Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

‘রেকর্ড’ খারাপ

‘রেকর্ড’ যেন পিছু ছাড়ছে না নরেন্দ্র মোদিকে! একই দিনে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন। দুটি ক্ষেত্রেই ছক্কা হাঁকিয়ে রেকর্ড করে ফেলেছেন মোদি।

‘রেকর্ড’ খারাপ
  • ২৪ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

‘রেকর্ড’ যেন পিছু ছাড়ছে না নরেন্দ্র মোদিকে! একই দিনে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন। দুটি ক্ষেত্রেই ছক্কা হাঁকিয়ে রেকর্ড করে ফেলেছেন মোদি। একটিতে কেন্দ্র ও রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসাবে সবচেয়ে বেশি দিন কাটানোর মাইলফলক ছুঁয়েছেন তিনি। তাঁর সামনে শুধু তিনিই। অন্যটিতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এগারো বছরের শাসনে ‘রেকর্ড’ পরিমাণ ঋণ করে দেশকে মোটামুটি দেনার দায়ে ডুবিয়ে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে একটানা ৪৬১৩ দিন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মোদি। ২০১৪ সালের মে মাসে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। সেই থেকে টানা ৪৩১৮ দিন দেশের সর্বোচ্চ শাসকের ভূমিকায়। অর্থাৎ সব মিলিয়ে সরকারের প্রধান হিসেবে ৮৯৩১ দিন কাটিয়েছেন। এর আগে সিকিমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পবনকুমার চামলিং একটানা ৮৯৩০ দিন মুখ্যমন্ত্রীর পদে ছিলেন। মোদি তাঁর রেকর্ড ভাঙলেন রবিবার। যদিও শুধু মুখ্যমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটানা ক্ষমতায় থাকার নিরিখে তিনি এখনও অনেকটা পিছিয়ে আছেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে পবন চামলিং ছাড়াও তাঁর থেকে অনেকটা এগিয়ে আছেন পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু এবং ওড়িশার নবীন পট্টনায়েক। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলাল নেহরু (৬১৩০ দিন) মোদির চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন। মোদির রেকর্ড দু’টি পদ (মুখ্যমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী) মিলিয়ে। তবে ‘রেকর্ড’ ভাঙার লক্ষ্যে তিনি বীরবিক্রমে এগিয়ে চলেছেন। 

Advertisement

এই রেকর্ড যদি তাঁর মুকুটে নতুন পালক হয়, তাহলে দুই সরকারের প্রধান হিসেবে তাঁর ব্যর্থতা ও স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার ইতিহাসও মনে রাখার মতো। প্রধানমন্ত্রী হয়ে শুরু থেকেই ‘আত্মনির্ভর’ ভারত গঠনের কথা বলে চলেছেন মোদি। তাঁর আমলে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দিকে ভারত এগিয়ে চলেছে বলে তোলপাড় করা প্রচার চালাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। অথচ বাস্তব সত্য হল, এই সরকারের আমলে দেশি-বিদেশি ঋণ অর্থাৎ দেনার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। দেশের মোট জিডিপির ৫৩ শতাংশ ঋণ! গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের যে বাজেট পেশ করেছে সরকার তাতে বলা হয়েছে, আসন্ন অর্থবর্ষে সরকারের মোট খরচ হবে সাড়ে ৫৩ লক্ষ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ৩৬ লক্ষ ৫১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকার সামান্য বেশি। আর বছর শেষে দেশি-বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২১৪ লক্ষ ৮২ হাজার ৫০ কোটি টাকা! এর মধ্যে ৬৫ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ। ধারদেনা করে দেশ চালানোর ক্ষেত্রে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে অনন্য নজির তৈরি করেছেন এই প্রধানমন্ত্রী! সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, স্বাধীনতার পর ৬৭ বছরে (২০১৪ সাল পর্যন্ত) ভারতের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭০ লক্ষ কোটি টাকা। মোদি জমানায় মাত্র ১১-১২ বছরে তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২১৪ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। বছর বছর সরকারের এই বিপুল ধারের বোঝা বহন করতে হচ্ছে দেশের ১৪৫ কোটি নাগরিককে। তথ্য বলছে, ভারতে ১ লক্ষ ৪২ হাজার টাকার দেনার বোঝা নিয়ে একজন শিশু জন্মগ্রহণ করছে। অন্য একটি মতে, দেশের মাথাপিছু দেনার পরিমাণ ৪.৮০ লক্ষ টাকা। কোনো সন্দেহ নেই, ব্যক্তিগত রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি এর দায়ও প্রধানমন্ত্রীর, যা তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। 
ঋণের এই মরণফাঁস থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা, পরামর্শ, বিশেষজ্ঞের মতামতের কোনো ঘাটতি নেই। যেমন, সবচেয়ে আগে প্রয়োজন রাজস্ব আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি বড়োলোক ও ধনীদের উপর অতিরিক্ত কর চাপিয়ে বাড়তি উপার্জনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আয় বাড়ানোর অন্যতম পথ হতে পারে কালো টাকা উদ্ধার, কর ফাঁকি দাতাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিয়ে মোটা জরিমানা আদায় করা, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংকঋণ খেলাপিদের ‘ছাড়’ না দিয়ে টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করা, সরকারের অহেতুক ও বাড়তি খরচে রাশ টানা, পরিকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে জিডিপি হার বাড়ানোর চেষ্টা, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা ইত্যাদি। কিন্তু প্রবাদ আছে, চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি। কী করলে ঋণ-দেনার হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা যায়, মোদি তা ভালোই জানেন। কিন্তু সঠিক পথে চললে রাঘববোয়ালদের গায়ে হাত পড়বে। তাতে শাসক দলেরই যে বড়ো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা। অতএব অক্টোপাসের মতো ঋণের বোঝা গলায় ফাঁস হয়ে থাকলেও তিনি চোখ বুজেই থাকবেন! না হলে তাঁর ঘনিষ্ঠদের উপর কোপ পড়তে পারে। তাই দেশ আরও তলিয়ে গেলেও তাঁর মাথার মুকুটে নিত্যনতুন পালক যুক্ত করার উদগ্র বাসনায় তিনি মেতে রয়েছেন। ঋণং কৃত্বা ধৃতং পিবেৎ-এর সহজতম পন্থাটি বেছে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। দেশবাসীর স্বপ্নপূরণে নিজের দেওয়া বহু প্রতিশ্রুতির অন্তর্জলি যাত্রা ঘটিয়ে, দেশবাসীর মাথার উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন ঋণের বোঝা! এক্ষেত্রেও ‘রেকর্ড’ গড়তে বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে তালিকায় শীর্ষস্থান দখলের দৌড়ে তাঁর ‘আত্মনির্ভর’ ভারতকে এগিয়ে রাখতে তিনি সদাসচেষ্ট! 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