বিশ্বজিৎ মাইতি, বরানগর: সিপিএম প্রার্থী তাঁর ‘স্যর’। তাঁর ফ্ল্যাটেই আবার একদা ভাড়া থাকতেন তৃণমূল প্রার্থী। তাঁকে ‘দাদা’ সম্বোধন করেন তিনি। তৃণমূল পরিচালিত পুরসভার চেয়ারম্যান আবার তাঁর দীর্ঘদিনের ‘পারিবারিক বন্ধু’। এহেন ব্যক্তিই এবার বিজেপির টিকিটে ভোটে লড়ছেন কামারহাটিতে। প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের সঙ্গে পদ্ম-পার্টির প্রার্থী অরূপ চৌধুরী ওরফে পুলকের সম্পর্কের রসায়ন এখন জল্পনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে এলাকায়। এদিকে, দলের নেতা-কর্মীরাও বুঝে উঠতে পারছেন না, কোন সমীকরণে টিকিট পেলেন অরূপবাবু। ভোটের ময়দানে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এই বিজেপি প্রার্থীকে নম্বর দিতে না চাইলেও আত্মবিশ্বাসী অরূপবাবুর দাবি, শেষ হাসি তিনিই হাসবেন।
বেলঘরিয়ার ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম লাগোয়া বিবেকানন্দনগরে বাড়ি অরূপ চৌধুরীর। কামারহাটিতে তাঁর মতো নেতা টিকিট পাওয়ায় অবাক হয়েছেন স্থানীয় বিজেপি নেতা থেকে কর্মীরা। অরূপবাবু ফুড কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ায় চাকরি করতেন। ২০০৬ সালে তিনি করণিকের পদ থেকে স্বেচ্ছাবসর নেন। নামেন হোর্ডিং-এর ব্যবসায়। সিপিএমের তৎকালীন দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা অমিতাভ নন্দীর মেয়ে ওই ব্যবসার অংশীদার ছিলেন। ব্যবসায়িক সূত্রে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় নন্দী পরিবারের সঙ্গে। ক্রমে তিনি অমিতাভবাবুর কাছের লোক হয়ে ওঠেন। দলীয় রাজনীতিতে অমিতাভবাবুর পালটা শিবিরে থাকা মানস মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। এক সময়ে মানসবাবু পরিচালিত বেলঘরিয়া উৎসবে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সেই থেকে মানসবাবু তাঁকে ‘চৌধুরী’ বলে ডাকেন। আর তিনি মানসবাবুকে ‘স্যর’ ছাড়া কথা বলেন না। সিপিএমের দুই নেতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক রীতিমতো চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছিল সেই সময়ে। এখনও মানসবাবুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট।
অন্যদিকে, কামারহাটির তৃণমূল নেতা গোপাল সাহা এখন পুরসভার চেয়ারম্যান। তাঁর সঙ্গে অরূপবাবুর পুরানো সম্পর্ক। একসঙ্গে অফিস থেকে ফেরা থেকে নানা সুখ-দুঃখের সঙ্গী তাঁরা। তাঁদের সম্পর্ক অনেকটাই পারিবারিক। ২০১১ সালে কামারহাটিতে জয়ী হন তৃণমূলের মদন মিত্র। সেই সময় বিবেকানন্দনগরে অরূপবাবুর ফ্ল্যাটে ভাড়ায় থাকতেন মদনবাবু। দক্ষিণেশ্বরের নতুন ফ্ল্যাটে আসার আগে ওই ফ্ল্যাটেই কিছুদিন কাটিয়েছেন তিনি। গৃহকর্তা হিসাবে ‘দাদা’ মদন মিত্রের সঙ্গেও জমাট রসায়ন গড়ে উঠেছিল তাঁর। শেষমেশ ২০১৮ সালে বিজেপিতে যোগ দেন অরূপ চৌধুরী। আদ্যপ্রান্ত শহুরে মানুষ ও হোর্ডিং ব্যবসায়ী হলেও তিনি রাজ্য কিষান মোর্চার সাধারণ সম্পাদক হয়ে যান। যোগ দেন আরএসএসে। এখন তাঁর বাড়িতেই নিয়মিত আরএসএসের শাখা বৈঠক হয়। তবে এবার যে তিনি কামারহাটির টিকিট পাবেন, তা বিজেপির বহু নেতাও কল্পনা করতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে মদনবাবু বলেন, ব্রোকারের মাধ্যমে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলাম। পরে দক্ষিণেশ্বরে নতুন ফ্ল্যাটে চলে আসি। ওনাকে বাড়ির মালিক হিসাবে চিনতাম। উনি প্রার্থী হয়েছেন শুনে প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। এখানে ব্যক্তি বড়ো কথা নয়। দল ও নীতির বিরুদ্ধে লড়াই হবে। সিপিএম প্রার্থী মানস মুখোপাধ্যায় বলেন, কামারহাটির সকলেই আমার পরিচিত। বিজেপি প্রার্থীকেও চিনি। ভোট হবে নীতির প্রশ্নে। বিজেপি প্রার্থী বলেন, বছর তিনেক আগে মেয়ের বিয়ের সময় আমার প্রতিপক্ষ সব প্রার্থী বাড়িতে এসেছিলেন। প্রার্থী হওয়ায় তাঁরা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। অরূপ চৌধুরী। -নিজস্ব চিত্র