


করুণাময়ী বিশ্বজননী শ্রীশ্রীমা সারদার দিব্য মাতৃত্বের কথায় প্রব্রাজিকা আপ্তকামপ্রাণা।
যিনি নিজেই অঙ্গীকার করেছিলেন: আমি সতেরও মা অসতেরও মা, তাঁর অমৃতময় জীবনের বৈচিত্রপূর্ণ ঘটনাবলির বাঁকে বাঁকে দেখা যায় কত মধুর লীলার স্বাক্ষর। শ্রীমদ্ভাগবত বলেছেন, ভগবান পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন মানুষকে অনুগ্রহ করার জন্য, যাতে তাঁর লীলা স্মরণ করে মানুষ ঈশ্বরপরায়ণ হতে পারে। যুগদেবীর অনুপম জীবনখানিতে আমরা এই কথাটির প্রতিফলন দেখি। অজস্র মানুষকে তিনি কল্যাণপথে চলবার প্রেরণা দিয়েছেন, তাদের জীবনকে পরিচালিত করেছেন শ্রেয়ের পথে।
একটি বিচিত্র সংসারের মধ্যে থেকে অগণিত সাধু ভক্ত এবং নানা শ্রেণির মানুষকে নির্বিচারে তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন। স্থূল দেহে থাকাকালীন বহু বছর ধরে অসংখ্য মানুষের প্রাণে তিনি শান্তি আনন্দ করুণা বর্ষণ করেছেন। স্বার্থপর সংসারের গন্ডির বাইরে তাঁর ওই নিঃস্বার্থ প্রেমের জগতে সকলেরই ছিল আমন্ত্রণ। জগৎকে আপনার করে নিতে শেখো; কেউ পর নয়, জগৎ তোমার : তাঁর এই বাণীই তাঁর জীবনের মূল নির্যাস।
তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন, তিনি সতেরও মা অসতেরও মা, সতীরও মা অসতীরও মা। দক্ষিণেশ্বর থেকেই সেই কৃপা বর্ষণের আরম্ভ। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আহার্যের থালা একবার এক মহিলা তাঁর হাত থেকে নিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের ঘরে গিয়ে রেখে আসেন। শ্রীশ্রীঠাকুর অত্যন্ত শুদ্ধসত্ত্বতনু, সামান্যতম অপবিত্র চিন্তা যার মনে ওঠে তিনি তার হাতে খেতে পারেন না। তাই তিনি অনুযোগ করে শ্রীমা সারদাকে বললেন, তাঁর খাবারের থালা যেন আর কখনো কারো হাতে না দেওয়া হয়। জননীর বিবেচনা কিন্তু অদ্ভুত। তিনি জানিয়ে দিলেন, তাঁকে মা বলে কিছু চাইলে তিনি না বলতে পারবেন না। আরো একটি আশ্চর্য কথা তিনি সেদিন বলেছিলেন: ‘তুমি তো শুধু আমার ঠাকুর নও, তুমি সকলের।’ এই কথাটির মধ্যে কতখানি তাৎপর্য লুকিয়ে আছে তা মনে করলে আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। তখন সারদা কিশোরী, নিজের স্বামীকে সকলের বলে ঘোষণা করার মধ্যে তাঁর অপূর্ব মহনীয়তা লক্ষ করার মতো। তাছাড়া তখনই তিনি জানেন, কী উদ্দেশ্য নিয়ে ভগবান ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন। সকলের কল্যাণের জন্যই তাঁর আসা, পাপীতাপী পবিত্র-অপবিত্র নির্বিশেষে সবাইকে উদ্ধার করতে। শ্রীশ্রীমা যেন অবতারকে নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করিয়ে দিলেন।
