


অহল্যা দ্রৌপদী কুন্তী তারা মন্দোদরী তথা।পঞ্চকন্যা স্মরে নিত্যং মহাপাতক নাশনম্।।
সতীসাজে নতিস্বীকার নয়। পুরাণ রামায়ণ মহাভারতের নারীদের তেজ দৃঢ়তা বুদ্ধিমত্তা ও অসহায়তা যুগধর্মের আলোয় আরো একবার দেখা। এই পর্বে কৃষ্ণভার্যা ‘রুক্মিণী’। লিখছেন সুচেতনা সেন কুমার।
মহাভারতের প্রধান নায়ক, দ্বাপরের শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ কৃষ্ণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে থেকে গিয়েছে যে নাম, তা ‘রাধা’। সে নামের সঙ্গে ভক্তি, প্রেম এমনভাবে জুড়েছে যে তার ঐশ্বর্যের আলোকে প্রায়ান্ধকারে দিনাতিপাত করছেন কৃষ্ণের অষ্টভার্যার প্রথমা, রুক্মিণী।
একেই তো জনমানসে তাঁর তেমন পরিচিতি নেই। না তো তিনি সেভাবে কোনো অসুরবধ করেছেন (যেমন সত্যভামা নরকাসুরকে বধ করেছেন), না বারবার কৃষ্ণের সঙ্গে ছুটে গিয়েছেন নরকাসুরের প্রাগজ্যোতিষপুর থেকে পাণ্ডবদের বনবাসক্ষেত্রে। না তো তার সঙ্গে এনেছেন স্যমন্তকের মতো কোনো দেবদুর্লভ মণি যাকে কেন্দ্র করে দ্বারকার রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে! তবুও তিনি কৃষ্ণের জীবনের অঙ্গ। কেমন অঙ্গ?
তরকারিতে নুনের মতো।
নুন, বড়ো অল্পেই গলে যায়। তরকারিতে মিশলে তাকে খুঁজে পাওয়া দায়; অথচ তাকে ছাড়া তরকারি যেন ‘তরকারি’ হয়েই ওঠে না। আলোনা তরকারি কে আর মুখে তোলে?
বিদর্ভের রাজকন্যা রুক্মিণী। তাঁর প্রিয় ভাই, রুক্মী। যে গল্প বহুবার শুনে কিশোরী থেকে যুবতীহৃদয় উদ্বেল হয়ে ওঠে, তা রুক্মিণী-হরণের কাহিনি। লোকমুখের কৃষ্ণের বীরত্বের কথা শুনে মুগ্ধ রুক্মিণী নিজে চিঠি লিখে এক ব্রাহ্মণকুমারের হাত দিয়ে সে পত্র কৃষ্ণকে পাঠালেন। চিঠির ছত্রে ছত্রে কৃষ্ণের প্রশংসা, কৃষ্ণের প্রতি রাজকন্যার প্রেম আর সেসবের অন্তরালে এক ভয়ের চোরাস্রোত বয়ে যায়। ভয়ের নাম শিশুপাল!
