Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

তিন রকম রাজনীতির উত্থান ভারতে

ভারতে বিগত ত্রিশ চল্লিশ বছরে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যেমন বদলে গিয়েছে, ঠিক তেমনই পরিবর্তন হয়েছে নেতানেত্রীদের আইডেন্টিটির।

তিন রকম রাজনীতির উত্থান ভারতে
  • ১৭ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: ভারতে বিগত ত্রিশ চল্লিশ বছরে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যেমন বদলে গিয়েছে, ঠিক তেমনই পরিবর্তন হয়েছে নেতানেত্রীদের আইডেন্টিটির। এই ৪০ বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের সূত্রপাত গত শতকের আটের দশকে। সেখানে ক্রমেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অতি সাধারণ জনগণের নয়নের মণি হয়ে উঠছেন এবং সেইসব মানুষের আস্থা অর্জন করে ফেলছেন, এরকম কিছু নেতার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হল। যাঁদের রাজনীতির পরিভাষায় বলা হয় মাস লিডার। জননেতা, জননেত্রী। 

Advertisement

বর্তমানে এই প্রজন্মের প্রত্যেকের বয়স ৭০ থেকে ৮০ বছরের ধারেকাছে। অথবা কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। কারা আছেন এই তালিকায়? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নরেন্দ্র মোদি, লালুপ্রসাদ যাদব, মুলায়ম সিং যাদব। দক্ষিণ ভারতে চলচ্চিত্র তারকা হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা যাঁরা রাজনীতিতে প্রবেশ করে এরকমই জননেতানেত্রী হয়ে উঠেছিলেন, তাঁরা হলেন এম জি রামচন্দ্রন, করুণানিধি,  এন টি রাম রাও এবং জয়রাম জয়ললিতা।  
উত্তর এবং পূর্ব ভারতে নয়ের দশক থেকে আইডেন্টিটি রাজনীতির জন্ম হল প্রবলভাবে। সেই রাজনীতির চ্যাম্পিয়ন হয়ে উঠে এলেন লালুপ্রসাদ যাদব, মুলায়ম সিং যাদব, কাঁসিরাম, মায়াবতীরা। আর বিরাট দুই জাতীয় রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়ে সেই বড়সড় ছাতার মধ্যে রাজনীতি করলেও  ক্রমেই নিজেকে লার্জার দ্যান লাইফ এক ভাবমূর্তি এবং ওই দলের সবথেকে জনপ্রিয় রাজনীতিক হিসেবে গড়ে তুললেন নরেন্দ্র মোদি ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। 
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চ্যালেঞ্জ আবার এক ধাপ বৃহৎ। তিনি ওই সর্বপ্রাচীন জাতীয় রাজনৈতিক দলে না থেকে নিজের দল গড়লেন। এবং এককভাবে আঞ্চলিক দলের সর্বেসর্বা হয়ে উঠলেন। আর মোদি দিল্লি, উত্তরপ্রদেশের একনায়তন্ত্রকে পরাজিত করে গুজরাত থেকে এসে গোটা দলকে নিজের হাতের তালুতে বন্দি করে ফেলেছেন। নামে বিজেপি, আসলে মোদির দল! 
আর এক ধারার রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে এই মাটি থেকে উঠে এসে জননেতা ও জননেত্রীদের প্রজন্মের পরে। প্রধানত পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমে। এই নেতানেত্রীরা সকলেই রাজনীতির ময়দানে এসেছেন তাঁদের পিতামাতার হাত ধরে। অর্থাৎ উত্তরাধিকার সূত্রে। বর্তমান ভারতে এরকম নেতা রয়েছেন রাজ্যে রাজ্যে। তাঁরাই আঞ্চলিক অথবা জাতীয় স্তরের দলের সুপ্রিমো কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নেতা। 
