই বলেছেন। রানি রুদ্রাম্মা পছন্দ করেন লড়াকু নারীদের। তাঁর স্বামী নিজামের সঙ্গে যোগ দিয়ে টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে একবার লড়াই করেছিলেন। সেই যুদ্ধে সামনে থেকে সেনাপতিত্ব পর্যন্ত করেছিলেন রুদ্রাম্মা। সেই কাহিনি এতবার শুনেছেন চেন্নাম্মা যে তাঁর এই সতীন দিদির প্রতি তাঁর বিশেষ এক সম্ভ্রম রয়েছে।
রুদ্রাম্মা এবং চেন্নাম্মা। দুই রানিকে নিয়ে মাল্লাসারজ দেশাই নিবির্ঘ্নেই রাজ্য শাসন করছিলেন। কিছুটা গোলমাল হয়ে গেল ব্রিটিশদের সঙ্গে মারাঠাদের এক শান্তি চুক্তি হওয়ায়। তারপর থেকেই মারাঠা শাসক দ্বিতীয় বাজি রাও কারণে, অকারণে বারংবার যেন অপমান করার চেষ্টা করেন মাল্লাসারজকে। আসলে এরকম একটি ক্ষুদ্র রাজ্য। অথচ তার গর্ব কত? বাজি রাও একবার পুণের শনিওয়ার ওয়ারা দুর্গে ডাকলেন দেশীয় রাজাদের। নৈশভোজে। সকলে এল। এই কিট্টুরের রাজাও এসেছিলেন। কিন্তু কিছুতেই এক পংক্তিতে বসে খেলেন না। কারণ? জনান্তিকে মাল্লাসারজ বলেছিলেন, তাঁর দেশাই বংশ লিঙ্গায়েত বংশীয় এক উচ্চবর্গ। এই মারঠো পেশোয়াদের কোনও জাতি ধর্ম বর্ণের উচ্চরক্ত আছে নাকি? এরা স্রেফ যুদ্ধ বিগ্রহ করে ধনী শাসক । যখন তখন যার তার সঙ্গে এরা বন্ধুত্ব পাতিয়েছে। এমনকী মাল্লাসারজ সম্ভাজী মহারাজ সম্পর্কেও নাকি বেশ কঠোর বাক্য বলতেন। আর সেই গর্ব ও ঔদ্ধত্য শুনে প্রচন্ড রেগে গিয়েছেন মনে মনে বাজি রাও। তিনি শুধু সুযোগ খুঁজছেন।
বিভিন্ন রাজা আর ব্রিটিশদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কাজ করেন রুদ্রাম্মা। চিঠি লেখায় তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। চেন্নাম্মাকেও তিনি নিজে শিখিয়েছেন এই কাজ। এই দুই সতীন কিট্টুর রাজ্যের স্তম্ভ। তাঁরা ইংরাজি জানেন, ঊর্দু জানেন, কন্নড়, মারাঠাও জানেন। অতএব প্রকৃত রাজত্ব চালাচ্ছেন দুই রানি! একথা বাকি রাজারাও জানে।
১৮১৩ সাল। পেশোয়া বাজি রাও এসেছেন কুমারস্বামী মন্দিরে। কিন্তু রাজা মাল্লাসারজ তাঁকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাননি। এসেছেন। কিন্তু দেরিতে। মাল্লাসারাজের আসার আগেই পার্শ্ববর্তী রাজ্যের রাজা আল্লাপ্পা গৌড়া পেশোয়াকে বললেন, আপনি কুমারস্বামী ভগবানের কাছে এসে পুজো দেবেন জেনেও কিন্তু এভাবে আপনাকে অসম্মান করেছেন কিট্টুর রাজ। তিনি এটা কেন করছেন জানেন? আসলে ভিতরে ভিতরে আপনার শত্রুদের সঙ্গে চক্রান্ত করে আপনার রাজ্য দখল করার পরিকল্পনা করছেন ওই কিট্টুররাজ। আর এই পরিকল্পনার পিছনে ওঁর দুই স্ত্রী। স্ত্রীদের মন্ত্রণা ছাড়া এই রাজা এক পাও এগোয় না। আপনি তাই সতর্ক থাকবেন।
বাজি রাও এই কথা শুনে বিশ্বাস করলেন। তিনি বললেন শিক্ষা দিতে হবে। দাঁড়াও। অতএব যখন তিনি শুনছেন যে দ্রুত আসছেন মাল্লাসারজ। তাঁকে স্বাগত জানাতে, তিনি স্থির করলেন সেই রাজা আসার আগেই তিনি চলে যাবেন। এখন আর কোনওভাবেই এখানে থাকা চলবে না। তিনি নির্দেশিকা রেখে গেলেন যে, মাল্লাসারজ এলে যেন অবিলম্বে পুণে গিয়ে দেখা করে। আর তারপরই কথা হবে।
একথা শুনে কোনও সন্দেহ হয়নি মল্লাসারাজের। তিনি তড়িঘড়ি পুণে গেলেন। এবং যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে বন্দি করা হল। ছুঁড়ে দেওয়া হল কারান্তরালে। শুধু যে কারাবাস তাই নয়। যত খারাপ খাদ্য দেওয়া সম্ভব সেটাই দেওয়া হচ্ছে। যাতে দুর্বল হতে হতে একদিন তাঁর মৃত্যু হয়। এতটাই প্রতিহিংসাপরায়ণ। বাজি রাওয়ের লক্ষ্য কিট্টুর রাজ্যের ধনসম্পদ। এই একটুখানি রাজ্য হলে কী হবে? স্বর্ণ খনি। ওই দুই নারী যেন নিপূণভাবে রাজ্য কোষাগারা পূর্ণ করেছেন।
আট মাস এভাবে রেখে রেখে প্রায় অর্ধমৃত করে ফেলা হল রাজা মাল্লাসারজকে। এবং স্থির করা হল তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। দেওয়াও হল। কিন্তু সেই মুক্তির অর্থ নেই। অর্ধমৃত রাজা মাল্লাসারাজ নিজের রাজধানীতেঙ প্রবেশ করার পরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। চেন্নাম্মা যেন পাথর। কিন্তু তাঁকে অকুল পাথারে রেখে রুদ্রাম্মা বললেন, আমি বেঁচে থাকব না। সহমরণের যাব। চেন্না তোর উপর এই সব রাজ্য আর পরিবারের ভার দিলাম। আমাকে মহারাজা বলেছেন বহুবার যে, একমাত্র তুইই পারবি এই ভার সামলাতে। তাই আমাকে কথা দে যে, তুমি হবি আমাদের সকলের মিলিত রাজা, মিলিত রানি। আমার পুত্র ছাড়া আর কেউ নেই আর এই বংশে। তুমি যদি মনে করিস তাকেই সিংহাসনে বসাবি। যদি মনে না করিস বসাবি না। কিন্তু যদি সে রাজা হয়, তাহলেও আসলে কিন্তু রাজমাতা হয়ে তুই চালাবি। আমাকে কথা দে! এই কথা বলে প্রস্তরবৎ বসে থাকা চেন্নাম্মাকে সব দায়িত্ব দিয়ে সহমরণে গেলেন রুদ্রাম্মা রাজার সঙ্গে।
তিন পুত্র ছিল এই পরিবারে। রুদ্রাম্মার দুই পুত্র। শিবলিঙ্গরুদ্রসারজা এবং বীররুদ্রসারজা। প্রথম জন বাপু সাহেব। দ্বিতীয় জন বাবা সাহেব। আর চেন্নাম্মার একটিমাত্র সন্তান। শিববাসবরাজ। কিন্তু একমাত্র রুদ্রাম্মার বড় পুত্র ছাড়া বাকি দুই সন্তানই মৃত। তরুণ বয়সে তাদের মৃত্যু হয়েছে। একমাত্র বেঁচে আছে রুদ্রাম্মার বড় ছেলে। বাপু সাহেব। চেন্নাম্মা তাঁকেই সিংহাসনে বসালেন। সৎ মায়ের আদেশ মতো পালন করতে লাগলেন সেই রাজা রাজত্ব।
১৮২৪ সাল। ৮ বছর রাজমাতা চেন্নাম্মার পরামর্শমতো সুশাসন উপহার দেওয়ার পর হঠাৎ জানা গেল মহারাজা বাপু সাহেবের যক্ষ্মারোগ। এবং বোঝাই যাচ্ছে তাঁর প্রাণ আর কিছুদিনের অতিথি। কিট্টুর যে এলাকায় পড়ে সেই অঞ্চলের ব্রিটিশ এজেন্ট অর্থাৎ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে এবং আড়ালে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে আসা শাসক জন থ্যাকারেকে অসুস্থ রাজা চিঠি লিখলেন। যেখানে তিনি বললেন, আমার কোনও সন্তান নেই। আমি শয্যাশায়ী। সম্ভবত আর বাঁচব না। তাই্ দত্তক নিতে চাই।আমার সেই দত্তক সন্তানই হবে আমার মৃত্যুর পর রাজা। আপনাকে জানিয়ে রাখলাম। যেহেতু আমাদের মধ্যে হওয়া চুক্তিতে সেরকমই লেখা আছে।
শিবলিঙ্গাপ্পা নামক এক কিশোরকে মনোনীত করা হয়েছে। তাঁকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে এসে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হল। ১৮২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দত্তক গ্রহণ অনুষ্ঠানও হল। জন থ্যাকারেকে চিঠি দিয়ে জানানো হল, মহারাজ আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই আমাদের আর নতুন রাজাকে অভিষেকপর্ব করা ছাড়া উপায় নেই। থ্যাকারে তৎক্ষণাৎ একজন ডাক্তার পাঠালেন। কিন্তু লাভ হল না। সেদিনই মৃত্যু হল বাপু সাহেবের। রুদ্রাম্মার বড় পুত্রের।
পরিবারের শেষতম পুরুষটিরও রও মূত্যু হল। তাহলে এবার? একজনও পুরুষ নেই। কারণ বাপু সাহেবের ১১ বছরের কিশোরী স্ত্রী বীরাম্মা। এখনও সন্তান হয়নি। চেন্নাম্মার নিজের অকালমৃত পুত্র শিববাসবরাজের স্ত্রী ১৬ বছরের জানকীয়াম্মা। আর চেন্নাম্মা নিজে। মধ্যবয়স্ক এক নারী। ৪৬ বছর বয়স। এখনও তেজি। এখনও যৌবনের সব লক্ষণই তাঁর শরীরে। কারণ একটাই। একদিনও যায় না যেদিন ভোরে উঠে অশ্বারোহণ কিংবা তরবারি যুদ্ধ অনুশীলন করেন না তিনি। লাগাতার করে চলেছেন সেই শৈশব থেকে।
সেই কারণেই তো আগে থেকে শিবলিঙ্গাপ্পাকে দত্তক নেওয়া হয়েছে। এই কিশোরকে বসানো হবে। সেই অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হল। কিন্তু এক ইংরাজ দূত হাজির। তিনি বলছেন, এই রাজাকে আমরা মানছি না। এই যে চিঠি। ব্রিটিশ এজেন্ট থ্যাকারে চিঠি পাঠিয়েছেন। সেই চিঠির বক্তব্য হল, এই দত্তক গ্রহণ পর্বউই অবৈধ। কোনও প্রমাণ নেই। কারণ রাজার এরকম কোনও দত্তক পুত্র গ্রহণের ইচ্ছাই ছিল না।
চেন্নাম্মার চেখ জ্বলে উঠল। তিনি দূতকে বললেন, আপনাদের তো মহারাজা নিজেই চিঠি পঠিয়ে বলেছিলেন তাঁর সিদ্ধান্তের কথা। এখন কেন এসব বলা হচ্ছে?