এবারে বরং গল্পটা একটু শুরু থেকে বলি। প্রেমের গল্পে প্রেমিক-প্রেমিকার সঙ্গে যদি একজন ভিলেন না থাকে, তাহলে আর গল্পের মজা কোথায়? তবে রুক্মিণী-কৃষ্ণের প্রেমে ভিলেন একাধিক। কখনো তা মানুষ, কখনও বা তা পরিস্থিতি। এখানে ছোটো করে বলি, হরিবংশ আর ভাগবত পুরাণে কিন্তু রুক্মিণী-হরণের অন্তর্নিহিত কারণ, দু’পক্ষের আবেগ, সম্পূর্ণ ভিন্ন। হরিবংশ বলছে রুক্মিণী আর কৃষ্ণ একে অন্যের কথা জেনেছেন লোকমুখে, তাতেই প্রীতির প্রাথমিক সূচনা। কৃষ্ণ তখন কংসবধ করে মথুরাতেই আছেন। রাজা উগ্রসেন হলেও মূল চালক কিন্তু দেবকীনন্দনই। বারবার মথুরায় আঘাত হানছেন মৃত রাজা কংসের শ্বশুর, মগধনরেশ জরাসন্ধ। জরাসন্ধের আঘাত প্রতিহত করতে করতে ক্লান্ত কৃষ্ণের জীবনে প্রথম বসন্ত এনেছিল প্রজামুখে রুক্মিণীর প্রশংসা (প্রথম, কারণ, মহাভারত বা হরিবংশে কৃষ্ণের প্রেমিকা রাধার অস্তিত্ব নেই)। একসময়ে জরাসন্ধও ক্ষান্ত দিলেন। গোমন্তকের (বর্তমান গোয়া) যুদ্ধে গো-হারান হেরে একটু থামলেন। তবে কি না তার আগে হারিয়েওছেন বহুবার কৃষ্ণ-বলভদ্র জুটিকে। উনি যুদ্ধের রাজনীতি ছেড়ে মন দিতে চাইলেন রাজনৈতিক মিত্রতায়। যার মিত্র যত বেশি, রাজনীতির প্রাঙ্গণে ততই সুদৃঢ় পদক্ষেপে তার পদচালনা। তাই প্রথমেই তাঁর নজর গেল বিদর্ভে। বিদর্ভকে বলা চলে দাক্ষিণাত্যের দ্বারবিশেষ। তাই সে রাজ্য যদি মিত্র হয় তবে দাক্ষিণাত্যেও নিজের প্রভাব বিস্তার করা যাবে, সম্ভবত এমনটাই ভেবেছিলেন মগধরাজ। বিদর্ভের সঙ্গে, বিশেষ করে বিদর্ভের রাজপুত্র রুক্মীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক খুবই ভালো। তবে অসমবয়সি মিত্রতার সম্পর্ককে বর্ধিত করে পারিবারিক সম্পর্কে পরিণত করতেই আগ্রহী হলেন জরাসন্ধ। চেদী-রাজকুমার শিশুপাল, যিনি জরাসন্ধের পুত্রসম, হয়তো বা পুত্রেরও অধিক প্রিয়, তাঁর সঙ্গেই রুক্মীর ভগিনী রুক্মিণীর বিবাহ দিতে চাইলেন তিনি। কিন্তু তৎকালীন রাজপরিবারে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দেওয়া হত স্বয়ম্বরকেই। বিদর্ভের স্বয়ম্বর তো আবার বিখ্যাত। এই বিদর্ভেরই রাজকন্যা ছিলেন দময়ন্তী, যাঁর স্বয়ম্বরে দেবতারাও উপস্থিত হয়েছিলেন। তাই প্রথমে একটি স্বয়ম্বরের ব্যবস্থা করা হল। সেই স্বয়ম্বরে উপস্থিত ছিলেন কৃষ্ণও। কিন্তু স্বয়ম্বর শুনে সবার আগে যিনি কপালে করাঘাত করলেন, তিনি জরাসন্ধ। স্বয়ম্বরের অর্থ কন্যা স্বেচ্ছায় কোনো রাজপুত্র/রাজা/রাজপুরুষকে বরণ করে নিতে পারবেন। সেক্ষেত্রে যদি রুক্মিণী শিশুপাল ভিন্ন অন্য কাউকে বরণ করে নেন, জরাসন্ধের পরিকল্পনার অবস্থা হবে দামোদরের বন্যার জলে ভেসে যাওয়া খড়কুটোর মতো। বৃদ্ধ তাই কৌশল অবলম্বন করলেন। কৃষ্ণের স্তুতি করতে করতেই বলে উঠলেন, তিনি ভীত। কেন? যদি কৃষ্ণকে রুক্মিণী বরণ না করে অন্য রাজপুত্রকে বেছে নেন জীবনসঙ্গী রূপে; কৃষ্ণ কি এ প্রত্যাখ্যান মেনে নেবেন? তিনি যদি রুক্মিণী আর তাঁর স্বামীর ক্ষতিসাধন করেন?
