


ছেঁড়া ঘুড়ি আর নিভে আসা তারা গুরু দত্ত, গীতা দত্ত এবং ওয়াহিদা রেহমান। এক নিশ্চুপ, নীরব এবং রহস্যময় ত্রিকোণ সম্পর্ক। লিখছেন সুনেত্রা সাধু।
একটা ট্রেন ঘন ধোঁয়া উড়িয়ে ধীর গতিতে স্টেশন ছেড়ে যাচ্ছে। পিছনে পড়ে আছে আবছা আঁধার আর ধোঁয়াশায় ঢাকা বম্বে শহর। যেন কোনও সাদা-কালো ছবিতে তৈরি করা হয়েছে রহস্যময় এক ছায়া। বম্বে সিনে জগৎ তখনও জানে না তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ‘সিনেমার মতো’ নাটকীয় একটি ঘটনা। বাতাসে গুঞ্জন উড়িয়ে, অপার ঐশ্বর্য, খ্যাতি আর চেনা গণ্ডি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে আকণ্ঠ প্রেমে ডুবে থাকা দুটো মানুষ। প্রেমিকটির নাম আজম-উল-হাসান। দীর্ঘদেহী, সুদর্শন, সুপুরুষ এবং ‘বম্বে টকিজ’-এর প্রথম হিরো। যাঁর শরীরে বইছে লখনউর খাঁটি নবাবি রক্ত। আর প্রেমিকাটি হলেন ‘বম্বে টকিজের ফার্স্ট লেডি’ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী দেবিকা রানি।
দেবিকা ছিলেন ঠাকুর পরিবারের আত্মীয়া। ছোটবেলা থেকেই মুক্তমনা আবহে বড় হয়ে উঠেছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে পড়তে আসা তাঁর এই দৌহিত্রীর চারুশিল্প জ্ঞানে মুগ্ধ হয়েছিলেন। কবি দেবিকার বাবাকে বলেছিলেন, ‘তোমার কন্যেটি সূর্যমুখীর কুঁড়ি। ওর জন্য রোদ্দুরের বন্দোবস্তে ফাঁকি দিও না যেন।’ ভারতের প্রথম শল্য চিকিৎসক কর্ণেল মন্মথ চৌধুরীও মেয়ের শিক্ষা-দীক্ষায় কোনও ফাঁক রাখেননি। শৈশব থেকেই দেবিকা ইউরোপীয় আদব-কায়দা শিখে বড় হয়ে উঠেছেন। যে সময় ভারতবর্ষে মেয়েদের অভিনেত্রী হওয়াকে বিশেষ ভালো নজরে দেখা হতো না সেই সময় তিনি ইউরোপের কলেজে ক্লিওপেট্রার চরিত্রে অভিনয়ের অডিশন দিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। দেবিকার নিঁখুত উচ্চারণ ও অবাক করা অভিনয় দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে বিচারকেরা বলেছিলেন, ‘আপনি হলিউডে ডাক পাবেন’। তখন তিনি লন্ডনের একটি কলেজে স্থপতিবিদ্যার ছাত্রী। কিন্তু ভবিষ্যৎ কেই বা দেখতে পায়! দেবিকারও অজানা ছিল যে একদিন তাঁর নামটি ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে আর ওতপ্রোতভাবে জুড়ে যাবেন হিমাংশু রাই এবং ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ‘বম্বে টকিজ’-এর সঙ্গে। এই ‘বম্বে টকিজ’-এরই প্রথম সবাক সিনেমা ‘জওয়ানি কি হাওয়া’ ছবিতে তাঁরই বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন সিনেমা জগতে সদ্য পা রাখা আজম-উল হাসান। বলতে গেলে যার অভিনয় শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছিল দেবিকা রানির তত্ত্বাবধানেই।
