হারাধন চৌধুরী: ফরাসি মনোবিদ জ্যাক লাকাঁ কাঠামোগত ভাষাতত্ত্ব, দর্শন এবং গণিতের উপর ভিত্তি করে ফ্রয়েডের কাজের পুনর্ব্যাখ্যা করেছিলেন। ১৯৩১ সালের ঘটনা। লাকাঁ তখনও মেডিকেলের ছাত্র, প্যারিসের সেন্ট-অ্যান হাসপাতালে মার্গারিট প্যান্টেইন নামে এক মহিলার চিকিৎসা করেন। তাঁর ডক্টরেট থিসিসে (Paranoid psychosis in its relationship with personality) অবশ্য তিনি ব্যবহার করেন ওই রোগিণীর ছদ্মনাম—‘এমি’। এমি এক ‘অপরাধ’ করে বসেন। বিখ্যাত অভিনেত্রী ইগেট দুফলোকে ছুরিকাঘাত করার চেষ্টা করেন তিনি। এজন্য তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়। অথচ দুফলোর কোনও দোষ ছিল না। এই অসংলগ্ন এবং হতবাক করা কাণ্ডের কারণ খুঁজতে গিয়ে লাকাঁ বুঝতে পারেন যে, এটি এক প্রকার ‘সেলফ-পানিশমেন্ট প্যারানয়া’। লাকাঁর মতে, এমি নিজেকে ছুরি মারার বিকল্প হিসেবে দুফলোকে বেছে নেন। কারণ এমি দুফলোর মতোই খ্যাতিলাভের খোয়াব দেখতেন। কিন্তু বাস্তবে তাঁর পক্ষে তা সম্ভব ছিল না এবং তিনি তেমনটি হতেও পারছিলেন না। এমি ভেবেছিলেন, এজন্য একমাত্র দায়ী দুফলো। তিনিই ষড়যন্ত্র করে এমিকে উপরে উঠতে দিচ্ছেন না। এমি ভাবলেন, তাঁর নিজের যে ‘পার্সিকিউটেড সাইকি’, সেটিকে আঘাত করার সবচেয়ে ভালো পথ হল সরাসরি দুফলোকে আঘাত করে বসা।
এবার জেনে নেওয়া যাক, প্যারানয়া কী? এটা এমন এক ধরনের মানসিক অবস্থা, যেখানে রোগী কোনও কোনও মিথ্যা বিশ্বাসকে (ডেলিউশন) ভীষণ সত্যি বলে ধরে নেয়। আমরা যাকে অনাকাঙ্ক্ষিত হিংসা (আনওয়ারেন্টেড জেলাসি) বলি, সেটা প্যারানয়েড ব্যক্তির মধ্যে থাকে প্রবল মাত্রায়। সারাক্ষণ এক ধরনের ‘এগজাজারেটেড সেলফ ইমপর্ট্যান্সের’ ভিতরে অবস্থান করে। বাস্তবে সে তুচ্ছ মানুষ হয়েও ডেলিউশনের কারণে নিজেকে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। সে ভাবে যে, ‘আমার চেয়ে দামি কেউ নেই। যেটা আমি ভাবি এবং বলে থাকি—কেবল সেটাই খাঁটি।’
এই প্রসঙ্গেই আসে ফ্রয়েডিয়ান সাইকোঅ্যানালাইসিসের কথা। এখানে ‘আইডিয়াল ইগো’ বলে একটি কথা আছে। লাকাঁর গবেষণার পাত্রী এমির ক্ষেত্রে আইডিয়াল ইগো ছিলেন দুফলো। আমাদের চারপাশে বহু ‘বামন’ ঘুরে বেড়ায় যারা তাদের আইডিয়াল ইগোর বিরুদ্ধে শয়নে স্বপনে জাগরণে লড়াই জারি রেখেছে। সকলের হাতে ধাতব ছুরি নেই, কিন্তু বাক্যবাণ নিক্ষেপে তারা যথেষ্ট পটু। আকথা-কুথায় নামী ব্যক্তিদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ায় তারা স্পেশালাইজেশন করে ফেলেছে। অতিসাধারণ মানুষ সেসব দিব্য ধরে ফেললেও এই আক্রমণকারীরা থেমে যাওয়ার পাত্র নয়।
