


এখন বাজারে বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্প রয়েছে। তার মধ্যে আপনার জন্য কোনটা সবচেয়ে ভালো বুঝবেন কী করে? পরামর্শ দিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার।
একটা সময় ছিল যখন চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত সঞ্চয় বলতে ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট বুঝতেন। কিন্তু ক্রমশ সঞ্চয়ের সংজ্ঞা মধ্যবিত্তের কাছে বদলাতে শুরু করল। এখন আর শুধুই ফিক্সড ডিপোজিটের মাধ্যমে টাকা জামাচ্ছেন না তারা। আরও বিভিন্ন উপায় রয়েছে যার মাধ্যমে মধ্যবিত্ত এখন সঞ্চয় করে। কিন্তু সেই পদ্ধতিগুলো জানানোর আগে ফিক্সড ডিপোজিট ও তার ভালো মন্দ বিষয়ে একটু জানানো দরকার।
প্রথম কথা হল যে উপায়ে একটা সময় সঞ্চয়ের অন্যতম সেরা উপায় ছিল তার থেকে মানুষ সরে যেতে শুরু করল কেন। একটা কারণ যেমন এই যে, সঞ্চয়ের অন্যান্য উপায় তাদের নাগালে এল, তেমন আর একটা কারণ, ফিক্সড ডিপোজিটের সুদের হারও কমতে শুরু করল। এখন প্রশ্ন হল এই সুদের হার কমল কেন? একটা কারণ অবশ্যই কর্পোরেট প্রেশার। সুদের হার বেশি রাখার অন্যতম কারণ ইনফ্লেশন রুখে দেওয়া। কিন্তু সেটা যদি অন্যভাবে আটকানো যায় তাহলে এফডিতে সুদ বেশি রাখা হবে কেন? এইসব নানা কারণে এফডি-র সুদের হার ক্রমশ কমতে শুরু করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সঞ্চয় প্রকল্পের উপরের দিকেই রয়েছে ফিক্সড ডিপোজিট। এখনও মধ্যবিত্তের কাছে এই উপায়টি সঞ্চয়ের অন্যতম সেরা উপায়। তার কারণ এটা সঞ্চয় প্রকল্প হিসেবে খুবই নিরাপদ। তাছাড়াও হঠাৎ টাকাটার প্রয়োজন পড়লে এফডি ভাঙিয়ে নেওয়া সহজ। ফলে সঞ্চয় প্রকল্প হিসেবে মধ্যবিত্তের কাছে এফডি এখনও বেশ জনপ্রিয়।
এছাড়া বেশ কিছু বছর ধরেই মধ্যবিত্তের সঞ্চয় প্রকল্পের মধ্যে উপর দিকে স্থান করে নিয়েছে গোল্ড বন্ড ও হলমার্ক বার। তার মূল কারণ অবশ্যই ঊর্ধ্বমুখী সোনার দাম। এই মুহূর্তে সোনার দাম যেমন সামান্য কমেছে, এই সময় যদি কিছু টাকার সোনার বন্ড কিনে রাখা যায় তাহলে তা সঞ্চয়ের খুব ভালো উপায় হয়ে উঠবে পরবর্তীতে। সোনার দাম কিন্তু কখনোই কমবে না, বরং বাড়তেই থাকবে। ফলে সোনায় সঞ্চয় করলে তাতে লাভ বই ক্ষতি হবে না। তবে এরজন্য একটু সতর্ক থাকতে হবে। সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। মার্কেট স্টাডি করে দেখতে হবে কোন সময় সোনার দাম কমবে বা কমার সম্ভাবনা রয়েছে, এবং সেই মুহূর্ত কাজে লাগিয়ে সোনার বন্ড কিনে রাখতে হবে। এই মার্কেট স্টাডি কেউ নিজেও করতে পারে বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শও নিতে পারে এই বিষয়ে। একইভাবে সিলভার বন্ড কেনা যায়। কিন্তু যেহেতু রুপোর দাম তুলনামূলক কম, তাই সিলভার বন্ড এখনও সঞ্চয় প্রকল্প হিসেবে ততটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।