কৃষ্ণ বিদর্ভে গিয়েছিলেন নিজের চতুরঙ্গে সেনা নিয়ে। সেইদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন মগধরাজ। বাকিরাও তার সুরে সুর মেলালেন। বিদর্ভরাজ ভীষ্মক ভয় পেলেন। তিনি স্বয়ম্বর সভা ভেঙে দিলেন। জরাসন্ধ হাফ টাইমে এগিয়ে গেলেন এক গোলে।
এরপরেই শিশুপালের সঙ্গে রুক্মিণীর বিবাহ নির্ধারিত হয় মূলত রুক্মীর আগ্রহে। এরপরেই কহানি মে টুইস্ট। বিয়ের দিন এগিয়ে এল। রুক্মিণী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, শিশুপালকে তিনি বিয়ে করবেন না। বিদর্ভের রমণীরা সাধারণ ছিলেন না। বিদর্ভেরই কন্যা লোপামুদ্রা, দময়ন্তী। বৈদর্ভী মাত্রেই তিনি বিশেষ গুণাবলির অধিকারিণী। তিনি শিশুপালের মতো সাধারণ একজনের ঘরণি হতে পারেন কি? হরিবংশ বলছে, কৃষ্ণ এই বিবাহের কথা শুনে বিচলিত হয়ে উপস্থিত হলেন বিদর্ভের প্রান্তে। তারপরে আর কী, ইন্দ্রাণী মন্দিরে বিয়ের আগে পুজো দিতে যাওয়া রুক্মিণীকে নিয়ে সোজা দ্বারকা! হ্যাঁ, রুক্মিণী হরণের কথা শুনে বাধা দিতে এসেছিলেন রুক্মী, তবে কৃষ্ণের সামনে কী আর টিকতে পারেন ভদ্রলোক? হেরে, মাথার চুল খুইয়ে অপমানে লাল হয়ে বিদর্ভের রাজধানীতে না ফিরে পাশেই ভোজকট নামের এক নতুন নগর পত্তন করে সেখানে বসবাস শুরু করলেন।
তারপর রুক্মিণী ও কৃষ্ণ দ্বারকায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন। কৃষ্ণ যা করলেন, সেটা ভালোবাসার সঙ্গে রাজনীতিও। রুক্ষ্মিণী বিরোধিতা করলেও ভীষ্মক সরাসরি জামাতার বিরোধিতা করবেন না, নিশ্চিত ছিলেন তিনি। সুতরাং মগধরাজ জরাসন্ধের একটা চালকে মাত দেওয়াই গেল।
এই প্রসঙ্গে জানাই, রুক্মিণী আর কৃষ্ণ কিন্তু আবার দূরসম্পর্কের আত্মীয়ও বটে; ভোজ, বৃষ্ণি, অন্ধক, যাদব এরা সেই যযাতির বড়ো ছেলে যদুরই বংশ। এখনকার কথাই ভাবুন! পাশের পাড়ার তুতো কাকুর মেয়েকে নিয়ে পালাল পাড়ার ডাকাবুকো হ্যান্ডসাম ছেলেটা। দুইপাড়ার নসুকাকিমা, টেঁপিপিসিমা কিন্তু দোষ দেবে মেয়েটিরই। ‘আমাদের কেষ্টর মতো ছেলে হয়, তুমি বল তো বুল্টের মা? মেয়ের বাপ রাজি হল না বলেই তো পালাল!’ অথবা ‘কেষ্টর মতো ছেলে দেখেই মেয়েটা গলায় ঝুলে পড়ল।’— এমন কথা শোনা যাবে তো? তখন নসুকাকিমা, টেঁপিপিসিমা না থাকলেও হরিবংশের গল্পে যুক্ত হল একটা চিঠি। সে চিঠি প্রাণ পেল ভাগবতে। দূর করল কৃষ্ণচরিত্রের ‘ঈষৎ দোষ’, ‘অন্যের বাগদত্তাকে অপহরণ’। সেই চিঠিই পরে এমন ‘সত্য’ হয়ে উঠল যে হরিবংশকেই মানুষ বিস্মৃত হল। সবার উপরে সত্য হয়ে টিকে রইল ভাগবত পুরাণে রুক্মিণীর কৃষ্ণকে লেখা পত্র, যা না শুনে আজও গুজরাতের দ্বারকাধীশ মন্দিরে ঘুমোতে পারেন না দ্বারকাধীশ।