এই প্রবণতার সৃষ্টিকর্তা কংগ্রেস। ওড়িশায় হঠাৎ একটি হার্ট অ্যাটাক হওয়ায় ১৯৬৪ সালে ভূবনেশ্বরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন জওহরললাল নেহরু। তিনি কংগ্রেসের সভাপতি কামরাজকে ওই হাসপাতালের কেবি঩নেই ভিজিটিং আওয়ার্সে আলাদা করে ফিসফিস করে বলেছিলেন, আমার পরে কিন্তু ইন্দু…আমার পরে ইন্দুই। সেটা হয়নি। তবে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর মোরারজি দেশাইকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া আটকাতে কংগ্রেসের একটি অংশ নেহরুজির স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন। প্রিয় কন্যা ইন্দু অর্থাৎ ইন্দিরা গান্ধী঩কে প্রধানমন্ত্রী পদে বসানো হয়।  
মতিলাল নেহরুর পুত্র হিসেবে জওহরলাল কংগ্রেস সভাপতি হননি। তিনি যোগ্য ছিলেন এবং কংগ্রেসের একটি বড় অংশ তাঁকে মেনে নিয়েছিল। বিশেষ করে গান্ধীজির আশীর্বাদ ছিল। কিন্তু সঞ্জয় গান্ধী, রাজীব গান্ধীদের ইন্দিরা গান্ধীই হাত  ধরে নেতা, কংগ্রেসের প্রধান করেছেন। তারপর থেকে সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীদের পালা। 
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে যে গোয়ালিয়রের যুবক জনসংঘে যোগ দেন, সেই অটলবিহারী বাজপেয়ি এককভাবে প্রবল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর যোগ্য সহযোগী হিসেবে লালকৃষ্ণ আদবানি এসে দুজনে মিলে নানাবিধ এক্সপেরিমেন্টের পর ১৯৮০ সালে বিজেপি নামক একটি দল গঠন করে ভারতের ভাগ্যই বদলে দেন। 
ছয়ের দশকের শেষভাগ থেকে তামিলনাড়ুতে ডিএমকে দলের করুণানিধি ক্র঩মেই একজন জনপ্রিয় নেতা হয়ে ওঠার আভাস দেন। আবার ওড়িশায় বিজু পট্টনায়ক হয়ে উঠেছিলেন  পৃথকভাবে গ্রহণযোগ্য। এই দুজনের নাম উল্লেখ করার কারণ হল, দক্ষিণে এবং পূর্ব ভারতের এই দু‌ই নেতার পুত্ররা বহু বছর পর ভারতের দুই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হবেন। নবীন পট্টনায়ক এবং এম কে স্ট্যালিন। সুতরাং বিগত ৩০ বছর ধরে দেখা গিয়েছে, এই আঞ্চলিক নেতাদের প্রভাব রাজ্য ও জাতীয় স্তরে প্রবল আকার নিয়েছে। তাঁরা মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, কেন্দ্রে মন্ত্রী হয়েছেন, কেন্দ্র ও  রাজ্যে জোটগঠন করেছেন। অর্থাৎ রাজনীতির ময়দানে প্রত্যেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন। 
ঠিক তারপর দেখা যাচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের রাজনীতির সিংহভাগ প্রবণতা হল এইসব ফার্স্ট জেনারেশন তুমুল জনপ্রিয় নেতানেত্রীদের পরিবারের মানুষেরাই সেইসব দলের পরবর্তী উত্তরাধিকার হয়ে উঠেছেন। এবং তাঁদের মধ্যে অনেকেই রীতিমতো নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে উত্তরাধিকার হওয়ার পক্ষে প্রমাণও দাখিল করেছেন। যেমন তেজস্বী যাদব, অখিলেশ যাদব, এম কে স্ট্যালিন, জগনমোহন রেড্ডি। 
চন্দ্রবাবু নাইডু এই তরুণ প্রজন্মের না হলেও তিনিও বস্তুত এন টি রামা রাওয়ের জামাই হিসেবে ক্ষমতায় আরোহণ করেন এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেন। অন্ধ্রপ্রদেশে কংগ্রেস এবং বিজেপির প্রধান দুই নেত্রী কে? একজন ওয়াই এস শর্মিলা রেড্ডি। কংগ্রেসের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রাজশেখর রেড্ডির কন্যা। আর  অন্যজন বিজেপির দুগ্গাবতী পুরন্দেশ্বরী। কে তিনি? এন টি রামা রাওয়ের কন্যা। অর্থাৎ এন টি রামা রাওয়ের কন্যা বিজেপি  সভাপতি। জামাই তেলুগু দেশমের প্রধান ও মুখ্যমন্ত্রী। আর অন্যদিকে রাজশেখর রেড্ডির পুত্র জগন এবং কন্যা শর্মিলা। দুই পৃথক দলে। অর্থাৎ অন্ধ্রপ্রদেশের রাজনীতি চলছে পরিবারতন্ত্রের মাধ্যমেই। অসমে প্রধান বিরোধী নেতা গৌরব গগৈ। প্রাক্তন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ তাঁর পিতা। হায়দরাবাদের অবিসংবাদী মুসলিম নেতা আসাউদ্দিন ওয়াইসি। পারিবারিক সূত্রে উঠে এসেছেন এবং যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। তাঁর পিতা ছিলেন সুলতান সালাউদ্দিন ওয়াইসি। টানা ৬ বারের এমপি। 