দূত বলল, আমাকে মিস্টার থ্যাকারে বলেছেন, সেই চিঠি জাল। আসলে মহারাজা মৃত্যুশয্যায়। তাঁর পক্ষে কোনও চিঠি লেখা সম্ভব নয়। স্বাক্ষর করাও নয়। আমাদের ডাক্তার সেরকমই রিপোর্ট দিয়েছেন। অতএব ওই স্বাক্ষর কিংবা হস্তলিপি সবই জাল।
চেন্নাম্মা বললেন, আমার ছেলের ইচ্ছাপত্র আমি জাল করব?
চেন্নাম্মাকে সেই দূত বলল, আপনার নিজের ছেলে তো নয়! সৎ ছেলে! আপনি আসলে চাইছেন নিজের পছন্দের কাউকে এনে সিংহাসনে পুতুলের মতো বসিয়ে নিয়ে নিজের মতো রাত্বি করবেন। এই রাজ্যে সবাই জানে যে আসল রানি আপনি! ক্ষমতা আপনি ছাড়তে নারাজ!
চেন্নাম্মা উঠে দাঁড়ালেন। আর এগিয়ে গিয়ে দূতের গালে চড় মারলেন দুবার। তারপর রক্তচক্ষু দেখিয়ে বললেন, মিস্টার থ্যাকারেকে বলবেন আমি এই উত্তরটা দিয়েছি। বেয়াদপি করেছেন বলে। আবার এরকম কথা বললে আমাদের এখানেই বন্দি করব। কত সেনা আনতে পারে ইংরাজ দেখা যাক। যান এখনই!
সেই দূত হতভম্ব ও অপমানিত হয়ে চলে গেল। আর ক্ষিপ্ত থ্যাকারে নিজের উপরওয়ালাদের চিঠি লিখে বলল, কিট্টুরকে আমরা দখল করে রাজকোষ নিজেদের হাতে রাখতে পারলে আর চিন্তা করতে হবে না। অগাধ স্বর্ণমুদ্রা আর খাজনা আসে এই রাজ্য থেকে। একজন মাত্র মহিলা গোটা রাজ্যের দায়িত্বে। আমরা তাঁকে বার্ষিক কিছু ভাতা দিয়ে দেব। প্রাসাদেই থাকতে দেব। তাহলেই তো হল।
দাক্ষিণাত্যের কমিশনার উইলিয়ম চ্যাপলিন, বম্বে রেসিডেন্সির গভর্নর মুনস্টুয়ার্ট এলফিনস্টোন দফায় দফায় নিজেদের মধ্যে চিঠি চালাচালি করছেন। তাদের লক্ষ্য কিট্টুরকে দখল করা। অবশেষে সেটাই স্থির হল। লন্ডন থেকে অনুমোদন আনানো হল লিখিতভাবে। আর তারপরই চেন্নাম্মাকে লিখিতভাবে বলা হল, রাজকোষ আমাদের দখলে থাকবে। আপনাদের একটি নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়া হবে। যেহেতু আপনাদের কোনও শাসক নেই।
চেন্নাম্মা পালটা চিঠি লিখলেন, আমিই শাসক। এখনও পর্যন্ত। আপনারা একবার কিট্টুর এসে দেখবেন যে প্রজাদের কাছে রানির ভূমিকা ও সম্মান কী? আপনাদের একজন সেনাকেও একজন প্রজা যদি শাসক হিসেবে স্যালুটও করে, তাহলেই আমি আমাদের এই দাবি ছেড়ে দেব। একজনও আমার প্রজা আপনাদের একজনকেও স্যালুট করবে না। সেই চেষ্টা করবেন না।
এই হুমকি একজন নারী ব্রিটিশ কোম্পানিকে দিচ্ছেন ১৮২৫ সালে, এটা অভাবনীয় তখন। কারও সেই সাহস ছিল না। হায়দরাবাদের নিজাম পর্যন্ত ব্রিটিশ কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা করে নিয়েছেন। তাঁর কাজ হল বছরে দুবার করে নজরানা দেওয়া বড়লাটসাহেবকে। আর পরিবর্তে তিনি নিজের মতো করে রাজস্ত করেন। কিন্তু সারা বছর ধরে প্রচুর অত্যাচার সহ্য করতে হয় ব্রিটিশ অফিসারদের। তাও মুখে টুঁ শব্দ করেন না নিজাম। মহারানি চেন্নাম্মাকে যেন হায়দরাবাদের নিজাম ভেবে না বসে ব্রিটিশ কোম্পানি।
চেন্নাম্মা ১১ অক্টোবর চ্যাপলিনকে চিঠি লিখে বললেন, এই শেষবার বলছি, আপনাদের পক্ষ থেকে আমাদের অনুমোদনের চিঠি পাঠান। আমরা স্থির করব যে, কে হবেনব আমাদের রাজা। আপনারা নয়!
চ্যাপলিন কোনও জবাবই দিলেন না। উলটে কিট্টুর এসে রাজকোষের হিসাবপত্র বুঝে দিতে লোক পাঠালেন। তাঁকে চেন্নাম্মা বললেন, চলে যেতে। আর সেদিনই ১৮ অক্টোবর চেন্নাম্মা রাজপ্রাসাদের সামনের প্রাঙ্গণে সকল প্রজাদের ডাকলেন। তারপর অলিন্দ থেকে বললেন, আমার উপর আপনাদের বিশ্বাস আছে তো?
প্রজারা চিৎকার করে বলল, আছে মহারানি!
এই ব্রিটিশ কোম্পানি জানে না যে, আমরা কিট্টুরের মানুষের কাছে আগে স্বাধীনতা, তারপর প্রাণ। আগে সম্মান। তারপর সুখ শান্তি। ব্রিটিশকে আমরা জানাতে চাই, আমাদের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত কিট্টুর আমাদের থাকবে। আমরা প্রাণ দেব। দাসত্ব করব না! অতএব আপনারা সকলে তৈরি থাকুন। আমরা যদ্ধি করব। কুমারস্বামী ভগবানের জয়!
প্রজারাও চিৎকার করে উঠল জয় কুমারস্বামী মহারাজ!
৪৬ বছর বয়সী চেন্নাম্মা নিজেকে সেনাপতি ঘোষণা করলেন। বললেন, আমি মহারানি নই। রাজমাতা নই। এখন আমি সেনাপতি। আমি সামনে থেকে লড়াই করব। চেন্নাম্মার পাশে থাকবেন সেনাপ্রধান বীরাপ্পা। আর প্রধান কৌশল রচনাকারী গুরুসিদাপ্পা। ৭ হাজার সেনা। ২ হাজার অশ্ব। ১ হাজার উট। মাত্র ৫০টি হাতি। ১৬টা কামান! এই হল চেন্নাম্মার শক্তি। আর এই নিয়েই তিনি ঘোষণা করেছেন বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী। কোলাপুরের মহারাজা খবর পেয়ে বার্তা দিলেন আমি সবকরম সাহায্য করব। চেন্নাম্মা জানেন এসব কথার কথা। ব্রিটিশ কোম্পানি যখন ১০টি কামান তাক করবে কোলাপুরের দিকে, তখন এই মহারাজা আগে আত্মসমর্পণ করবেন। এই পুরুষ রাজাগুলির সাহস তিনি তো দেখছেন। অতএব যা করতে হবে একাই।
ব্রিটিশ এজেন্ট জন থ্যাকারে কিট্টুর দুর্গে গিয়ে দুর্গ দখল করতে নির্দেশ দিলেন তাঁর সেনাপ্রধানকে। স্টিভেনসন আর ইলিয়ট নামক দুই যোদ্ধা কিট্টুর দুর্গে সেনাবাহিনি সহ গেলেন। সঙ্গে এমনকী পরিবারবর্গও। তারা ধরেই নিয়েছেন যে, ইংরেজ সেনা দেখেই কিট্টুরের কেল্লার পতন হবে। কিন্তু ব্রিটিশ সেনাদের দেখেই কেল্লার তোরণ আটকে রেখে ভিতরে নিজেদের বন্দি করে রাখলেন না চেন্নাম্মা। বরং তিনি নির্দেশ দিলেন আক্রমণ!