আরেকটি ঘটনা। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে এক বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলতে বারণ করতেন কারণ সেই বৃদ্ধার পূর্বজীবন ভালো ছিল না। শ্রীশ্রীমা কিন্তু স্বামীকে বলেছিলেন, ‘ও তো এখন ভালো কথাই কয়, হরিকথা কয়।’ মানুষ ভুল করতেই পারে, কিন্তু সেই ভুলটিকে যদি সারাজীবন মনে রেখে তার সঙ্গে কেউ কথা না বলে অথবা তাকে সারা জীবন শাস্তি দেয়, তা শোধরানোর উপায় না করে, তাহলে তা খুবই অমানবিকতা। মা সর্বদাই তাঁর সন্তানদের মনের ধুলো কাদা ঝেড়ে নিয়ে তাদের কোলে তুলে নিয়েছেন। যারা এলে অন্যেরা অসন্তুষ্ট হত তাদেরও তিনি সাদরে তাঁর কাছে আসতে দিতেন, বলতেন, তারা তাঁর আশ্রয় নিয়েছে, আশ্রিতকে তিনি ছাড়তে পারবেন না।
অনেক সময় আমাদের মনে হয়, তাঁর আপাত সাধারণ জীবনটির মাধুর্য যেন সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষভাবে বিকশিত হয়েছিল। স্বামী সারদেশানন্দজি লিখেছেন, ‘মায়ের বাড়িতে কুলি, মজুর, গাড়িওয়ালা, পালকি-বেহারা, ফেরিওয়ালা, মেছুনী-জেলে যে-ই আসুক, সকলেই তাঁর পুত্র-কন্যা; সকলে ভক্তগণেরই মতো স্নেহ-আদর পায়। এখানে শুধু জিনিসপত্র ও টাকাকড়ির আদান-প্রদান নয়, স্বার্থপর সাংসারিক রীতির ঊর্ধ্বে নিঃস্বার্থ প্রেমের ব্যাপার; সকলেই তা জানে। সকলেই মায়ের সন্তান, যে-কোন উপলক্ষেই আসুক, সুমিষ্ট সম্ভাষণ, স্নেহাদরে জলখাবার মুড়ি-গুড়— না হলে অন্তত একটু প্রসাদী মিষ্টি-জল পাবেই। আর সেই সকরুণ স্নেহদৃষ্টি— যা ইহ-পরকালে আর ভুলতে পারবে না, যদি বা বিস্মরণ হয়, দুঃখে-কষ্টে পড়লেই মনে হবে অভয়াকে, আর মনে পড়বে তাঁর অভয়বাণী, কৃপাদৃষ্টি!’
যাদের জন্য কেউ ভাবে না, তাদের কথা মা ভেবেছেন সারাজীবন। সেই জাতপাতের নিগড়ে বাঁধা সমাজে ব্রাহ্মণের বিধবা হয়ে বাস করে শ্রীশ্রীমা যে অপূর্ব উদারতা দেখিয়েছেন তা বিস্ময়কর। জয়রামবাটির কাছেই শিরোমণিপুরে বহু মুসলমান বাস করত। তাদের জীবিকা ছিল তুঁতের চাষ। ইংরেজদের রেশমের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সেই চাষ বন্ধ হয়ে যায়। তুঁতে চাষিরা বাধ্য হয়ে চুরি-ডাকাতি করতে আরম্ভ করে। মা কিন্তু তাদের খুবই ভালোবাসতেন, তারা যখনই আসত যেভাবে পারতেন সাহায্য করতেন। মায়ের নতুন বাড়ি যখন হল তখন তিনি গ্রামবাসীদের আপত্তি অগ্রাহ্য করে তাদেরই মিস্ত্রির কাজ দিলেন। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন কেন তারা চুরি করে। পরবর্তী কালে তাদের পরিবর্তন দেখে গ্রামের মানুষ অবাক হত। তারা বলত, ‘মায়ের কৃপায় ডাকাতগুলো পর্যন্ত ভক্ত হয়ে গেল রে।’ একদিন একজন তুঁতে মুসলমান তার বাড়িতে হওয়া কতকগুলি কলা এনে সসংকোচে মাকে দেয়, বলে যে ঠাকুরের জন্য এনেছে। মা প্রীতির সঙ্গে হাত বাড়িয়ে বলেন, ‘খুব নেব বাবা, দাও।’ সেখানে উপস্থিত এক ভক্ত বললেন, ‘ওরা চোর, আমরা জানি। ওর জিনিস ঠাকুরকে দেওয়া কেন?’ মা নিরুত্তরে কলাগুলি ঠাকুরের জন্য তুলে রাখলেন। তাকে মুড়ি মিষ্টি দিলেন। পরে সে চলে গেলে মা ভক্তটিকে বললেন, ‘কে ভালো কে মন্দ আমি জানি।’ তিনি বলতেন, ‘দোষ তো মানুষের লেগেই আছে। কী করে যে তাকে ভালো করতে হবে, তা জানে কজনে।’