‘বম্বে টকিজ’-এর প্রাণ বম্বে চলচ্চিত্র জগতের ‘ডিভা’ দেবিকা রানি আর নবীন অভিনেতা আজম-উল-হাসান একদিন ইলোপ করলেন। ঘটনাটি এতই অপ্রত্যাশিত ছিল যে দেবিকার স্বামী হিমাংশু রাই দিশেহারা হয়ে পড়লেন আর মাঝপথে থেমে থাকল ‘জীবন নাইয়া’ ছবির কাজ। যে ছবির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের চিত্রগ্রহণ হয়ে গিয়েছিল। আজম-উল-হাসান ও দেবিকা রানি পালিয়ে যাওয়াতে সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ‘বম্বে টকিজ’-এর অধিপতি দেবিকার স্বামী হিমাংশু রাই। হাসানের পরিবর্তে অন্য নায়কের খোঁজ সহজ হলেও দেবিকার জায়গায় অন্য নায়িকাকে ভাবা সহজ ছিল না। ‘বম্বে টকিজ’-এ দেশি এবং বিদেশি মিলিয়ে কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় চারশো। ‘জীবন নাইয়া’র কাজ মাঝপথে থেমে যাওয়াতে ‘বম্বে টকিজ’ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। এমনটা যে হতে পারে তা দেবিকার অজানা ছিল না। কারণ দেবিকা শুধু মাত্র হিরোইন ছিলেন না। বম্বে টকিজ পরিচালনার ভার অনেকটাই তাঁর উপরেই ছিল। কিন্তু প্রেম এমন একটি বিষয় যা উচিত অনুচিত এবং ঠিক ভুলের অনেক ঊর্দ্ধে। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কিছু শূন্যতা থাকে। দেবিকার জীবনেও ছিল। তিনি ছিলেন হিমাংশু রাইের দ্বিতীয় স্ত্রী। ‘বম্বে টকিজ’ পরিচালনার চাপে তাঁদের দাম্পত্য জীবনেও ‘প্রেম’ শব্দটি ঝাপসা হয়ে এসেছিল। হয়তো দেবিকার জীবনের সেই শূন্যতাকে পূর্ণতা দিতেই আজম-উল-হাসানের আগমন ঘটেছিল। ‘জওয়ানি কি হাওয়া’ ছবির শ্যুটিং চলাকালীন তাঁরা একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। আসলে মোহময়ী দেবিকা রানি স্বভাবতই রোমান্টিক প্রকৃতির ছিলেন। যৌবনের চাবিকাঠি ছিল তাঁর হাতের মুঠোয়। তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে পৌঁছতে চেয়েছিলেন ‘টপ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ। আর বাঁচতে চেয়েছিলেন এক নাটকীয় জীবন। তাই বোধহয় তাঁদের পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা অনেকটা ‘জওয়ানি কি হাওয়া’ সিনেমার মতোই ছিল। যে গল্পে কমলা (দেবিকা রানি) তার প্রেমিক রতনলালের (আজম-উল-হাসান) সঙ্গে বিয়ের দিন ইলোপ করে। তবে শেষরক্ষা হয়নি। কমলার বাবা ধাওয়া করে ট্রেনের মধ্যে তাঁদের ধরে ফেলেন। রতনলালের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষ হয় যা শেষ হয় একটি গুলির শব্দে। তারপর সন্ধ্যার রহস্যময় অন্ধকারে ট্রেন থেকে একটি মৃতদেহ ফেলে দেওয়া হয়। ‘বম্বে টকিজ’-এর প্রথম সবাক ছবি ‘জওয়ানি কি হাওয়া’ ছিল এক জমজমাট থ্রিলার। কাহিনির সঙ্গে আগাথা ক্রিস্টির রহস্য উপন্যাস ‘মার্ডার ইন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস’-এর মিল থাকলেও ‘জওয়ানি কি হাওয়া’ ছিল সম্পূর্ণ ভারতীয় পটভূমিতে তৈরি এবং তাতে সিনেমার জনপ্রিয়তায় কোনও ভাঁটা পড়েনি।