আর তাই নিজে অশ্বপৃষ্ঠে উঠে ক্ষুদ্র এক সেনাবাহিনি নিয়েই তাড়া করলেন ব্রিটিশ সেনাকে। স্বল্প সংখ্যায়, কিন্তু ভয়ঙ্কর দ্রুতগামী এবং তীক্ষ্ণ এক তিরধনুক ছোঁড়ার অসামান্য প্রশিক্ষণ। মাত্র দুটি পিস্তল ছিল চেন্নাম্মার কাছে। বাকি সবই তির ধনুক বর্শা। ওই মান্ধাতা আমলের অস্ত্র নিয়েই রীতিমতো কচুকাটা করা হল ব্রিটিশ সেনাকে। নিয়ে আসা হল ব্রিটিশ সেনার সঙ্গে থাকা তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের। এরা ধরে নিয়েছিল ব্রিটিশ সেনা দেখে রানি ও তাঁর পরিবার কেল্লা ছেড়ে পালাবেন। আর এরা সকলে নির্বিঘ্নে থাকতে শুরু করবে। আতঙ্কিত স্টিভেনসন। এই নারী তো দুর্ধষ যোদ্ধা! তিনি পালালেন।
চেন্নামাকে এবার যেন ভয় পেতে শুরু করেছেন জন থ্যাকারে। তিনি চিঠি লিখলেন। বললেন, আপনাকে ১১টি গ্রামের ইজারা দিতে পারি আমরা। আপনি আর কোনও দাবি করতে পারবেন। এই লিখিত প্রস্তাব নিয়ে আমি নিজেই আসছি।
থ্যাকারে এলেন বটে। কিন্তু এক ঘন্টা। দুই ঘন্টা। তিন ঘন্টা। চেন্নাম্মা দেখাই করলেন না। পাঁচ ঘন্টা বসিয়ে রাখার পর রানি চেন্নাম্মা বললেন,ওনাকে বলো আমি অসুস্থ। দেখা করতে পারব না। আর হ্যাঁ, ওই প্রস্তাবে আমার সায় নেই। আমার রাজ্য আমার থাকবে।
থ্যাকারে এতই ক্ষিপ্ত যে তিনি ফিরে গিয়েই ৫ হাজার সেনা নিয়ে নিজেই হাজির হলেন কেল্লায়। কিট্টুর দুর্গের বাইরে থ্যাকারের সেনা ঘোষণা করল ঘেরি। অর্থাৎ আধুনিক ভাষ্যে ২৪ মিনিটের সময়সীমা। এই ২৪ মিনিটের মধ্যে কেল্লার তোরণ দ্বার না খুলে দিলে কামান দাগা হবে। তাই হল। হুমকিতে কোনও কাজ হয়নি। আর তাই উপর্যুপরি কামান দেগে তোরণ দ্বার ধ্বংস করে ব্রিটিশ বাহিনি কেল্লায় ঢুকে এল। তারা জানেই না যে, ততক্ষণে চেন্নাম্মার নিজের সেনাবাহিনি তো বটেই, গোটা রাজ্যের পুরুষেরা পিছনের তোরণ দিয়ে প্রবেশ করে বিরাট এক সেনাবহিনি তৈরি করেছে। আর ব্রিটিশ কোম্পানির সেনারা এভাবে গণহত্যার শিকার হয়নি কখনও। চেন্নাম্মার নেতৃত্বে ধরে ধরে ব্রিটিশ সেনার শিরশ্ছেদ করা হল। পালকি নিয়ে কেল্লার বাইরে অপেক্ষা করছিলেন স্বয়ং জন থ্যকারে। মহারানি চেন্নাম্মার নিজের সেনাপতি বালা সাহেব পিস্তল দিয়ে থ্যাকারেকে হত্যা করল। ইলিয়ট ও স্টিভেনসন ধরা পড়ল রানির হাতে। তাঁদের ধরে কেল্লার অন্দরে বন্দি করলেন রাজমাতা চেন্নাম্মা। দিনটি ছিল দশেরা। এরকম এক ভয়াবহ পরাজয় যে হতে পারে এক ৪৬ বছর বয়সী নারীর কাছে এটা অতি বড় দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করেনি ব্রিটিশ কোম্পানি।
কালেক্টর ফুলার্টন চ্যাপলিনকে চিঠি লিখে বললেন, স্যার এটা ছোট খাটো যুদ্ধ নয়। আমাদের অন্তত ২৫ হাজার সেনা চাই। আমাদের দুই কমান্ডার স্টিভেনসন আর ইলিয়টকে এখনও রানি চেন্নামা বন্দি করে রেখেছেন। এই মহিলার কোনও ইচ্ছাই নেই আত্মসমর্পণ করার। কিছু একটা করুন স্যার। কমিশনার চ্যাপলিন বললেন, কেল্লা উড়িয়ে দাও! এই নারীকে উপযুক্ত সাজা দিতে হবে।
চ্যাপলিন চিঠি লিখে চেন্নাম্মাকে বললেন যে, যদি আপনি আপনার কাছে বন্দি থাকা আমাদের অফিসারদের মুক্তি দেন, তাহলে আপনি যা চাইছেন তাই হবে। আপনার পছন্দের দত্তককে সিংহাসনে বসাতে পারেন।
চেন্নাম্মা বিশ্বাস করলেন ইংরাজকে। এবং ভুল করলেন। কারণ কোম্পানির এই অর্থ লোভী আধিকারিকরা অত্যন্ত ঘৃণ্য মানসিকতার। তারা ভারতে এসেছে লুটপাট করতে। আধুনিক দস্যু। আর তাই রানি চেন্নাম্মা যখন স্টিভেনসন,ইলিয়টদের মুক্তি দিলেন, তারপরই ৪ ডিসেম্বর মধ্যরাতে কেল্লা আক্রমণ করল কোম্পানি। যা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। কারণ, পরদিন সকালে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল চ্যাপলিনের সঙ্গে রানি চেন্নাম্মার। বিশ্বাসঘাতক ব্রিটিশ সেই কথা রাখল না। মধ্যরাতে আক্রমণ করে রানি চেন্নাম্মার সেনাবাহিনিকে ধ্বংস করল। কেউ পালালো। সিংহভাগ শেষ রক্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করল।
১৮২৪ সালে কিট্টুর কেল্লায় প্রবেশ করে সেই কেল্লাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার আগে ব্রিটিশ বাহিনি ১৬ লক্ষ নগদ টাকা লুট করল। ৪ লক্ষ টাকার অলঙ্কার ছিনিয়ে নিল। আসল কথা হল, আত্মসমর্পণ করা। চেন্নাম্মাকে বলা হল, আত্মসমর্পণ করলে বার্ষিক ৪০ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে। একটি প্রাসাদে তিনি থাকতে পারেন।
রানি চেন্নাম্মা ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। বললেন, আমাকে বন্দি করে রাখুন ভালো চান তো! নয়তো আজ নয় কাল আপনাদের আমি রাজ্য ছাড়া করব। এই হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখছি। সুযোগ পেলেই প্রত্যাঘাত!
সত্যিই আতঙ্কিত হয়ে পড়ল ব্রিটিশ কোম্পানি! বাইলহোঙ্গাল দুর্গে রানিকে বন্দি করে রাখা হল। চার বছর পর রানি চেন্নাম্মার মৃত্যু হল! কিন্তু তাঁর জ্বেলে দেওয়া অগ্নিশিখার মতো বিদ্রোহের সত্ত্বা প্রজ্জ্বলিত রইল। কারণ, চেন্নাম্মার মৃত্যু সত্ত্বেও কিট্টুর নিয়ে শান্তি ও স্বস্তি পেল না ব্রিটিশ। কারণ লাগাতার কিট্টুরের নাগরিকরা গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল ব্রিটিশের বিরুদ্ধে। ১৮৩১ থেকে ১৮৫৭ লাগাতার প্রায় কয়েক বছর পর পরই বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়েছে! রীতিমতো মাথাব্যথা হয়েছিল কিট্টুর। প্রতিটি বিদ্রোহের প্রধান স্লোগান ছিল, মহারানি চেন্নাম্মার জয়ধ্বনি! চেন্নাম্মার নামাঙ্কিত মন্দির স্থাপন করে কিট্টুরবাসী দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রান্তিক এক ক্ষুদ্র জনপদ, যে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল! প্রেরণার নাম রানি চেন্নাম্মা!
তিন
রানি লক্ষ্মীবাঈ
বিথুরের গঙ্গাঘাটে দুটি বালক বালিকাকে খেলতে দেখা যায়। দুজনেই পেশোয়া দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের খুদই স্নেহের। বালকের নাম ধন্ডি পন্ত। আর বালিকা ডাক নাম মনু। অসলে মণিকর্নিকা। আজ তাঁর পিতা মরোপন্ত বিথুরে চলে এসে পেশোয়া বাজি রাওয়ের কাছেই বাড়ি নির্মাণ করে থাকছেন বটে। তবে এই কন্যার জন্ম বারাণসীতে।
ভগবান বিষ্ণুর তৈরি করা ঘাটে স্নান করতে গিয়ে যখন পার্বতীর কানের দুল হারিয়ে গেল মহাদেব যথেষ্ট ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। একটি কুন্ডও তৈরি করা হয়। যেখানে পার্বতী স্নান করবেন এরপর থেকে। কান থেকে পড়ে গঙ্গায় হারিয়ে যাওয়া অলঙ্কারের নামেই ঘাটের নাম হয়ে গেল মণিকর্ণিকা। মরো পন্ত সেই ঘাটে নিয়ম করে যেতেন পুজো পাঠ করতে। আর তাই স্বাভাবিকভাবে তাঁর ঘরে যখন কন্যার জন্ম হল, তখন তাঁর নাম দিলেন মণিকর্ণিকা। ডাক নাম মনু। কিন্তু বারাণসীতে বেশিদিন থাকা হয়নি। কাজের অভাব। আর তাছাড়া সিংহসনচ্যুত হয় পেশোয়া দ্বিতীয় বাজি রাও বিথুরেই এসে থাকছিলেন, তখন প্রিয় পাত্র মরো পন্তকে বলেছিলেন, এখানে চলে এসো। একসঙ্গে থাকা যাবে। এখানে কাজের ব্যবস্থাও হয়ে যবে।. মরোপন্ত পরিবার নিয়ে চলে এলেন।
ওই যে বালকটির সঙ্গে মনু খেলা করছে বিথুরের গঙ্গাঘাটে, সে হল, আসলে পেশোয়া রাজি রাওয়ের দত্তক নেওয়া। ছেলেটির ডাক নাম নানা। বিথুর জায়গাটা আজকের কানপুরের কাছে। অসংখ্য মাঠ এবং বেশ কিছু জঙ্গলে আকীর্ণ। মনু যেহেতু মেয়েদের মতো পুতুল খেলায় আগ্রহী নয়,তাই তাদেরচ প্রধান পছন্দের খেলা হল অশ্বরোহণ। দুটি ঘোড়া নিয়ে দৌঁড় প্রতিযোগিতা। কখনও মনুর জয় হয়। কখনও নানার।
সেদিন আচমকা নানার ঘোড়া মুখ থুবড়ে পড়ল। প্রবল চিৎকার করে ছিটকে গিয়ে নানার মাথা একটি পাথরে ঢুকে গেল। এবং সে নিষ্পন্দ। ঘোড়া নিয়ে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল মনু। চিৎকার শুনে ঘাড় বেঁকিয়ে দেখতে পেল, নানা পড়ে আছে। এবং নড়াচড়া করছে। ফিরে এল মনু ঘোড়া নিয়ে। কাছে এসে দেখল মাথা থেকে অঝোরে রক্ত পড়ছে।
কিন্তু কোনও চিৎকার চেঁচামেচি নয়। আশেপাশে কিছু কিছু আদিবাসীকে দেখা যায় ফসলের কাজ করছে। তাদের ডাকল না মনু। সে নিজে ঘোড়া থেকে নেমে নানাকে ধরে ধরে নিজেই নিজের অশ্বে তুলে বসিয়ে দিল। কিন্তু অচেতন নানা বসবে কীভাবে একা একা? অতএব তাকে ঘোড়ায় শুইয়ে দেওয়া মনস্থ করল মনু। তবে তার আগে ঘাস ছিঁড়ে দাঁত দিয়ে চিবিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিল। আর নিজের উড়নির এক টুকরো ছিঁড়ে বেঁধে দিল ক্ষতকে ঢেকে। সেই অবস্থায় লাফ দিয়ে উঠে ঘোড়া চালিয়ে ফিরল পেশোয়ার কাছে।
সকলেই ছুটে এল। কী হয়েছে..কী হয়েছে। মনু ঘোড়া থেকে নেমে বলল, পড়ে গিয়েছে। সামান্য লেগেছে! বদ্যিকে ডেকে দাওয়াই দিয়ে দাও।
কিন্তু পেশোয়া নিজে নানাকে দেখে রীতিমতো উদ্বিগ্ন। মনু কাকে বলছে সামান্য লেগেছে? এ তো সাংঘাতিক ক্ষত। এমনকী রক্তক্ষরণে বন্ধ না হলে নানার মৃত্যু হবে। একজন মেয়ের এই সময় কান্নাকাটি করে সকলকে ডেকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। আর এই মেয়ের কোনও তাপ উত্তাপ নেই। বোঝা গেল সেই মেয়ের স্নায়ু শক্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। এই মেয়েটিকে সাধারণ নরম সরম ভাবলে ভুল হবে।
মেয়ে বড় হচ্ছে। বিয়ে দিতে হবে তো! বিথুরেই থাকেন তাঁতীয়া দীক্ষিত। মরোপন্তের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁতীয়ার সুবিধা হল, কর্মসূত্রে তিনি মাঝেমধ্যেই এদিক ওদিক অন্য নগরী, জনপদে যাতায়াত করেন। আজকাল তাঁতীয়া ঝাঁসিতে থাকেন। তাই তাঁকেই মরোপন্ত বললেন, যদি ভালো কোনও পাত্রের সন্ধান পাও একট খোঁজখবর করে জানিও। মনুর বিয়ে দিতে হবে।
তাঁতীয়া বললেন, মনুর বিয়ে কি যার তার সঙ্গে দেওয়া যায় নাকি। দেখছো না কত সুন্দর দেখতে হচ্ছে। আর কী দাপট। এই মেয়েকে নিছক গৃহস্থ বাড়িতে রান্না করে, ফসলের কাজ করে আর গোরুছাগল চরানোর জন্য মাঠে যাওয়া মানায় নাকি? আমাকে ওর জন্মকোষ্ঠীটা দাও। যদি কোনও ভালো পাত্রের সন্ধান আসে তাহলে জন্মছক সঙ্গে রাখলে সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাবে।
কিন্তু জন্মছক দেখে তাঁতীয়া দীক্ষিতের প্রবল বিস্ময়। একি এই মেয়েটি তো সত্যিই সাধারণ জীবন কাটাতে আসেনি! তিনি যতই দেখছেন ততই অবাক হচ্ছেন। মনুর পিতাকে তাঁতীয়া বললেন, তোমার মনু শুধু যে রানি হবে তাই নয়, একদিন ওর বীরত্বের কথা গোটা দুনিয়া জানবে। লিখে রাখো। মরোপন্ত ভয় পেলেন। বললেন, বিথুরের এই প্রান্তে বাস করি। কোনওমতে জীবনজীবিকা চালিয়ে বেঁচে আছি। আমাদের ঘরের মেয়ে আবার কোন দেশের রানি হবে বলো তো! এসব বিশ্বাস হয় না!
