দীপক চক্রবর্তী: ‘নেপাল রানস লাইক এ হর্স। শ্যুটস লাইক এ বুলেট।’ হলদে হয়ে যাওয়া কাগজের কাটিং দেখলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। টাইম মেশিনে চড়ে কয়েক দশক পিছিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। ১৯২৫ সালের ২৮ মে। গড়ের মাঠে তুমুল উত্তেজনা। ইস্ট বেঙ্গল-মোহন বাগান চিরকালীন রেষারেষির সেই শুরু। প্রথম ডার্বিতেই লাল-হলুদের মশালে গনগনে আঁচ। নেপাল চক্রবর্তীর একমাত্র গোলে সেদিন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে বশ মানায় ইস্ট বেঙ্গল। আর বড় ম্যাচে প্রথম গোলদাতা আমার বাবা। লাল-হলুদ রং আমাদের গর্ব, ঐতিহ্যও বটে।
আদি বাড়ি ঢাকার বিক্রমপুর। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে আমিও ঘুরে বেড়িয়েছি গ্রামে। আবছা মনে পড়ে সবকিছুই। ১৯২১ সালে ইস্ট বেঙ্গলে যোগ দেন বাবা। পরের সাত বছর লাল-হলুদ জার্সিতে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। কাদা মাঠে বুট পরিহিত গোরাদের সামালানোর জন্য পায়ে শাড়ির পাড় জড়িয়ে নিতেন। বাবার রুটিন ছিল ঘড়ির কাঁটায় মাপা। ফুটবল খেলতে অফুরন্ত দম প্রয়োজন। তাই ভোরে ঘুম থেকে উঠে দৌড়াতে বেরতেন তিনি। এই নিয়মে পরিবর্তন হয়নি কখনও। তার আগে দুটো ডিম ভেঙে তার মধ্যে মিশিয়ে নিতেন নুন। সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল বাতাবি লেবু দিয়ে ফুটবল খেলা। বাঙালরা বাতাবি লেবুকে বলেন জাম্বুরা। পায়ের জোর বাড়াতে এই পদ্ধতি হয়তো কেউ ভাবতেও পারবেন না। বাবার খেলায় খুশি হয়ে পরবর্তীতে ওঁকে চাকরির প্রস্তাব দেয় টিসকো। কাটহুইলার কাপ তখন প্রবল জনপ্রিয়। কলকাতার বাঘা বাঘা দলকেও কড়া টক্কর দিত টিসকো। যাই হোক, ইস্পাতগরীতেই ফুটবল থেকে অবসর নেন বাবা। খেলার মাঠে সজোরে তলপেট লক্ষ্য করে লাথি চালায় এক গোরা ফুটবলার। মারাত্মক আহত বাবাকে মাঠ থেকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। শেষপর্যন্ত মৃত্যমুখ থেকে ফিরে আসলেও ফুটবলে আর পা দিতে পারেননি তিনি।
বাবার মতো আমাদের পরিবারের রংও লাল-হলুদ। ছোটবেলায় গ্যালারিতে বসে আমেদ, সালে, ভেঙ্কটেশদের ম্যাচ দেখার অনুভূতি আজও হৃদয়ে দোলা দেয়। ইস্ট বেঙ্গল আমাদের যৌবনের উপবন, বার্ধক্যের বারাণসী। অবসরে স্কটল্যান্ডের ছিমছাম শহর আবেরদিনে বসেই প্রিয় ক্লাবকে শুভেচ্ছা জানাই। আর অতি অবশ্যই দুপুরের পাতে সর্ষে ইলিশ খাওয়ার ফাঁকে জোর গলায় বলতে চাই, জয় ইস্ট বেঙ্গল।
লেখক নেপাল চক্রবর্তীর পুত্র