যাইহোক, বিয়ে হল। তারপরেই দ্বারকার রাজনীতিতে মণির ঘনঘটা। সত্রাজিৎ সূর্যদেবের থেকে পেলেন স্যমন্তক যা অধিকার করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল সকলে, অক্রূরের মতো বৃদ্ধ থেকে শতধন্বার মতো কিশোরও। সেই মণি নিয়ে মৃগয়ায় গেলেন তাঁর ভাই প্রসেনজিৎ। তারপরে সিংহের হাত ঘুরে সে মণি গেল জাম্ববানের হাতে, যা উদ্ধার করতে গিয়েই কৃষ্ণের বিবাহ জাম্ববতীর সঙ্গে। পরে মণি ফেরত পেয়ে আনন্দিত সত্রাজিৎ আবার কৃষ্ণের হাতেই তুলে দিলেন তাঁর কন্যারত্ন সত্যভামাকে। বিয়ের পরে পরেই প্রায় দুই সতীনকাঁটা হাজির হল রুক্মিণীর জীবনে। তাও তিনি অনন্যা, নিজ গুণে ভাস্বর। তাঁর জীবনও কিছু কম ঘটনাবহুল নয়।
সত্যভামা বাবার মৃত্যুর খবর দিতে সোজা বারণাবতে উপস্থিত হন। প্রাগজ্যোতিষপুর অভিযানে কৃষ্ণের সারথি হন কিন্তু তাঁকে সন্তানশোক পেতে হয় না। পিতৃশোকের তুলনায় সন্তানশোক অনেক বেশি হৃদয়বিদারক, যে কোনো মায়ের কাছে। কৃষ্ণ-রুক্মিণীর প্রথম সন্তান প্রদ্যুম্নকে হরণ করে শম্বরাসুর। সেই শিশু যখন দ্বারকায় প্রত্যাবর্তন করল, সে কিশোর। সে তখন একা নয়; সে শুধুই রুক্মিণী তনয় নয়। সে তখন মায়াবতীর স্বামীও। যে শিশুর শৈশব কখনো চোখেই দেখেননি রুক্মিণী, তাকে আর তার বধূকে বরণ করে দ্বারকার প্রাসাদে এনেছেন। একজন মায়ের থেকে তাঁর প্রথম সন্তানের শৈশব ছিনিয়ে নেওয়া হল; সে কোনো সুযোগই পেল না সন্তানকে মনের মতো করে মানুষ করার। তাও অভিযোগ নেই রুক্মিণীর।
কৃষ্ণের প্রথম ভার্যার জীবনের অন্যতম দু’টি উল্লেখযোগ্য ঘটনার একটি পুণ্যক ব্রত, অন্যটি যথাসময়ে উল্লেখ করা হবে।
পুণ্যক ব্রতের যে বর্ণনা হরিবংশে রয়েছে তা পড়লে জানা যায়, এটির নিয়মকানুন অত্যন্ত কঠিন। সাধারণত যেসব ব্রত আমরা দেখেছি ছোটো থেকে, তা একদিনের ব্যাপার মোটের উপর। কিন্তু পুণ্যক ব্রত তা নয়। এটি সুদীর্ঘ সময় ধরে নানা নিয়ম পালনের মধ্যে দিয়ে উদ্যাপন করতে হয়। দ্বারকায় কৃষ্ণের স্ত্রীদের মধ্যে রুক্মিণীই প্রথম, যিনি পুণ্যক ব্রত করেছিলেন।