একটি স্যাটায়ার ধর্মী রচনায় কাচের ঘরের বাসিন্দাদের উদ্দেশে স্টিফেন লিককের ‘পরামর্শ’ ছিল, অন্যদের দিকে এমন তেড়ে ঢিল ছোড়া উচিত, যাতে কোনও ঢিল কাচের ঘরটি ছুঁতে না-পারে। ডেলিউশনে ভোগা লোকজনকে অবিকল এমনই আক্রমণাত্মক আবিষ্কার করে সমাজ আর অবাক হয় না। আমরা অহরহ দেখছি—নিজের আইডিয়াল ইগোদের আঘাত করে নিজেকেই শাস্তি দিচ্ছে তারা—লাকাঁর ‘সেলফ পানিশমেন্ট প্যারানয়া’কে চরিতার্থ করছে।
এই কথাগুলির অবতারণা কেন? প্ররোচিত করছে বাংলায় বিরোধীদের লাগাতার রাজনৈতিক লম্ফঝম্প। বিধানসভার নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়তেই তাদের লাফালাফি বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে। এসব করার সময় তারা খেয়াল রাখছে না, পড়ে গিয়ে হাড়গোড় ভেঙেচুরে যাবে কিংবা ব্যাপারটা লোক হাসানোর পর্যায়ে চলে যাচ্ছে কি না।
বিরোধী শিবিরে একাধিক বাম ও অতিবাম দল আছে। রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন কংগ্রেসও। তবে সবাইকে ছাপিয়ে যেতে দেখা যায় প্রধান বিরোধী দল বিজেপির কাণ্ডজ্ঞান। লোকসভা, বিধানসভা নির্বাচনের মতো সুবৃহৎ গণতান্ত্রিক উৎসব মানেই গেরুয়া শিবিরের দিল্লিওয়ালাদের দাপাদাপি হয়ে ওঠে দর্শনীয়। এই যেমন ২২ আগস্ট ঘুরে গেলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনটি মেট্রোপথের আংশিক যাত্রার শুভসূচনা হয়েছে তাঁর হাতে। সেদিন দমদমে এক রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে প্রদত্ত ভাষণে তিনি বাংলায় ‘আসল পরিবর্তন’ চাইলেন। প্রধানমন্ত্রীর দাবি, সেই পরিবর্তন একমাত্র বিজেপিই আনতে পারে। তিনিই স্লোগান দিলেন, ‘বাঁচতে চাই, বিজেপি তাই।’ বিজেপির ‘পরিবর্তন সংকল্প সভা’ থেকে বাংলার উন্নয়নের প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পার্টিকে নিশানা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিকশিত বাংলা মোদির গ্যারান্টি। আমাদের কাছে বাংলার উন্নয়নের রোড ম্যাপ আছে। কিন্তু তৃণমূল উন্নয়ন-বিরোধী।’ কেন্দ্রের বিভিন্ন প্রকল্পে মমতার সরকারের ‘বাধাদানের খতিয়ানও’ তুলে ধরেন মোদি। ‘বিজেপি জমানায় ত্রিপুরা ও অসমে উন্নয়নের বন্যার দৃষ্টান্ত’ সামনে রেখে মোদি বাংলার মানুষকে ‘সেবা’ করারও একটি চান্স চান।
আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, এটাই ছাব্বিশের ভোটের আগে বিজেপি নেতৃত্বের ডেইলি প্যাসেঞ্জারির শুরু। এরপর এই যাতায়াতে গতিসঞ্চার হবে দ্রুত। দিল্লির কোনও চেনা নেতাই বাদ পড়বেন না বলেই মনে হয়। তাঁরা কিছু ‘ধরতাই’ দিয়ে যাবেন (যেমন—‘আসল পরিবর্তন’ এবং ‘বাঁচতে চাই, বিজেপি তাই’) এবং বঙ্গ-বিজেপির লোকজন তার পিঠে ‘দোয়ারকি’ গাইতে থাকবেন দিবারাত্র। এখনই হলফ করে বলে দেওয়া যায় যে, দোহারগণ দিল্লির নেতাদের ছাপিয়ে যেতে চাইবেন এবং পাল্লা জুড়বেন নিজেদের মধ্যে। তখন ‘আইডিয়াল ইগো’ মমতাকে টার্গেট করে কুকথারও বন্যা বইতে পারে। দীর্ঘকাল চেপে রাখা যন্ত্রণার উপশমের অন্য রাস্তা যে চূড়ান্ত অক্ষমদের অজানা!