১৯৩৫ সাল। তখন ‘বম্বে টকিজ’-এর হাত ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ সদ্য সাবালক হয়ে উঠছে। হয়েছে নির্বাক থেকে সবাক। ‘বম্বে টকিজ’-এর কথা যখন এলই তখন এর গড়ে ওঠার কাহিনিটাও পাতায় থাক। কারণ রামকে জানতে হলে যেমন অযোধ্যাকে জানতে হয় অথবা শ্রীকৃষ্ণকে জানতে হলে বৃন্দাবনকে তেমনই ভারতীয় সিনেমা জগতের অন্দরের খবর জানতে হলে হিমাংশু রাইের হাতে গড়ে ওঠা ‘বম্বে টকিজ’-এর নাম বাদ দেওয়া যায় না। আর মনে রাখতে হয় ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের ‘স্ক্রিন গডেস’ দেবিকা রানি চৌধুরীকে। যাঁর মতো সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, রহস্যময়ী ব্যক্তিত্ব চলচ্চিত্র জগতে প্রায় বিরল।
সময়টা স্বাধীনতার বেশ কিছুর আগে, তখন বম্বের উত্তর-পশ্চিমের মালাডকে ‘মিনি মিউনিখ’ বলা হতো। কারণ সেই মালাডেই স্ত্রী দেবিকা রানির সহযোগিতায় হিমাংশু রাই ও দেবিকা রানি চৌধুরী স্থাপন করেছিলেন ‘বম্বে টকিজ’। যা এশিয়ার সেরা সজ্জিত ফিল্ম স্টুডিওগুলির মধ্যে একটি। জার্মানি আর ব্রিটেন থেকে আসা মহারথীরা সেই ফিল্ম সিটিতে এসে যোগ দিলেন। পরিচালক ফ্রান্জ অস্টেন ছবি পরিচালনার দায়িত্বটি কাঁধে তুলে নিলেন, সঙ্গে রইলেন কার্ল ফন স্প্রেতি ও জোসেফ উইরসিং।
বম্বে শহরে নিজস্ব ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলার ইচ্ছের কথা জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে আরও কিছু বছর পিছনে। যেখানে অবধারিতভাবে আসবে একটি নাম, নিরঞ্জন পাল। যিনি ছিলেন জাতীয়তাবাদী নেতা বিপিন চন্দ্র পালের পুত্র। যাঁকে বাদ দিলে বম্বে টকিজ, হিমাংশু রাই, দেবিকা রানি আর আজম-উল হাসানের গল্পটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। নিরঞ্জন পাল-ই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ভারতীয় সিনেমাকে আন্তর্জাতিকতায় উত্তীর্ণ করতে চেয়েছিলেন। লন্ডনে ডাক্তারি পড়ার উদ্দেশ্যে ভারত ছেড়েছিলেন, কিন্তু এখানে থাকাকালীনই ব্রিটিশ রঙ্গমঞ্চে এবং চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন। ডাক্তারি পড়া মাঝপথে ছেড়ে দিয়ে ঢুকে পড়লেন ‘ইন্ডিয়ান আর্ট অ্যান্ড ড্রামাটিক সোসাইটি’তে। অভিনয়ের পাশাপাশি শুরু করলেন চিত্রনাট্য লেখার কাজ। কিন্তু অর্থের অভাবে নাটক এবং সিনেমা তৈরি করার স্বপ্ন তখনও অধরা ছিল।
সালটা ১৯২০, পিকাডেলির এক রেস্তরাঁয় তাঁর সঙ্গে ‘সেলউইন থিয়েটার্স’-এর বিখ্যাত পরিচালক ‘গাই ব্র্যাগডন’-এর আলাপ হল। নিরঞ্জন পালের লেখা ‘দ্য গডেস’ নাটক তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। ব্র্যাগডন নাটকটি মঞ্চস্থ করতে সম্মত হলে এক ভারতীয় অভিনেতার খোঁজ পড়ল। কারণ সেই সময় ইউরোপের রঙ্গমঞ্চে ব্রিটিশ এবং জার্মান অভিনেতারাই রং মেখে ভারতীয় নাটকে অভিনয় করতেন। কিন্তু নিরঞ্জন পাল ‘দ্য গডেস’- এর জন্য একজন ভারতীয় অভিনেতা খুঁজছিলেন। তাঁরই বন্ধু পত্নী মেবেল পালিত যোগাযোগ করিয়ে দিলেন লন্ডনে আইন পড়তে আসা হিমাংশু রাইের সঙ্গে। ‘দ্য গডেস’ নাটকেই নায়কের ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করলেন হিমাংশু রাই। বাকিটুকু ইতিহাস। এরপর নিরঞ্জন আর হিমাংশু হয়ে উঠলেন একে অপরের পরিপূরক। হিমাংশুও ছিলেন শান্তিনিকেতনের ছাত্র। বাবার ইচ্ছেতে লন্ডনে আইন পড়তে এসেছিলেন। কিন্তু ‘দ্য গডেস’ নাটকটি জনপ্রিয় হতেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে সিনেমা জগতের সঙ্গে জুড়ে গেলেন। বলতে গেলে তখন থেকেই ‘বম্বে টকিজ’-এর সলতে পাকানোর কাজটি শুরু হয়েছিল।
