মৃদুলকান্তি ঘোষ, কলকাতা: ‘পরবর্তী স্টেশন মালিকপুর...’। ট্রেনের সাউন্ড সিস্টেমে ঘোষণা শুনে জানালা দিয়ে প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকাল ঋক। কিন্তু ফলকে হলুদের উপর কালো দিয়ে যে অন্য নাম লেখা! সেখানে স্পষ্ট বাংলায় লেখা মল্লিকপুর। ক্লাস ফাইভের ঋক বাবা-মায়ের সঙ্গে লক্ষ্মীকান্তপুরের ট্রেন ধরেছে। শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার লোকাল দুলতে দুলতে এগিয়ে চলেছে। বাবার দিকে তাকিয়ে ঋকের প্রশ্ন, বাবা কোনটা ঠিক? বাবা বললেন, স্টেশনের নাম মল্লিকপুর। ভুল ঘোষণা হচ্ছে। বাবার কথা শুনে যারপরনাই অবাক হল ছোট্ট পড়ুয়া। আমরা ভুল বললে স্যর বকাবকি করেন, আর ট্রেনের ঘোষণাতেই ভুল!
আরেকটু এগতেই ফের স্টেশনের নাম ঘোষণা হল। এবার খটকা লাগল ঋকের বাবারও। ‘পরবর্তী স্টেশন শ্মশান রোড...’। শাসন রোডের নাম শুনেছেন, তাই বলে শ্মশান! একি বেয়াদপি, একের পর এক স্টেশনের নাম ভুল। তাঁর গলায় অসন্তোষ ক্রমশ চড়ছে। ফটাশ জল বিক্রি হচ্ছে কামরায়। হকারের হাঁকডাক, যাত্রীদের কোলাহল। পাশে বসা যাত্রী রাগে গজগজ করছেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন, এ আর নতুন কী দাদা, যান নামখানা পর্যন্ত, দেখবেন স্টেশনের নামের শ্রাদ্ধ করে ছেড়েছে ওরা। যা খুশি উচ্চারণ। শুনতে শুনতে আমাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে, এখন আর খারাপ লাগে না। রেলের দায়বদ্ধতা দেখে অবাক লাগে। স্টেশনের নামের কোনও গুরুত্ব নেই। বাংলা ভাষার প্রতি রেলের অবজ্ঞাই একারণে দায়ী।
ঋকের বাবা প্রবীরবাবুকে বেশ বিরক্ত দেখাল। ছেলেও বাবার মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে। ওকে কীভাবে বোঝাবেন, শব্দ খুঁজে পাচ্ছিলেন না তিনি। আবার একটা স্টেশন আসছে। ফের কান খাড়া প্রবীরবাবুর, ট্রেনের মাইকে শোনা গেল— ‘পরবর্তী স্টেশন বাহরু’। এবারও ভুল! স্টেশনের নাম আসলে বহরু। এখানেই জন্ম সঙ্গীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের। নামটা তাই অপরিচিত নয়। তাঁর জন্মস্থানের ক্ষেত্রেও এহেন অবহেলা। পরবর্তী স্টেশন জয়নগর। সেখানেও ভুল উচ্চারণ, ঘোষিকার কণ্ঠে বাজছে... ‘পরবর্তী স্টেশন জয়নগর-মাজিলপুর’। জায়গাটি মাজিলপুর নয়, মজিলপুর। একের পর এক স্টেশনের যা খুশি নাম শুনিয়েও ভ্রুক্ষেপ নেই রেলের।
নিত্যযাত্রীরা জানাচ্ছেন, বহু স্টেশনের নাম যা খুশি তাই বলা হচ্ছে। তিনটি ভাষাতেই ভুল উচ্চারণ করা হচ্ছে স্টেশনের। রেল কী বলছে? তুঘলকি এই কাজের ব্যাখ্যা কী? রেলের তরফে জানানো হয়েছে, এমন অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। খোঁজ নিয়ে দেখছি। অভিযোগ এলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিত্যযাত্রী সংগঠনের এক সদস্য বলছিলেন, রেল কেন্দ্রের অধীন। কেন্দ্র কখনওই আঞ্চলিক ভাষাকে গুরুত্ব দেয় না। আর বাংলাকে হেয় করা ওদের রক্তে। নিজের খুশি মতো উচ্চারণ করে। যা খুশি বানান লেখে। শাসন আর শ্মশানের পার্থক্য ওরা বোঝে না। শিয়ালদহ স্টেশনে গিয়ে দেখুন, বনগাঁ বানান লেখা রয়েছে বনগাঁও। বাংলা ভাষাকে সম্মান করে না রেল কর্তৃপক্ষ। আমরা এর প্রতিবাদ আগেও জানিয়েছি। এবারও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
ঋক বেশ মজা পেয়েছে বড়দের ভুল ধরে।