তাঁতীয়া বললেন, আমার কথা মিলিয়ে নিও। আর সেই ব্যবস্থা আমিই করব।
গঙ্গাধর রাও ঝাঁসির রাজা। তাঁকে নিয়ে এমনিতে কোনও সমস্য নেই। কিন্তু ঝাঁসির বাসিন্দা ও রাজদরবারের একটাই চিন্তা। রাজার কোনও সন্তান নেই। রমাবাঈ ছিলেন রাজার স্ত্রী। স্বল্প রোগভোগে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সন্তান রেখে যাননি। এসব ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নিয়ম হল অনতিবিলম্বে রাজা আবার বিবাহ করবেন। গঙ্গাধর রাওকে রাজকর্মচারী আত্মীয় স্বজন পজরবারের সকলে বলছেন বটে। কিন্তু তিনি প্রথম স্ত্রীকে যেন ভুলতে পারেন না। তাই তিন. চাইছেন না বিবাহ করতে। এমতাবস্থায় একটি গোপন অভিযোগ আর সন্দেহ দেখা দিচ্ছে।
রাজা গঙ্গাধর কি আসলে নপুংসক? তাঁর কি সন্তানধারণ ক্ষমতা নেই? নাকি তিনি পুরুষ হলেও ভিতরে ভিতরে নারীমনের এক মানুষ। এরকম একাধিক সন্দেহ ঘিরে থাকছে। যার অন্যতম কারণ হল, গান বাজনা নাচের শখ রাজার। সে তো কমবেশি সকল রাজার থাকে। কিন্তু গঙ্গাধর রাওয়ের অন্যতম বিশেষ আগ্রহ নাটক। তিনি নিজেই নাটক করেন এবং বেছে বেছে নারীচরিত্র করে থাকেন। অবশ্যই নাটক হিসেবে অপূর্ব সেই অভিনয়। কিন্তু একজন পুরুষ অসামান্য নারী চরিত্র ফুটিয়ে তুললে সন্দেহ হবে না যে, তিনি আসলে বোধহয় নারীসুলভ? সেই সন্দেহ হচ্ছে।
এহেন গঙ্গাধর রাওয়ের কাছে বিবাহের প্রস্তাব দিতে চাইছেন তাঁতীয়া। কারণ একটাই। তিনি মনুর জন্মছক দেখে বুঝেছেন এই মেয়েটি রানি হওয়ার মতো। আর অন্যদিকে মনুর কথা পেশোয়ার কাছে শুনে এসেছেন। মেয়েটি বীর ও সাহসীও বটে। গঙ্গাধর রাও যেমন একটু নরম সরম, সেরকম মানুষ চিরকালীনভাবে একটি রাজ্যকে সামলে রাখতে পারেন না। তাঁর দরকার এক শক্তপোক্ত সহায়ক কেউ। সেনাপতি কিংবা অমানৎ অথবা মন্ত্রীরা হলে ক্ষমতা বিভাজনের একটি সম্ভাবনা থাকে। এমনকী বিদ্রোহ করে রাজাকে সরিয়েও দেওয়া আকছাড় হয়েছে। অতএব পরিবারের কেউ যদি সেই দায়িত্ব নেয়, তাহলে সবথেকে ভালো। এই ইংরেজ কোম্পানির আচারআচরণ ভালো নয়। গঙ্গাধরকে বর্তমান ব্রিটিশ এজেন্ট খুবই সম্মান করেন। কিন্তু এই সম্মান কতদিনের? টাকা আদায় করছে, তাই সম্মান করছে। এখন তো আরও বেশি করে ব্রিটিশ টাকার দাবি করে চলেছে। তাই এখন থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
তাঁতীয়া দীক্ষিত রাজার সঙ্গে দেখা করে বললেন, মহারাজা আপনি বিরক্ত হবে জানি। তবু বলছি আপনি একবার যদি এই মেয়েটিকে দেখেন এবং কথা বলেন, আমার বিশ্বাস আপনার সিদ্ধান্ত বদলাবেন। আপনার নিজের জন্য নয়। আপনি একবার ভেবে দেখুন। আমাদের জন্য, আমরা যারা সাধারণ প্রজা, ঝাঁসির জন্য যাঁরা প্রাণ দিতে প্রস্তুত, তাদের কি এভাবে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের মধ্যে ফেলে দেওয়া উচিত? আপনার কোনও সন্তান কিংবা উত্তরাধিকারী না থাকলে ঝাঁসিকে আজ নয় কাল আপনার জীবিতকালেই ব্রিটিশ কোম্পানি দখল করবে। এই আলোচনা আমি শুনে এসেছি নিজের কানে লখনউ ক্যান্টনমেন্টে।
রাজা গঙ্গাধর রাও কিছুটা নিমরাজি হয়েই রাজি হলেন মেয়েকে দেখতে। এবং কোনও সন্দেহ নেই তেজি তরুণী সুন্দরী মণিকর্ণিকাকে দেখে গঙ্গাধর রাও অভমত বদলে ফেললেন। এবং রাজি হলেন বিবাহ করতে।
এই যে অনেক দূরের প্রান্তিক জনপদের এক মেয়েকে দেখে মহারাজা বিবাহ করতে রাজি হয়েছেন, এই সংবাদ পেয়েই ঝাঁসির মানুষ সবথেকে বেশি খুশি হল ওই মেয়েটির প্রতি। কারণ এই মেয়ে অসাধ্য সাধন করেছে। রাজা এতকাল ধরে বুন্দেলা, সিন্ধিয়া, পেশোয়ারাজ থেকেও অনেক বিবাহরে সম্বন্ধকে আমল দেননি। এই প্রথম তিনি এক কথায় রাজি হলেন।তার অর্থই হল এই কন্যার মধ্যে কিছু একটা আছে।
১৮৪২ সালের মে মাসে বিবাহ হয়ে গেল ঝাঁসির রাজা গঙ্গাধর রাওয়ের সঙ্গে বারাণসীর এক সাধারণ পরিবারের কন্যা মনুর। যারা পরবর্তীতে স্থানান্তরিত হয়েছে বিথুরে। আর এই বিবাহে খুব খুশি হলেন স্বয়ং দ্বিতীয় বাজি রাও। তাঁর কাছে থাকা দত্তক নেওয়া সেই বালক এখন তরুণ। কিন্তু সে বড় একা হয়ে গেল। তার খেলার সাথী মণিকর্ণিকা চলে যাচ্ছে। তাও আবার রানি হয়ে। এখন তো আর সে সেই মনু থাকবে না। নানার জীবন এবার থেকে একা একাই কাটবে। চুপচাপ হয়ে গেল সে। এই নানা আগামীদিনে পরিচিত হবেন নানা সাহেব হিসেবে। এবং আবার তাঁর সঙ্গে এক অদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেখা হবে ঝাঁসির রানির সঙ্গে। যে রানি একদা ছিলেন নানাসাহেবের খেলার সঙ্গী।
আজ পূর্নিমা। ঝাঁসিতে প্রবেশ করার তিনটি প্রবেশ তোরণ। প্রতিটিকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। আলো ঝলমল করছে প্রতিটি পথ। মশাল যেন লক্ষ সূর্য এনে দিয়েছে। গঙ্গাধর রও যখন সিঁদুর পরিয়ে দিচ্ছে মনুর সিঁ.তে তখন বেজে উঠল একদিকে বাদ্যযন্ত্র এবং অন্যদিকো কামানের গোল। বিবাহ উপলক্ষ্যে ১০০ বার দাগা হল তোপ। অর্থাৎ এই দম্পতির দাম্পত্য ১০০ বছর যেন বেঁচে থাকে।
নবদম্পতিকে যেতে হল ঝাঁসির বিষ্ণুমন্দিরে। পাশেই পরিবারের ইষ্টদেবী মহালক্ষ্মী মন্দির। যেখানে মাতা লক্ষ্মীর কাছে করজোড়ে আশীর্বাদ চাইতে হয়। আর বেঁধে নেওয়া হবে মাতা লক্ষ্মীর পাগের ফুল এবং ফসলের অংশ। সেটি নতুন বউয়ের আঁচলে থাকবে। তারপর বেজে উঠু শঙ্খ। পুরোহিতকুল ঘোষণা করলেন, ঝাঁসির নতুন রানির নতুন নাম! মাতা লক্ষ্মীদেবীর নামে। রানি লক্ষ্মীবাঈ। আঁচলে যখন বাঁধা হচ্ছে সেই দেবী লক্ষ্মীর প্রসাদী ফুল ও নৈবদ্যের ফসল, তখন রানি বললেন, একটু শক্ত করে বাঁধুন! খুলে না যায়! আমি বেঁধে দেব?
সদ্যবিবাহিত এক কন্যার কন্ঠে থাকার কথা লজ্জা। কিন্তু সেটা নেই। বরং স্পষ্ট ও জোরালো দ্বিধাহীন। গঙ্গাধর রাও ভাবলে তাঁর রাজকর্মচারী পুরোহিতরা সম্ভবত খারাপ কিছু ভাবছেন। এই মেয়ে হয়ত অসংস্কৃত। আরও একটু মার্জিত হওয়া দরকার ছিল না এক রানির?