বাংলায় ‘পরিবর্তন’ শব্দটি জনপ্রিয় হয়েছিল কার সৌজন্যে? ৩৪ বছরের জগদ্দল সিপিএম-শাহির পরিবর্তন চেয়ে দেড় দশক আগে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন ‘অগ্নিকন্যা’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মুখে ‘পরিবর্তন’ কথাটি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল, সেটাই ছিনতাই করতে মরিয়া বিজেপি। অর্থাৎ মোদি যে ‘আসল পরিবর্তন’ চাইছেন সেটা মমতার আহ্বানের অক্ষম নকল ছাড়া কিছু নয়। বিগত ভোটযুদ্ধে তৃণমূলের স্লোগান ছিল—‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়।’ জননেত্রীর হাসিমুখ ছবি সংবলিত এই স্লোগান ২০২১-এর ফেব্রুয়ারিতে তৃণমূল ভবন থেকে নেট মাধ্যমে প্রকাশ হতেই ৫ ঘণ্টায় ৩৩ লক্ষ শেয়ার হয়েছিল! ভারতে ভোটের বাজারে নিঃসন্দেহে এক প্রকাণ্ড রেকর্ড। ‘বাঁচতে চাই, বিজেপি তাই’—স্লোগানে সবুজ ব্রিগেডের রাজনৈতিক প্রচার কৌশলের ছায়াটাই প্রকট দেখাচ্ছে না কি? ‘জয়শ্রীরাম’ ছেড়ে স্বয়ং মোদি ‘মাকালী’ এবং ‘মাদুর্গা’র নাম জপতে শুরু করেছেন। সোজা কথায়, বাংলার প্রধান বিরোধী দল ভরপুর টোকাটুকির মানসিকতা দিয়েই একটা শুভ কাজে নামার সংকল্প নিয়েছে।
‘মোদির গ্যারান্টি’ দেখে দেখে মানুষ ইতিমধ্যেই ক্লান্ত। মোদির গ্যারান্টি বলতে বাংলার গরিব মানুষগুলি সীমাহীন বঞ্চনার অধিক কিছু পায়নি। একশো দিনের কাজ এবং আবাস যোজনায় টাকা মেলেনি আজও। চাকরি/কর্মসংস্থানের নামগন্ধ নেই। এখন চলছে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ রাজ্যগুলিতে বাঙালি বা বাংলাভাষীদের উপর রকমারি নিপীড়ন। এসআইআর-এর ধুয়ো তুলে এই অত্যাচার বহুবর্ধিত হয়ে উঠেছে। বিজেপির এক ‘মহামানব’ তো নিদান দিয়েছেন, ‘বাংলা কোনও ভাষাই নয়!’ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বভারতীতে অবহেলার শিকার স্বয়ং স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্যদিকে, ‘নাগরিক’ শব্দের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে বৃহৎ প্রশ্নচিহ্ন। স্বাধীনতার আট দশকেও রাষ্ট্র জানে না, কারা তার নাগরিক! আধারসহ রকমারি কার্ড দেওয়া হয়েছে। সবগুলিই তৈরি করা বাধ্যতামূলক। অথচ সেগুলি ‘নির্ভরযোগ্য’ বলে মানেন না সরকার বাহাদুর স্বয়ং! সব মিলিয়ে বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না।
শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী বাংলায় এসে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন। হ্যাঁ, পরিবর্তন অবশ্যই দরকার। তবে মা-মাটি-মানুষের সরকারের নয়, পরিবর্তন জরুরি গেরুয়া অক্ষের। যত জন বিজেপি এমপি, এমএলএ বাংলায় আছেন তাঁদের আসনগুলিতে অবশ্যই পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ যাঁরা ইতিমধ্যেই নিজেদের বাংলা-বিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন তাঁদের জন্য কেন বাংলার কিছু অমূল্য আসন নষ্ট হবে? এঁরা আবার জেতা মানে, বাংলার ক্ষতিবৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করবেন। বাংলার বদনামের বিস্তার ঘটাবেন দেশজুড়ে। মোদির দলের কিছু নেতার কাছ থেকে মাঝেমধ্যে যে ‘গ্যারান্টি’ মেলে তা বঙ্গভঙ্গের রকমারি প্যাকেজ মাত্র। তবে বাংলার মানুষ রুখে দাঁড়াতেই অবশ্য কেউ কেউ ‘থুড়ি’ বলে কথা ঘোরাতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। বাংলার বদনাম বৃদ্ধির জন্য দিল্লিতে অপপ্রচারেও সিদ্ধহস্ত তাঁরা। বাংলার জনমুখী প্রকল্পগুলি রুখে দেওয়ার জন্য দিল্লিতে গিয়ে দরবারেও দড় কেউ কেউ। সোজা কথায়, দেশজুড়ে যে গেরুয়া বিশৃঙ্খলা কায়েম হয়েছে, তাতে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খাচ্ছে উন্নয়ন। এই ধাক্কা কত মারাত্মক হবে তার পরিসংখ্যান পেশে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত এখন আরবিআই এবং এসবিআই!