ব্রতক্লান্ত স্ত্রীর সঙ্গে বসেছিলেন কৃষ্ণ, যখন নারদ তাঁর হাতে তুলে দেন পারিজাত। আর এর পরবর্তী ঘটনাই আরো স্পষ্ট করে দেয় সত্যভামার সঙ্গে রুক্মিণীর পার্থক্য। রূপের অহংকারে সত্যভামার মাটিতে পা পড়ে না। তার উপরে স্যমন্তক উদ্ধার করে কৃষ্ণ তাঁকেই সমর্পণ করেছেন। সত্যভামা সেই স্যমন্তকের অধিকারিণী যে দিনে আটবার সুবর্ণ প্রসব করে। সেই দিক থেকে রাক্ষস বিবাহ বা গান্ধর্ব বিবাহের সূত্রে দ্বারকায় আসা রুক্মিণী রাজকন্যা হলেও সত্যভামার তুলনায় ম্রিয়মাণ। যাইহোক, এইসব কারণে সত্যভামা নিজেকে কৃষ্ণের জীবনের অবিচ্ছেদ্য প্রধান অংশ বলেই ভাবতে ভালোবাসতেন। এহেন কৃষ্ণ পারিজাত পেয়ে তাঁকে দেবেন, এ-ই স্বাভাবিক। কিন্তু কৃষ্ণ তা করলেন না। তিনি পারিজাত দিলেন রুক্মিণীকে; তাও হাতে নয়, সোজা ক্লান্ত রুক্মিণীর চুলে লাগিয়ে দিলেন পারিজাত। কে জানে পারিজাতের স্বর্গীয় সুগন্ধে হয়তো তাঁদের দাম্পত্যের সুবাসও সম্পৃক্ত হয়েছিল।
এ খবর গেল সত্যভামার কানে। অনুমান করা যায়, দাস-দাসীরা কিঞ্চিৎ রং চড়িয়েই এ খবর তাঁর কানে পৌঁছে দিয়েছিলেন। হয়তো চুলে ফুল লাগানোর পরে তাঁদের কল্পনায় কৃষ্ণ রুক্মিণীর থুতনি ধরে বলেছিলেন, ‘আহা! রূপে গুণে আমার রুক্মিণীর যোগ্য এ দ্বারাবতীতে আর কে?’ সত্যভামা সেসব শুনে গোঁসাঘরে খিল দিলেন। আক্ষরিক অর্থেই গোঁসাঘর ছিল তাঁর। সেখানেই নিজেকে বদ্ধ করলেন। সুন্দর বেশবাস, আভূষণ রইল মাটিতে পড়ে...। অভিমানের সজ্জায় নিজেকে সুসজ্জিত করলেন সত্যভামা। আর তার বর্ণনাও রয়েছে।
কৃষ্ণ গেলেন মানিনীর মানভঙ্গ করতে। ফিরব স্বরূপে, কিন্তু শর্ত হল, পারিজাতের ফুল নয় গোটা গাছখানাই আমার উঠোনে চাই। কৃষ্ণ চললেন সত্যভামাকে নিয়ে পারিজাত আনতে সোজা অমরাবতীতে। অথচ তার আগে কৃষ্ণ যখন সত্যভামাকে নিয়ে প্রাগজ্যোতিষপুরে নরকাসুরকে বধ করতে গেছেন, রুক্মিণীর তাতে অভিমান নেই, নেই অভিযোগ। আমিও রাজকন্যা, আমাকেও নিয়ে চল— এমন কোনো আবদার নেই। আসলে রুক্মিণী আজীবন নিঃস্বার্থ হয়ে কৃষ্ণকে ভালোবেসে গিয়েছেন। শম্বরাসুর পুত্রকে হরণ করল, তাও তাঁর অভিযোগ নেই। তিনি জানেন কৃষ্ণ অবশ্যই প্রদ্যুম্নের সুরক্ষার বন্দোবস্ত করেছেন। যতই শম্বরাসুরের প্রাসাদে সে বড়ো হলেও কৃষ্ণের একটি চোখ প্রদ্যুম্নকে নিরীক্ষণ করছে সর্বক্ষণ। রুক্মিণী তাই নিশ্চিন্ত হয়েছেন।