হিমাংশু যখন ব্রিটিশ এবং জার্মানদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অভিনয়, সিনেমা ও নাটকের কাজ করছেন তখন দেবিকা চৌধুরী নামে একটি মেয়ে লন্ডনে টেক্সটাইল ডিজাইন আর স্থাপত্যবিদ্যার ছাত্রী হয়ে পড়াশোনা করতে এসেছেন। থাকছেন নিরঞ্জন পালের বাড়িতে। যে দেবিকা চার বছর বয়সে ওয়ালটেয়ার শহরের এক মঞ্চে নারদ মুনির চরিত্রে অভিনয় করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। শৈশব থেকেই বিদেশি নির্বাক ছবি দেখে অভিনয়ের শিক্ষা পেয়েছেন। নিরঞ্জনের বাড়িতে থাকার সুবাদে ইউরোপের অভিনয় জগতের সঙ্গে আরও বেশি করে জড়িয়ে পড়লেন। ওই যে আগেই বলেছি দেবিকা চেয়েছিলেন এক নাটকীয় জীবন। অতএব মঞ্চের একক উজ্জ্বল আলো এবার দেবিকার উপরে ফেলা যাক।
হিমাংশু যখন ‘আ থ্রো অব ডাইস’ ছবির কাজটি শুরু করেছেন তখন তাঁর জীবনে দেবিকার আগমন ঘটেছিল। হিমাংশু বিবাহিত, বয়সে দেবিকার থেকে ষোলো বছরের বড়। বিয়ে করেছিলেন মিউনিখের ‘ডয়েশ থিয়েটার’-এর অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী মেরি হাইনলিনকে। তাঁদের নীলিমা নামের এক কন্যা সন্তানও ছিল। বিবাহিত হিমাংশু ‘উফা’-র আয়োজিত এক পার্টিতে দেবিকাকে দেখে চমকে উঠেছিলেন। দেবিকা তখন লন্ডনের ‘রয়্যাল আকাদেমি অব ড্রামাটিক আর্ট’-এর ছাত্রী। শিখছেন সৌন্দর্য চর্চা এবং মঞ্চ সজ্জার কাজ। আত্মপ্রত্যয়ী দেবিকাকে এড়িয়ে যাবেন এমন পুরুষ বিরল। হিমাংশু সেই চূড়ান্ত আধুনিকা, অসামান্য সুন্দরী বঙ্গললনার প্রেমে পড়লেন। যদিও হিমাংশুর চরিত্রটিও কম রঙিন ছিল না। তরল হৃদয়বৃত্তির কারণে বহু আগেই ‘লেডিজ ম্যান’, ‘ওম্যানাইজার’ তকমা জুটেছে। কিন্তু দেবিকার প্রেমে পড়ার পর তিনি দেরি করেননি। স্ত্রী মেরি এবং কন্যা নীলিমাকে ত্যাগ করে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেবিকার সঙ্গে এনগেজড হয়েছিলেন।
১৯২৮ সাল। হিমাংশু রাই তখন রাজস্থান ও দিল্লি ঘুরে ‘আ থ্রো অব ডাইস’ সিনেমার কাজটি সারছেন। সেসময় হিমাংশুর অতিথি হয়ে দেবিকা ভারতে এলেন। তাঁকে স্টেশন থেকে রিসিভ করার দায়িত্বটি হিমাংশুরই ছিল। কিন্তু সিনেমার কাজে আটকে পড়লেন। সহকারী মধু বসুর উপর দেবিকাকে স্টেশন থেকে রিসিভ করার দায়িত্বটি বর্তে ছিল। অথচ মধুর কাছে দেবিকা ছিলেন একেবারেই অচেনা। ‘কী করে চিনব?’ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করতেই দেবিকার মোহে ডুবে থাকা হিমাংশু শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, ‘ইটস ইমপসিবল টু মিস হার’। কথাটা অবশ্য মিথ্যা ছিল না। তাঁর মতো ব্যক্তিত্বময়ী নারী চোখ এড়িয়ে যাবে, এমনটা হয় না। এই ঘটনার পর দেবিকা বেশ কিছু মাস ভারতেই ছিলেন। সেই সময় হিমাংশুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা অনেক বেশি পোক্ত হয়েছিল। ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে ‘আ থ্রো অব ডাইস’-এর কাজ। হিমাংশু আর দেবিকা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। বিয়ের পরেই ফিরে গেলেন জার্মানিতে। দু’জনেরই লক্ষ্য ছিল ভারতের মাটিতে একটি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা। তাই দু’জনেই বল্গাহীন ঘোড়ার মতো ছুটতে শুরু করলেন। হিমাংশুর ইচ্ছেতেই দেবিকা ‘উফা’তে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দিলেন। তখন ইউরোপ জুড়ে নির্বাক ছবিকে সবাক করার কর্মকাণ্ড চলছে। হিমাংশুও সেসব কাজ দ্রুত শিখে নিচ্ছেন। প্রথম স্ত্রী মেরির সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হলেও এক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তখনও থেকে গিয়েছিল। দেবিকাকে সঙ্গে নিয়ে হিমাংশু অনেকবারই মেরি ও নীলিমার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছেন। নীলিমার অ্যালবামে সে সব ছবির হদিশ পাওয়া যায়। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, হিমাংশুর অত্যন্ত ঘনিষ্ট, ‘বম্বে টকিজ’-এর নেপথ্যে থাকা অন্যতম সহকারী মধু বসুর স্মৃতিচারণ ‘আমার জীবনে’-এ কোথাও মেরির উল্লেখ নেই। নিজের ইমেজ রক্ষা করতে হিমাংশু মেরির কথা গোপন রাখতেই পছন্দ করতেন। দেবিকার সঙ্গে বিয়ের পর সমস্ত প্রলোভন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে স্বচ্ছ ইমেজ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যখন নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইছেন তখন দেবিকা ধীরে ধীরে পাপড়ি মেলছেন। বাড়ছে তাঁর গুণমুগ্ধ ভক্তের সংখ্যা।
১৯৩৩ সাল। জার্মানি তখন উত্তাল। বাড়ছে নাৎসিদের দাপট। দেবিকা আর হিমাংশু ঠিক করলেন ভারতে ফিরে আসবেন। জার্মান সিনেমা জগতের সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু মানুষও তাঁদের সঙ্গে ভারতে এলেন। বম্বের মালাডে প্রতিষ্ঠিত হল ‘বম্বে টকিজ’। আর ভারতের মাটিতে গড়ে উঠল ‘মিনি মিউনিখ’। নিরঞ্জন পাল এতদিন স্বাধীন ভাবে কাজ করছিলেন। যুক্ত হয়েছিলেন অরোরা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে। কিন্তু হিমাংশুর অনুরোধে নিরঞ্জন সব ছেড়ে ‘বম্বে টকিজ’-এ যোগ দিলেন। ঘটে যাওয়া ঘটনার সবটাই ছিল রূপকথার মতো সুন্দর। এরপর হিমাংশু আর দেবিকার জীবনটাও সরলরেখায় বয়ে যেতে পারত। কিন্তু তা হয়নি। কারও ক্ষেত্রেই বোধহয় হয় না। আমাদের জীবনে উত্থান পতন থাকে। হয়েছিল সেটাই, উত্থানের পর এসেছিল অনিবার্য সাময়িক পতন।
সময়টা ১৯৩৬ সাল। এ কোনও সুদূর অতীত নয়। ইতিহাসের পাতা খুঁজলে অনায়াসেই বহু অবিকৃত তথ্যের হদিশ পাওয়া যাবে। তবু অতীতের ঘরে কিছু অলঙ্ঘ্য আঁধার থাকে আর থাকে কিছু স্বল্পালোকিত কাহিনি। যা সিনেমাকেও হার মানায়। আমরা বরং সেই ছেড়ে যাওয়া ট্রেন আর সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা দুটো মানুষের গল্পে ফিরে যাই। যাদের জীবনটা সিনেমার গল্পের মতো, নাকি সিনেমার গল্পটা তাদের জীবনের মতো সেই হিসেব এখনও অমীমাংসিত। এইসময় দেবিকা আর হিমাংশুর জীবনে আজম-উল-হাসান এক অপ্রত্যাশিত ঝড় বয়ে এনেছিল।