দুঃখী পীড়িত অবহেলিত যারা, তাদের প্রতি মায়ের প্রশ্রয় বিশেষভাবে প্রকাশিত হত। সাতবেড়ে গ্রামের লালু জেলে মায়ের বাড়িতে কোনো উৎসব অনুষ্ঠান হলে আবদার করে মাকে গান শোনাতে আসত। জয়রামবাটির চৌকিদার অম্বিকাকে মা সাদরে নিজের দাদা বলে স্বীকার করতেন। একবার এক সাপুড়ে খেলা দেখিয়ে যাওয়ার পর মা তাদের আপ্যায়ন করেন। মা তাদের দলপতিকে মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করছেন দেখে এক ভ্রাতৃবধূ অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘সাপুড়েকে টাকা দিয়েছ, কাপড় দিয়েছ, খেতে দিয়েছ, এই তো বেশ। ওদের আবার ছোঁয়া কেন বাপু!’ লোকজননী কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ‘লোকটা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে,... আর আমি মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করব না? তোমাদের এ কেমনতর কথা!’
গ্রামের একটি বিধবা বধূ কানে ঘা হয়ে প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছিলেন। কেউ তাঁর কোনো খবর নিত না। মা তাঁকে কোয়ালপাড়ার আশ্রমে রেখে সেবা করবার ব্যবস্থা করেছিলেন।
মা বাগবাজারে থাকতে কর্মচারী চন্দ্রমোহন দত্ত মায়ের এবং উদ্বোধন কার্যালয়ের সেবা করতেন। হঠাৎ একদিন খবর পেলেন তাঁর দেশের বাড়িঘর পদ্মানদীর গ্রাসে নষ্ট হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ নিরাশ্রয় পরিবারের কথা ভেবে চন্দ্রবাবুর পাগল হওয়ার উপক্রম। মা এই খবর জেনে খুবই উদ্বিগ্ন হলেন এবং গোপনে তাঁকে ৩০০ টাকা দিয়ে বললেন, ‘দেশে গিয়ে ওদের একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে এসো।’ বলাবাহুল্য, সেই আমলে ৩০০ টাকার অর্থমূল্য ছিল অনেক ।
মায়ের আশীর্বাদ এমনি করেই সাধারণ মানুষের উপর ঝরে পড়েছে। তাঁর জগৎজোড়া সন্তানদের জন্য তাঁর অন্তরে সর্বদাই মঙ্গলকামনা প্রবাহিত থাকত। এক ডাক্তারের স্ত্রী একবার মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন তাঁর স্বামীর যাতে আর্থিক উন্নতি হয়। তাতে মা বলেন, ‘বউমা, এমন আশীর্বাদ করব আমি— লোকের অসুখ হোক, কষ্ট পাক? তা তো আমি পারবো না মা! সব ভালো থাকুক, জগতের মঙ্গল হোক।’
রোজ গঙ্গাস্নানের পর তিনি সর্বান্তঃকরণে প্রার্থনা করতেন, ‘মা জগদম্বে, জগতের কল্যাণ করো।’
কখনো কখনো ভক্তদের ভক্তির উচ্ছ্বাস পাগলামিরই নামান্তর হয়ে উঠত। কেউ হয়তো প্রণাম করতে এসে তাঁর পায়ের আঙ্গুলে মাথা ঠুকে দিল, যতদিন ব্যথা থাকবে মা তাকে মনে রাখবেন ভেবে। কেউ হয়তো তাঁকে প্রণাম করবার সময় বহুক্ষণ ধরে প্রাণায়াম ন্যাস ইত্যাদি করতে লাগল, মা ঠায় দাঁড়িয়ে গলদঘর্ম হয়ে পূজা নিতে লাগলেন। সংসারের নানা কামনা-বাসনায় পূর্ণ মানুষ তাঁর পবিত্র শরীর স্পর্শ করলে মায়ের অসহ্য জ্বালা যন্ত্রণা হত। কিন্তু এই কথা শুনলে পাছে স্বামী সারদানন্দজি প্রমুখ সেবকরা প্রণাম বন্ধ করে দেন সেই ভয়ে মা কিছু বলতেন না, নীরবে গঙ্গাজলে পা ধুয়ে নিতেন। মায়ের কষ্ট দেখে একবার তাঁর সঙ্গিনী গোলাপ মা মাকে অভিযোগ করে বলেছিলেন, ‘তোমার যেমন হয়েছে— যে আসবে মা বলে, অমনি পা বাড়িয়ে দেবে!’ করুণায় বিগলিত জননী উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কী করব, গোলাপ? মা বলে এলে আমি যে থাকতে পারিনে।’