পাণ্ডবদের বনবাসে যখন সত্যভামা কৃষ্ণের সঙ্গী হয়ে এসেছিলেন, পাঞ্চালীকে বড়ো অদ্ভুত প্রশ্ন করেছিলেন। পঞ্চস্বামীকে কীভাবে নিজের বশে রাখ তুমি দ্রৌপদী? তুমি কি কোনো ওষুধের সন্ধান জানো? কৃষ্ণপ্রিয়ার মুখে এ প্রশ্ন বড়ো অস্বাভাবিক। তবে এই প্রশ্নই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কৃষ্ণকে নিয়ে সত্যভামার ‘ইনসিকিউরিটি’। কৃষ্ণের জীবনে তিনি তৃতীয় নারী, তাও এত ভয়? অথচ প্রথম নারী রুক্মিণীর মুখে এমন কিছুই শোনা যায়নি কখনো। কিন্তু তাই বলে কি কষ্ট হয়নি? নিজের প্রেমকে সপত্নীর শয্যাসঙ্গী হতে দেখে মনে কাঁটা বেঁধে না শুধু পাষাণীর; মানবীর নয়। আর রুক্মিণী তো অত্যন্ত মানবী। তিনি কৃষ্ণকে হারানোর কথাও ভাবতে পারেন না। পরিহাসচ্ছলে কৃষ্ণও যদি তাঁকে বলেন, ‘দেখ তো আমাকে বিয়ে করে কী কষ্টেই না দিন কাটছে তোমার’, রুক্মিণী তাতেও ব্যথিত হন। অথচ কৃষ্ণে সর্বস্ব সমর্পণ করার পরেও তাঁকেই দীর্ঘ দ্বাদশ বর্ষের বিরহবেদনা সহ্য করতে হয় দুর্বাসার অভিশাপে!
সেও এক কাহিনি। কোপনস্বভাব দুর্বাসা উপস্থিত হয়েছেন দ্বারকায়; আতিথ্য নিয়েছেন কৃষ্ণের। তবে দুর্বাসার যা ট্র্যাক রেকর্ড, তিনি এলেই ঝামেলা আসে। এখানেও ব্যতিক্রম নয়। দুর্বাসা এসেছেন; অতিথি দুর্বাসার নানা অত্যাচার সহ্য করে চলেছে দ্বারকার রাজপ্রাসাদ। কোনো দিন বলেন খাবেন না, অথচ সেই দিনই স্নান সেরে এসে হাঁক পাড়েন, ‘ভোজন কোথায়?’ কোনোদিন লম্বা তালিকা ধরিয়ে বলেন সব খাবেন। অথচ খাওয়ার সময়ে এককণা অন্ন মুখে দিয়েই তাঁর পেট ভরে যায়। আর দুর্বাসার সেবা করার জন্য কৃষ্ণের সঙ্গী কে? সেই রুক্মিণী। আর শেষদিনে তো সমস্ত সীমাই পার করে ফেললেন ঋষি। পায়েস খেতে চাইলেন। গরম গরম পায়েস আনা হল রান্না করে। সেই পায়েস কিছুটা খেয়ে বাকিটা গায়ে মাখতে বললেন সভার্যা কৃষ্ণকে। গায়ে গরম পায়েস ঢেলেই সে আদেশ পালন করেন তাঁরা। তারপরের আদেশ, রথ নিয়ে এসো। রথে ঘোড়া থাকবে না; রথ টানবেন রুক্মিণী আর কৃষ্ণ। সেই আদেশও পালন করলেন তাঁরা। পথশ্রমে ক্লান্ত, তৃষ্ণার্ত রুক্মিণীর অবস্থা দেখে শার্ঙ্গ ধারণ করলেন দ্বারকানাথ। তাঁর তিরের তীক্ষ্ণ আঘাতে অকুস্থলে উপস্থিত হল পাতালগঙ্গা বা ভোগবতীর একটি ধারা। তৃষ্ণা নিবারণ তো করলেন রুক্মিণী, কিন্তু দুর্বাসা এতে কুপিত হলেন। তাঁর বক্তব্য কেন রুক্মিণী তাঁর অনুমতি ছাড়াই জল পান করেছেন! তিনি অভিশাপ দিলেন রুক্মিণীকে যে, দ্বাদশ বৎসর তাঁকে কৃষ্ণকে ছাড়া থাকতে হবে একাকী। তবে এই অভিশাপের তৎক্ষণাৎ বিরোধিতা