Bartaman Logo
৩০ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এক মহিলার একা লড়াইয়ের ফল কাল

১৯৫২ থেকে ভারতের নির্বাচনি ইতিহাসে আর কোন অঙ্গরাজ্যে এভাবে দখলের ভোট হয়েছে? এক মহিলাকে হারাতে লক্ষ লক্ষ জলপাই রঙা উর্দি, হাতে বন্দুক, ভারী বুট? কাশ্মীরে নয়, ইম্ফলেও নয়, ডবল ইঞ্জিন যোগী রাজ্যও এই মানচিত্রের বাইরে।

এক মহিলার একা লড়াইয়ের ফল কাল
  • ৩ মে, ২০২৬ ০৪:০০

হিমাংশু সিংহ: ১৯৫২ থেকে ভারতের নির্বাচনি ইতিহাসে আর কোন অঙ্গরাজ্যে এভাবে দখলের ভোট হয়েছে? এক মহিলাকে হারাতে লক্ষ লক্ষ জলপাই রঙা উর্দি, হাতে বন্দুক, ভারী বুট? কাশ্মীরে নয়, ইম্ফলেও নয়, ডবল ইঞ্জিন যোগী রাজ্যও এই মানচিত্রের বাইরে। ভারতের কুখ্যাত দুষ্কৃতী, সমাজবিরোধী এবং জঙ্গি দৌরাত্ম্য কি একমাত্র বাংলাতেই সীমাবদ্ধ? ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড  ব্যুরোর রিপোর্ট কি পশ্চিমবঙ্গে আধাসেনার এই রেকর্ড মোতায়েনের পরিসংখ্যানকে সমর্থন করে? গত বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোট দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, লড়াইটা আদৌ তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে হচ্ছে না। প্রতি মুহূর্তে জওয়ানদের ছুটে যাওয়া, গাড়ি থামিয়ে মহামান্য এলওপির দলীয় কর্মীদের উপর আস্থা না রেখে বাড়তি আধাসেনা চেয়ে বারংবার কন্ট্রোল রুমে ফোনই জানান দিচ্ছিল, ভোটটা চলছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে রাজ্যের তিন তিনবারের শাসক দলের। আরও স্পষ্ট করে বললে কোনো রাজনৈতিক দল নয়, সংগঠনও নয়, বাংলার বিগত অর্ধশতাব্দীর সর্বাধিক জনপ্রিয় নেত্রীর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রের আড়াই লক্ষ আধাসেনাকে। তাঁর চতুর্থবারের মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথকে আটকাতেই এত বড়ো অপারেশন। আগামী কাল ফল প্রকাশের পরও বিধায়ক কেনাবেচার খোলা বাজারে যা চলতে থাকবে অমিত শাহদের রিমোট অঙ্গুলিহেলনে! যার পোশাকি নাম অপারেশন লোটাস।