কিন্তু পুরোহিতরা চমকে গেলেও তাঁদের মুখে মৃদু হাসি। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বলে, তাঁরা বুঝতে পারছেন এই কন্যার মধ্যে এক সহজাত জোরালো সত্ত্বা আছে। যা শাসন করতে পারে অন্যদের। আর আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এরকমই দরকার। কারণ সকলের মধ্যেই সর্বক্ষণ তিরতির করে বইছে ভয়। এই বুঝি ব্রিটিশ দখল করল ঝাঁসি! ব্রিটিশের সঙ্গে গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়াদের অত্যন্ত দহরম মহরম। সিন্ধিয়ারা সবার আগে বশ্যতা স্বীকার করেছে। সুতরাং সিন্ধিয়ারাও যে কোনও সময় দখল করতে পারে ঝাঁসি! অতএব ঘরে বাইরে শত্রু। তাই এরকম এক শক্তিশালী চরিত্র চাই এখন ঝাঁসির। উপস্থিত সকলের অন্তরে কিছুটা যেন স্বস্তি এল যে, এবার হয়ত ঝাঁসি পেল এক ভবিষ্যতের ক্ষমতাবান শাসককে। রাজা গঙ্গাধর রাও নরম সরম। তাঁর স্ত্রী হওয়ার জন্য এরকমই একজন কাউকে দরকার ছিল.। দ্রুত রানি লক্ষ্মবাঈয়ের নাম প্রজাদের মধ্যেই ছড়িয়ে গেল। এই ঘটনাটি বিশেষ করে। কতটা জনপ্রিয় হয় এই ঘটনাটি? এতটাই, যে, এরপর যে কোনও মেয়ে বিবাহের পর মন্দিরে গেলে প্রাথমিক আচার বিচার পুজোর পর আঁচলে প্রসাদী ফুল বাঁধার সময় বলে উঠত, শক্ত করে বাঁধুন! নরম যেন না হয়, খুলে যাবে। অর্থাৎ রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের সংলাপ বিখ্যাত হয়ে গেল পরথম দিনেই।
মনু থেকে রানি লক্ষ্মীবাঈ হয়ে ওঠার পর্বে প্রথমে নিজেকে বদলে ফেলতে হচ্ছে সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস এবং কথোপকথনের ভঙ্গি। মারাঠা ব্রাহ্মণ পরিবার গঙ্গাধর রাওয়ের পরিবারে খাদ্য, ব্যবহার, পোশাক সবই আলাদা মনুর পারিবারিক সংস্কৃতির তুলনায়। এমনকী পায়েসান্ন যাকে শ্রীখন্ড বলা হবে সেটিও নতুন করে রান্না করা শিখতে হবে। কারণ পরিচারিকা এবং পাচক পাচিকা অনেক আছে। কিন্তু শ্রীখন্ড রান্না করতে হবে বাড়ির বধূকে। সে তিনি যতই রানি হন। অতএব প্রথম কয়েকটি মস রানির চলে গেল রান্নাঘরে।
কিন্তু তাই বলে গঙ্গাধর রাও চাইলেন না যে, তাঁর রানি শুধু ঘর গৃহস্থালী সামলাবেন। তিনি চান রানি শিক্ষা লাভ করুন। অতএব ভাষা শিক্ষা শুরু হল। কিন্তু রানি বললেন, নিছক ভাষা শিক্ষা শাস্ত্র পাঠ কেন? আমার ইচ্ছা যুদ্ধ বিদ্যা। অসিচালনা শেখাও। আমি অশ্বারোহণে পটু। কিন্তু যুদ্ধের বাকি কৃৎকৌশলও শিখতে চাই। গঙ্গাধর রাও বিস্মিত হলেন। কিন্তু খুশিও হলেন।
মানুষটি ঠিক এই বুন্দেলখন্ডের পুরুষদের মতো নয়। একটু যেন মেয়েলি। আবার একইসঙ্গে অত্যন্ত রুক্ষ আচরণও করে ফেলেন। তাই গঙ্গাধর রাও আসলে কেমন সেটাই যেন বুঝে উঠতে পারেন না লক্ষ্মীবাঈ। একটাই ইতিবাচক দিক হল গঙ্গাধর রানিকে প্রচন্ড ভালোবাসেন। আর ধীরে ধীরে তাঁর রাজদরবারের অনেক কাজই হাতে ধরে শেখাচ্ছেন। তিনি বারংবার বলেন, আমি যখন থাকব না, তখন তোমার যেন রাজ্য চালাতে কোনও সমস্যা না হয়।
এসব কথা কেন বলছেন? রানি জানতে চান।
গঙ্গাধর বলেন, এসব কথার দরকার আছে। কারণ আমার বয়স তোমার তুলনায় অনেক বেশি আজ নয় কাল আমার ক্ষমতা অনেক কমে যাবে। তোমার অল্প বয়সেই আমার মৃত্যুও হবে। তাই সবকিছুর জন্য তৈরি থাকা দরকার। কেন জানো? আমার কিছু হলে এই ইংরেজ এজেন্টরা সবার আগে এসে দেখবে যে তোমার ক্ষমতা কতটা? তুমি আদৌ কিছু রাজ্যশাসন সম্পকের জানো কিনা। এসব দেখবে তারা। ওরা ওত পেতে আছে যে কোনো রাজ্যকে দখল করে আগে কোষাগারটি নিজেদের দখলে নিয়ে আসতে। আর যদি শাসক দুর্বল হয়, তাহলে তো কোনও প্রশ্নই নেই তাঁদের সিংহাসনে রেখে দেওয়ার। অতএব তোমাকে হতে হবে শক্তিশালী শাসক। আর তোমার মধ্যে শক্তিশালী যোদ্ধা হওয়ার সব গুণই তো আছে। আমাকে শ্রদ্ধেয় বাজি রাও বলেছিলেন যে, তোমার মধ্যে থাকা আগুন যেন আমি নিভতে না দিয়ে বরং আরও বেশি করে প্রজ্জ্বলিত করতে চেষ্টা করি। তাই তুমি যুদ্ধবিদ্যা প্রশিক্ষণ করায় আমি খুশি।
এক বছর তিন মাস পর সেই খুজশি কিন্তু বজায় রইল না। বহু বছর পর আলোর রোশনাই জ্বলেছিল ঝাঁসিতে। কারণ অবশেষে এসেছিল এক উত্তরাধিকারী। রানি লক্ষ্মীবাঈ পুত্র সন্তান প্রসব করেছেন। ঝাঁসির মানুষ তো বটেই, সবথেকে বেশি যেন আনন্দে আত্মহারা গঙ্গাধর রাও। পুত্রের পিতা। তাঁর সম্পর্কে যে অপবাদ ছিল সেটি কেটেছে। তাঁকে সকলে মেয়েলি বলে যে অপমান করে তার জবাবও দেওয়া গিয়েছে। আর তার থেকেও বড় কথা হল, অবশেষে রাও বংশের এক প্রদীপ এসেছে। আর যাই হোক উত্তরাধিকারী নেই একথা বলে তো ঝাঁসিকে দখল করা যাবে না!
পুত্রের আগমনে উৎসব শুরু হয়েছে। হাতির পিঠে হাওদায় ঝাঁসির প্রতিনিধিরা ঘুরে ঘুরে গ্রামে গ্রামে উপহার বিলি করল। তিনদিন ধরে খাদ্যোৎসব চলল। এমনকী ৬ মাসের খাজনা পর্যন্ত মকুব করে দেওয়া হল প্রজাদের। কিন্তু মাত্র তিন মাস রইল এই আনন্দ। প্রদীপ নিভে গেল। নিস্প্রদীপ হল প্রাসাদ। ঝাঁসি এক নিরবচ্ছিন্ন অন্ধকার বেদনায় প্রবেশ করল। কারণ তিন মাস বয়সের পুত্রের মৃত্যু হল। মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে।
১৮৫১ সালের সেই ধাক্কা সামলাতে পারছেন না গঙ্গাধর রাও। তিনি যেন আর বাইরে বেরনোর শক্তিও পান না। তাঁকে যতই বলা হয়, মহারাজা আবার তো রানির সন্তান হবে। একটি নয়, আরও অনেক হবে। আপনি এত ভেঙে পড়ছেন কেন? গঙ্গাধর রাও নিজেকেই অভিশপ্ত বলছেন। আমার স্ত্রী নিঃসন্তান হয়ে মারা যায়। একটি নিষ্পাপ কন্যা আমার স্ত্রী হয়ে আসার পর আমাকে সন্তান উপহার দেয়। সেই সন্তানও বেঁচে রইল না। এসব কার দোষ? আমার! আমারই জীবনে কোনও অভিশাপ আছে। তাই আমি যতদিন বেঁচে আছিল ঝাঁসির অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি নেই। গঙ্গাধর রাও ক্রমেই এক দীর্ঘ অবসাদে প্রবেশ করছেন। তাঁকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, তিনি এই রাজ্যের মহারাজা। মাত্র দু বছরের মধ্যে ১৮৫৩ সালে মহারাজা গঙ্গাধর রাওয়ের সম্যক ধারণা হল তিনি আর বাঁচবেন না। মাঝেমধ্যেই তাঁর চেতনা চলে যাগ। তিনি রানিকে বললেন, আমাদের এক দত্তক নেওয়া দরকার লক্ষ্মী!
রানি বললেন, আপনার যেমন ইচ্ছা তেমন হবে।
বাসুদেব নাওয়ালকারের পুত্র আনন্দ রাওকে গ্রহণ করা দত্তক।
আর তারপরই ১৭ নভেম্বর জীবনদীপ নির্বাপিত হল মহারাজা গঙ্গাধর রাওয়ের। রানি লক্ষ্মীবাঈ একাকী হয়ে গেলেন। তিনিও তো মা। তিনিও তো সন্তান হারিয়েছেন। কিন্তু এতদিন স্বামীকে সান্ত্বনা দিতে এবং শক্তি যোগাতে তিনি প্রবলভাবে নিজেকে শান্ত রেখেছেন। এখন কীভাবে আর পারবেন? কেনই বা শান্ত থাকবেন? এখন তো তাঁর আকুল হয়ে অবশেষে চোখে সব জল বের করে দেওয়া উচিত?