করেন কৃষ্ণ। মূলত তাঁরই যুক্তিতে নিজের ভুল বোঝেন দুর্বাসাও। অবশেষে তিনি রুক্মিণীকে আশীর্বাদ করেন যে তিনিই কৃষ্ণের প্রিয়তমা পত্নী হয়ে থাকবেন আজীবন। যদিও এর পরে এক দীর্ঘ বিরহকাল কাটিয়েছেন রুক্মিণী-কৃষ্ণ। দ্বারকার যে স্থানে রুক্মিণী এই দ্বাদশ বর্ষ তপস্যা করে কাটিয়েছিলেন, সেখানেই অবস্থিত আজকের রুক্মিণী মন্দির। দ্বারকার যাত্রা দ্বারকেশ্বরীর মন্দিরেই সমাপ্ত হয়। তাঁর মন্দিরে না গেলে দ্বারকাযাত্রা অসম্পূর্ণ।
শাপ কাটানোর পরে আসি সেই দ্বিতীয় ঘটনায়, যা তাঁর জীবনের আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা— তুলাভারম্। তুলাপুরুষ নিয়মটি বেশ প্রাচীন। একটি তুলার একদিকে বসবেন কোনো ব্যক্তি। যাঁর ওজনের সমান সোনা বা রত্ন দান করা হবে। সত্যভামা এই তুলাপুরুষ ব্রততে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। স্যমন্তক যাঁর অধীন, তাঁর কি রত্ন বা সুবর্ণের চিন্তা? সত্যভামা নিশ্চিত ছিলেন তিনি একাই এ ব্রত সম্পন্ন করতে সক্ষম। কিন্তু বিধি বাম। কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল সত্যভামার ব্যক্তিগত সংগ্রহ তো দূর, দ্বারকার সমগ্র রত্নভাণ্ডারও কৃষ্ণের সমান ওজনের নয়। সেই সময়ে অকুস্থলে উপস্থিত হলেন সেই রুক্মিণী। গোটা তরকারিতে যতই সব্জি দেওয়া হোক, মশলা, ঘি এসব দেওয়া হোক, নুনের অভাবে সেই তরকারি অখাদ্যে পরিণত হয়। আগেই বলেছি রুক্মিণী সেই নুন। বড়ো সামান্য; তাঁর উপস্থিতি যেন চোখেই পড়ে না অথচ তিনি না থাকলে সব অচল। রুক্মিণী এগিয়ে এসে সেই তুলাভারের সব রত্ন সরিয়ে, রাখলেন তুলসীপাতা। এ যেন তাঁর আর কৃষ্ণের প্রেমের প্রতীক, পারস্পরিক নির্ভরতার প্রতীক। মুহূর্তের মধ্যে দুই তুলাপাত্রের ওজন হয়ে গেল সমান। এ যেন এক নীরব তাচ্ছিল্য রুক্মিণীর, প্রেমিক পুরুষকে রত্নে ক্রয় করা যায় না, প্রেমেই ক্রয় করতে হয়। এ যেন এক নিঃশব্দ চপেটাঘাত সত্যভামার অহংবোধে; চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া, প্রেমের সংজ্ঞা কী। আর একইসঙ্গে এও উপলব্ধি করানো, দিনশেষে রুক্মিণীই সে-ই, যাঁকে ছাড়া স্বয়ং দ্বারকাধীশ অচল।
