সংবাদদাতা, বেলদা: দু’শো বছরের পুরনো দাঁতনের জেনকাপুরের রথে চমক একটাই। এই রথে তিনটি নয়, জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার ছ’টি বিগ্রহ থাকে। রথযাত্রা উপলক্ষে মেলায় জমিয়ে চলে বিকিকিনি। শুধু হিন্দু নন, মুসলিম ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষও জেনকাপুরের এই রথে শামিল হন।
কথিত রয়েছে, রাজা কালীয় গঞ্জন দাঁতনের জেনকাপুরে নিজেদের গড় গড়ে তুলেছিলেন। আর তারপরে এই জেনকাপুরে শুরু হয়েছিল দুর্গাপুজো। তবে রথযাত্রা শুরু হয় তারও অনেক পরে।
মেদিনীপুরের ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, ওড়িশা তথা কলিঙ্গরাজ গঙ্গদেব খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতকে মেদিনীপুর-সহ দক্ষিণ রাঢ় অঞ্চল তাঁর শাসনসীমার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সেই সময় নদী ও সমুদ্র উপকূলবর্তী এই অঞ্চল জলদস্যুদের দাপটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। কলিঙ্গরাজ সেই জলদস্যু দমনে পাঠিয়েছিলেন কালীয় গঞ্জন রায় নামে দোর্দণ্ডপ্রতাপ এক সেনাপতিকে। তিনি বিক্রমের সঙ্গে এখানকার দুই জলদস্যুকে হত্যা করেন। সাফল্যের পারিতোষিক হিসেবে ‘রাজা’ উপাধি ও বেশকিছু তালুক লাভ করেন কালীয় গঞ্জন । ষোড়শ শতক নাগাদ জেনকাপুরে গড়ে ওঠে জমিদারি গড়। কালীয় গঞ্জনের পরবর্তী প্রজন্ম কুঞ্জবিহারী এখানে এসে পাকাপাকিভাবে জমিদারির পত্তন করেন। বর্তমান জমিদার পরিবারের সদস্যরা জানাচ্ছেন, প্রায় দু’শো বছর ধরে চলে আসছে এই রথযাত্রা। জমিদার চৌধুরী ব্রজেন্দ্রনাথ রায়ের আমলেই নাকি রথযাত্রা শুরু হয়। জমিদার পরিবারের বর্তমান সদস্যরা জানান, দাঁতনের শরশঙ্কা এলাকা একসময় জেনকাপুরের জমিদারির অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানকার জগন্নাথ মন্দিরের তিনটি বিগ্রহ দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়েছিল। পরে জেনকাপুরে সেই বিগ্রহগুলিকে আনা হয়। তখন থেকেই এই মন্দিরে রয়েছে ছ’টি বিগ্রহ। রথে সেই ছ’টি বিগ্রহই থাকে। রথ চলে। সঙ্গে হতে থাকে নাম সংকীর্তন। পাশাপাশি চলে আদিবাসী নৃত্যও। প্রায় ২০ ফুটের বেশি উঁচু ৯ চূড়ার এই রথে জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রার ছ’টি বিগ্রহ যাত্রা করেন। এখনও রীতি মেনে জমিদার পরিবারের প্রবীণ সদস্য রথের রশি টেনে রথযাত্রার উদ্বোধন করেন। জমিদার পরিবারের বর্তমান এক সদস্য অতুলকৃষ্ণ রায় বলেন, ১৯৭০ সালে এখানে গড়ে ওঠে ‘শ্রী দুর্গা শ্যামরায়জু ট্রাস্ট’। সেই ট্রাস্ট দুর্গাপূজা ও রথযাত্রার আয়োজন করে। স্থানীয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে স্থায়ী একটি মাসির বাড়িও গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানেই রথের দিন বিগ্রহগুলিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সাতদিন বাদে ফের উল্টো রথে শামিল হন সবাই।-নিজস্ব চিত্র