এবার আসা যাক সঞ্চয়ের আর একটা উপায়ের কথায়, যে উপায়টি ক্রমশ মধ্যবিত্তের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সঞ্চয়ের এই প্রকল্পের নাম মিউচুয়াল ফান্ড। এর মাধ্যমে আমরা শেয়ার বাজারে টাকা নিয়োগ করি। এবং শেয়ার বাজারের ওঠা পড়ার উপর আমাদের লাভ বা ক্ষতি নির্ভর করে। এই মুহূর্তে পারিপার্শিক অস্থিরতার জন্য শেয়ার বাজারে মন্দা লেগেছে, ফলে বিনিয়োগ করলে হয়েতো আশাতীত লাভ হচ্ছে না, কিন্তু পরিবেশ শান্ত থাকলে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও শেয়ার বাজার উঠবে এবং সেই সময় এখানে বিনিয়োগ করলে লাভের আশা ভালোই হবে। তবে একটু দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মিউচুয়াল ফান্ড বেশি লাভজনক। আর এখানে টাকা যতদিন রাখবেন ততদিন তার উপর কোনো সুদ পড়বে না। কিন্তু টাকা তুলে নিলে ১২.৫ শতাংশের একটা সুদ চেপে যায় লাভের উপর। মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে যদি বহুদিন ধরে টাকা জমানো যায়, তাহলে ১১ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত লাভ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে যদি কেউ সতর্ক হয়ে জমাতে চান তাহলে ইকুইটি এবং ডেট দু’ভাগে টাকা জমাতে পারেন। তাতে লাভের হার সামান্য কম থাকে ঠিকই, আবার একই সঙ্গে ক্ষতির আশঙ্কাও কম থাকে।
আর একটা সঞ্চয় প্রকল্প হল এসআইপি। এটাতে টাকা রাখা যায় দু’ভাবে। যারা অল্পবয়সি, তারা এই প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় করতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রতি মাসে অল্প পরিমাণ অর্থ এই প্রকল্পে জমানো যায়। এবং বহুদিন জমানোর পর একবারে বড় অঙ্কের অর্থ তোলা যায়। এটা অল্প বয়সিদের পক্ষে খুব সুবিধাজনক। কিন্তু যাঁরা বয়স্ক তাঁরা কি তাহলে এসআইপি প্রকল্পে টাকা জমাতে পারবেন না? অবশ্যই পারবেন। তাঁদের ক্ষেত্রে নিয়মটা একটু আলাদা, তাঁরা একবারে অনেকটা টাকা জমিয়ে নিতে পারেন, এবং মাসে মাসে সেই লগ্নির বিনিময়ে সুদ তুলতে পারেন। সঞ্চয় প্রকল্প হিসেবে এসআইপি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য, যার ফলে তার জনপ্রিয়তাও ক্রমবর্ধমান।
এছাড়াও রয়েছে এমন কিছু কোম্পানির ফিক্সড ডিপোজিট স্কিম যে কোম্পানিগুলোকে এএএ বা ট্রিপল এ রেটিং দেওয়া হয়। অর্থাৎ এই ধরনের কোম্পানির শেয়ারের দাম কোনোদিন পড়ে না। এই কোম্পানিগুলো থেকে ফিক্সড ডিপোজিট কেনা যায়। এবং সেক্ষেত্রে লাভের হার বেশি। ফলে এই ধরনের ফিক্সড ডিপোজিট অনেকেই সঞ্চয়ের উপায় হিসেবে কিনে রাখেন। কিন্তু এর আবার একটা সমস্যাও আছে। যদি কোনো কারণে কোম্পানি উঠে যায় তাহলে সম্পূর্ণ টাকা লোকসান হবে। তখন কিন্তু আসলটাও আর পাওয়া যাবে না। ফলে খাতায় কলমে এই সঞ্চয় প্রকল্প খুবই লাভজনক মনে হলেও, কোনো প্রাইভেট কোম্পানির ফিক্সড ডিপোজিট বন্ড কেনার আগে একটু ভাবনা চিন্তা করে নেওয়া দরকার।