এবার বরং মঞ্চের একক আলোটি দেবিকার থেকে সরিয়ে আজম-উল-হাসানের উপরে ফেলা যাক। তিনি লখনউর বাসিন্দা, ছিলেন আইনের ছাত্র। অথচ অভিনয়ের নেশা তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত। সম্ভ্রান্ত বংশোদ্ভূত হাসান আইনের পড়া মুলতুবি রেখে বম্বে পাড়ি দিলেন। তখন ‘জওয়ানি কি হাওয়া’ ছবির জন্য হিমাংশু রাই নতুন নায়কের সন্ধান করছেন। নায়িকার ভূমিকায় থাকছেন দেবিকা রানি। এক পার্টিতে হিমাংশুই আজম-উল-হাসানকে আবিষ্কার করলেন। হাসান ছিলেন দীর্ঘদেহী সুদর্শন যুবা। গায়ের রংটি ছিল অসম্ভব ফর্সা। ভাইচাঁদ প্যাটেল তাঁর বই ‘টপ ২০: সুপারস্টারস অব ইন্ডিয়ান সিনেমা’তে এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন। যদিও সিনেমায় অভিনয়ের কোনও অভিজ্ঞতাই আজম-উল-হাসানের ছিল না। কিন্তু হিমাংশুর ভরসা ছিল। তিনি জানতেন অভিনয়ে পারদর্শী দেবিকা তাঁর কো-স্টারকে ঠিক শিখিয়ে পড়িয়ে নেবেন, সঙ্গে তিনি তো আছেনই।
বম্বে টকিজের পরবর্তী তিনটি ছবির জন্য আজমকে চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছিল। তখনও কেউ জানে না অদূরেই অপেক্ষা করছে সিনে জগতে সাড়া ফেলে দেওয়া একটি ঘটনা, যা আজম-উল-হাসানের জীবনটাকে আলো থেকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে। ‘জওয়ানি কি হাওয়া’ ছবি চলাকালীন দেবিকার সঙ্গে আজমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। যা বম্বে টকিজের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষের চোখ এড়ায়নি। তবে হিমাংশু বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেননি। দিলেও স্বাধীনচেতা দেবিকা তাঁর কথা শুনবেন, এমনটা ছিল না। ‘জওয়ানি কি হাওয়া’ সিনেমাটি সফল হলে আজম-উল-হাসান ও দেবিকা রানিকে নিয়ে শুরু হল ‘জীবন নাইয়া’ ছবির কাজ। তখন দেবিকা হাসানের প্রেমে পুরোপুরি নিমজ্জিত। হাসান মনে করতেন দেবিকা ‘পিঞ্জরে মে কয়েদ চিড়িয়া’। হিমাংশুর দাপটে যাঁর অভিনয় প্রতিভা ততখানি প্রস্ফুটিত হতে পারেনি।
সাদাত হসন মান্টোর একটি লেখায় দেবিকা রানি ও আজম-উল-হাসানের ইলোপ সম্পর্কে কিছু তথ্যের হদিশ পাওয়া যায়। মান্টো বেশ কিছু বছর বম্বে সিনে জগতে স্ক্রিপ্ট রাইটিং-এর কাজ করেছেন। পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি যখন ঘটছে তখন মান্টো বম্বে শহরে উপস্থিত। তার বেশ কিছু বছর পর এক পাকিস্তানি পত্রিকায় তিনি লিখছেন আজম-উল-হাসান দেবিকা রানিকে সেলুলয়েড জগৎ থেকে বাস্তব জগতে টেনে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দেবিকা ও হাসান ঠিক করেছিলেন কলকাতায় গিয়ে ‘নিউ থিয়েটার্স’-এ যোগ দেবেন। সমস্ত পরিকল্পনাকে সত্যি করতে দু’জনে সব কিছু ছেড়ে বম্বে থেকে কলকাতার ট্রেনে চড়ে বসলেন। গিয়ে উঠলেন গ্র্যান্ড হোটেলে। আসলে দেবিকার সাহস ছিল হিমাংশুর নিয়ন্ত্রণের অনেক ঊর্ধ্বে।