শ্রীরামকৃষ্ণদেব শ্রীশ্রীমাকে বলে গিয়েছিলেন, ‘কলকাতার লোকগুলো যেন অন্ধকারে পোকার মতো কিলবিল করছে। তুমি তাদের দেখো।’ কলকাতাকে প্রতীক করে সমস্ত জগতের ভারই জননী সারদার উপর অর্পিত হয়েছিল। শত শত মানুষ গিয়েছে তাঁর কাছে, স্নেহ ভালোবাসা আর একটু শান্তি পেতে। যে যা চেয়েছে তাঁর কাছে তাই পেয়েছে। ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ। তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই পার্থিব বাসনা পূর্ণ করে শ্রীশ্রীমা তাদের অপার্থিব সম্পদের দিকেই পরিচালিত করেছেন।
একটি দৃষ্টান্ত। গৃহবধূ বীণাপাণি ঘোষ। তাঁর জীবন ধন্য হয়েছিল করুণাময়ী মায়ের আশ্রয়লাভে। তখনকার দিনের কঠোর শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়ি ছিলেন শ্রীশ্রীমায়ের কাছে মন্ত্রদীক্ষাপ্রাপ্ত, কিন্তু শাশুড়ির সামনে অপরের সঙ্গে কথা বলার নিয়ম ছিল না। তাই বাগবাজারে উদ্বোধন বাড়িতে শাশুড়ির সঙ্গে শ্রীশ্রীমায়ের কাছে গেলেও তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হত না। মায়ের কাছে কৃপালাভের ইচ্ছা মনে মনে থাকলেও তা প্রকাশ করার অবকাশ পাননি বীণাপাণি। বহু বছর অপেক্ষা করার পর অবশেষে সুযোগ ঘটে। শ্রীশ্রীমা তখন নিবেদিতা স্কুলের বোর্ডিংয়ে আছেন অসুস্থ ভাইঝি রাধুকে নিয়ে। ঠাকুরঘরে দীক্ষা হল। বীণাপাণি মায়ের চরণ দুটি ধরে কাতর স্বরে বলেছিলেন, ‘মা মা, শ্রীচরণে আশ্রয় দিলেন তো?’ তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে, চোখ মুছিয়ে দিয়ে কৃপাময়ী উত্তর দিয়েছিলেন, ‘হ্যাঁ মা, দিলুম বইকি।’
এই মহা আশ্বাসের মর্ম বীণাপাণি সারা জীবন ধরে উপলব্ধি করেছেন। তাঁর লক্ষপতি পিতা একবার লখনউতে মার্কেটে নিয়ে গিয়ে তাঁকে বললেন, ‘তোমার যা ইচ্ছা নাও।’ কয়েক হাজার টাকার জিনিস কিনলেও তখন তিনি দিতেন কিন্তু বীণাপাণির মনে হল, শ্রীশ্রীমা তো নির্বাসনা হবার শিক্ষা দিয়েছেন! কন্যা বললেন, ‘কিছুই চাই না বাবা, সবই তো আছে, মিছিমিছি এই লখনউ থেকে কলকাতা অবধি বোঝা বাড়বে।’
এমন সুযোগ হারানোর জন্য সংসারের দৃষ্টিতে বোকা মেয়েকে অনেক গঞ্জনা পরে সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু নীরবে তিনি তাঁর কৃপাময়ী গুরুমাকে স্মরণ করছিলেন।
বেশ কয়েক বছর পর একবার সপরিবারে তাঁরা বেলুড় মঠে গিয়েছেন। সংসারের নানা প্রতিকূলতা তখন তাঁদের সঙ্গী। শ্রীরামকৃষ্ণের পার্ষদ স্বামী শিবানন্দজি তখন মঠের প্রেসিডেন্ট। প্রণাম করতেই তিনি বীণাপাণিকে প্রসন্ন মূর্তিতে বলে উঠলেন, ‘তোর কী চাই? বল কী চাই?’