কিন্তু কই! পারছেন না তো! কেন পারছেন না? কারণ ওই গঙ্গাধর রাওয়ের কথাগুলো আজ যেন বেশি করে সত্যি হচ্ছে। রানি লক্ষ্মীবাঈ বুঝতে পারছেন যে, তাঁকে কোনওভাবেই কোনওরকম নারীসুলভ দুর্বলতা দেখানো চলবে না। তিনি যে একজন মা, একজন স্ত্রী এসবও ভুলে যেতে হবে। কারণ তাঁর উপর হাজার হাজার ঝাঁসিবাসীর দায়িত্ব। চারদিকে যেখানে ভাঙনের শব্দ, বশ্যতা স্বীকার করার অপমানের বার্তা, সেখানে ঝাঁসি কি নিজের সম্মান বজায় রেখে থাকতে পারবে মাথা উঁচু করে নিজের রাজ্যকে নিজে শাসন করার গরিমাকে বুকে করে? এই প্রশ্নের উত্তর রানির দায়িত্ব পালনের উপর নির্ভর করছে। আর তাই কান্নাকাটি চলবে না। তাঁকে আরও বেশি করে শক্তিশালী হতে হবে।
রানিকে তাঁর যোগ্য সম্মান পাইয়ে দিতে মহারাজা গঙ্গাধর রাও আগেই ইচ্ছাপত্র করে গিয়েছেন। তিনি ব্রিটিশ আধিকারি মেজর জন এলিসের সামনে তিনি পাঠ করেছিলেন সেই ইচ্ছাপত্র। তাঁর অবর্তমানে তাঁর প্রতি যে আচররণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ব্রিটিশ দেখিয়েছে সেই একই ব্যবস্থা থাকবে রানি ও তাঁর সন্তানের জন্য। দত্তক সন্তানই তাঁদের আইনি উত্তরাধিকারী। অতএব এই ইচ্ছাপত্রকে যেন সম্মান দেওয়া হয়। ব্রিটিশ আধিকারিক জন ইলিস সেই কথা শুনেমিাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেছিলেন। আসলে তাঁর মনে ছিল অন্য চক্রান্ত ও পরিকল্পনা। একজন রানিকে এত বড় এক রাজ্য শাসনের অধিকার দেবে না ব্রিটিশ।
একজন নারী স্বামীর মৃত্যুর পর সাদা শাড়ি পরবে। সে যাবে কাশী। সবথেকে বড় লজ্জা হল সন্তানহীন হয়েও স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যায়নি কেন সে?আইন করে যতই বন্ধ হয়ে যাক স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যাওয়া সতীপ্রথা, তা সত্ত্বেও সমাজের গভীরে এই মনস্তত্ব রয়েই গিয়েছে। তাই রানিকে নিজের রাজবংশের মধ্যেই এইসব কথা শুনতে হচ্ছে। কিন্তু তিনি দাঁতে দাঁত চেপে এসব সহ্য করবেন। তাঁকে ঝাঁসির দয়িত্ব পালন করতেই হবে।তিনি লিখিতভাবে কলকাতায় চিঠি পাঠিয়ে লর্ড ডাহেৌসিকে জানালেন, আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে রানি হওয়া এবং দত্তক সন্তানের হয়ে ঝাঁসির শাসক হিসেবে ঘোষণা করার পর্ব সম্পন্ন করুন। আমাদের কাজ আটকে যাচ্ছে আপনাদের থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র না আসায়।
ডালহৌসির কোনও ইচ্ছাই নেই রানির কথা মেনে নিয়ে রাজা গঙ্গাধর রাওয়ের সেই শেষ ইচ্ছাপত্রকে সম্মান জানানোর। বরং ডালহৌসি ১৮৫৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি লর্ড ডালহৌসি সিদ্ধান্ত নিলেন ব্রিটিশ কোম্পানির অধীনেই সরাসরি নিয়ে আসবেন ঝাঁসিকে। সংবাদ এল রানির কাছে। ১৫ মার্চ স্বয়ং সেই বড় লাটসাহেবের নির্দেশ নিয়ে মেজর ইলিস আসছেন ঝাঁসি। মুখোমুখি বসে ঝাঁসিকে কোম্পানির অন্তর্গত করে নেওয়া হবে সেদিন।
মেজর ইলিস এসে পাঠ করে শোনালেন কোম্পানির ঘোষণাপত্র। এবার থেকে আর দেশীয় রাজ্য ঝাঁসি থাকবে না রানির হাতে। তিনি বার্ষিক একটি ভাতা পাবেন। আর অন্য সুযোগ সুবিধা। কিন্তু এই প্রাসাদ ছেড়ে দিতে হবে। এই কেল্লায় থাকবে ব্রিটিশ সেনা এবং মেজর ইলিস আসবেন মাঝেমধ্যে।
রানি লক্ষ্মীবাঈ গোটা পাঠ পর্ব নীরব রইলেন। তারপর জানালেন, হামারি ঝাঁসি হাম নেহি দেঙ্গে কিসি কো! যো করনা হো করলে আংরেজ!
মেজর ইলিস স্তব্ধ হয়ে গেলেন এই দুঃসাহস দেখে। তিনি বললেন, এই সিদ্ধান্তের ফলাফল কী হবে আপনি জানেন তো রানি?
রানি বললেন, জানি। আমি নিজেকে সেইমতো প্রস্তুত করব।
মেজর ইলিস বললেন, অলরাইট দেন! বলেই চলে গেলেন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে।
রানির প্রতিবাদ ও আপত্তির কথা কানেই তুললেন না ডালহৌসি। তিনি ঝাঁসির ক্ষমতা হস্তান্তর করার পর্বটির দায়িত্ব দিলেন মেজর ম্যালকমের উপর। মেজর ম্যালকম যে প্রস্তাব তৈরি করেছেন সেটি হল, প্রতি মাসে রানিকে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা ভাতা। তিনি যেখানে চাইবেন সেধানে থাকতে পারেন। ঝাঁসির কেল্লা রানিকেই দেওয়া হবে। তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে। রানি ও তাঁর সহকারি নারীদের জীবদ্দশায় গ্রেপ্তার করা হবে না। রাজকোষাগারের অলঙ্কার, স্বর্ণমুদ্রা, ব্যক্তিগত মুদ্রাসম্পদ সবই রানি পাবেন।
কিন্তু ডালহৌসি ম্যালকমকে ধমক দিলেন। এসব কী? কোষাগারের এক পয়সাও রানি পাবেন না। ওটা আমাদের।
কত ছিল সেই সময় কোষাগারে? ২ লক্ষ ৪৫ হাজার ৩৭৮ টাকা। অগাধ সোনা রূপোর মুদ্রা ও অলঙ্কার। এই সব কিছু থেকে বঞ্চিত করা হল রানিকে। তিন কোম্পানি সেনা এসে দখল করল ঝাঁসি। কেল্লায় ঢুকে থাকতে শুরু করল বাংলা থেকে আসা একটি রেজিমেন্ট। একাংশ ছেড়ে দেওয়া হল রানিকে।
সুতরাং রানি লক্ষ্মীবাইয়ের পক্ষে আর কিছু করার উপায় নেই। কিন্তু সময় কি আসবে না? রানি নিজের রানি সত্ত্বা বজায় রাখছেন। তাঁর কাছে ঝাঁসির মানুষ আসে। শলাপরামর্শ করে। তিনি যথাসম্ভব সহায়তা করেন সকলকেই। প্রজারা তখনওজানে যে, যদিও রানির হাতে আর ঝাঁসির রাজপাট নেই, তবুও রানিই তাদের শাসক। রানিই তাদের অভিভাবক।
১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বারাকপুরের উনবিংশতম রেজিমেন্টকে দেওয়া হল এক নতুন ধরণের কার্তুজ। যেখানে চর্বি মাখানো আছে। যা এনফিল্ড রাইফেলে ব্যবহার করতে হবে। তৎক্ষণাৎ রটে গেল এই চর্বি আসলে গোরু এবং শূকরের চর্বি। যদিও এই জল্পনা ও চর্চার উৎস নিয়ে নানাবিধ ভিন্নমত রয়েছে। কিন্তু যা নিয়ে মতান্তর নেই সেটি হল ওই বারাকপুর রেজিমেন্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিল যে, তারা এই কার্তুজ ব্যবহার করবে না। বারাকপুরে সেই সময় অভারতীয় সেনা ছিলই না। তড়িঘড়ি আনানো হল বর্মা থেকে। তাদের এনেই সম্পুর্ণ ভারতীয় সেনাদের বরখাস্ত করার হুমকি দেওয়া হল। আগুন জ্বলল। কয়েকজন অফিসার বলেছিল যতক্ষণ না ওই বর্মার সেনা আসে ততক্ষণ তোমরা অপেক্ষা করো। মনে হয় না এরকম কিছু হবে। দেখা। কিন্তু একজন সেনা জওয়ানের সেই ধৈর্য নেই। আমাদের জাত ধর্ম নষ্ট করছে যারা তাদের জন্য আবার অপেক্ষা কীসের? সেই সেনা জওয়ান বন্দুক নিয়ে সরাসরি বিদ্রোহ করল। তাঁর গুলিতে মৃত্যু হল একাধিক অফিসারে। বিদ্রোহীর নাম মঙ্গল পান্ডে!
একে একে দখল হয়ে যাচ্ছে ব্রিটিশ দখলদারি। দিল্লিতে পৌঁছে গিয়েছে বিদ্রোহীরা মিরাট থেকে। একে একে জুন মাসে লখনউ, কানপুর, সীতাপুর। এলাহাবাদেও ঢুকে পড়েছে বিদ্রোহীরা। আতঙ্কিত ব্রিটিশ বুঝতে পারছে এবার মধ্যভারত দখল করে নেবে ভারতীয় সেনারা। তাই ঝাঁসির প্রশাসক আলেকজান্ডার স্কেন রানি লক্ষ্মীবাঈকে বললেন, আপনি কি কেল্লায় থাকবেন? নাকি অন্যত্র চলে যাবেন? এদিকেও কিন্তু বিদ্রোহ হবে বলে মনে হচ্ছে!
রানি বললেন, আমি কেল্লায় থাকব। আপনারা আমাকে অন্তত ৩৫ জনের একটি প্রহরী বাহিনি দিন, তাহলে হবে।
আলেকজান্ডার স্কেন সে. ব্যবস্থা করলেন। ততক্ষণে কলকাতা থেকে ৮ হাজার সিপাইকে পাঠাতে বলা হয়েছে ঝাঁসিতে। কিন্তু হঠাৎ ঝাঁসিতেই বিদ্রোহ। খোদ ব্রিটিশ ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে থেকেই ভারতীয় সেনারা এলো পাথাড়ি গুলি ছুঁড়ছে। এমতাবস্থায়। কী করবেন ক্যাপ্টেন কর্ডন। প্রধান প্রশাসক ক্যাপ্টেন ডানলপ বললেন কর্ডনকে যে, রানিকে এখনই বলুন তাঁর প্রশাসন সামলাতে। আমরা যদি সেনাদের এই বার্তা দিতে পারি যে, ঝাঁসির রাজ্যপাট আবার রানির হাতেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে আর বিদ্রোহ বাড়তে পারবে না। ওদের তো বিদ্রোহ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে। রানিই যদি শাসক হন তাহলে তো আর আমাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নেই! তারপর সব মিটে গেলে না হয়, আমরা আবার ঝাঁসিকে নিজেদের দখলে নিয়ে নেব। এই রানি তো আর আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন না!
ব্রিটিশরা এই ঘোষণা করে দিল। আর তখন ভারতীয় সেনারা আর গোলা বন্দুক নিয়ে কেল্লা কিংবা ক্যান্টনমেন্টে আক্রমণ না করে চলে এল ঝাঁসি কেল্লায়। সেখানে রানির সঙ্গে দেখা করে তারা জানায়, রানিমা, আমরা যাচ্ছি দিল্লি। সেখানে সম্রাটকে আবার হিন্দুস্তানের শাহেনশাহ করা হবে। যুদ্ধ করতে হবে টাকা চাই। আমাদের ৩ লক্ষ টাকা দিন।
এত টাকা রানি কোথায় পাবেন? তিনি বললেন, বিদ্রোহ স্তিমিত করতেই ব্রিটিশরা এভাবে আমাকে রানির পদে বসিয়েছে। অথচ এখনও কোষাগার তাদের হাতে। আমার কাছে নিজের গয়না আছে। সেটাই তোমাদের দিচ্ছি। রানি লক্ষ্মীবাঈ তাঁর প্রায় ১ লক্ষ টাকা মূল্যের গয়না তুলে দিলেন বিদ্রোহী সেনাদের হাতে।
ব্রিটিশ সরকারের আধিকারিকদের ডাকলেন রানি। কেল্লায়। ডাকলেন জায়ীরদারদের। সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিরাও এল। রাতে কেল্লায় একটি বৈঠক হবে। সেই বৈঠকে সম্মিলিতভাবে ব্রিটিশ আধিকারিকদের সামনেই তাবৎ জমিদার, জায়গীরদার, গ্রাম প্রতিনিধিরারা জানিয়ে দিল যে, ঝাঁসির শাসন থাকা উচিত রানির হাতে। তাহলেই আর সিপাহীনের বিদ্রোহ হত্যালীলা, অরাজকতা, অশান্তি হবে না। সেই বৈঠকের পরই ঝাঁসির কেল্লরে শীর্ষে উড়িয়ে দেওয়া হল লাল রঙের ঝাঁসির রানির প্রতীক সহ পতাকা।
পরদিন নিজের প্রশাসন গঠন করে ফেললেন রানি। এবং পুরোদমে শাসন ব্যবস্থা কায়েম করলেন। কিন্তু আসলে ব্রিটিশ অপেক্ষা করছে কবে থামবে সিপাহী বিদ্রোহ। তারা লক্ষ্য করছে যে সিপাহী বিদ্রোহের আড়ালে রানি লক্ষ্মীবাঈ ধীরে ধীরে নিজের সেনাবাহিনি এবং রাজ্যপাট গড়ে তুলছেন। যার আসল লক্ষ্য হল স্বাধীনতা। রানি কি ভুলে গিয়েছেন যে, ঝাঁসিতে তাঁকে অস্থায়ীভাবে রাখা হয়েছে? ব্রিটিশ রিজেন্ট চিঠি লিখে রানিকে প্রশ্ন করলেন, আপনি আপনার সেনাবাহিনি এভাবে নিজের মতো করে বাড়িয়ে চলেছেন কেন? কারণ কী?