Advertisement

৬ মাস ধরে নাম বাদের বিষময় কুনাট্যের পর সীমান্ত পাহারায় কর্তব্যরত জওয়ানদের একতরফা নামিয়ে গদি দখলের চেষ্টা! স্বাধীন ভারতে এমন নজিরের কথা কেউ মনে করতে পারেন বিগত সাত দশকের ভোট ইতিহাসে? মনে করতে পারেন এমন ব্যতিক্রমী নির্বাচনের কথা, যেখানে সন্ত্রাস ও দাঙ্গাকবলিত রাজ্য থেকে তুলে জওয়ানদের পাঠানো হচ্ছে শান্ত বাংলায়? সংখ্যাটা একজন দু’জন নয় লাখে লাখে। প্রশ্ন করি, আগামী বছর উত্তরপ্রদেশের ভোটটাও একই কায়দায় হবে তো! আড়াই লক্ষ সিআরপিএফ, বিএসএফ জওয়ানের সঙ্গেই লখনউয়ের রাজপথে নামবে তো এনআইএ? ভোটের আগের দিনও তালিকায় নাম উঠবে আর খোদ রাজভবন থেকে ভেসে আসবে বদলের স্লোগান? মহামান্য জ্ঞানেশ কুমারের তথাকথিত ‘নিরপেক্ষতার’ দম দেখব ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে!
জন্মলগ্ন থেকেই এনআইএ বা জাতীয় তদন্ত এজেন্সি কোনোদিন ভোট তদারকি, বুথের আনাচেকানাচে বোমার মশলা লুকিয়ে রাখা হয়েছে কি না, তা খুঁজতে নেমেছে বলে শোনা যায়নি। ১৮ বছর আগে মুম্বইয়ে পাকিস্তানি জঙ্গিদের অতর্কিতে হাড়ে কাঁপন ধরানো হামলার পরপরই আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ এনআইএ’র জন্ম মূলত সীমান্তপারের জঙ্গি কার্যকলাপ রুখতে। বিস্ফোরক খোঁজা ও তা কোথা থেকে সংগঠিত হল তা নির্দিষ্ট করাই কাজ।। পরে আইন পাশ করিয়ে তার কাজের পরিধি আরও বাড়ানো হলেও ভোট তদারকিতে এই প্রথম। কাশ্মীরের ভোটেও এনআইএকে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করার ভূমিকায় দেখা যায়নি। লজ্জার মাথা খেয়ে বাংলায় তাও দেখা গেল অবলীলায়। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের চব্বিশ ঘণ্টা আগে জেলায় জেলায় বিস্ফোরক এবং সুতলি বোমার সন্ধানে এনআইএ’র বিশেষজ্ঞরা নামলেন কমিশনের (পড়ুন অমিত শাহের) নির্দেশে। এই তৎপরতা যদি কাশ্মীরে দেখা যেত তাহলে পহেলগাঁওয়ের হিন্দু নিধন দেখতে হত না। দেখতে হত না, বিগত ১২ বছরের একটিও জঙ্গি হানার ঘটনা। সম্ভবত দেশকে জঙ্গিমুক্ত করার তুলনায় অঙ্গরাজ্য বাংলা দখল কেন্দ্রের শাসক বিজেপির অগ্রাধিকারের তালিকায় এই মুহূর্তে দশ ধাপ এগিয়ে। তাই রেয়াত করা হচ্ছে না কিছুই। সেই কারণেই সকাল সন্ধে জ্বলতে থাকা মণিপুর থেকে পর্যন্ত সাড়ে ৮ হাজার জওয়ান এসেছে বাংলায়। কেন? বাংলার আইন-শৃঙ্খলা কি কাশ্মীর ও মণিপুরের চেয়েও খারাপ! এরাজ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় কত মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বিগত এক বছরে? এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, বিজেপির কিছুতেই যেন তর সইছে না। সংগঠন আঁতুড় ঘরে, বুথে বুথে এজেন্সির ভাড়া করা লোক দেওয়া ছাড়া গতি নেই, তবু পশ্চিমবঙ্গ চাই-ই চাই! ভরসাকে পাখির চোখ করতে গিয়ে আখেরে এই গা-জোয়ারির নামে ভয় ছড়িয়ে দেওয়াতেই বেশি জোর দিচ্ছে গেরুয়া শক্তি। ফল বেরনোর আগেই ছোটোবড়ো নেতারা বদলার হুংকারও দিচ্ছেন। সংযত থাকার বদলে এই আগ্রাসী মনোভাব মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়!
জনসমর্থন ষোলোআনা পক্ষে থাকলে, বিজেপির সংগঠন ও স্থানীয় নেতৃত্ব যুদ্ধের জন্য পুরোদস্তুর তৈরি থাকলে এত কিছুর কি প্রয়োজন হত? ভূপেন্দ্র যাদব, পবন বনসল, আধডজন ভিনরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, ত্রিপুরার বিপ্লব দেবদের হালের অভিজ্ঞতা বলছে, তৈরি নেই কিছুই। জেলায় জেলায় বহিরাগত কারিয়াকর্তাদের ভিড়। ২০১১ সালে বামেদের ৩৪ বছরের সাজানো রাজ্যপাট উলটে দিতে আজকের মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে পালাবদলের লড়াই দেখেছিলেন বাংলার মানুষ। সেই যুদ্ধ ছিল ঐতিহাসিক পালাবদলের। অগুনতি হাওয়াই জাহাজ উড়িয়ে টাকার শ্রাদ্ধ করে বহিরাগত নেতা নেত্রীদের প্রয়োজন হয়নি সেদিন। কেন্দ্রের সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রও সঙ্গে ছিল না। মমতার একার ক্যারিশমাই জুগিয়েছিল পালাবদলের