কিন্তু বাস্তব বড়ই কঠোর। তাঁরা কলকাতায় চলে গেলে পড়ে থাকল ‘জীবন নাইয়া’ ছবির অর্ধ সমাপ্ত কাজ। হিমাংশু পড়লেন অকূল পাথারে। তাঁর আত্মসম্মানেও প্রবল আঘাত লেগেছিল। চেয়েছিলেন দেবিকার সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করতে, কিন্তু তাতে ‘বম্বে টকিজ’-এর সঙ্গে জুড়ে থাকা মানুষেরা সব থেকে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতেন। এই দূর্যোগপূর্ণ সময়ে হিমাংশুর পাশে দাঁড়ালেন ‘বম্বে টকিজ’-এর সাউন্ড রেকর্ডিস্ট শশধর মুখার্জি। হিমাংশুকে না জানিয়েই কলকাতায় পৌঁছলেন। গ্র্যান্ড হোটেলে গিয়ে দেবিকার সঙ্গে দেখা করলেন। তখন দেবিকার কাছে নিউ থিয়েটার্সের অফার এসেছে। দেবিকাও বম্বেতে ফিরতে চাইছেন না। কিন্তু শশধর মুখার্জির কথায় তিনি শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছিলেন। শশধর বোঝান হিমাংশু ছাড়া তাঁর প্রতিভাকে আর কেউ তেমন ভাবে প্রকাশ করতে পারবে না। হাসানকে কলকাতায় ফেলে রেখে দেবিকা বম্বেতে ফিরে এলেন। আর হিমাংশু রাই হাসানের কেরিয়ারটিকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। ‘জীবন নাইয়া’ ছবির যে সমস্ত দৃশ্যের চিত্রগ্রহণ হয়ে গিয়েছিল সেসব বাতিল সম্পর্কের মতোই আবর্জনার স্তূপে ছুড়ে ফেলা হল। শুরু হল এক নতুন অধ্যায়।
দেবিকা বম্বে ফিরলেন ঠিকই কিন্তু এই ঘটনার পর হিমাংশুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সেভাবে আর কখনও জোড়া লাগেনি। হিমাংশু যতদিন বেঁচেছিলেন ততদিন তাঁরা একসঙ্গে ‘বম্বে টকিজে’র কাজ সামলেছেন। দেবিকার কেরিয়ারের গ্রাফটিও তরতর করে উপরে উঠেছে কিন্তু একে অপরের সম্পর্কটি ছিল নিতান্ত পেশাদারিত্বের। পরবর্তী সময়ে হাসানের সঙ্গে দেবিকা আর কোনও সম্পর্কই রাখেননি। মাঝপথে থেমে থাকা ‘জীবন নাইয়া’ ছবির কাজটি শেষ করতে হিমাংশু এক ‘নিরাপদ নায়ক’-এর খোঁজ করছিলেন। আবারও শশধর মুখার্জি পরিত্রাতা হয়ে আবির্ভূত হলেন। তাঁর শ্যালক তখন ‘বম্বে টকিজ’-এ ল্যাব টেকনিশিয়ানের কাজ করছিলেন সেই কুমুদলাল কুঞ্জলাল গঙ্গোপাধ্যায়কে রাতারাতি ‘জীবন নাইয়া’ ছবির নায়ক করে দেওয়া হল। ছবির কাজটি নির্বিঘ্নে শেষ হলে পর্দায় কুমুদলালের নামটি বদলে করে দেওয়া হল অশোক কুমার।
এক নতুন নায়কের আবির্ভাব ঘটল। এরপর বেশ কিছু ছবিতে অশোক কুমার ও দেবিকা রানিকে পাশাপাশি দেখা গিয়েছে। তাঁদের জুটি জনপ্রিয় হয়ে উঠল। এই প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণ প্রতাপ এবং অস্পৃশ্য কস্তুরীর মধ্যেকার প্রেম নিয়ে তৈরি ‘অচ্ছুত কন্যা’ ছবির নামটি বিশেষভাবে উল্লেখ করতেই হয়। এটি ছিল মহাত্মা গান্ধীর দেখা একমাত্র ছবি। সিনেমায় দেখানো সমাজের করুণ অবস্থা তাঁর হৃদয়কে আলোড়িত করেছিল। বম্বেতে যখন দেবিকার উত্থানের ঘটনা ঘটছে তখন কলকাতার অভিনয় জগতে আজম-উল-হাসান নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘অনাথ আশ্রম’-এ (১৯৩৭) মহান অভিনেতা পৃথ্বীরাজ কাপুরের সহ-অভিনেতা হয়ে অথবা ‘দুশমন’-এ (১৯৩৯) এ কে.