একটি মেয়ে সেই কবে এসেছেন বধূ হয়ে। পুত্র ফিরে এল মায়াবতীকে নিয়ে ঠিকই কিন্তু তারপরে প্রদ্যুম্নের সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল রুক্মীর কন্যা রুক্মাবতীর। এই দু’জনের সন্তানই অনিরুদ্ধ। ঊষা আর অনিরুদ্ধের উদ্দাম প্রেম এবং সেই কারণে বাণাসুরের সঙ্গে কৃষ্ণের যুদ্ধ তো খুবই বিখ্যাত। তবে অনিরুদ্ধের সঙ্গেই রুক্মীর পৌত্রীরও বিয়ে দিয়েছিলেন রুক্মী। ভাবতে অবাক লাগে, যে বোনের বিয়ে মেনে নেননি, তাঁরই ছেলে ও নাতির সঙ্গে নিজের মেয়ে ও নাতনির বিয়ে দেওয়ার জন্য রীতিমতো জোরাজুরি করেছিলেন রুক্মী। এ কি তাঁর অনুশোচনার ফল? যদি এ কথা মনেও হয়, তবে ভ্রান্ত ধারণাটি ভঙ্গই করি। জীবনের অন্তিম দিন পর্যন্ত কৃষ্ণকে আপন করে নিতে পারেননি রুক্মী। আর অন্তিম দিনের কথা যখন এলই, জানাতে চাই রুক্মী মারা যান বলরামের হাতে, অনিরুদ্ধের সঙ্গে রুক্মীর পৌত্রীর বিবাহসভাতেই।
যে কৃষ্ণের কাছে হাতজোড় করে একদা ভাইয়ের প্রাণভিক্ষা চেয়ে নিয়েছিলেন রুক্মিণী, সেই ভাইকে সেই কৃষ্ণেরই জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার হাতে বধ হতে হয়েছে শুনে কী হয়েছিল তাঁর মনের অবস্থা? মহাকাব্য রচয়িতারা নীরব। তবে তাঁর কোনো বিদ্রোহ বা বিশেষ শোকের কথা লিপিবদ্ধ হয়নি, ফলত ধরে নেওয়া যেতেই পারে, রুক্মিণী ক্ষমা করে দিয়েছিলেন বলরামকে, আর রুক্মীকেও। অনিরুদ্ধের সন্তান বজ্র (মতান্তরে বজ্রনাভ)কেই ইন্দ্রপ্রস্থের রাজা হিসেবে রাজ্যাভিষেক করা হয়েছিল দ্বারকা জলমগ্ন হওয়ার পরে।
কৃষ্ণের মৃত্যুর পরে সহমরণ বেছে নিয়েছিলেন তাঁর প্রথম ভার্যা। কৃষ্ণহীন জীবনকে অর্থহীন মনে হয়েছিল হয়তো তাঁর। যাঁর হাত ধরে নিজের পরিচিত স্থান, মানুষগুলিকে ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন এক স্থানে নতুনভাবে জীবন শুরু করেছিলেন বৈদর্ভী, তিনি চলে যাওয়ার পরে হয়তো সমগ্র পৃথিবীই তাঁর চোখে শূন্য হয়ে গিয়েছিল।
শাস্ত্রে তিনি লক্ষ্মীস্বরূপা। তিনিই বিষ্ণুবক্ষবিলাসিনী লক্ষ্মী, তিনিই রাঘবহৃদয়নিবাসিনী জানকী। রুক্মিণী মন্দিরে যে মূর্তিতে তিনি পূজিতা, তা চতুভুজা লক্ষ্মীর মতোই। বরং বিঠ্ঠলদেবের সঙ্গে তাঁর যে মূর্তি দক্ষিণে প্রচলিত, সেখানে তিনি দ্বিভুজা। শাস্ত্রের পরে যদি আসি সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্যে, তাহলেও একবাক্যে স্বীকার করতে হবে তিনিই কৃষ্ণের একমাত্র স্ত্রী।
একমাত্র হন আর না-ই হন, রুক্মিণীর ত্যাগ, প্রেম, নিবেদন তাঁকে বসিয়েছে এক অন্য উচ্চতার আসনে। চেষ্টা করেও যে স্থানে কখনোই পৌঁছতে পারবেন না বাকি সপ্তভার্যা।