এরপর আসা যাক সবচেয়ে নিশ্চিত সঞ্চয় প্রকল্পের কথায়। সেটা অবশ্যই পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড বা পিপিএফ। এই খাতে যত বেশি সম্ভব অর্থ রাখা উচিত। এই খাতে টাকা রাখলে সুদের হার ৭.১ শতাংশ, কিন্তু সেটা সম্পূর্ণই ট্যাক্স ফ্রি। এই খাতে টাকা জমানো মূলত সিকিউরিটির কারণে। এর কিছু সুবিধে রয়েছে যেগুলোর কথা আগে বলে নেওয়া দরকার। প্রথমত এই খাতে প্রথম যখন টাকা জমাতে শুরু করবেন তখন পনেরো বছরের জন্য জমানো যায়। তারপর তা রিনিউ করা যায় পাঁচ বছরের মেয়াদে। কিন্তু ধরুন আপনি টানা পনেরো বছর পিপিএফ-এ টাকা জমানোর পর আর তা রিনিউ করতে চাইছেন না, সে ক্ষেত্রেও আপনার অ্যাকাউন্টটা চালুই থাকবে। আপনি ট্যাক্স বাঁচানোর জন্য টাকাটা ওই অ্যাকাউন্টে রেখে দিতে পারেন যত দিন খুশি। এছাড়া বছরে একবার ওই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা ধার করতে পারেন। এবং টাকা আপনার বিশেষ প্রায়োজনে যখন ইচ্ছে তুলেও নিতে পারেন। ফলে এই প্রকল্পের মতো ভালো সঞ্চয় প্রকল্প কমই হয়।
এরপর আসি তাঁদের কথায় যাঁরা রিটায়ারমেন্টের পর পেনশনভোগী। তাঁরা পেনশনের থেকে কিছু টাকা দিয়ে রিসার্ভ ব্যাংকের বন্ড কিনে রাখতে পারেন। এই বন্ডগুলোয় এনএসসি বন্ডের তুলনায় সামান্য বেশি ইন্টারেস্ট পাওয়া যায়। এই বন্ডের একটা লকইন পিরিয়ড রয়েছে, সাত বছরের। সেই সময় পর্যন্ত বন্ড ভাঙানো যাবে না। তারপর তা ভাঙাতে পারেন। তবে এই প্রকল্পের আবার একটা সমস্যার দিকও আছে। তা হল, ওই সাত বছরের লক ইন পিরিয়ডের মধ্যে যদি সুদের হার কমে যায় তাহলে জমানো টাকা খানিকটা হলেও কমে যাবে এবং সেক্ষেত্রে একটু লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
একদম শেষে আসা যাক লাইফ ইনসিওরেন্স বা এলআইসি-র কথায়। এখানে বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয় প্রকল্প রয়েছে। তবে তার মধ্যে অ্যানুইটি স্কিমগুলো মধ্যবিত্তের জন্য লাভজনক। এক্ষেত্রে দু’ভাবে টাকা জমানো যায়। এক হল, চাকরি করতে করতে প্রতি মাসে খানিকটা টাকা এই প্রকল্পে জামালেন অথবা প্রতি বছর একটা বড়ো টাকা এই প্রকল্পে জমালেন, তারপর প্রকল্প অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট লকইন পিরিয়ড পর্যন্ত টাকাটা তোলা যাবে না। কিন্তু লকইন পিরিয়ড শেষ হলে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট টাকা আপনি প্রতি মাসে পাবেন। অনেকটা মাসিক রোজগারের মতোই। সারা জীবন এই টাকাটা আপনি পেয়েই যাবেন। এবং আপনার মৃত্যুর পর আপনার নমিনি যে থাকবে সে সাম অ্যাসিয়রড-এর টাকা এককালীন পেয়ে যাবে। এই সঞ্চয় প্রকল্পটি মোটামুটি লাভজনক।
এছাড়াও বাজারে বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্প রয়েছে। নিজের সুবিধে অনুযায়ী টাকা জমাতেই পারেন তাতে। তবে মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রে যেগুলো সঠিক এবং নিরাপদ সেই ধরনের প্রকল্পের সঞ্চয় করা শ্রেয়। আর একটা কথা, সঞ্চয় করার আগে প্রকল্পটা বিষয়ে ভালো করে জেনে নেওয়া জরুরি। একটা স্কিমে টাকা জমানোর সময় বিভিন্ন হিডেন ক্লজ থাকে। এমন কিছু যা হয়তো আপনার সামনে খোলসা করে বলা হয় না। সেগুলো আছে কি না এটা খতিয়ে দেখে বুঝে নেবেন। সবচেয়ে ভালো হয় কোনো অভিজ্ঞ কারও পরামর্শ নিতে পারেলে। তাঁরা এই হিডেন ক্লজ সম্বন্ধে জানেন এবং আপনাকে সঠিকভাবে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। যদি অন্য কারও পরামর্শ না নিতে চান তাহলে প্রকল্পের বিষয়ে যে বুকলেট থাকে সেটা খুঁটিয়ে পড়ে তবেই সিদ্ধান্ত নেবেন।