রানি পালটা চিঠিতে বললেন, নিরাপত্তার জন্য। আপনাদের নারী পুরুষরাও তো এখানে থাকেন। তাঁদের সুরক্ষা দিতে হবে না!
রানির কৌশল বুঝতে পারছে ব্রিটিশ। কিন্তু কী করবে বুঝতে পারছে না।
রানি লক্ষ্মীবাঈ জানেন আজ নয় কাল ব্রিটিশ এই রাজ্য আবার ফেরত চাইবে। দিতে না চাইলে, দখল করবে। তিনি তাই গোপনে অশ্বপৃষ্ঠে চেপে গ্রাম থেকে গ্রামে যাচ্ছেন। ছদ্মবেশে। বলছেন সেনাবাহিনিতে যোগ দিন। আমাদের রাজ্যকে বাঁচাতে হলে সবাইকে যুদ্ধ করতে হবে।
২২ হাজার জনসংখ্যার ঝাঁসিতে রানি ১৪ হাজার সেনা বাহিনি গঠন করে ফেললেন এভাবে। তাদের মধ্যে ১৫০০ সেপাই আছে যারা ব্রিটিশ রেজিমেন্টে ছিল। তারাই নেতৃত্ব দেবে। আর সবথেকে তৎপর্যপূর্ণ হল, মহিলারা দলে দলে যোগ দিয়েছে সেনাবাহিনিকে। রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের সৈন্যদলের একটি পৃথক শক্তিই হল নারী বাহিনি।
রানি লক্ষ্মীবাঈকে তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে রাজ্যপাট এবার হস্তন্তর করতে। তিনি রাজি হননি। অতএব এবার আক্রমণ। ব্রিটিশ স্থির করল। মেজর জেনারেল হিউজ রোজ নেতৃত্বে। পৃথক একটি ব্যাটেলিয়ন তৈরি হয়েছে। শুধু ঝাঁসি অভিযানের জন্য। ৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৮। রোজের সেনা পৌঁছেছে সাগর জেলায়। ছবানপুরের রাজাকে পরাস্ত করে শুরু হল হিউজ রোজের অভিযান।
কিন্তু ৩১ মার্চ তিনি শুনলেন তাঁতীয়া তোপী তাঁর বিরাট বাহিনি নিয়ে ঝাঁসির দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তাঁতীয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন রানিও। ততক্ষণে তিনি আটকে রাখবেন রোজের বাহিনি। কিন্তু তাঁতীয়া তোপীর বাহিনিকে পরাজিত করেছেন রোজ। অতএব এবার লক্ষ্য কেল্লা।
১৮৫৮ সালের এপ্রিল মাস। ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন মহাশক্তিশালী ব্রিটিশ সেনার বিরুদ্ধে।
অসংখ্যা ঘাস উঠে আসছে কেন কেল্লার দিক থেকে। সেই ঘাসের আড়ালে রয়েছে বড় বড় পাথর। ওই পাথরের উপর পা রেখে ব্রিটিশ সেনারা উঠে আসছে কেল্লায়। রানি কামান দাগার নির্দেশ দিলেন। উত্তর দিক থেকে উঠে এসেছে একদল ব্রিটিশ। রানির আরব ও আফগান বাহিনি ঠিক মাঝখানে রাখল তাঁদের রানিকে। তারপর শুরু হল যুদ্ধ। একজন করে উঠে আসছে। আর রানি লক্ষ্মীবাঈ দুই হাতে তরবারি চালাচ্ছেন। একের পর এক ব্রিটিশ সেনরে পতন হচ্ছে কেল্লায়।
হঠাৎ এক তীব্র শব্দ। একবার নয়। দুবার নয়।. তিনবার। কেল্লার দক্ষিণ প্রান্ত থেকে কোনও শব্দ নেই কেন? রানি জানতে পারলেন যে, কেল্লার প্রাচীরে এক বিরাট গর্ত হয়েছে। আর আটকে রাখা যাবে না ব্রিটিশ বাহিনিকে। তাহলে কি পরাজয় স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করবেন? অসম্ভব? একা হাতে এবং তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী ও যোদ্ধাদের অসীম সাহস আর মনোবলকে ভেঙে দেওয়া যায় না।
প্রাসাদ এবং কেল্লা দুদিকেই আক্রমণ তীব্র করেছে ব্রিটিশ। সহযোদ্ধারা বললেন, রানিমা, আপনি পালন, কাল্পির দিকে। তাঁতীয়া তোপী ওখানে. আছে। আমরা এদিকে সামনে নেব। আপনি না বাঁচলে আমাদের যুদ্ধও বৃথা হবে। আপনি যান…।
৪ এপ্রিল পুত্র আনন্দরাও, যার নাম দেওয়া হয়েছে দামোদর, তাকে পিঠে বেঁধে নিলেন রানি। দুই হাতে দুই বন্দুক নিয়ে নিজের সাদা ঘোড়ায় সওয়ার হলেন। এবং কয়েক ক্রোশ এগোতেই দেখলেন সামনেই শত্রুপক্ষ। জায়গাটার নাম ভান্দার। আর কোনও উপায় নেই। ১০ জন সঙ্গী নিয়ে ব্রিটিশের সেনাদের সঙ্গে তুমুল লড়াই করলেন রানি। এবং জয়ী হলেন। ১৬০ মাইল একটানা ঘোড়া চেপে রানি পৌঁছলেন কাল্পি। যেখানে রয়েছেন পেশোয়া এবং তাঁতীয় তোপী। কী করবেন আপনি? আমাদের এখানে আশ্রয় নেবেন? নাকি…?পেশোয়া জানতে চান। বলেন, আমরা আপনাকে নিরাপদে আমাদের এক কেল্লায় পাঠিয়ে দিতে পারি!
রানি লক্ষ্মীবাঈয়ের গোটা শরীর ঘামে ভিজে গিয়েছে। লেপ্টে গিয়েছে তাঁর কেশরাশি কপালের সঙ্গে। একটু পরই যেন অচেতন হয়ে যাবেন। সেই অবস্থায় বললেন, আমি আবার লড়াই করব! ঝাঁসিকে মুক্ত করব। আমার সঙ্গীরা যোদ্ধারা যুদ্ধ করছে!
রানি লক্ষ্মীবাঈকে তারপরও দফায় দফায় সামনে পেয়েও পরাজিত করতে পারেনি ব্রিটিশ বাহিনি। রানি লক্ষ্মীবাঈ হাল ছাড়েননি। কখনও গোয়ালিয়রে হানা দিয়েছেন। কখনও চম্বলের উপত্যকায় লুকিয়ে থেকেছেন। কখনও পাহাড়ে শিবির করা ব্রিটিশদের আক্রমণ করেছেন। ১৬ জুন এরকমভাবে ব্রিগেডিয়ার স্মিথের সেনাবাহিনির শিবিরে আচমকা আক্রমণ করেছিলেন রানি। গোয়ালিয়রের পাহাড়ি অঞ্চলে। সেই যুদ্ধে রানি এক হাতে বন্দুক, এক হাতে তরবারি নিয়ে যুদ্ধ করছিলেন। আচমকা কার্তুজ এসে তাঁর কাঁধে লাগল। ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন রানি। কিন্তু সেই শেষ মুহূর্তেও গুলি ছুঁড়লেন!
রানি লক্ষ্মীবাঈ, ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী যুদ্ধের এক বাতিস্তম্ভ হয়ে রয়ে যাবেন!