এল. সায়গলের সহ অভিনেতার চরিত্রে অভিনয় করেও হাসান বিশেষ কোনও ছাপ রাখতে পারেননি। তাঁর অভিনয় কোথাও তেমনভাবে প্রশংসিত হয়নি। পরবর্তীতে ‘কপালকুণ্ডলা’ ও ‘নর্তকী’ ছবিতেও অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু সেই দুটো ছবিও ভালো ব্যবসা করতে পারেনি। শোনা যায় জীবনযুদ্ধে নাজেহাল হাসান প্রসিদ্ধ গায়িকা ও অভিনেত্রী জাহান আরা কজ্জনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। জাহান আরা মাত্র তিরিশ বছর বয়সে মারা যান। দেশ ভাগ হলে আজম-উল-হাসানও পাকিস্তানে চলে গেলেন।
দেবিকা ও হাসানের সম্পর্কে প্রেমের থেকে মোহ ছিল অনেক বেশি। তাই বোধহয় পরিস্থিতির বেনিয়মে প্রেম ফিকে হয়ে এসেছিল। এরপরেও দেবিকার সঙ্গে বেশ কিছু অভিনেতার নাম জড়িয়েছে। দেবিকা কখনও আবেগকে প্রশ্রয় দেননি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কখনও সর্বসমক্ষে চোখের জল ফেলিনি, তাতে নজরের ধার কমে যায়।’ এক মারাঠি অভিনেত্রীর স্মৃতিচারণায় আমরা এক বিস্ময়কর ঘটনার কথা জানতে পারি। বম্বে টকিজে হিমাংশুর মৃতদেহ রাখা আছে, বহু মানুষ আসছেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। সেই অভিনেত্রীও গিয়েছিলেন। ভয় পাচ্ছিলেন দেবিকাকে কেমন দেখবেন কী বলেই বা সান্ত্বনা দেবেন। কিন্তু একটি বন্ধ দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখলেন দেবিকা বেশ কিছু পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে বসে মদ্যপান ও হাসাহাসি করছেন। আসলে দেবিকা সব সময় নিজের শর্তে বেঁচেছেন। প্রেমে পড়তে এবং সেই প্রেম কাটিয়ে উঠতে তাঁর বেশি সময় লাগত না। তাই যে আজম-উল-হাসানের সঙ্গে পালিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন সেও এক সময় বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছিল।
হিমাংশু চলে যাওয়ার পর একাহাতে বম্বে টকিজের দায়িত্ব সামলেছেন। এই দার্ঢ্যেই ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম গুণ অথবা সমাজের চোখে দোষ। বহু সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু ভারতীয় সিনেমার শৈশবকালে যে অভিনেত্রী চার মিনিটের চুম্বন দৃশ্যে অভিনয় করতে পারেন তাঁর কাছে এসব তুচ্ছ। দেবিকার বয়স যখন চল্লিশ তখন রুশ চিত্রকর নিকোলাস রোয়েরিখের ছেলে স্বেতোস্লাভকে বিয়ে করে আবার সিনে ইন্ডাস্ট্রিকে চমক দিলেন। ততদিনে ‘বম্বে টকিজ’ ভেঙে গিয়েছে। দেবিকা বিয়ের পর চলে গেলেন কুলুর প্রাসাদে। শুরু করলেন এক নতুন অধ্যায়। দেবিকার জীবনে পুরুষেরা এসেছেন আবার চলেও গিয়েছেন। থেকে গিয়েছে কিছু গল্প। যেমন আজম-উল-হাসান রেখে গিয়েছেন, যা অনেকটা সিনেমার মতো। কিন্তু সত্যিই যদি দেবিকা সেসময় কলকাতা থেকে না ফিরতেন? থেকে যেতেন হাসানের সঙ্গে... যদি এমন হতো, তাহলে কেমন হতো...