একটি দেশের অর্থনীতি কতটা সময়োপযোগী তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হল, দেশবাসীর ব্যাঙ্কিং অভ্যাস। ব্যাঙ্কিং অভ্যাসের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজন একটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট। কিন্তু পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যর্থতার কারণে বেশিরভাগ প্রান্তিক অঞ্চলে ব্যাঙ্কের শাখা পৌঁছয়নি। এমনকী পোস্টাল ব্যাঙ্কিং সিস্টেম এবং সমবায় ব্যাঙ্কের পরিষেবা থেকেও অসংখ্য মানুষ বঞ্চিত ছিল। ফলে প্রান্তিক অঞ্চলের কয়েক কোটি মানুষ নগদ লেনদেনে অভ্যস্ত ছিল। কী সঞ্চয়, কী ঋণগ্রহণ—উভয় ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার বাইরেই তাদের বিচরণ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। ঋণগ্রহণের জন্য একদিকে মহাজনের খপ্পরে পড়ত এবং অন্যদিকে রকমারি চিটফান্ডে সঞ্চয় করে সর্বস্বান্ত হতো তারা। এই সমান্তরাল অর্থনীতির সঙ্গে সরকারি রাজস্বব্যবস্থার সম্পর্ক প্রায় ছিল না। ফলে রাজকোষও নানাভাবে ফাঁকিতে পড়ত। পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্য সমস্যাটি বারবার অর্থমন্ত্রকের গোচরে এনে সমগ্র দেশকে ব্যাঙ্কিংব্যবস্থার আওতায় আনার দাবি তুলেছিল। কিন্তু সব গ্রামে এবং দেশের সর্বত্র বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কস্থাপন লাভজনক হবে না—এই অজুহাতে ‘অলাভজনক’ পরিসরে ব্যাঙ্কিং পরিষেবার বিস্তার রুখে দেওয়া হয়েছিল। ভারতের মতো সুবৃহৎ দেশে তার যে কুফলের ফলন সম্ভব সেটাই হয়েছিল বিস্তর। গরিব মানুষ শুধু সঞ্চয় এবং ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হতো না, ছোটখাটো ব্যবসায়িক লেনদেন এবং মজুরিগ্রহণেও নানাভাবে প্রতারিত হতো। এই ধরনের লেনদেন মূলত নগদ অর্থে সীমিত ছিল বলে ব্যাপক দুর্নীতিরও শিকার হতো বহু গরিব মানুষ।
ঠিক এমনই এক মুহূর্তে ত্রাতার মতোই উদিত হন নরেন্দ্র মোদি। ২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসে তিনি লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী জনধন যোজনা (পিএমজেডিওয়াই) ঘোষণা করেন। দেশজুড়ে প্রকল্পটির রূপায়ণ শুরু হয় সে-বছরই ২৮ আগস্ট। উদ্বোধনের দিনই দেড় কোটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। দাবি করা হয় যে, আর্থিক ক্ষেত্রে নাগরিকের অন্তর্ভুক্তির এটাই বিশ্বের বৃহত্তম উদ্যোগ! পরবর্তী একদশকে (৭ মার্চ, ২০২৫ পর্যন্ত) মোট অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে ৫৫ কোটি ২ লক্ষ। সরকারের দাবি, এই অ্যাকাউন্টগুলির মধ্যে ৩৬ কোটি ৬৩ লক্ষ—অর্থাৎ বেশিরভাগই গ্রামাঞ্চলের মানুষকে খুলে দেওয়া হয়েছে। সংখ্যাতত্ত্বের দিক থেকে এই তথ্য অভূতপূর্ব এবং এই ছবি আমাদের গর্বিত করে। কেননা, এই সাফল্য বাস্তব হলে এবং এর ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হলে ভারতের অর্থনীতির হাল ফিরে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তব কি সেই সাক্ষ্য দিচ্ছে? পরিতাপের সঙ্গেই বলতে হচ্ছে যে, ‘না’। একদিকে, দেশের যেসব মানুষকে লক্ষ্য করে জিরো ব্যালান্সের জনধন অ্যাকাউন্ট খোলার বন্দোবস্ত হয়েছিল, পরবর্তীকালে তাদের বেশিরভাগেরই আয়পত্তর তেমন বাড়েনি। কী কৃষিজীবী, কী অন্য ক্ষেত্রের শ্রমজীবী—অধিকাংশ ব্যক্তিকেই এই বন্ধনীতে রাখা যায়। ফলে বহু লোক তাদের নামে খোলা অ্যাকাউন্টে কোনও লেনদনেই করে না। এমন গ্রাহকদের প্রায় দেড় কোটি জনধন অ্যাকাউন্ট একপ্রকার নিষ্ক্রিয় হয়ে রয়েছে। এমনকী, বহু লোক জানেই না যে তাদের নামে (তাদের আধার, প্যান দিয়ে) ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে এবং চালু রয়েছে। এমন অ্যাকাউন্টগুলিকে হাতিয়ার করে প্রতারক চক্র ব্যাপক আর্থিক দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছে। সাইবার প্রতারক চক্রের ভয়াবহ দৌরাত্ম্য নজরে আসার পরেও তা রুখতে সরকারের ল্যাজেগোবরে অবস্থা।
তাই চিহ্নিত দেড় কোটির মতো জনধন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সরকার বন্ধ করে দেওয়ারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেননা সাইবার প্রতারণা মারফত হাতানো টাকা ট্রান্সফারের জন্যই অ্যাকাউন্টগুলি তুরুপের তাস হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি এতটাই চরমে যে এবার আসরে নামতে হয়েছে খোদ আরবিআই’কে। বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ককে তারা সুপারিশ করেছে যে, ওইসব নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া হোক। তার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে সেইমতো। যেসব জনধন অ্যাকাউন্টে দীর্ঘদিন যাবৎ কোনও প্রকার আর্থিক লেনদেন হচ্ছে না, সেগুলিই বন্ধ করে দেওয়া হবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ‘মিউল হান্টার’ অভিযান থেকে জানা গিয়েছে যে, শুধুমাত্র ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার অধীনস্থ ‘নিষ্ক্রিয়’ জনধন অ্যাকাউন্টগুলি ব্যবহার করে ১৪৭ কোটি টাকার প্রতারণা ঘটে গিয়েছে। এই হিসেবটিও মাত্র ছ’মাসের! রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট বলছে, গত অর্থবর্ষে দেশে মোট ১৩,৫১৬টি ডিজিটাল প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, আর তার মাধ্যমে নয়ছয় হয়েছে ৫২০ কোটি টাকা। কর্তৃপক্ষের অনুমান, গত কয়েকবছরে দেশজুড়ে অংসংখ্য জনধন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে স্রেফ ডিজিটাল প্রতারণার মতলবে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের এই সাবধানী পদক্ষেপ প্রশংসার দাবি রাখে। তবে, একইসঙ্গে আমাদের ভাবাচ্ছে পিএমজেডিওয়াই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে। মোদি সরকারকে অনেক বেশি বাস্তববাদী হতে হবে। ছাড়তে হবে চমক আর চালাকির রাজনীতি। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হলে, গালভরা বুলি আওড়ানো ছেড়ে ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ স্লোগানেই হতে হবে আন্তরিক।