বারুদ। সেদিনের পরিস্থিতির সঙ্গে আজকের আকাশপাতাল তফাত। এবারের উদ্দেশ্য একটাই স্বাধীনতা উত্তর বাংলার জনপ্রিয়তম নেত্রীর চতুর্থবারের শপথে বাধা তৈরি করো যেনতেন। অধিকাংশ জেলাতেই বিজেপির সংগঠনের কঙ্কালসার চেহারা বেআব্রু। মোদিজি ও অমিত শাহ কয়েক ডজন সভা, প্রচারে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও পেনাল্টি বক্সে ঢুকতে কি পেরেছেন? না গোলমুখে জটলাতেই নষ্ট হয়েছে সুযোগ! অসংখ্য বুথে এজেন্টই দেওয়া গেল না কেন? অমিত শাহদের উচিত ছিল রাজ্যবাসীকে ভয়-ভরসার গুগলি না দিয়ে আগে কর্মীদের চাঙ্গা করা। সদস্য সংগ্রহ অভিযানে জোর দেওয়া। অনেক চেষ্টা করেও সক্রিয় সদস্য না বাড়ায় শেষে কাশ্মীর, মণিপুর থেকে ঢালাও আধাসেনা আনা এবং চড়া হারে এজেন্সি ভাড়া করা ছাড়া উপায় ছিল না বিজেপির সামনে। যার ফলশ্রুতিতেই তামিলনাড়ুতে ভোট হয়েছে ৩০০ কোম্পানি আর বাংলায় ২৪০০ কোম্পানি আধাসেনা নামিয়ে। এই বৈষম্য কার স্বার্থে এবং কাকে খুশি করতে! 
আর মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার অপেক্ষা। তারপরই বাংলার ফল। গত দেড় দু’মাস ধরে টানা যুদ্ধের পরিণাম জানা যাবে সোমবার বেলা গড়াতেই। সেই ফলে এক্সিট পোলের কুনাট্যের পর্দা ফাঁসই শুধু হবে না, মমতা নামের ম্যাজিক আজও বঙ্গজীবনে কতটা অটুট তারও একটা ইঙ্গিত মিলবে। তবে ফল যাই হোক, তা যেন রাজনৈতিক জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে, সামাজিক শান্তিকে যেন কোনোভাবেই প্রভাবিত করতে না পারে! যেই বলে থাকুন, ‘চুন চুন কে’ ৪ তারিখ বেলা চারটের পর থেকে মল্লযুদ্ধের আহ্বান কিংবা ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে হিসাব বুঝে নেওয়ার উল্লাস কোনোমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। বারংবার উলটো করে ঝুলিয়ে মারার নিদান, কোন দলের নেতার মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে? এধরনের হুংকার ভোট পরবর্তী হিংসায় মদত দিতে বাধ্য। সেই দায় দায়িত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের উপর নির্বাচন কমিশন চাপাবে তো! নাকি উত্তরপ্রদেশের ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ তথা নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয় পাল শর্মার কনভয় আগামী পাঁচ বছর ফলতার গ্রামে গ্রামে নাগরিকদের সুরক্ষা দেবে? অজয় পাল শর্মা যোগীরাজ্যে ফিরে গেলে সেখানকার নাগরিকরা আরও বিপন্ন হবেন না তো? ‘সিংঘম’ বনাম ‘পুষ্পা’ নাটক সিনেমার পর্দায় যতটা মনোগ্রাহী, বাস্তবের মাটিতে কিন্তু পুরো উলটো!
ভোটের ফল যাই হোক প্রতিটি পক্ষকে মনে রাখতে হবে কোনো অবস্থাতেই যেন বদলা ও প্রতিশোধস্পৃহা প্রশ্রয় না পায়। ইতিহাস সাক্ষী নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসায় চিরদিনই প্রাণ হারায় সাধারণ গরিব খেটেখাওয়া মানুষ। নেতাদের গায়ে তার আঁচটুকুও পড়ে না। নেতাদের উসকানিতে প্রতিপক্ষের বাড়িতে যারা হামলা চালাতে যায়, রক্তপাত ঘটায় তারাও নিতান্তই গরিব। কিন্তু ভোটের আগে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে নিয়ম করে প্রায় প্রতিটি সভায় হিংসায় উসকানি দিয়েছেন তা অবিশ্বাস্য। প্রধানমন্ত্রী কতজন বাঙালির ‘চুন চুন কে’ হিসাব নেন কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উলটো করে ঝুলিয়ে কতজনকে সোজা করেন, রাজ্যবাসী তা দেখতে চায়। দেখতে চায়, প্রতিহিংসার সেই আগুনে পুড়ে বাংলা সত্যি খাঁটি সোনার হয়, না প্রতিশোধের তাড়নায় রাজ্যটাই হিংসায় ডুবে শেষ হয়ে যায়! উন্নয়ন স্তব্ধ করে বাংলার বদনাম মানুষ কিন্তু মোটেই সহ্য করতে রাজি নয়। গত ৬ মাস সংগঠিতভাবে বাংলাকে অপমান করা হয়েছে। সর্বশক্তি দিয়ে বাংলা মাকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা চলেছে উদয় অস্ত। সোমবারের ফল বেরনোর পর সেই বদনামের কুনাট্যের যেন অবসান হয়। দয়া করে উন্নয়নে মন দিন, বাংলার বদনাম করবেন না।

সম্পর্কিত সংবাদ