প্রথমে আশি-নব্বইয়ের দশকের পর থেকে দেখা গেল, কোনও বিখ্যাত পরিবারের সোনার চামচ মুখে না নিয়ে এসেও মোদি, মমতা, লালুপ্রসাদ, মুলায়ম, নীতীশকুমাররা একক ক্ষমতায় জনপ্রিয় হয়েছেন। এবং একটি করে দলের সর্বোচ্চ কর্ণধার হয়েছেন। এরপরের ধাপ হল নেতানেত্রীদের পুত্রকন্যা ও পরিবারের সদস্যরা নেতানেত্রী হয়েছেন। তাঁরা এখন আঞ্চলিক ও জাতীয় স্তরে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিজেপির বহু পুত্রকন্যা  গুরুত্বপূর্ণ নেতানেত্রী অথবা উচ্চ কোনও পদে। সে বাঁশরী স্বরাজই হন অথবা জয় শাহ। উদাহরণ অনেক। 
আর তৃতীয় একটি ধাপের জন্ম হয়েছে ২০১৩ সালে। ওই ধারার জন্মদাতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে গণআন্দোলন এবং এতকালের অচল, পাথরের মতো চলা রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে নতুন এক আধুনিক ধারার রাজনীতি ও সরকার উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কেজরিওয়াল এসেছেন। বিস্ময়করভাবে ১২ বছর ধরে একটানা দিল্লিতে শাসন করেছেন। পাঞ্জাবে এখনও সরকার তাঁর। অন্য রাজ্যেও তাঁর একাধিক বিধায়ক রয়েছে।
আর এই যে কেজরিওয়ালের ফর্মুলা, সেই মডেলের আরও একজন নয়া রাজনীতিকের আবির্ভাব ঘটেছে বিহারে। প্রশান্ত কিশোর। কেজরিওয়াল এবং প্রশান্ত কিশোরের ফরম্যাট হল, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে উচ্চশিক্ষিত, এলিট, কমবয়সি এবং হিন্দি, ইংরাজিতে সমান স্বচ্ছন্দ। তাঁদের দুজনের রাজনীতির স্লোগান এক। রাজ্যের অগ্রাধিকার আগে। কেজরিওয়াল দিল্লির সম্মান চেয়ে পূর্ণ রাজ্যের জন্য লড়াই করেন। তিনি দিল্লির সরকারি শিক্ষায় বিপ্লব এনেছেন। প্রশান্ত কিশোরও ঠিক সেই ধাঁচেই প্রচার করছেন নিজের নতুন পার্টির মাধ্যমে। অর্থাৎ বিহারে শিক্ষা আগে দরকার। বিহারের অস্মিতা দরকার। 
এই যে নতুন একটি রাজনৈতিক ফরম্যাট, একে বলা হচ্ছে পলিটিক্যাল স্টার্ট আপ। সম্পূর্ণ কর্পোরেট স্টাইলের সঙ্গে জনসংযোগ মেশানো। প্রশান্ত কিশোর দেহাতি ভাষায় কথা বলেন আজকাল সভা সমাবেশে। কেজরিওয়ালকে দেখা গিয়েছে ইংরাজি সংবাদ মাধ্যমেও হিন্দিতে সাক্ষাৎকার দিতে। কারণ তাঁর লক্ষ্য হল, আম জনতা। তাদের সঙ্গে কানেক্ট করতে হবে। একজন শিক্ষিত মানুষ আমাদের নেতা হয়েছেন। এই বার্তা দিতে চান এই দুই নেতা। এই ফরম্যাট ভারতে নতুন। 
আগামী দিনে থাকবে তিনটি ধারার রাজনীতি। একদিকে পরিবারতন্ত্রের পুত্রকন্যা ও পারিবারিক সদস্যরা। আর অন্যদিকে জাতীয় দল বিজেপি। এই দলের নতুন কোনও জননায়ক উঠে আসেনি আর। মোদির পর কী হবে যথেষ্ট অনিশ্চিত। আর তৃতীয় পক্ষ এই প্রশান্ত কিশোর, কেজরিওয়াল স্টাইল। 
কেজরিওয়াল, প্রশান্ত কিশোরের মতো রাজনীতির প্যাটার্ন কি অন্য রাজ্যেও শুরু হবে? অর্থাৎ ফ্রেশ মুখ। নতুন রাজনীতি। এই নয়া রাজনীতি সফল হবে? নাকি ভারতের চালিকাশক্তি হবে সেই ট্র্যাডিশনাল রাজনীতি! অর্থাৎ জননায়ক জননায়িকা হতে হবে সবার আগে! আবার কি নতুন কিছু আইডেন্টিটি রাজনীতি শুরু হবে? 
ধর্ম এবং জাতপাতের পর, আগামী দিনের আইডেন্টিটি রাজনীতির চালিকাশক্তি কি প্রাদেশিক অস্মিতা? অর্থাৎ রাজ্য, ভাষা ও জাতি ফার্স্ট! তারপর অন্য কিছু! সম্ভবত তাই! দক্ষিণের সিনেমা ভারতজয় করেছে। এবার দক্ষিণের এই পুরানো ফর্মুলাও কি ভারতজয় করবে? 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