অন্যদিকে, সংগত কারণেই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রের তোয়াক্কা বোধহয় আর তেমন করেন না। তিনি নিজের মতো করেই একের পর এক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিচ্ছেন। লক্ষণীয় যে তাঁর কাছে বরাবরই অগ্রাধিকার পাচ্ছে ধর্ম বর্ণ ভাষা নির্বিশেষে গরিব এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আর বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং অস্মিতার সঙ্গেও আপস করতে নারাজ তাঁর সরকার।
এখন সত্যিই যদি বাঙালির ভালো চান, তবে বাংলা নিয়ে ব্যক্তিগতভাবেই মাথা ঘামান প্রধানমন্ত্রী। বাংলার প্রাপ্য অর্থ দিন, যাবতীয় বকেয়াসমেত। বাংলার মানুষের হাতে হাতে কাজের ব্যবস্থা করুন। তার জন্য নতুন শিল্প চাই। মোদি দাবি করেছেন, বাংলায় ইলেক্ট্রিক গাড়ি শিল্প গড়তে চান। তবে তার জন্য বাংলাকে বিজেপির হাতে তুলে দেওয়ার শর্ত দিয়েছেন তিনি। আচ্ছা বলুন তো, সদিচ্ছা থাকলে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ কি খুব জরুরি? ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলির হাল নতুন করে বলার কী আছে, এ তো ওপেন সিক্রেট! গোটা দেশটাই টানা তিন টার্ম বিজেপি তথা মোদির হাতের মুঠোয়। বাংলা এই দেশেরই সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলির একটি। মোদি নিজেও সে-কথা মুক্তমঞ্চ থেকে স্বীকার করেছেন। তাহলে যোগ্য দেশনেতা হিসেবে কেন এরাজ্যের আর্থিক বিকাশে তিনি আন্তরিক হবেন না? তার জন্য পৃথকভাবে রাজ্যদখলের অপেক্ষা কেন? সেটা সংকীর্ণ রাজনীতির জুতোয় পা গলানো নয় কি? মোদিকেই বলতে শোনা গেল, বাংলার সার্বিক বিকাশ ছাড়া তাঁর স্বপ্নের ‘বিকশিত ভারত’ নির্মাণ সম্ভব হবে না।
তাঁর কাছে শেষ দাবি, দেশজুড়ে বাঙালি এবং বাংলাভাষীদের অসম্মান বন্ধ করুন। ভুলে যাবেন না, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলা এবং বাঙালির অবদান ও আত্মত্যাগ সবার চেয়ে বেশি। এমন দুর্দশায় পতিত হওয়ার জন্য আমাদের পিতৃপুরুষগণ ইংরেজকে দেশছাড়া করেননি নিশ্চয়। বিজেপির বঙ্গ নেতারা যাতে দ্রুত সেলফ-পানিশমেন্ট প্যারানয়া মুক্ত হতে পারেন, তার জন্য সুচিকিৎসারও ব্যবস্থা করুন। এমন কমপ্লেক্সে যাঁরা ভুগছেন তাঁদের উপর নির্ভর করে আর যাই হোক বাংলা দখল কোনওকালেই সম্ভব হবে না।