চার
ভারতীয় নারীদের বীরগাথা
ইন্দোরের এক রানির নাম শুনলেই মনে হয় বুঝি বারাণসীর ঘাট নির্মাণ, আওরঙ্গজেবের হাতে বারংবার ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের সংস্কার এবং আজকের রূপদান করা, উজ্জয়িনী মহাকালেশ্বরকে রক্ষা করে নতুন করে মন্দির গড়ে তোলা, শিপ্রা নদীর ঘাটকে এক মনোরম পবিত্রস্থলে পরিণত করার সঙ্গে তাঁর নাম সম্পৃক্ত। আসলে কী শুধুই তাই? সম্পূর্ণ ভুল।
স্বামীর সঙ্গে তিনি ছিলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন। এবং চোখের সামনে কামানের গোলায় স্বামী খান্ডেরাওয়ের মৃত্যু দেখেও অবিচলিত সেই ইন্দোরের মহারানি যুদ্ধ সমাপ্ত করেছিলেন। এবং অতঃপর প্রবল সামাজিক ও পারিবারিক চাপ সহ্য করেও কিছুতেই স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যাননি। এই মহীয়সীর নাম ইন্দোরের মহারানি অহল্যা বাঈ হোলকর। তাঁকে বহু কটুকথা সহ্য করতে হয় যে, খান্ডেরাওয়ের অন্য পত্নীরা যেখানে সহমরণে গেলেন স্বামীর সঙ্গে তিনি কেন সতী হলেন না? তাঁর সবথেকে বড় শক্তি ছিলেন তাঁর শ্বশুর মাল্লোরাও। ইন্দোরের মহারাজা। তিনি বলেছিলেন, অহল্যা, আমি জানি এই ইন্দোরকে রক্ষা করতে যদি কেউ পারে, সে হল তুমি। অতএব তোমার সতী হওয়া চলবে না। তোমার সন্তান পালন ও ইন্দোরকে রক্ষা করার জন্যই বেঁচে থাকা প্রয়োজন।
সেই দায়িত্ব আজীবন পালন করেছেন অহল্যাবাঈ। শ্বশুর মাল্লার রাও এবং পুত্র মাল্লে রাও অন্যত্র যুদ্ধে ব্যস্ত। মাল্লার রাও দূত মারফৎ বিধবা পুত্রবধূকে বলে পাঠালেন যে, যেহেতু আমরা কেউ নেই, সেই সুযোগে গোহদকার বিদ্রোহীরা জড়ো হয়েছে গোয়ালিয়রের কাছে। ওদের দুর্গের মধ্যেই। তাই এখনই তুমি যাও ওদের আগেভাগে প্রতিহত করতে হবে। গোহদকার উপজাতি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও নৃশংস। তাদের বিরুদ্ধে কেউ লড়াই করার সাহস পায় না। অহল্যাবাঈ হোলকর সেনাবাহিনিকে নেতৃত্ব দিয়ে শুধু যে গোয়ালিয়রে গিয়ে নিজের সীমানা বাঁচানোর চেষ্টা করলেন তাই নয়। তিনি নিজেই আক্রমণ করলেন গোহদ দুর্গ। কারণ এই দুর্গ হল উত্তর ও মধ্যভারতের প্রায় মধ্যস্থল। সুতরাং এই দুর্গ দখলে থাকলে অস্ত্র যোগান, খাদ্য মজুত, নজরদারি এবং শত্রুপক্ষকে বন্দি করে রাখার সব কাজই হওয়া সম্ভব। মাত্র তিনদিনের যুদ্ধে অহল্যাবাঈ হোলকর এই দুর্গ দখল করেছিলেন। গোহদকার উপজাতি এক নারী যোদ্ধার অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় হতবাক হয়ে গিগে মালওয়া ছাড়িয়ে রাজপুতানায় পালিয়ে যায় চিরতরে।
ঠগীদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযান কে চালিয়েছিলেন? রানি অহল্যাবাঈ হোলকর। চম্বলের ডাকাতদের বেতোয়া নদীতীরে পরাজিত করে নদী পেরিয়ে আগ্রা পালিয়ে যেতে কে বাধ্য করেন? অহল্যাবাঈ হোলকর। বৃদ্ধাবস্থায় সম্পূর্ণ নিজেকে পৃথক এক প্রাসাদে বন্দি রেখেও ইন্দোরের প্রকৃত শাসন শেষ দিন পর্যন্ত চালিয়ে গিয়েছেন এই অসমসাহসী ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ নারী।
ভারতের ইতিহাস নিছক বীর যোদ্ধা, সাহসী সম্রাট কিংবা নিপূণ সুশাসক রাজাদের কাহিনিতেই আবদ্ধ নয়। উত্তর থেকে দক্ষিণ ভারত। ভারতজুড়ে প্রাচীন কলে থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সময়সীমায় সাহসিনী নারীদের কাহিনিতে পূর্ণ। কোনও পুরুষ যোদ্ধা নয়। মারাঠা রানি তারাবাঈ একাই সম্রাট আওরঙ্গজেবের দক্ষিণ অভিযানকে আটকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিলেন। ৫০ হাজার সেনার কে বাহিনি তৈরি করেছিলেন। তাদের বলাই ছিল যেখানে যেখানে আওরঙ্গজেব বাহিনি পাঠাবেন সেখানেই আগে থেকে পৌঁছে গিয়ে মোগলসেনাকে হত্যা করতে হবে। তাই হয়েছিল মাসের পর মাস। আওরঙ্গজেব সবথেকে বেশি ক্ষিপ্ত ও আতঙ্কিত ছিলেন তারাবাঈয়ের যোদ্ধাদের নিয়ে। কাকাতিয়া রাজবংশের মহারানি রুদ্রাম্মা দেবীর বীরত্ব এমনই ছিল যে, তাঁর নামই দেওয়া হয়েছিল মহারানি রুদ্রদেব। ১২৮৯ সালে যখন অম্বা দেবার সঙ্গে যুদ্ধরত অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ততদিনে তাঁর ৩২টি যুদ্ধ জয় হয়ে গিয়েছে। রুদ্রাম্মা দেবী যাদবদের পরাস্ত করেছেন। গঙ্গা বংশীয়দের তাড়িয়ে দিয়েছেন নিজের রাজ্য থেকে। কলিঙ্গ উপজাতিদের পরাজিত করেছেন। আবার দেবগিরির মহারাজা তাঁকে নারী শাসক হিসেবে কটাক্ষ করায় তাঁর রাজ্যে ঢুকে দেবগিরির সেনাবাহিনিকে ধূলিসাৎ করেছিলেন শুধু নয়। দেবগিরিকে বাধ্য করেছিলেন বার্ষিক খাজনা প্রদান করতে। একটি রাজ্যকে পাশের স্বাধীন রাজ্য ভয়ে নিয়ম করে খাজনা দিচ্ছে, এই ঘটনা ইতিহাসে বিরল। তাও আবার দেবগিরির রাজা এক পুরুষ। আর রুদ্রাম্মা ছিলেন নারী। সুতরাং, আজ নয়, ভারতের নারীশক্তি চিরন্তন এক বীরগাথা।
আজ থেকে ৫০০ বছর আগে দক্ষিণ ভারতের কোনও এক প্রান্তিক রাজ্যের সাগরতীরবর্তী জনপদের নারীর আত্মসম্মানবোধ কতটা ছিল? যখন নাকি সেই সব জনপদে নারীরা ঊর্ধাঙ্গ পর্যন্ত উন্মোচিত করেই রাখতেন। কারণ সেটাই ছিল রীতি। যা দেখে বাণিজ্য করতে আসা পর্তুগীজরা ধরেই নিয়েছিল তারা প্রাচীন কোনও আফ্রিকার বর্বরতার দেশে এসে পড়েছে। অতএব এদের শাসন করার অধিকার নেই। আমরা সাদা চামড়ার মানুষ। আমরাই এদের সভ্যতা উপহার দেব। এহেন এক সময়ে দুই দেশীয় রাজ্য পাশাপাশি। একটি ম্যাঙ্গালুরু। পাশেই উল্লাল। উল্লালের রাজা থিরুমালা রায়ার কোনও সন্তান ছিল না। তাই ভাইঝি বুকা দেবীকেই তিনি উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেছিলেন। বুকা দেবী যখন উল্লালের সিংহাসনে বসলেন, সেই বছরটি ছিল ১৫৪৪ সাল। তাঁর নতুন নাম হল অবক্কা দেবী। স্বাভাবিক নিয়মেই অবক্কা দেবীকে ম্যাঙ্গালুরুর রাজা লক্ষমাপ্পা বঙ্গরাজার সঙ্গে বিবাহ দিলেন। এই বিবাহ হওয়ার পর্তুগীজরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন হল। কারণ এভাবে তো এই দুই শক্তি মিলিত হয়ে আরও বেশ ক্ষমতাবান হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারা জানে এই লক্ষমাপ্পা বঙ্গরাজা লোকটা নামে রাজা হলেও ভীরু প্রকৃতির। সুতরাং আরও ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করার রাস্তা প্রশস্ত করা হল।
যারাই এই পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস করবে আমি তাদের সঙ্গেই জোট করব। তারাই আমার বন্ধু। বললেন অবক্কা। তিনি স্বামীর কাছে এই ম্যাঙ্গালুরুতে থাকেন বটে, তবে এখানে থেকেই উল্লালের রাজকার্যও চালিয়ে যান। মাঝেমধ্যেই সেখানে থাকেন। কিন্তু তাঁর এই ঘোষণা মোটেই পছন্দ হল না স্বামী বাঙ্গারাজার। তিনি বললেন, পর্তুগীজদের কাছে যে রকম আধুনিক অস্ত্র আছে, তাদের সঙ্গে কে কতদিন ধরে যুদ্ধ করে জয়ী হবে? সম্ভবই নয়। সেই তুলনায় আমরা বরং পর্তুগীজদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করি। একবার তারা আমাদের বন্ধু হয়ে গেলে আর অন্য কোনও রাজা আমাদের আক্রমণ করা কিংবা তোমার রাজ্যের দিকেও চোখ তুলে তাকানোর সাহস পাবে না।
স্বামী শুধু যে কথার কথা বলছে না, এই কথাটি নিজের জীবন ও রাজকার্যে সত্যিই প্রয়োগ করতে চলেছে সেটা বুঝলেন অবক্কা দেবী। তাঁকে কোণঠাসা করার জন্য প্রথমে তাঁর রাজ্য উল্লাল থেকে বার্ষিক অনুদান দাবি করল পর্তুগীজরা। তারা বলল, এই স্বর্ণমুদ্রা আর আদায় করা খাজনার অংশ আমাদের না দেওয়া হলে উল্লাল দখল করে নেব। গোয়া আমাদের কবজায় এসেছে। এবার উল্লাল। রানি অবক্কা পর্তুগীজ দূতকে বললেন, যত দ্রুত সম্ভব হয়, আমার রাজ্যের বাইরে চলে যান। এখনই। নচেৎ একবার আমি যদি সিদ্ধান্ত নেই যে, প্রত্যাঘাত করব, তাহলে কিন্তু আপনাকে গ্রেপ্তার করে ফাঁসি দিয়ে সেই কাজটি প্রথম শুরু করব। অতএব তাড়াতাড়ি পালান।
সেই কথা পর্তুগীজরা শুনে বঙ্গারাজাকে বললেন,আপনার স্ত্রী নিজেকে কী ভাবছেন! আপনারও কি সেই মতামত? আপনার স্ত্রী আমাদের সূতের সঙ্গে ওরকম ব্যবহার করার কারণেই আমরা চাই আপনি আমাদের জরিমানা দেবেন। বার্ষিক যে টাকা আমরা উল্লালের কাছে চেয়েছি, সেই টাকাই আপনাকে দিতে হবে। সঙ্গে দ্বিগুণ মুদ্রা।
ম্যাঙ্গালুরুর রাজা বাঙ্গারাজা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ স্ত্রীর প্রতি। বললেন, এসব কী হচ্ছে? আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সব জমিদারি! এখানে শাসক করতে চাইলে এইসব শক্তিশালীদের সঙ্গে সদ্ভাব রাখতেই হবে। তুমি একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছো। এখনই ক্ষমতা চাও ওদের কাছে।
বিস্ময়ে হতবাক অবক্কা দেবী বললেন, আমি ক্ষমা চাইব! এই কথাটি বলার আগে আপনার ভাবা দরকার ছিল কাকে কী বলছেন!
বঙ্গারাজা বললেন, আমি স্থির করেছি পর্তুগীজদের সঙ্গে মিত্রতা করব। ওরা যা চাইছে তাই দেব। জলে থেকে কুমীরের সঙ্গে লড়াই করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
দুই মেয়ে এক পুত্র জন্ম নিয়েছে ততদিনে এই দম্পতির। সন্তানদের নিয়ে রানি অবক্কা অশ্বপৃষ্ঠে উঠলেন। আর বললেন, আমি চললাম। আমার রাজ্যে।
মানে? বঙ্গারাজা হতবাক। এসব কী? তিনি বললেন, কোথায় যাবে? কেন যাবে?
এরকম ভীরুর সঙ্গে থাকলে আমরা সন্তানেরাও ভীরু কাপুরুষ তৈরি হবে। বললেন আবাক্কা দেবী।
ইতিহাসে তাঁকে বলা হয় অভয়া দেবী। তারপর থেকে আর স্বামীগৃহে যাননি। উল্লালে নিজের রাজ্য নিজে শাসন করেছেন। এবং ত্রিশ বছরে অন্তত ১২ বার এই অবাক্কা দেবী পর্তুগীজদের আক্রমণ থেকে নিজের রাজ্যকে রক্ষা করেছেন। এমনকী একবার তাঁর রাজ্যে প্রবেশ করে পর্তুগীজ বাহিনি সম্পূর্ণ ছত্রভঙ্গ করে দেয় অবক্কা দেবীর সেনাদের। তিনি পালিয়ে রাতে একটি মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কিন্তু ভোর হওয়ার আগে মাত্র ২০ জন যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে আবার নিজের প্রাসাদের দখল নেওয়া পর্তুগীজদের আক্রমণ করেন। এবং মাত্র পাঁচ ঘন্টায় প্রাসাদ ফাঁকা করে প্রবেশ করেন নিজের কক্ষে। তাঁর চারদিকে তখন ছিল রক্তবন্যা! তিনি এক অঙ্কনশিল্পীকে ডেকে বলেছিলেন এই যে পর্তুগীজদের রক্তের মধ্যে বসে আছি, এই ছবি আঁকো! বাইরে টাঙাবো!
এই ছিল ভারতের নারী শাসকদের আত্মসম্মান এবং বীরত্ব! তালিকা অন্তহীন!