স্বয়ং শিবাবতার চতুর্বর্গদানে উন্মুখ। বীণাপাণির মনে জেগে উঠল শ্রীরামকৃষ্ণের কথা: রাজার সঙ্গে দেখা হলে কি লাউ কুমড়ো চাইতে হয়? আরো মনে উঠল শ্রীশ্রীমায়ের নির্বাসনার উপদেশ। তাঁর ঠোঁট উচ্চারণ করল : ‘ঠাকুরের পায়ে যেন রতি মতি হয় মহারাজ, আর কিছু চাই না।’ সাক্ষাৎ শিব সুপ্রসন্ন হয়ে বললেন, ‘হবে হবে, তোদের হবে।’
একই রকম আরও একটি ঘটনা। বীণাপাণির দেওরের লালগোলার বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণের আর এক পার্ষদ স্বামী অখণ্ডানন্দজি মহারাজ একবার অতিথি হয়ে রয়েছেন। সকালবেলা বাগানে ইজিচেয়ারে বসে শিশুর মতন নানা গল্প করছেন। বীণাপাণি বললেন, ‘মহারাজ আজ পয়লা জানুয়ারি, আজকের দিনে ঠাকুর কল্পতরু হয়েছিলেন, আপনিও আজ আমাদের কল্পতরু হোন।’ তখনই শিশুসুলভ ভাব ত্যাগ করে মহারাজ গম্ভীর হলেন এবং যেন বর দিতে উদ্যত হয়ে বললেন, ‘বলো তোমার কী চাই।’ বীণাপাণির মনে আবার গুরুর বাণী জেগে উঠল: নির্বাসনা। তিনি বললেন, ‘মহারাজ, আর কিছু নয়, আমি গরম গরম খাবার করে দেব আর আপনি আমার কাছে বসে খাবেন।’ ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের রূপ আবার বদলে গেল, তিনি শিশুর মতো বলে উঠলেন, ‘বেশ তাই হবে, তুমি যা দেবে তাই খাব।’
এইভাবে বারবার করুণাময়ী বিশ্বজননী শিষ্যার অন্তরে বসে তাঁকে রক্ষা করেছেন, শুভ পথে চলবার প্রেরণা দিয়েছেন, স্থূলদেহে না থেকেও যেন স্বয়ং হাত ধরে বাসনাজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।
আমাদের অন্তর থেকে লোভ ক্রোধ হিংসা বিদ্বেষের অসুর দূর করতেই তাঁদের আসা। শ্রীশ্রীমায়ের পরম আশীর্বাদ মানব সভ্যতার উপর বর্ষিত হয়েছে— যে এসেছে, যে আসেনি, যে আসবে, সকলকে তিনি জানিয়ে দিতে বলে গেছেন, তাঁর ভালোবাসা তাঁর আশীর্বাদ সকলের উপর আছে। তাঁর আশীর্বাদের অর্থ আমাদের পার্থিব কামনা পূর্ণ হওয়া নয়, বরং আমাদের অন্তরের জাগরণ। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, সকল উপাসনার সার শুদ্ধচিত্ত হওয়া আর অপরের কল্যাণ সাধন করা। শ্রীরামকৃষ্ণ-সারদা-বিবেকানন্দের সমস্ত আশীর্বাদকে, সমস্ত বাণীকে এই একটি বাক্যে সংহত করা যায়। আমরা যেন নিজে ভালো হতে চেষ্টা করি এবং সকলের ভালো করতে চেষ্টা করি, এটিই তাঁদের আগমনের উদ্দেশ্য। তাঁদের সেই তাৎপর্যময় আশীর্বাদ আমাদের সকলের উপর অঝোর ধারায় বর্ষিত হোক।